মুন্সীগঞ্জের আলু : উৎপাদন কম ও হরতাল-অবরোধে বিপাকে চাষীরা

মুন্সীগঞ্জে পুরোদমে আলু উত্তোলন চলছে। গত দু-দিন মুন্সীগঞ্জে বৃষ্টি হওয়ায় আলু জমি ভিজে রয়েছে তাই আলু উঠানো কাজে বিঘ্ন ঘটছে। শুক্রবার সরেজমিনে টঙ্গীবাড়ী উপজেলার হাসাইল, পাচগাঁও, কামারখাড়া ইউনিয়নের বিভিন্ন কৃষি জমিতে ঘুরে দেখা গেছে কৃষকরা তাদের আলু ক্ষেতের কেইল (আলুর সারি) লাঙল দিয়ে চিরে রোদে আলু শুকাতে দিয়েছেন। রোদে শুকানোর পর এ সমস্ত আলু দুপুরের দিকে মাটি হতে আলাদা করে ঝুড়ি ভরে কেউ বাড়িতে কেউ জমির মধ্যে সংরক্ষণ করছেন।

এ বছর আলুর চামড়ায় ঘায়ের মতো স্পট হয়ে অনেক আলু নষ্ট হয়ে গেছে। উৎপাদনও হয়েছে অন্যান্য বছরের তুলনায় কম। উৎপাদন কম, আলু নষ্ট হয়ে যাওয়া এবং আলুর মূল্য উৎপাদন খরচের চেয়ে কম হওয়ায় হতাশায় দিন কাটছে আলু চাষীদের। ইতিমধ্যে উঁচু অঞ্চল মুন্সীগঞ্জ সদর উপজেলা এবং সিরাজদিখান উপজেলার অনেকাংশের আলু উত্তোলন শেষ পর্যায়ে এবং নিচু অঞ্চল বিশেষ করে টঙ্গীবাড়ী, লৌহজং, শ্রীনগরসহ সিরাজদিখানের নিচু জমির কৃষকরা সবেমাত্র আলু উত্তোলন শুরু করেছেন। আলু উৎপাদনের মৌসুমে এ বছর বিরুপ আবহাওয়া বিরাজ করায় আলু জমিতে নাবিধসা ও পচন রোগ দেখা দেয়ায় অন্য বছরের তুলনায় অনেক জমিতে আলু উৎপাদন কম হয়েছে বলে জানালেন আলু চাষীরা।

যেসব জমিতে পচন রোগ দেখা দেয়নি সেই জমির আলু গাছ এখনও তাজা থাকায় এবং কিছুদিন আগে বৃষ্টি হওয়ায় এ জমিগুলোতে বাম্পার ফলন আসা করছেন তারা। তবে টানা অবরোধ ও হরতালের কারণে আলু কেনাবেচায় ধস নেমেছে। জেলার ৫০ হাজার আলু চাষীর মাথায় হাত পড়েছে। একদিকে উৎপাদন কম অন্যদিকে আলু বিক্রি করতে না পারা এ যেন তাদের মড়ার উপর খাঁড়ার ঘা। গত বছর প্রচুর পরিমাণ আলু বিদেশে রফতানি হওয়ায় আলু উত্তোলনের শুরুতে এবার লাভের আসা করছিল তারা।

কিন্তু হরতালের কারণে পরিবহনের অভাবে দেশের বড় বড় মোকামের পাইকাররা হাত গুটিয়ে বসে আছেন ফলে দেশ-বিদেশে আলু রফতানি হুমকির মুখে পড়েছে। মুন্সীগঞ্জের চাষীদের কাছ থেকে আলু কিনছেন না পাইকাররা। টঙ্গীবাড়ী উপজেলার পাঁচগাঁও গ্রামের কৃষক আলি ইসলাম জানান, এ বছর আলু ফলন খুব কম হয়েছে এবং তার জমির ২৫ ভাগ আলুর চামড়ার ওপরে ঘায়ের মতো হয়ে নষ্ট হয়ে গেছে। জমিতে ৭-৮ টাকা কেজি দরে আলু বিক্রি হলেও সব-সময় পাইকার খুঁজে পাচ্ছেন না। সে আরও জানাল, তাদের প্রতি কেজি আলু উৎপাদন করতে ১০-১২ টাকা খরচ পড়েছে।

জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতর সূত্রে জানা গেছে, দেশের বৃহৎ আলু উৎপাদনকারী অঞ্চল মুন্সীগঞ্জে এবার ৩৭ হাজার ৬শ হেক্টর জমিতে প্রায় ১৩ লাখ মেট্টিক টন আলু উৎপাদিত হবে। এর মধ্যে সাড়ে ৪ লাখ টন আলু জেলায় সচল থাকা ৬৭টি কোল্ড স্টোরেজে সংরক্ষণ করা সম্ভব। বাকি ৯ লাখ টন আলু বাজারজাতকরণ ও বাড়ির আঙ্গিনায় গোলাঘরে, আলু জমিতে সংরক্ষণ করে কৃষক।

রাজনৈতিক অস্থিরতা ও হরতালের কারণে এখন মুন্সীগঞ্জ জেলার মাঠে-ময়দানে খোলা আকাশের নিচে লাখ লাখ বস্তাভর্তি আলু স্তূপ আকারে রয়েছে। এমনিতে এবার মুন্সীগঞ্জে উৎপাদন হওয়া প্রায় ৯ লাখ মেট্টিক টন আলু কোল্ড স্টোরেজের অভাবে সংরক্ষণ করতে পারছেন না চাষীরা। উপরন্তু সীমিত সংখ্যক কোল্ড স্টোরেজগুলোতে অগ্রিম কোটা বিক্রি হয়ে যাওয়ায় উৎপাদিত আলু সংরক্ষণ নিয়ে দুশ্চিন্তায় পড়েছেন চাষীরা। প্রান্তিক চাষীদের বাইরে আলু ব্যবসায়ী ও এলাকার প্রভাবশালী কৃষকরা আগে থেকেই অগ্রিম হিমাগারগুলোর কোটা কেটে রাখায় এই মৌসুমে বিজ আলু সংরক্ষণ করতে প্রান্তিক চাষীদের হিমশিম খেতে হচ্ছে।

যুগান্তর

Comments are closed.