পদ্মা সেতু : নিম্নমানের বালু দিয়ে কনস্ট্রাকশন ইয়ার্ড

টেন্ডার কোটেশন বিওকিউ (বিল অব কোয়ানটিটি) অমান্য করে পদ্মা নদীর নিম্নমানের বালু দিয়েই সেতুর কনস্ট্রাকশন ইয়ার্ড নির্মাণ করা হচ্ছে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। ইয়ার্ডের রাস্তা, অবকাঠামো, ড্রেন, মালামাল রাখার ইয়ার্ডসহ বিভিন্ন কাজে ব্যবহার করা হচ্ছে নিম্নমানের ইট। এর ফলে সামান্য ঝড় হলেই ইয়ার্ড ভেঙে যাওয়া এবং ৪ বছর পর ইয়ার্ড ব্যবহারের অনুপযোগী হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্ট অনেকে।

শুরুতেই সামান্য ওজনের ‘এক্সাভেটার’ কয়েক বার আসা যাওয়া করায় এখনই ভেঙে যাচ্ছে ইয়ার্ডের রাস্তার ইট। তৈরি হয়েছে খানাখন্দ। গত ২১ থেকে ২৪ জানুয়ারি মুন্সীগঞ্জের মাওয়া, শরীয়তপুরের জাজিরা এলাকায় পদ্মাসেতু প্রকল্পের কনস্ট্রাকশন ইয়ার্ড সরেজমিনে ঘুরে এবং বিওকিউ ডকুমেন্ট যাচাই করে এসব চিত্র পাওয়া গেছে।

সেতু ভবন সূত্রে জানা গেছে, পদ্মা বহুমুখী সেতু নির্মাণ প্রকল্পের কার্যাদেশ পায় দুটি চীনা কোম্পানি। মূল সেতুর জন্য ১২ হাজার ১৩৩ কোটি টাকার কার্যাদেশ পায় চায়না মেজর ব্রিজ ইঞ্জিনিয়ারিং কোম্পানি। নদী শাসন প্রকল্পের ৮ হাজার ৭শ’ কোটি টাকার কাজ পায় সিনোহাইড্রো করপোরেশন।

দুই নম্বর ইট আর ভিটি বালু দিয়েই কাজ করছে রাজমিন্ত্রীরা

অনুসন্ধানে জানা গেছে, বাংলাদেশ ব্রিজ অথরিটির (বিবিএ) কিছু প্রভাবশালী প্রকৌশলীই ওই দু’টি চায়নিজ কোম্পানিকে বিভিন্ন অনিয়মের ক্ষেত্রে সহযোগিতা করছেন। তার বিনিময়ে তাদের কাছ থেকে আদায় করছেন আর্থিক সুবিধা। এছাড়া ওইসব অসাধু প্রকৌশলী তাদের লোকজনকে চীনা ঠিকাদার কোম্পানিতে বিভিন্ন পর্যায়ে চাকরিও পাইয়ে দিচ্ছেন বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, পদ্মাসেতুর নির্বাহী প্রকৌশলী দেওয়ান আব্দুল কাদের তার মনোনীত লোকদের চীনা কোম্পানি দু’টোতে ড্রাইভার হিসেবে চাকরি পাইয়ে দিয়েছেন। এছাড়াও কনস্ট্রাকশন ইয়ার্ডে তার লোকজনকে ঠিকাদারি কাজ পাইয়ে দেয়ারও তথ্য পাওয়া গেছে।

এই ভিটি বালু দিয়েই চলছে নির্মাণ কাজ

গত ২৩ জানুয়ারি শরীয়তপুরের জাজিরা পয়েন্টের কনস্ট্রাকশন ইয়ার্ড ঘুরে দেখা গেছে, বিভিন্ন স্থানে স্তুপ করে রাখা হয়েছে ভিটি বালু (যেখানে কাজ করছে সেখানকার বালু)। ইটের কোনো খোয়া দেখা যায়নি। অথচ ইটের খোয়া, সিলেটের বালু এবং সিমেন্ট দিয়ে কনস্ট্রাকশন ইয়ার্ডের ঘরের ফ্লোর তৈরি করার কথা রয়েছে বিওকিউতে। এভাবে গোঁজামিল দিয়ে ইয়ার্ডের কাজ চললে মূল সেতুর কাজ শুরুর পর ইয়ার্ড ধসে পড়তে পারে এমন আশঙ্কা করছেন সেখানে কর্মরত শ্রমিকরা।

মোশাররফ হোসেন নামের ইয়ার্ডের এক রাজমিন্ত্রী বাংলামেইলকে বলেন, ‘প্রথমে ভিটি বালু দিয়ে ভরাট করে তার উপর অল্প পরিমান দুই নম্বর ইট দিয়ে দায়সারা গোছের ঢালাই করে ইয়ার্ডের ফ্লোর তৈরি করা হয়েছে। সিলেটের বালু ও ইটের খোয়া ব্যবহার করা হয়নি।’

তিনি বলেন, ‘ফ্লোরে ৭ ফুট ঢালাই দেয়ার কথা কিন্তু সেখানে ৫ ফুট ইট দিয়ে বাকি ২ ফুট ঢালাই করা হয়েছে। নদী থেকে ড্রেজার দিয়ে ইয়ার্ডে মাটি ফেলার কথা থাকলেও শুধু মাত্র ভেকু দিয়ে (এক্সাভেটার) ইয়ার্ডের মাটি কেটে ইয়ার্ড তৈরি করা হচ্ছে।’

ইয়ার্ডের রাস্তা করার আগেই ভেঙে যাচ্ছে

এই ইয়ার্ডের কাজ পেয়েছেন কুষ্টিয়ার ঠিকাদার জাকির হোসেন বুলবুল। অভিযোগ উঠেছে তিনি চীনা ঠিকাদার কোম্পানির দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের নানাভাবে অনৈতিক সুবিধা দিয়ে অবাধে দুর্নীতি করে যাচ্ছেন। এক নম্বর ইটের কথা বলে চালিয়ে দিচ্ছেন নিম্নমানের দুই নম্বর ইট। ৫ থেকে ৬ হাজার টাকায় আনা প্রতি হাজার ইটের মূল্য হাতিয়ে নিচ্ছেন ৮ হাজার টাকা করে।

নাম প্রকাশ না করা শর্তে ইয়ার্ডে কর্মরত অপর এক রাজমিস্ত্রী বলেন, ‘বাউন্ডারি ওয়াল নির্মাণের জন্য যে ব্লক ব্যবহার করা হচ্ছে তার মূল্য ৬০ টাকা। কিন্তু ঠিকাদার জাকির হোসেন বুলবুল চীনা কোম্পানির কাছ থেকে হাতিয়ে নিচ্ছেন প্রতি ব্লক ১শ টাকা করে। আর যে বালু ব্যবহার করা হচ্ছে তার প্রতি বর্গফুটের মূল্য ওই এলাকায় ৫ টাকা করে কিন্তু বিল নেয়া হচ্ছে প্রতি বর্গফুটে ৪৪ টাকা।’

এদিকে মুন্সীগঞ্জের মাওয়া পয়েন্টের ইয়ার্ডেও একই চিত্র পাওয়া গেছে। ইয়ার্ডের রাস্তায় যেসব ইট ব্যবহার করা হয়েছে তার সবই নিম্নমানের। সামান্য ওজনের গাড়ি চললেই ভেঙে যাচ্ছে বিছানো ইট। মূল সেতুর ভারী যানবাহন চলাচল করলে এ রাস্তার কোনো চিহ্নই থাকবে না বলে মন্তব্য করেন সাদেক হোসেন নামে অপর এক রাজমিন্ত্রী।

৬০ টাকার এই ব্লক বিল করা হচ্ছে ১শ’ টাকা করে

দেখা গেছে, শুধু ভিটি বালু আর সামান্য সিমেন্ট দিয়েই নির্মাণ করা হচ্ছে বাউন্ডারি ওয়াল। সেখানে কর্মরত সোহেল নামের এক শ্রমিক বাংলামেইলকে বলেন, ‘ঠিকাদারা আমাদের যেভাবে কাজ করতে বলেছে, আমরা সেভাবেই কাজ করছি। এখানে ভিটি বালু আর সিমেন্ট দিয়ে মিক্সার তৈরি করা হচ্ছে। কোনো ইটের খোয়া দেয়া হয়নি।’

এ ব্যাপারে মূল সেতুর নির্বাহী প্রকৌশলী দেওয়ান আব্দুল কাদেরের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বাংলামেইলকে বলেন, ‘এটা আমাদের বিষয় নয়, ঠিকাদারের বিষয়। তারা তাদের ইচ্ছামতো কাজ করবে। পাঁচ বছর পর আমাদের কাছে ইয়ার্ড বুঝিয়ে দিয়ে দেবে। এছাড়া সার্বিক কাজ দেখাশোনার জন্য কনসালট্যান্ট নিয়োগ দেয়া হয়েছে। তারাই এর তদারকি করবে।’

এ ব্যাপারে কথা বলার জন্য কয়েক দফায় মোবাইল ফোনে ঠিকাদার জাকির হোসেন বুলবুলের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি ফোন রিসিভ করেননি।

বাংলামেইল

Comments are closed.