গজারিয়ায় অবৈধ গ্যাস সংযোগের উৎসব

রাজধানীসহ আশ-পাশের জেলাগুলোয়
অবৈধ গ্যাস সংযোগ নিয়ন্ত্রণে সম্পূর্ণ ব্যর্থ হয়েছে দেশের সবচেয়ে বড় গ্যাস বিতরণ প্রতিষ্ঠান তিতাস গ্যাস ট্রান্সমিশন এন্ড ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি লিমিটেড (তিতাস গ্যাস)। রাজধানীর আশেপাশের জেলাগুলোতে প্রতিনিয়ত বাড়ছে অবৈধ সংযোগের সংখ্যা। রাজধানীর উত্তরে সাভার, টঙ্গী, গাজীপুরের কালিয়াকৈর, নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জ, সোনারগাঁ, নরসিংদীর পাঁচদোনা, গাবতলী এবং মুন্সীগঞ্জের গজারিয়ায় অবৈধ গ্যাস সংযোগ নেয়ার হিড়িক পড়েছে। স্থানীয় পর্যায়ে তিতাসের কর্মচারী, তালিকাভুক্ত ঠিকাদার, ট্রেড ইউনিয়নের নেতা এবং সংশ্লিষ্ট এলাকার প্রশাসন ও পুলিশকে ম্যানেজ করেই চলছে এসব অবৈধ সংযোগের কাজ। দিনের আলোতে মাইলের পর মাইল রাস্তা খুঁড়ে এসব অবৈধ সংযোগ টানা হচ্ছে। স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও সরকারিদলের প্রভাবশালী নেতারাই নিয়ন্ত্রণ করছে এসব অবৈধ গ্যাস সংযোগ প্রদানের প্রক্রিয়া। হাতিয়ে নিচ্ছে কোটি কোটি টাকা।

এদিকে গ্যাস স্বল্পতার কারণে বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। বন্ধ রাখা হচ্ছে সারকারখানা। সরকার আবারও গ্যাসের দাম বাড়ানোর কথা ভাবছে। তবে অবৈধ সংযোগ উচ্ছেদ অভিযানে উল্লেখযোগ্য সফলতা অর্জন করতে পারেনি সরকার। কিছু স্থানে অভিযান চালানো হলেও বেশিরভাগ অবৈধ সংযোগ রয়ে গেছে ধরা-ছোঁয়ার বাইরে। আর প্রতিদিনই বাড়ছে অবৈধ সংযোগের সংখ্যা। নকশাবহির্ভূত এলাকায় রাস্তা খুঁড়ে অবৈধ লাইন টানা হচ্ছে। দেখেও না দেখার ভান করছে প্রশাসন।

জ্বালানি বিশেষজ্ঞদের মতে, দেশে গ্যাসের প্রমাণিত মজুদ অনুযায়ী আগামী দশ থেকে বার বছরেই গ্যাস ফুরিয়ে যাবে। দেশের ষোল কোটি মানুষের এই সম্পদ ভোগ করছে অল্প কিছু মানুষ। অবশিষ্টদের জন্য কিছুই করতে পারেনি সরকার। এ খাতে বিশাল অঙ্কের রাজস্ব আসছে। তবে অবৈধ সংযোগ ব্যাপকভাবে বেড়ে যাওয়ায় মোটা অবৈধ অঙ্কের রাজস্ব হাতছাড়া হয়ে যাচ্ছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, প্রশাসন চাইলে শুরুতেই গ্যাসের অবৈধ বিতরণ লাইন বসানো বন্ধ করে দিতে পারে। কিন্তু তারা দেখেও না দেখার ভান করে থাকে। এসব অবৈধ সংযোগের টাকার একটা ভাগ তাদের পকেটেও যায়। পরবর্তীতে কিছু দায়সারা অভিযান পরিচালনা করে তারা সরকার ও জনগণের সাধুবাদ পেতে চায়।

এ বিষয়ে তিতাসের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (চলতি দায়িত্ব) প্রকৌশলী নওশাদ ইসলাম বলেন, কোথায় কোথায় অবৈধ সংযোগ হচ্ছে আমরা সবকিছুই জানি। কিন্তু প্রশাসনের অসহযোগিতা এবং রাজনৈতিক কারণে আমরা অসহায় হয়ে পড়েছি। তিনি বলেন, সংশ্লিষ্ট সব জায়গায় আমরা রিপোর্ট করে যাচ্ছি। আমরা শেষ পর্যন্ত চেষ্টা করে যাব এসব অবৈধ সংযোগ উচ্ছেদ করতে। তিনি বলেন, সাধারণ মানুষের উদ্দেশে আমরা বলব কেউ যাতে টাকা দিয়ে অবৈধ সংযোগ না নেয়।

সরেজমিন দেখা গেছে, নারায়ণগঞ্জের সোনারগাঁ উপজেলার বৈদ্যেরবাজার ইউনিয়নে চলছে অবৈধ গ্যাস সংযোগের হিড়িক। দশ-বার কিলোমিটার বিতরণ লাইন সম্প্রসারণের মাধ্যমে ইউনিয়নের এগারটি গ্রামে অবৈধ সংযোগ প্রদানের কাজ করছে এলাকার প্রভাবশালী মহল। প্রশাসনকে মোটা অঙ্কের টাকা দিয়ে ম্যানেজ করা হয়েছে। স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতা উলুকান্দি গ্রামের রব ডাক্তারের নেতৃত্বে গ্রামে গ্রামে সাব-কমিটি করে টাকা উঠানো হচ্ছে। রাইজারপ্রতি নেয়া হচ্ছে এলাকাভেদে পঁচিশ থেকে ত্রিশ হাজার টাকা। হামছাদী গ্রামসহ কয়েকটি গ্রামে সংযোগ চালু হয়ে গেছে। আগামী এপ্রিলে প্রতিটি গ্রামেই সংযোগ চালু হয়ে যাবে বলে এলাকাবাসীর সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে।

তিতাসের সোনারগাঁ অফিসে কথা বললে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক কর্মকর্তা বলেন, এসব অবৈধ সংযোগের সঙ্গে তিতাস গ্যাস কর্মচারী ইউনিয়নের সভাপতি মো. দেলোয়ার চৌধুরী জড়িত। তার ব্যক্তিগত নিয়োগও সোনারগাঁ অফিসে। তিনি সেখানে মাসে একদিন অফিস করেন। তার ছেলে রাজীব তার হয়ে নিয়মিত তিতাসের সোনারগাঁ অফিসে কাজ করছেন। তবে এ বিষয়ে দেলোয়ার চৌধুরী বলেন, অবৈধ সংযোগের সঙ্গে আমি সম্পৃক্ত নই। আমার ছেলে রাজীব সোনারগাঁয় ‘ডেইলি বেসিস’-এ কাজ করে।

এদিকে মুন্সীগঞ্জের গজারিয়ায় দীর্ঘদিন চলছে অবৈধ সংযোগের কাজ। উপজেলার আটটি ইউনিয়নের মধ্যে ইতিমধ্যে বালুয়াকান্দি, বাউশিয়া, ভবেরচর, টেঙ্গারচর, ইমামপুর ইউনিয়নের অনেক গ্রামেই অবৈধ সংযোগ নেয়া সমাপ্ত হয়েছে। তিতাস গ্যাস একবার অভিযান চালিয়ে মহসড়কের সঞ্চালন লাইন থেকে দুইটি বিতরণ লাইনের সংযোগ বিচ্ছিন্ন করলেও তারা চলে যাওয়ার পর আবার সেই সংযোগ চালু করা হয়েছে। এবার উপজেলার অবশিষ্ট এক-চতুর্থাংশ এলাকায় অবৈধ গ্যাস সংযোগের আওতায় আনার প্রকল্প হাতে নিয়েছেন সরকারি দলের দুই প্রভাবশালী নেতা। উপজেলার হোসেন্দী এবং গজারিয়া ইউনিয়নের সবগুলো গ্রামে অবৈধ সংযোগ দেয়ার উদ্যোগ নিয়েছেন তারা। এদের মধ্যে একজন মুন্সীগঞ্জ জেলা আওয়ামী লীগের বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিষয়ক সম্পাদক এবং গজারিয়া ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মো. শফিউল্লাহ শফি এবং অপরজন গজারিয়া উপজেলা ছাত্রলীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক এবং হোসেন্দী ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মো. মনিরুল হক মিঠু।

নির্ভরযোগ্য একাধিক সূত্রে জানা গেছে, দুই ইউনিয়নে অবৈধ গ্যাস সংযোগ নেয়ার বিষয়ে উভয় চেয়ারম্যানসহ স্থানীয় প্রভাবশালী মহল মিঠু চেয়ারম্যানের বড়ভাই (ঢাকা মেডিকেল কলেজের সহকারী অধ্যাপক) এর বাসায় বৈঠক করেছেন। বৈঠকে দুই ইউনিয়নের বিরোধ নিষ্পত্তি হওয়ার পর উভয় চেয়ারম্যান প্রতিটি গ্রামে সাব-কমিটি গঠন করে গ্যাস সংযোগের কাজ শুরু করেছেন।

জানা গেছে, দুই ইউনিয়নের অন্তত বিশটি গ্রামে অবৈধ গ্যাস সংযোগ দেয়ার উদ্যোগ নিয়েছেন এই দুই নেতা। গজারিয়া ইউনিয়নের পনের-ষোলটি গ্রামে তিন থেকে সাড়ে তিন হাজার রাইজার এবং হোসেন্দী ইউনিয়নের পাঁচ-ছয়টি গ্রামে বারশ’ থেকে পনেরশ’ রাইজার বাসানো হবে। প্রতি রাইজারের জন্য গ্রাহকের কাছ থেকে এলাকাভেদে ত্রিশ থেকে পঁয়ত্রিশ হাজার টাকা নেয়া হবে। সে হিসেবে প্রায় পাঁচ হাজার রাইজারের জন্য পনের কোটি টাকা সংগ্রহের কাজে নেমেছে এই চক্র। সরেজমিন দেখা গেছে, ইউনিয়নের প্রায় পাঁচ কিলোমিটার এলাকায় লাইন বসানোর কাজ শেষ করেছে তারা। আরও আট-নয় কিলোমিটার লাইন বাসানো হবে। সড়ক দিয়ে বিতরণ লাইন বসানোর পর বিতরণ লাইন থেকে দশ ফুট পাইপ বসিয়ে দেবে এই চক্র। একটি রাইজারে দুইজন গ্রাহক গ্যাস নিতে পারবে। এজন্য তারা গ্রাহকের কাছ থেকে ত্রিশ-পঁয়ত্রিশ হাজার টাকা করে নিচ্ছে। লাইন টানা এবং অন্যান্য স্থাপনার কাজ গ্রাহককে নিজ খরচে করতে হবে।

স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, মোটা অঙ্কের লাভের আশায় গজারিয়া ইউনিয়ন চেয়ারম্যান মো. শফিউল্লাহ নিজেই এই প্রকল্পে বিনিয়োগ করছেন। সম্প্রতি প্রায় ২৫ লাখ টাকার পাইপ (গ্যাস বিতরণ পাইপ) কিনে তিনি গজারিয়া ইউনিয়ন পরিষদ ভবনের নিকটবর্তী টিএন্ডটি অফিস সংলগ্ন একটি বাড়িতে সংরক্ষণ করেছেন। জানা গেছে, দুই ট্রাক বোঝাই পাইপ এনে স্থানীয় প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সাবেক শিক্ষক সৃজন মাস্টারের বাড়িতে রাখা হয়েছে।

এ বিষয়ে চেয়ারম্যান মো. শফিউল্লাহ বলেন, সব গজারিয়াই গ্যাসের আওতায় এসে গেছে। তবে তার ইউনিয়নে এখনও কোথাও কোন গ্যাস সংযোগ দেয়া হয়নি। পাইপ সংরক্ষণের বিষয়ে তিনি বলেন, এই পাইপ তিনি ক্রয় করেননি। কে-বা-কারা এই পাইপ কিনেছে এ বিষয়ে তিনি কিছু জানেন না।

অবৈধ সংযোগের বিষয়ে ইতিপূর্বে নারায়ণগঞ্জ-৩ (সোনারগাঁ) আসনের জাতীয় পার্টির সংসদ সদস্য লিয়াকত হোসেন খোকা এবং মুন্সীগঞ্জ-৩ (গজারিয়া ও মুন্সীগঞ্জ সদর) আসনের সরকারি দলের সংসদ সদস্য অ্যাডভোকেট মৃণাল কান্তি দাসের সঙ্গে কথা হয়। লিয়াকত হোসেন খোকা বলেন, আমি অবৈধ সংযোগের বিরুদ্ধে। যারা এসব সংযোগ দিয়েছে তাদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণের আহ্বান করছি। তবে ইতিপূর্বে যেসব মানুষ টাকা দিয়ে এসব সংযোগ নিয়েছে তাদের সংযোগ যেন বৈধ করে দেয়া হয় সে বিষয়ে মন্ত্রণালয়ে আমি চিঠি দিয়েছি। অ্যাডভোকেট মৃণাল কান্তি দাস বলেন, যারা অবৈধ গ্যাস সংযোগ দিচ্ছেন তারা জাতির শত্রু। অবৈধ সংযোগের সঙ্গে জড়িত না হতে গজারিয়ায় আইনশৃঙ্খলা মিটিংয়ে আমি সব চেয়ারম্যান মেম্বারকে আহ্বান জানিয়েছি। প্রশাসনকেও নির্দেশ দিয়েছি অবৈধ সংযোগ গ্রহণকারীদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণের।

নরসিংদীর মাধবদী, পাঁচদোনা, বাগহাটা, ঘোড়াদিয়া, দাসপাড়া, হাজীপুর, গাবতলীসহ বিভিন্ন এলাকায় মাইলের পর মাইল অবৈধ সংযোগ নেয়া হচ্ছে। কয়েকটি এলাকায় তিতাস অভিযান চালিয়েছে। তবে ছাত্রলীগের হাতে ম্যাজিস্ট্রেটসহ তিতাসের কর্মকর্তাদের লাঞ্ছিত হওয়ার ঘটনাও ঘটেছে। এছাড়া আরও কয়েক জায়গায় এলাকাবাসী অভিযান প্রতিহত করতে লাঠিসোটা নিয়ে বেরিয়েছে। এদিকে সাভার, টঙ্গী, আশুলিয়া, গাজীপুরের কালিয়াকৈর, নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জের বিভিন্ন ইউনিয়নেও চলছে অবৈধ গ্যাস সংযোগ নেয়ার হিড়িক। মাঝে মাঝে অভিযান চালিয়ে তিতাস গ্যাস কো. কিছু কিছু এলাকায় অবৈধ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করছে। তবে অভিযান শেষে পুনঃসংযোগ নিয়ে নিচ্ছে স্থানীয়রা।

সংবাদ

Comments are closed.