সাহিত্য একঘেয়েমী থেকে মুক্তি দেয়

একান্ত সাক্ষাৎকারে পূরবী বসু
[ড. পূরবী বসু বাংলাদেশের মুন্সীগঞ্জ জেলার বিক্রমপুরের মেয়ে। বাল্যকাল ও স্কুল জীবনের স্মৃতিঘেরা এই শহর। সেখানেই বেড়ে ওঠা তার। ১৯৬৪ সালে স্থানীয় এভিজেএম গার্লস হাইস্কুল থেকে এসএসসি পরীক্ষায় পাস করে হরগঙ্গা কলেজে অধ্যায়ন। পরবর্তীতে ঢাকার বদরুন্নেসা কলেজ থেকে এইচএসসি।

মুন্সীগঞ্জ শহরের এক জনপ্রিয় চিকিৎসকের কন্যা। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে শেষ করেছেন ফার্মেসিতে অনার্সসহ স্নাতক পর্যায়ের শিক্ষা। তারপর বিদেশ যাত্রা। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মেডিক্যাল কলেজ অভ পেনসিলভ্যানিয়া ও ইউনিভার্সিটি অভ মিসৌরি থেকে লাভ করেছেন যথাক্রমে প্রাণ-রসায়নে এমএস ও পুষ্টিবিজ্ঞানে পিএইচডি। বিজ্ঞানচর্চা তার পেশা। নিউইয়র্কের মেমেরিয়াল স্লোন কেটারিং ক্যান্সার সেন্টারে গবেষণা ও কর্নেল ইউনিভার্সিটিতে অধ্যাপনায় কেটেছে বেশ কিছুকাল। অনেক গবেষণা-প্রবন্ধ প্রকাশিত হয়েছে সারা বিশ্বের নানা নামি জার্নালে। দীর্ঘ বিদেশবাসের পর দেশে ফিরে আসেন এক খ্যাতনামা ঔষধ প্রস্তুত প্রতিষ্ঠানের উচ্চপদে। দেশের সর্ববৃহৎ বেসরকারি প্রতিষ্ঠান ব্র্যাক-এ স্বাস্থ্য বিভাগের পরিচালকও ছিলেন।

প্রথিতযশা লেখক পূরবী বসু বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্র প্রবাসী। স্মৃতি বিজড়িত শহরে বিচরণের এক ফাঁকে তার সাহিত্য জগতে পা রাখা। পূরবী বসুর আরেক পরিচয় হল তিনি খ্যাতিমান লেখক জ্যোতিপ্রকাশ দত্তের স্ত্রী।

বিশিষ্ট পুষ্টিবিজ্ঞানী ও গল্পকার ড. পূরবী বসু প্রবাসী হলেও বাংলা সাহিত্য; সাংস্কৃতিক চর্চা করছেন নিরলসভাবে। তিনি দীর্ঘ প্রায় চার দশক ধরে যুক্তরাষ্ট্রে। বর্তমানে তিনি মধ্য আমেরিকার কলরডো রাজ্যের ডেনবার শহরে নিজের বাড়িতে অবসর জীবনযাপন করছেন।

পূরবী বসুর সাহিত্যকর্ম বিস্তর। ছোট গল্প ও কলাম লিখেই বেশি পরিচিতি। এরই মাঝে নারী নিয়ে লিখেছেন গবেষণাধর্মী বই। সাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধে পূরবী বসুর কলামগুলো খুবই জনপ্রিয়। পূরবী বসুর প্রকাশিত বই এর মাঝে ‘পূরবী বসুর গল্প’ প্রথম প্রকাশিত হয় ১৯৮৯ সালে। তারপর পর্যায়ক্রমে আজন্ম পরবাসী, রাধা আজ রাঁধবে না, নারী ভাবনা, সাম্প্রদায়িকতা বিরোধী গল্প, জোছনা করেছে আড়িসহ গবেষণাধর্মী ‘নোবেল বিজয়ী নারী’ নিয়ে তার বই উল্লেখযোগ্য। পূরবী বসু ৬০ দশকের মাঝামাঝি থেকেই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রী অবস্থায় পত্র-পত্রিকায় লেখালেখি শুরু করেন।

সম্প্রতি পূরবী বসু বেড়াতে এসেছিলেন দেশে। এক ফাঁকে তার এই সাক্ষাৎকারটি নেন কবি ও গল্পকার আশরাফ ইকবাল। ]

লেখক জীবনের শুরু…

ছোটবেলা থেকেই লিখি। প্রথম লেখা স্কুলের হাতে লেখা দেয়াল পত্রিকায়। গোয়েন্দা গল্প- ‘অতীন হত্যা রহস্য”। এ ছাড়া কচিকাঁচার আসর, খেলাঘর, সাত ভাই চম্পা ইত্যাদি ছোটদের আসরে লিখতাম।

জীবনে স্মরণীয় ঘটনা, আনন্দের ঘটনা…

এসএসসির ফলাফলের দিন। আশাতীতভাবে ঢাকা বোর্ডের কম্বাইন্ড মেরিট লিস্টে মেয়েদের মধ্যে প্রথম হই। ছেলেমেয়েদের মধ্যে চতুর্থ। বাবা এত বেশি খুশি হলেন যে, দুপুরে খেতে ডাকলে বাবা হেসে মাকে বললেন, ‘খাবো কী? মেয়ের রেজাল্টটেইতো পেট ভরে গিয়েছে।’ বাবার পরিতৃপ্ত মুখমণ্ডল দেখে, তার কথা শুনে নিজেকে পৃথিবীর সবচেয়ে সুখী মানুষ বলে মনে হয়েছিল।

প্রবাস জীবনের অভিজ্ঞতা…

জীবনের দুই তৃতীয়াংশ কাটলো প্রবাসে। যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন রাজ্যে। এত সময়ের অভিজ্ঞতা কি দু’চার কথায় শেষ করা যায়? তবে এটুকু বলতে পারি প্রবাস জীবনে সব সময়েই মনে হয়েছে বিদেশে আছি। আর প্রায় সব সময়ই দেশে ফিরে আসার প্রতীক্ষাতেই দিন কেটেছে। মানসিকভাবে কখনো দেশ থেকে নিজেকে বিচ্ছিন্ন মনে হয়নি।

সাহিত্য পাতায় প্রথম প্রকাশিত লেখা…

কাগজে প্রথম প্রকাশিত লেখার কথা স্পষ্ট মনে নেই।

লেখার অনুপ্রেরণা কার কাছ থেকে বা কীভাবে পেলেন?

সর্বপ্রথম আমার বাবার কাছ থেকে। তিনি মুন্সীগঞ্জের তৎকালীন জনপ্রিয় ডাক্তার ছিলেন। তরণী রঞ্জন বসু। পরবর্তীতে আমার স্বামী, প্রখ্যাত কথা সাহিত্যিক জ্যোতিপ্রকাশ দত্তের কাছ থেকে। আর সাহিত্যপাতার সম্পাদকদের কাছ থেকেও উৎসাহ পেয়েছি। বিশেষ করে সম্পাদক আবুল হাসনাতের নাম উল্লেখযোগ্য।

অবসরের সময় কাটে…

বই পড়ে, লিখে, গান শুনে, ছায়াছবি দেখে আর বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডা দিয়ে- সরাসরি অথবা টেলিফোনে।

লেখালেখি ছাড়া অন্যান্য পছন্দ-অপছন্দ…

অপছন্দ করি স্বার্থপরতা, সাম্প্রদায়িকতা, কুসংস্কার ও ভণিতা। পছন্দের আছে অনেক কিছুই।

প্রিয় কিছু সাহিত্যিকদের কথা…

যাদের কথা সবাই বলবেন তাদের কথা ছাড়াও কয়েকজন প্রিয় লেখক যেমন- সমরেশ বসু, মানিক বন্দোপাধ্যায়, জ্যোতিপ্রকাশ দত্ত, হাসান আজিজুল হক, জেমস ম্যাককোর্ট, এডুইক ডান্টিকাট, থ্রিটি উরমিগর আমার প্রিয়।

খুব কাছের সাহিত্যিক-বন্ধু…

প্রচুর সাহিত্যিক বন্ধু আছে, নাম বলা সম্ভব নয়।

সামাজিক দায়িত্বে লেখকের দায়িত্ব…

লিখতে হবে। লেখকের দায়িত্বশীলতা রচনার মাধ্যমে।

লেখক হিসেবে সফলতার মাপকাঠি…

পাঠক ও সমালোচক লেখাকে কীভাবে গ্রহণ করলেন, লেখা সময় উত্তীর্ণ কিনা। এগুলো মাপকাঠি হতে পারে।

ব্যর্থতা…

আরও ভাল ও উন্নতমানের লেখা লিখতে না পারা।

আপনার না পাওয়া…

না পাওয়ার অনেক কিছু রয়েছে, যেমন আছে পাওয়ার অনেক কিছুই।

সাহিত্যে স্বীকৃতি…

অনন্যা সাহিত্য পুরস্কার (২০০৫), কথাসাহিত্যে বাংলা একাডেমী পুরস্কার (২০১৩) এইতো। লিখে যাচ্ছি।

আপনার প্রতি পাঠকের আকৃষ্টতার কারণ…

বলতে পারি না। আদৌ আকৃষ্ট হয়েছেন, তার-ও কোন প্রমাণ নেই। বেশি আকৃষ্টের প্রসঙ্গ তাই ওঠে না। আমার কিছু কিছু বই যদিও ভাল বিক্রি হয়, সেটা বইটির জন্য, তার অঙ্গসজ্জা, শিরোনাম না বিষয়, নাকি আমার জন্য, না উভয়ের জন্যই তা আমি জানিনা; পাঠক বলতে পারবেন। যাচাইয়ের মাপকঠি আমি বুঝি না।

প্রকাশিত বই এর সংখ্যা ও একুশে গ্রন্থমেলা-২০১৫ তে বই…

পঁয়ত্রিশটার মত হবে। এবার মেলায় সাতটি বই প্রকাশিত হয়েছে।

সম্প্রীতির জন্য শব্দাবলি- বই সম্বন্ধে জানতে চাই

সাধারণ হিন্দু-মুসলমানের মধ্যে জানাশোনা, বোঝা, সম্প্রীতি বাড়াবার আকাঙ্ক্ষা নিয়ে বইটি রচিত। এটি একটি অভিনব ও মৌলিক গ্রন্থ বলে আমি মনে করি, যার পরিবর্ধন-পরিমার্জন এর যথেষ্ট সুযোগ রয়েছে।

বিক্রমপুর নিয়ে ভাবনা ও দায়িত্বানুভূতি…

অনেক ভাবি। আমার সাধ্যমতো কিছু করার কথা ভাবি, করার চেষ্টা করি।

বিক্রমপুর কেন্দ্রিক পছন্দের লেখা এবং বিক্রমপুরের প্রিয় লেখক…

এত বিস্তৃত উত্তর এত অল্প সময়ে!! পরে কখনো বলবো। তবে অনেক লেখা ও অনেক লেখক পছন্দের…

বর্তমানে বিক্রমপুরের যারা লেখালেখিতে আছেন তাদের সম্পর্কে…

সবার কথা তো জানি না। বিশেষ করে দেশের বাইরে থাকায়। তবে প্রথিতযশা লেখক, কবিদের লেখা পড়েছি-পড়ি। গর্ববোধ করি। এই প্রজন্মের ভেতর বিক্রমপুর নিয়ে নতুন উদ্দীপনা ও তাদের সাহিত্যানুরাগ আমায় মুগ্ধ করে।

অতীতের ধারাবাহিকতায় বিক্রমপুরের সৃজনশীল ব্যক্তিত্ব ইদানীং আসছে না, কারণ…

একেবারে আসছে না এ কথা বলা যায় কি?

একজীবন চর্চায় নিমগ্ন থেকে সাহিত্য সম্পর্কে আপনার উপলব্ধি…

সাহিত্য আমাকে জীবনের একঘেঁয়েমী থেকে মুক্তি দেয়। আমার নান্দনিক বোধ উজ্জীবিত করে। আমাকে চিন্তার খোরাক যোগায়।

ব্যক্তিগত প্রসঙ্গে— সংসার…

আমার স্বামী কথাসাহিত্যিক জ্যোতিপ্রকাশ দত্ত। আমাদের এক কন্যা জয়ীষা। পরিবেশ সচেতনতা সম্পর্কিত একটি এনজিও এর কর্মকর্তা। পুত্র দীপন একজন এ্যাটর্নী।

তরুণ লেখকদের প্রতি…

বলার আছে। অনেক পড়তে হবে- দেশী ও বিদেশী সাহিত্য। আমি নিজেও যথেষ্ট পড়াশোনা করি। লেখার মান উন্নয়নে এক একটি লেখাকে ঘষে মেজে পরিশীলিত করার চেষ্টা করা দরকার, বার বার দরকার। কম্পিউটারে লিখতে শিখলে এটা সহজতর হয়। সমালোচনা সইবার ও গ্রহণ করার উদারতা থাকা দরকার। আর দরকার তাড়াহুড়া করে বই প্রকাশ করার প্রবণতা রোধ করা।

দ্য রিপোর্ট

Comments are closed.