পদ্মা সেতু : ঘুষ না দেয়ায় ক্ষতিপূরণ পাননি ২৩ ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী!

পদ্মা বহুমুখী সেতু নির্মাণের আওতায় মাওয়া পয়েন্টে জমি অধিগ্রহণের ফলে ২৩ ক্ষতিগ্রস্ত ব্যবসায়ী তিন বছরেও ক্ষতিপূরণ পায়নি। নানা দেনদরবার, চিঠি চালাচালির পরও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের উদাসীনতা ও অবহেলার কারণে এখন পথে বসার উপক্রম হয়েছে ওই ব্যবসায়ীদের। এমনও অভিযোগ উঠেছে যে, সেতু বিভাগের পুনর্বাসন সংক্রান্ত নির্বাহী প্রকৌশলী ক্ষতিপূরণ দেয়ার আশ্বাস দিয়ে ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে ঘুষ দাবি করেছেন। ঘুষ দিতে অপারগতা জানানোয় পুনর্বাসন তালিকা থেকে বাদ পড়েছেন ওই ব্যবসায়ীরা।

এ নিয়ে মাওয়া ১নং ফেরিঘাট এলাকায় ক্ষতিগ্রস্তদের মাঝে ক্ষোভ আর হতাশা বিরাজ করছে। যে কোনো সময় সেখানে বড় ধরনের অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন স্থানীয় লোকজন। গত ২০ জানুয়ারি সরেজমিনে পদ্মা সেতু প্রকল্প এলাকা ঘুরে এসে এ তথ্য জানা গেছে।

ক্ষতিগ্রস্ত ব্যবসায়ীদের সূত্রে জানা যায়, ২০১২ সালের ২৯ জানুয়ারি পদ্মা বহুমুখী সেতু প্রকল্পের রিসেটেলমেন্ট কর্মসূচির অংশ হিসেবে সাইট নালিশ প্রতিকার কমিটির এক সভা অনুষ্ঠিত হয়। ওই সভায় নালিশ প্রতিকার কমিটির আহ্বায়ক ও সেতু বিভাগের পুনর্বাসন সংক্রান্ত নির্বাহী প্রকৌশলী, নালিশ প্রতিকার কমিটির সদস্য ও মেদিনীমণ্ডল ইউনিয়র পরিষদের চেয়ারম্যান, অপর সদস্য মেদিনীমণ্ডল ইউপির মহিলা মেম্বার ও ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তিদের একজন প্রতিনিধি উপস্থিত ছিলেন।

সভার সিদ্ধান্ত অনুযায়ী পরে মুন্সীগঞ্জ জেলা প্রশাসক এবং সেতু কর্তৃপক্ষের মনোনীত কর্মকর্তাদের উপস্থিতিতে যৌথ তদন্তের মাধ্যমে ২৩ জনকে ক্ষতিগ্রস্ত ব্যবসায়ী হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। কিন্তু পুনর্বাসন সংক্রান্ত সেতু বিভাগের প্রকৌশলী মো. তোফাজ্জল হোসেন গোপনে ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে ঘুষ দাবি করেন। কিন্তু ঘুষ না দেয়ায় ব্যবসায়ীদেরকে অবকাঠামো তালিকা থেকে বাদ দেয়া হয়েছে বলে অভিযোগ করেছেন ব্যবসায়ীরা।

ব্যবসায়ীরা এ ব্যাপারে বিস্তারিত জানিয়ে এবং এর প্রতিকার চেয়ে পদ্মাসেতু প্রকল্পের পরিচালক বরাবরে ২৩ জন ২৩টি আবেদন করেছেন। এরপরও ক্ষতিপূরণের ব্যাপারে কোনো উদ্যোগ নিচ্ছে না প্রকল্প কর্তৃপক্ষ। ব্যবসায়ীদের অভিযোগ, এ ব্যপারে প্রতিকার চেয়ে সেতু বিভাগে গেলে তারা জেলা প্রশাসককে দেখিয়ে দেয় আবার জেলা প্রশাসকের কাছে গেলে সেতু বিভাগে পাঠিয়ে দেয়।

পদ্মাসেতু প্রকল্প এলাকার মাওয়া পয়েন্টের ক্ষতিগ্রস্ত ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী মো. আবু তাহের বাংলামেইলকে জানান, পদ্মা বহুমুখী সেতু নির্মাণ প্রকল্পে দক্ষিণ মেদিনীমণ্ডল মৌজার নদী শাসনের জন্য অধিগ্রহণের ফলে আরএস ৬০৪ নং দাগে তার বসত বাড়িসহ উচ্ছেদের শিকার হন। এছাড়া মুন্সীগঞ্জ জেলা প্রশাসক এবং সেতু বিভাগের মনোনীত কর্মকর্তাদের উপস্থিতিতে যৌথ তদন্তকালে আবু তাহেরের সকল অবকাঠামো ও গাছপালা লিপিবদ্ধ করা হয়।

আবু তাহের বলেন, ‘পদ্মা বহুমুখী সেতু প্রকল্পের (মাওয়া) পুনর্বাসন সংক্রান্ত নির্বাহী প্রকৌশলীকে মোটা অংকের ঘুষ দিতে না পারায় আমার নাম চূড়ান্ত তালিকা থেকে বাদ দিয়েছে। এরপর ২০১৩ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি তালিকা সংশোধনের দরখাস্ত দেয়ার পর তদন্ত কর্মকর্তারা পরিদর্শন করে গেছেন। অনেকে ৭ ধারা নোটিশ পেয়েছেন। কিন্তু আমি এখনো কোনো নোটিশ পাইনি।’

আব্দুল বারেক বয়াতি নামের আরেক ক্ষতিগ্রস্ত ব্যবসায়ী বলেন, ‘মাওয়া ১নং ফেরিঘাটে আমার দু’টি খাবার হোটেল ও একটি চায়ের দোকান ছিল। ভূমি অধিগ্রহণ এলাকার মধ্যে পড়ে আমাকে উচ্ছেদ হতে হয়েছে। এরপরও আমাকে অবকাঠামোগত কোনো ক্ষতিপূরণ দেয়া হয়নি। আমি এখন রিক্তহস্ত।’

আব্দুল মোতালেব খান নামের অপর ব্যবসায়ী বলেন, ‘১নং ফেরিঘাটে আমার ডিজেল-তেলের দোকান ছিল। কোনো নোটিশ না পাওয়ায় মুন্সীগঞ্জ জেলা প্রশাসক ও বিবিএর (সেতু কর্তৃপক্ষ) কাছে আবেদন করেও কোনো ক্ষতিপূরণ পাইনি।’

এ পয়েন্টের ক্ষতিগ্রস্ত অন্য ব্যবসায়ীদের মধ্যে রয়েছেন মো. মহিউদ্দিন, মো. লিটন শেখ, পারুল আক্তার, আবু কালাম, মো. ইউসুফ বেপারী, মো. জামাল মোল্লা, মো. রাজা হাওলাদার, মো. আলকাছ শেখ, মো. খালেক বেপারী, মো. শহিদুল শেখ, মো. ইউসুফ খাঁ, মো. সিরাজ মুন্সি, মো. আব্দুল মালেক বেপারী, শ্রী শিবু দাস, মো. ইসমাইল বেপারী, মো. জলিল ফরাজী, মো. খালেক সরদার ও শ্রী তপন চন্দ্র মাল।

ক্ষতিগ্রস্ত ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে ঘুষ চাওয়ার ব্যাপারে জানতে চাওয়া হয় সেতু বিভাগের পুনর্বাসন সংক্রান্ত নির্বাহী প্রকৌশলী মো. তোফাজ্জল হোসেনের কাছে। তিনি বাংলামেইলকে বলেন, ‘ঘুষ চাওয়ার অভিযোগটি ডাহা মিথ্যা। কেউ অধিগ্রহণ তালিকা থেকে যদি বাদ পড়েন তাহলে ক্ষতিপূরণের টাকা কোনোভাবেই পাবেন না।’

তিনি জানান, জিআরসি কমিটি ২০০৭-০৮ সালে একটি তালিকা করেছে। সে সময় কোনো ব্যবসা প্রতিষ্ঠান ওখানে ছিল না। বর্তমানে যে সব ব্যবসায়ী অভিযোগ করছে তারা এই তালিকা তৈরির পরে ব্যবসা প্রতিষ্ঠান করেছে। তারপরও জিআরসি কমিটি ভুল করতে পারে। এ জন্য ক্ষতিগ্রস্তরা নতুন করে আবেদন করতে পারেন। সে ব্যাপারে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে আমরা জেলা প্রশাসকের কাছে সুপারিশ করতে পারি।

এ ব্যাপারে পদ্মাসেতুর প্রকল্পের পরিচালক প্রকৌশলী শফিকুল ইসলাম বাংলামেইলকে বলেন, ‘২৩ ব্যবসায়ী ক্ষতিপূরণ পেল কি না সেটা আমার দেখার বিষয় নয়। এটা জেলা প্রশাসকের বিষয়।’

রতন বালো = বাংলামেইল

Comments are closed.