পদ্মা সেতুর কাজ চলছে অবিরাম

সেতু নির্মাণে বিশাল কর্মযজ্ঞ চলছে পদ্মা নদীর দুই পাড়ে। নির্দিষ্ট কর্মপরিকল্পনা অনুযায়ী এগিয়ে চলছে দেশের সর্ববৃহৎ প্রকল্প পদ্মা বহুমুখী সেতুর নির্মাণ কাজ। তাই নির্ধারিত সময়ের আগেই প্রকল্পের কাজ শেষ হবে বলে আশা প্রকাশ করেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা। পদ্মা সেতু প্রকল্প বাস্তবায়নের সুবিধার্থে মূল সেতু, নদী শাসন, মাওয়া ও জাজিরা সংযোগ সড়ক নির্মাণ, সার্ভিস এরিয়া এবং তদারকি পরামর্শক সংক্রান্ত মোট ৬টি প্যাকেজে ভাগ করে প্রকল্পের নির্মাণ কাজ চলছে। ইতোমধ্যে পদ্মার দুই পাড়ের সংযোগ সড়কসহ প্রকল্পের নির্মাণ কাজ প্রায় ১৭ শতাংশ শেষ হয়েছে। এছাড়া মূল সেতুর নির্মাণে পাইলিং-এর জন্য নদীতে পাইলিং পাইপ বসানোর কাজ চলছে। আগামী ২০ মার্চ থেকে মূল সেতুর ট্রায়াল পাইলিং শুরু হবে বলে জানান সংশ্লিষ্টরা। এর পরেই শুরু হবে মূল পাইলিংয়ের কাজ। এছাড়া পুনর্বাসন, নদী শাসন, তদারকি ও পরিবেশ কার্যক্রমসহ প্রকল্পের অন্যান্য উন্নয়নমূলক কাজও চলছে একই সঙ্গে।

দেশি-বিদেশিসহ প্রতিদিন প্রায় কয়েক হাজার শ্রমিক নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছে পদ্মা সেতুর বিভিন্ন প্রকল্পে। ৬ দশমিক ১৫ কিলোমিটার দৈর্ঘ্যের দ্বিতল বিশিষ্ট সেতুটি নির্মিত হবে কংক্রিট আর স্টিল দিয়ে। এর উপর দিয়ে গাড়ি ও নিচ দিয়ে ট্রেন চলাচল ব্যবস্থা থাকবে। মূল সেতু, সংযোজ সড়ক ও নদী শাসন সকল প্যাকেজ মিলে সেতু প্রকল্পের জন্য ব্যয় ধরা হয়েছে ২৪ হাজার ৭৭ কোটি টাকা। এর মধ্যে মূল সেতু নির্মাণের কাজ করছে চায়না মেজর ব্রিজ ইঞ্জিনিয়ারিং কনস্ট্রাকশন কোম্পানি। এছাড়া অন্যান্য প্রকল্পে কাজ করছে আলাদা ঠিকাদার প্রতিষ্ঠান। তাই পদ্মা সেতু নির্মাণকে কেন্দ্র করে মুন্সীগঞ্জ জেলার মাওয়া এবং শরিয়তপুর জেলার জাজিরার বিশাল এলাকাজুড়ে চলছে ব্যাপক কর্মতৎপরতা। বিএনপি-জামায়াত জোটের সহিংস অবরোধ ও হরতালের মধ্যেও পদ্মা সেতু নির্মাণ কাজ এগিয়ে চলছে বলে জানান সংশ্লিষ্টরা।

সরেজমিনে পদ্মা সেতু এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, পদ্মা নদীর দুই পারে চলছে ব্যাপক কর্মযজ্ঞ। চলছে সেতুর সঙ্গে সংযোগ স্থাপনের জন্য রাস্তা নির্মাণ, মাটি পরীক্ষা, নদীর ওপর প্লাটফর্ম নির্মাণ, পাইল তৈরিসহ বিভিন্ন কাজকর্ম। এছাড়া নদী তীর থেকে বিশাল ক্রেনের মাধ্যমে মালপত্র উঠানামার কাজ চলছে। পদ্মা নদীর দুই পাড়ে সেতুর সংযোগ সড়ক নির্মাণ কাজ পুরোদমে এগিয়ে চলছে। এপাড়ে মুন্সীগঞ্জ জেলার লৌহজং থানার মেদেনীম-ল ও কুমারভোগ দুটি ইউনিয়নের মধ্যে দিয়ে নির্মাণ করা হচ্ছে এই সংযোগ সড়ক। ওপাড়ে শরিয়তপুর জেলার জাজিরা থানার নাওডোবা ইউনিয়নের মধ্যে দিয়ে সাড়ে ১০ কিলোমিটার সংযোগ সড়ক নির্মাণ কাজ চলছে।

চার লেনের এ সংযোগ সড়কের মাটির ফেলার কাজ প্রায় শেষ পর্যায়ে। কোথাও বিটুমিন ফেলার কাজ শুরু হয়েছে। এই সড়কের মধ্যে ৯৭০ মিটারের ৫টি ছোট সেতু, ১৯টি বক্স কালভার্ট, ৮টি আন্ডার পাস ও টোলবুথ নির্মাণ প্রক্রিয়া চলছে। এজন্য রড, পাথর, বালু, সিমেন্টসহ অন্যান্য উপকরণ জড়ো করা হয়েছে নদীর পাড়ে। নৌপথে আনা বিভিন্ন উপকরণ খালাস কাজ চলছে।

এদিকে প্রায় ২ দশমিক ৫০ কিলোমিটার মাওয়ার সংযোগ সড়কের নির্মাণে মাটি ফেলার কাজ প্রায় শেষ পর্যায়ে। এর মেধ্যেই চলছে টোল বুথ, কলভাটসহ অন্যান্য অবকাঠামো নির্মাণ প্রক্রিয়া। তাই ইট, সুরকি, পাথর, বালু প্রভৃতি জড়ো করা হয়েছে প্রকল্প এলাকায়। প্রতিদিন প্রায় কয়েক হাজার শ্রমিক কাজ করছে প্রকল্প এলাকায়। এ সব শ্রমিক ও ঠিকাদার প্রতিষ্ঠান চায়না মেজর ব্রিজ কর্মকর্তাদের থাকার জন্য মাওয়া ও জাজিরা এলকায় নির্মাণ করা হয়েছে আবাসিক ভবন। এছাড়া প্রকৌশলীদের থাকার জন্য মাওয়া ও জাজিরায় ভাড়া করা হয়েছে ২০টি বাড়ি। শ্রমিকদের থাকার জন্য দুই পাড়ে টিন শেডের প্রায় ২০০ ঘর নির্মাণ করা হয়েছে।

এ ব্যাপারে পদ্মা সেতু প্রকল্পের পরিচালক মো. শফিকুল ইসলাম সংবাদকে বলেন, পদ্মা সেতুর নির্মাণ কাজ স্বাভাবিক গতিতেই চলছে। ইতোমধ্যে দুই পাড়ের সংযোগ সড়কসহ অন্যান্য স্থাপনার প্রাথমিক কাজ এগিয়ে চলছে। এছাড়া মূল সেতু নির্মাণে সয়েল টেস্টের কাজ চলছে। তাই পদ্মা সেতুর নির্মাণ কাজের এই ধারা অব্যাহত থাকলে আগামী চার বছরের মধ্যেই সেতু নির্মাণের কাজ শেষ হবে বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি।

এ সময় নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক পদ্মা এলকায় কর্মরত বাংলাদেশি এক প্রকৌশলী বলেন, ৬ দশমিক ১৫ কিলোমিটার দৈঘ্র্যেরে পদ্মা সেতু ৪২টি পিলারের ওপর নির্মিত হবে। ১৫০ মিটার পরপর পিলার বসানো হবে। পূর্ব ঘোষণা অনুযায়ী গত ১ মার্চ সেতুর টেস্ট পাইল বসানো শুরু হয়েছে। এছাড়া সেতু এলাকার অ্যালাইনমেন্টের কাজ ইতোমধ্যে শেষ হয়েছে। গত বছর ১ নভেম্বর মুন্সীগঞ্জের মাওয়ায় এবং ১৩ নভেম্বর শরিয়তপুরের জাজিরায় মাটি পরীক্ষা করা হয়েছে। তাই ইতোমধ্যে ২৫০ মিটার প্রশস্ত করে চর কাটার কাজ শুরু হয়েছে। তাই দ্রুতই মূল সেতুর কাজ শুরু হবে বলে জানান ওই কর্মকর্তা।

তিনি আরও বলেন, পদ্মা সেতু নির্মাণে প্রায় ১ হাজার ১০০ একর জমি অধিগ্রহণ করা হয়েছে। ক্ষতিগ্রস্তদের জন্য মুন্সীগঞ্জ, শরিয়তপুর ও মাদারীপুরে চারটি পুনর্বাসন কেন্দ্র স্থাপন করা হয়েছে। এ পর্যন্ত সব মিলিয়ে প্রকল্পটির বাস্তব অগ্রগতি ১৭ শতাংশ। আর্থিক অগ্রগতি ২৩ শতাংশ।

এ বিষয়ে সেতু বিভাগের সচিব খন্দকার আনোয়ারুল ইসলাম বলেন, দেশের সর্ববৃহৎ এ অবকাঠামো নির্মাণ হুট করেই শুরু করা যাবে না। এজন্য পদ্মা সেতুর নির্মাণে আগেই কর্মপরিকল্পনা করা আছে। সে অনুযায়ী এগিয়ে চলেছে প্রকল্পের বাস্তবায়ন। এখন পর্যন্ত ১৭ শতাংশ বাস্তব অগ্রগতি হয়েছে। পরিকল্পনা অনুযায়ী ২০১৮ সালের ডিসেম্বরেই এর উদ্বোধন করা যাবে আশা করা যায়।

সেতু সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের সঙ্গে আলাপ করে জানা গেছে, দক্ষিণ পশ্চিমাঞ্চলের ২১ জেলার সঙ্গে ঢাকাসহ সারা দেশের সরাসরি সড়ক যোগাযোগ স্থাপনের লক্ষ্যে গত বছরের নভেম্বর মাসে শুরু হয়েছিল পদ্মা সেতু প্রকল্পের কাজ। ২০১৮ সালে পদ্মা সেতু দিয়ে চলাচল করবে যানবাহন ও রেল এই কর্মপরিকল্পনা নিয়েই এগুচ্ছে সবকিছু। নিরলসভাবে এগিয়ে যাচ্ছে সংযোগ সড়ক, ইঞ্জিনিয়ার ও শ্রমিকদের আবাসন, সংযোগ সড়কে থাকা কালভার্ট, সংযোগ সড়কের পাশের সার্ভিস রোড় তৈরি, ওয়ার্কশপ, টোল প্লাজা, ড্রেজিং ও ক্ষতিগ্রস্তদের পুনর্বাসন কাজ। ভারি ভারি নির্মাণ যন্ত্র দিয়ে চলছে পাথর কাটা, মাটি কাটা, মাটি ভরাট, রাস্তা সমান করার কাজ। ওয়েল্ডিংয়ের আলোর ঝলকানি আর ভারি যন্ত্রপাতির শব্দে মুখরিত জাজিরার পদ্মাপাড়। চীন থেকে ইতোমধ্যে তিনশর অধিক প্রকৌশলী এসেছেন আরও কয়েক শতাধিক আসার কথা রয়েছে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট সূত্র।

জানা গেছে, ৬.১৫ কিলোমিটার সেতু প্রকল্পের জন্য ব্যয় ধরা হয়েছে ২৪ হাজার ৭৭ কোটি টাকা। এর মধ্যে মূল সেতুর জন্য ১২ হাজার ১ শত ৩৩ কোটি ব্যয় ধরা হয়েছে। দুই পারের ১৩ কিলোমিটার নদী শাসনের জন্য ৮ হাজার ৭ শত ৭ কোটি টাকার কাজ করছে চায়না সিনোহাইড্রো কর্পোরেশন। ৩ বছরের মধ্যে কাজ শেষ করার শর্তে ১ হাজার ৯৭ কোটি টাকা ব্যয়ে সংযোগ সড়ক ও টোল প্লাজা নির্মাণ কাজ শুরু করেছে যৌথভাবে আবদুল মোনেম নিমিটেড ও মালয়েশিয়ার এইচসিএম নামের দুইটি ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠান।

২৫ মিটার প্রস্থ মোট ১২.১৬ কিলোমিটার সংযোগ সড়কের মধ্যে জাজিরা পয়েন্টে সারে দশ কিলোমিটার দৈঘ্র্যের ৪ লেন বিশিষ্ট সংযোগ সড়কের কাজ চলছে দ্রুততার সঙ্গে। প্রকল্পের মেয়াদ শেষ হওয়ার আগেই সংযোগ সড়ক নির্মাণ সম্পন্ন করে তা মানুষের ব্যবহারের জন্য উন্মুক্ত করে দেয়ার বিষয়টি ভেবে দেখছে সরকার। ১৭ হাজার কোটি টাকা ব্যয় নির্ধারণ করে ঢাকার গেন্ডারিয়া থেকে ফরিদপুরের ভাঙ্গা পর্যন্ত ৮২.৩২ কিলোমিটার রেল পথ নির্মাণ করা হবে। যার জন্য রেল বিভাগ ৩৬৫ হেক্টর জমি অধিগ্রহণ করছে।

জাজিরার নাওডোবায় সার্ভিস এরিয়া-২ এর অধীনে পদ্মা রিসোর্ট নির্মাণ করা হবে। এখানে ১টি মোটেল ম্যাস, ১টি রিসোর্ট অভ্যার্থনা কেন্দ্র, ১টি সুপারভেশন অফিস ও ৩০টি ডুপ্লেক্স ভবন নির্মাণের কাজও দ্রুত গতিতে এগোচ্ছে যা নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে সম্পন্ন হবে বলে আশা করছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা। এ দিকে প্রকল্পের সকল কাজ তদারকির দায়িত্ব দেয়া হয়েছে দক্ষিণ কোরিয়ার কোরিয়ান এক্সপ্রেসওয়ে ও বাংলাদেশ সেনাবাহিনীকে।

নাওডোবার বাসিন্দা সিরাজুল ইসলাম পদ্মা সেতুর জন্য তার ভিটেবাড়ি দিয়ে মনোকষ্টে থাকলেও সেতু নির্মাণের কাজ দেখে ভিটেহারানোর কথা ভুলে গিয়ে বলেন, এই সেতু নির্মাণ হওয়ায় আমাগো জমির দাম কয়েক গুণ বেড়ে গেছে। এখানে কলকারখানা হইলে আমাগো ছেলে পেলে কাম কইরা বাঁচতে পারবো। য্যামনে কাম হইতাছে তাতে বেশি দিন লাগবো না।

বাংলাদেশি শ্রমিক কামাল হোসেন বলেন, আমরা দেশি ও বিদেশি সকল শ্রমিকই রাত দিন কাজ করছি। দিন রাত কাজ করেও আনন্দিত। কারণ দেশের সর্ব বৃহৎ কাজের আমি নিজেও একজন অংশীদার।

আবদুল মোনেম লিমিটেড ইঞ্জিনিয়ার এবিএম ফুয়াদ আহম্মেদ, পদ্মা ব্রিজের মূল কাজের পাশাপাশি এর আনুসাঙ্গিক কাজও দ্রুত গতিতে বাস্তাবায়ন করা হচ্ছে। প্রতিদিন ডিজিটালি কাজের হিসাব রাখা হচ্ছে। সন্তোষজনক গতিতেই কাজ এগিয়ে যাচ্ছে।

সংবাদ

Comments are closed.