আলুর বীজ ভালো তো ফলন ভালো

মুন্সিগঞ্জ থেকে ১৫ বছর আগে ভোলার সদর উপজেলার ইলিশা গুপ্তমুন্সিবিলে আলু চাষ করতে আসেন শাজাহান ব্যাপারী (৫৫)। এর আগে ভোলায় আলু চাষ হতো না বললেই চলে। শাজাহানের দেখাদেখি বিল থেকে ইউনিয়নে, ইউনিয়ন থেকে জেলায় ছড়িয়ে পড়ে আলু চাষ। গুপ্তমুন্সিবিলের আলুচাষি মো. সামসুদ্দিন ব্যাপারী (৪৭) প্রথম বছর ৪৮ শতাংশ জমিতে আলু আবাদ করে লাভবান হন। ১৪ বছর ধরে তিনি আলু চাষ করছেন। চলতি বছর ২২ একর জমিতে আলুর আবাদ করেছেন। প্রায় ১৩ লাখ টাকা খরচ করে প্রায় ২৬ লাখ টাকার আলু পেয়েছেন।

সামসুদ্দিন ব্যাপারী বলেন, ভোলায় আলু চাষ বাড়াতে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের কোনো ভূমিকা নেই। বরং তারা বিগত বছর নিম্নমানের আলুবীজ দিয়ে কৃষকের ক্ষতি করেছে। গত বছর বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন করপোরেশনের (বিএডিসি) অনেক আলুবীজ থেকে এক মাসেও চারা না গজানোয় চাষিদের মাথায় হাত পড়েছিল। এ কারণে উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা অর্জিত হয়নি চাষিদের। ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন অনেকে। এ বছর আলুচাষিরা মুন্সিগঞ্জ থেকে আলুর বীজ সংগ্রহ করেছেন।

ভোলা সদর, বোরহানউদ্দিন, দৌলতখান, চরফ্যাশনসহ জেলার বিভিন্ন উপজেলায় আলুচাষিদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ভোলার আলুচাষিদের প্রধান সমস্যা উন্নত বীজসংকট। এ ছাড়া কৃষি কর্মকর্তাদের পরামর্শ, ঋণের ব্যবস্থাসহ সুবিধা-অসুবিধা দেখার জন্য পাওয়া যায় না বলে অভিযোগ আছে।

ইলিশার গুপ্তমুন্সিবিলের আলুচাষি মো. জুয়েল, আলাউদ্দিন; বাপ্তা সুন্দরখালীর আবু কালাম, আবদুর রহিম ও বোরহানউদ্দিন উপজেলার কুতুবা ইউনিয়নের রানীগঞ্জের আলুচাষি ছগির মাস্টারসহ অনেক কৃষক একই রকম অভিযোগ করে বলেন, যাঁরা উন্নত আলুবীজ লাগিয়েছেন, তাঁদের ফলন একরপ্রতি ৪০০ থেকে ৪৫০ মণ হয়েছে। আর যাঁরা উন্নত বীজ পাননি, তাঁদের ফলন ভালো হয়নি। কিন্তু খরচ একই রকম হয়েছে।

চাষিরা আরও বলেন, গত মৌসুমে আলু পাইকারি বাজারে চার-পাঁচ টাকা কেজি দরে বিক্রি হয়েছে। এ বছর ঢাকার বাজারে আলু ৯-১০ টাকা কেজি হলেও ভোলায় সর্বোচ্চ আট টাকায় বিক্রি হচ্ছে। তার পরও চাষিরা দ্বিগুণ লাভ করেছেন বলে জানান তাঁরা।

আলুচাষিরা আরও বলেন, দাম ভালো পেয়ে কৃষকেরা আলু সংরক্ষণ না করে সরাসরি খেতেই পাইকারদের কাছে বিক্রি করে দিচ্ছেন। বিগত সময়ে ভোলায় কোনো হিমাগার ছিল না। এ বছর একটি হিমাগার নির্মিত হওয়ায় আলু সংরক্ষণের উদ্যোগ নিয়েছেন চাষিরা। তবে ভাড়া বেশি হওয়ায় অনেকে শুধু বীজের আলু সংরক্ষণ করছেন।

ভোলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর জানায়, ২০১১ সালে ২ হাজার ৫৫ হেক্টর, ২০১২ সালে সাড়ে তিন হাজার হেক্টর, ২০১৩ সালে ৩৬৫ হেক্টর, ২০১৪ সালে ৫ হাজার ৬৬০ হেক্টর এবং চলতি বছর ৬ হাজার ৩২০ হেক্টর জমিতে আলুর আবাদ হয়েছে। চলতি বছর উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ১ লাখ ৮৯০ মেট্রিক টন থাকলেও গড় উৎপাদন হয়েছে ১ লাখ ৫১ হাজার ৬৮০ মেট্রিক টন।

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর ভোলার উপপরিচালক রামেন্দ্রচন্দ্র বাড়ৈ বলেন, দেশের যেকোনো স্থানের চেয়ে ভোলার মাটি আলু চাষের জন্য উপযোগী। আলু চাষের পরিধি বাড়ানোর জন্য তাঁরা চাষিদের উন্নত বীজের খোঁজ ও পরামর্শ দিচ্ছেন। তিনি বলেন, বিএডিসির বীজ নিম্নমানের, তা ঠিক নয়। গত বছরে বিএডিসির বীজ যাঁরা কিনেছেন, তাঁরা বীজ অঙ্কুরিত না হওয়ার খবর কৃষি বিভাগকে সঠিক সময়ে পৌঁছাননি। তা ছাড়া হিমাগারের আলুবীজ স্পর্শকাতর; রোদ-তাপ সহ্য করার ক্ষমতা কম। ডিলার বীজের বস্তা হিমাগার থেকে বের করে পাঁচ-সাত দিন নদীর ঘাটে ফেলে রেখেছেন। পরে কার্গো-জাহাজে ঠাসাঠাসি করে বোঝাই অবস্থায় ভোলায় আনে। এ বছর ওই সমস্যা কাটিয়ে উঠতে সক্ষম হওয়ায় ভালো ফলন পেয়েছেন কৃষকেরা। তবে কৃষকের হাতে উন্নত আলুবীজ পৌঁছে দেওয়ার জন্য একটি হিমাগার দরকার। ইতিমধ্যে বিএডিসিকে হিমাগার নির্মাণের পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।

প্রথম আলো

Comments are closed.