বাউশিয়ায় গার্মেন্ট পল্লী : কাজ পাবেন কয়েক লাখ শ্রমিক

লাবলু মোল্লা: ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের পাশে মুন্সীগঞ্জের গজারিয়ার বাউশিয়া এলাকায় প্রস্তাবিত ‘বাউশিয়া গার্মেন্ট পল্লী’র কাজ এগিয়ে চলছে দ্রুতগতিতে। এ বছরের মার্চের শুরু থেকে পুরোদমে ফের চলছে এ প্রকল্পের জন্য ভূমি অধিগ্রহণ। দেশের অন্যতম গার্মেন্ট পল্লী বাউশিয়া গার্মেন্ট পল্লীর ঝিমিয়ে থাকা কাজ আবার শুরু হয়েছে জোরেশোরে।

জানা গেছে, অধিগ্রহণকৃত ভূমির টাকা বিজিএমইএ যথাসময়ে পরিশোধ করতে ব্যর্থ হওয়ায় এ প্রকল্পের বাস্তবায়ন কাজ কিছুটা বিঘি্নত হয়। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা চীন সফরে গিয়ে ‘বাউশিয়া গার্মেন্ট পল্লী’ প্রকল্প বাস্তবায়নে দেশটির সঙ্গে একটি চুক্তি করেন। প্রকল্প বাস্তবায়নের লক্ষ্যে জেলা প্রশাসনের মাধ্যমে ফের দ্রুতগতিতে শুরু হয় জমি অধিগ্রহণের কাজ। প্রায় পৌনে ৫০০ গার্মেন্ট কারখানা প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে ৫৫০ একর জমি নিয়ে গার্মেন্ট পল্লী বাস্তবায়িত হতে চলেছে। প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে ৮ লাখ নারীশ্রমিকসহ ১০ লাখ মানুষের কর্মসংস্থান হবে। তত্ত্বাবধানে আছে মুন্সীগঞ্জ জেলা প্রশাসন।

বাংলাদেশ সরকারের কাছে জেলা প্রশাসনের মাধ্যমে দেশের তৈরি পোশাক উৎপাদক ও রপ্তানিকারকদের সংগঠন বিজিএমইএর পক্ষ থেকে মুন্সীগঞ্জের গজারিয়ায় এ গার্মেন্ট পল্লীর প্রস্তাবনা পেশ করা হয়। গজারিয়ায় ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের পাশে বাউশিয়ায় প্রস্তাবিত এ গার্মেন্ট পল্লীটি পোশাকশিল্পকে নতুন রূপে দাঁড় করাবে বলে মনে করেন এলাকাবাসী। এ শিল্পের ব্যবসায়ীদের ধারণা, দেশের শীর্ষ রপ্তানি আয়ের খাত পোশাকশিল্পকে একটি শিল্পসহায়ক সুশৃঙ্খল পরিবেশে নিরবচ্ছিন্ন উৎপাদনের নিশ্চয়তা দেবে বাউশিয়া গার্মেন্ট পল্লী।

এটি বাস্তবায়িত হলে প্রায় ১০ লাখ শ্রমিকের কর্মসংস্থান হবে। এ ছাড়া নানা ধরনের বিপত্তিসহ নাশকতার হাত থেকে রক্ষা পাবে এ শিল্প। বাড়বে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ রপ্তানি আয়। বাংলাদেশ এগিয়ে যাবে অর্থনৈতিক মুক্তির পথে। পোশাকশিল্পে বাংলাদেশ এশিয়া মহাদেশ তথা বিশ্বের অন্যতম অপার সম্ভাবনাময়ী দেশ। এ দেশে আছে দক্ষ শ্রমিক ও বিশাল জনশক্তি। আছেন সম্ভাবনাময় উদীয়মান দেশি-বিদেশি বিনিয়োগকারী। সুষ্ঠু ও সুন্দরভাবে এ শিল্পকে পরিচালিত করতে তাই দরকার গজারিয়ায় পোশাকশিল্প বাস্তবায়ন।

এ দেশে রয়েছে সাহসী ও দক্ষ জনশক্তি। রয়েছে গার্মেন্ট পল্লী গড়ে তোলার জন্য উপযুক্ত ভূমি। গজারিয়ার বাউশিয়া গার্মেন্ট পল্লী এর মধ্যে অন্যতম। এ পল্লী বাস্তবায়িত হলে লাখ লাখ মানুষের কর্মসংস্থানের সমাধান হবে। পোশাক খাতে ফিরে আসবে স্বস্তি আর শৃঙ্খলা। দেশে প্রতিষ্ঠিত হবে অর্থনৈতিক মুক্তি। এ শিল্পকে সামনে রেখেই একদিন বাংলাদেশ পৌঁছবে তার কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যে। এ বিষয়ে মুন্সীগঞ্জের জেলা প্রশাসক সাইফুল হাসান বাদল বাংলাদেশ প্রতিদিনকে জানান, সম্ভাবনাময় পোশাকশিল্পের জন্য ঢাকার অদূরে মুন্সীগঞ্জের গজারিয়া উপজেলায় ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের পাশে গার্মেন্ট পল্লীর জন্য বিজিএমইএ মুন্সীগঞ্জ জেলা প্রশাসনের মাধ্যমে সরকারের কাছে ৫৩০ একর জমি চায়।

সে লক্ষ্যে বাউশিয়ায় জমি অধিগ্রহণ প্রক্রিয়া শুরু করা হয়। কিন্তু বিধি মোতাবেক ৬০ দিনের মধ্যে অধিগ্রহণের টাকা রাষ্ট্রীয় কোষাগারে জমা দিতে বিজিএমইএ ব্যর্থ হওয়ায় সেবারের মতো প্রকল্প কাজ পিছিয়ে পড়ে। সাম্প্রতিক সময়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা চীন সফরে গিয়ে দেশটির সঙ্গে গার্মেন্ট পল্লী নির্মাণ নিয়ে একটি চুক্তি করেন। এরই পরিপ্রেক্ষিতে বর্তমান বছর বাউশিয়ায় ভূমি অধিগ্রহণ শুরু হয়েছে। এ প্রকল্পে ৫৩০ একর জমি অধিগ্রহণ করা হবে। এখানে ৪৭৭টি গার্মেন্ট কারখানা গড়ে তোলাসহ আনুষঙ্গিক বিষয়াদি নির্মাণের পরিকল্পনা রয়েছে।

এ ছাড়া এ গার্মেন্ট পল্লীর পাশেই গড়ে তোলা হবে এ খাতের শ্রমিকদের জন্য আবাসন প্রকল্প। এ গার্মেন্ট পল্লী বাস্তবায়িত হলে এ শিল্পে আনবে বৈপ্লবিক পরিবর্তন। রাজধানীতে মানুষের চাপও কিছুটা কমবে। কমবে যানবাহনের চাপ। ফলে ঢাকার যানজট অনেকাংশে কমে আসবে। এ প্রকল্পের সঙ্গে রয়েছে নদীপথের নিবিড় সম্পর্ক। নদীপথে দেশের সর্বত্র এ প্রকল্প এলাকার সংযোগ রয়েছে। এটি একটি আন্তর্জাতিক মানের দৃষ্টিনন্দন শিল্পপার্ক হবে বলেও তিনি অভিব্যক্তি প্রকাশ করেন।

জেলা প্রশাসক জানান, প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে এখান থেকে প্রতি বছর সরকার রাজস্ব পাবে ৫০০ থেকে ৬০০ কোটি টাকা। এ প্রকল্পের ৫৩০.৭৮ একর ভূমির ৩০ শতাংশ থাকবে রাস্তাঘাট ও অন্যান্য অবকাঠামো নির্মাণের জন্য। ৪৭৭টি পোশাক কারখানা ছাড়াও থাকবে ব্যাংক, বীমা, কাস্টমসসহ বিভিন্ন আর্থিক প্রতিষ্ঠানের কার্যালয়, পুলিশ ফাঁড়ি, ফায়ার স্টেশন, রাস্তাঘাট, কালভার্ট, ১০০ শয্যার হাসপাতাল, শিশুদের জন্য ডে-কেয়ার সেন্টার, শিশুপার্ক, ডাকঘর, টেলিযোগাযোগ ব্যবস্থা, তথ্যপ্রযুক্তি সেন্টার, ক্যান্টিন, মসজিদ এবং বিভিন্ন ধর্মাবলম্বীর উপাসনালয়।

এখানে জরুরি অবতরণের জন্য নির্মিত হবে দুটি হেলিপ্যাড, নিজস্ব বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্রসহ সার্বক্ষণিক বিদ্যুৎ, পানি ও গ্যাস সরবরাহ ব্যবস্থা। পরিবেশকে দূষণমুক্ত রাখতে সমগ্র প্রকল্পে থাকবে যথাযথ ব্যবস্থা। প্রকল্প এলাকা জুড়ে থাকবে দৃষ্টিনন্দন লেক ও বনায়ন। গার্মেন্ট পল্লীর শ্রমিকদের বসবাসের জন্য পাশেই থাকবে আবাসন প্রকল্প নামে একটি উপশহর। বাউশিয়া গার্মেন্ট পল্লী বাস্তবায়িত হলে তা হবে আন্তর্জাতিক মানের একটি শিল্পপার্ক।

এ ছাড়া বিজিএমইএ অফিস সূত্রে জানা গেছে, বাউশিয়া গামেন্ট পল্লী বাস্তবায়িত হলে কর্মসংস্থান হবে ১০ লাখ শ্রমিকের, যার প্রায় ৮০ শতাংশই নারী। এ প্রকল্পে পোশাকশিল্প মালিকরা বিনিয়োগ করবেন ১৫ হাজার কোটি টাকা।

এ বিষয়ে মুন্সীগঞ্জ জেলা আইনজীবী সমিতির সভাপতি অ্যাডভোকেট আবদুল মতিন মনে করেন, শ্রমিকদের বসবাসের জন্য এ এলাকাটি হবে খুবই স্বাস্থ্যসম্মত। গজারিয়ার সম্ভাবনাময় এ গার্মেন্ট পল্লী দ্রুত বাস্তবায়িত হবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।

বাংলাদেশ প্রতিদিন

Comments are closed.