দলবাজির ভিত্তিটা মোটেই মতাদর্শিক নয়, সেটা হচ্ছে স্বার্থগত

সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী: উচ্চশিক্ষার জন্য ভালো শিক্ষক চাই, সেই সঙ্গে আবার ভালো ছাত্রও চাই। উচ্চশিক্ষার উন্নতি এই দুয়ের সংযোগের ওপরই নির্ভর করে। শুধু উপযুক্ত শিক্ষক হলেই চলবে না, ভালো ছাত্রও দরকার হবে।

ছাত্ররা রাজনীতি করে, এটা সবারই জানা। কিন্তু সব ছাত্র করে না। কেউ কেউ করে, আগে ভালো ছাত্রদেরকেই ছাত্র রাজনীতিতে দেখা যেত, এখন তেমনটা দেখা যায় না। এর কারণ আছে। আগে ছাত্র রাজনীতির জন্য দুটি ক্ষেত্র ছিল প্রশস্ত, একটি ছাত্র সংসদের নির্বাচন, অপরটি ছাত্র আন্দোলন।

ছাত্র সংসদীয় নির্বাচনে প্রার্থীদের প্রথম ও প্রধান যোগ্যতাই ছিল পরীক্ষায় ভালো ফল করা। যারা ভালো ছাত্র বলে পরীক্ষায় স্বীকৃতি পেয়েছে, তারা ছাড়া অন্যরা নির্বাচনে দাঁড়াতে সাহস পেত না, কেননা এটা জানাই ছিল যে, খারাপ রেজাল্ট নিয়ে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে নামলে পরাজয় ছিল অবধারিত। অন্যদিকে দেশে জাতীয় পর্যায়ে যত আন্দোলন হতো তাতেও শিক্ষার্থীরা অংশ নিত। রাজনীতিতে শিক্ষা নেবার এ-ও ছিল আরেকটি ক্ষেত্র।

এই যে রাজনীতি করার দুটি জায়গা এ দুটিতে আমরা ভালো ছাত্রদেরই দেখতে পেতাম। রাজনীতির এই অনুশীলন শিক্ষার্থীদের সচেতন ও সামাজিক করে তুলত। সেই সচেতনতা ও সামাজিকতা শিক্ষা গ্রহণের ব্যাপারে তাদের আগ্রহ ও দক্ষতা দুটিরই বৃদ্ধি ঘটাত।

ছাত্র সংসদের কথাই প্রথমে ধরা যাক। ছাত্র সংসদের নির্বাচন হচ্ছে একটি বার্ষিক উৎসব। বার্ষিক ক্রীড়া প্রতিযোগিতার তুলনাতেও এই উৎসব ছিল প্রাণবন্ত ও সর্বজনীন। সবাই অংশ নিত। কেউ প্রার্থী হতো, অনেকে প্রচারে মেতে উঠত, যারা ভোট দিত তাদের ভেতরও দেখা দিত বিপুল উদ্দীপনা এবং ফলাফল নিয়ে প্রত্যাশা। এই যে উৎসাহ, উদ্দীপনা, পরস্পরের সঙ্গে মিলিত ও পরিচিত হওয়া, এর সুফল উচ্চশিক্ষার ওপর গিয়ে পড়ত। ছাত্ররা সজীব থাকত, তাদের ভেতর যারা বীর হিসেবে পরিচিত হতে আগ্রহী হতো, তারা দেখা যেত পড়াশোনায় আগে মনোযোগ দিয়েছে। শিক্ষাঙ্গনে ওই ‘বীরে’রাই হয়ে দাঁড়াত অনুকরণীয় আদর্শ। শিক্ষা জিনিসটা তো শুধু যান্ত্রিকভাবে গ্রহণের বিষয় হতে পারে না; উৎসাহ-উদ্দীপনা না থাকলে শিক্ষা গ্রহণ সহজ ও স্বাভাবিক হয় না। মাঠ শুকিয়ে গেলে ফসল ফলবে কী করে। আর উৎসাহ-উদ্দীপনা যে শুধু নির্বাচনের মধ্য দিয়ে তৈরি হতো, তা নয়। বিশ্ববিদ্যালয়ের আবাসিক হলগুলোর প্রত্যেকটিতে সাহিত্য-সংস্কৃতির প্রতিযোগিতা হতো; তাতে বিতর্ক, বক্তৃতা, গান, আবৃত্তি, অভিনয় সবকিছুই অন্তর্ভুক্ত থাকত। হল বার্ষিকী বের হতো নিয়মিত, তাতে লেখা ছাপানো একটি গৌরবের ব্যাপার ছিল। নাটক হতো বছরে অন্তত একবার। আন্তঃহল নাট্য প্রতিযোগিতা ছিল। কেন্দ্রীয়ভাবে সাংস্কৃতিক প্রতিযোগিতারও আয়োজন ছিল। খেলাধুলার সুযোগ পাওয়া যেত। সব মিলিয়ে শিক্ষার্থীরা মনে ও দেহে সুস্থ-সতেজ থাকত। সুস্থ ও সতেজ না থাকলে শিক্ষিত হবে কী করে? উচ্চশিক্ষার এলাকাতে ছাত্র সংসদীয় নির্বাচন এখন নেই, বহু বছর ধরেই নেই, ফলে সেখানে শিক্ষার্থীরা যে সতেজ ও সুস্থ রয়েছে, তা বলি কী করে? না, সেটা বলার উপায় নেই। অনেক ক্ষেত্রেই এই প্রতিষ্ঠানগুলো পরিণত হয়েছে শিক্ষিত মানুষের বস্তিতে, যেখানে প্রাণহীনতা, অবসাদ, কলহ সবকিছুই দেখা যাবে, কিন্তু বড়ই অভাব প্রাণের উন্মাদনার, যেটা না থাকলে শিক্ষা প্রাণবন্ত হবে এমন আশা করাটা সঠিক নয়। অন্যদিকে জাতীয় রাজনৈতিক আন্দোলনে ছাত্ররা যে মতাদর্শের ভিত্তিতে অংশ নেবে, এমন সম্ভাবনাও ক্ষীণ হয়ে গেছে। এখন রয়েছে বড় দু’টি রাজনৈতিক দলের অঙ্গসংগঠন হিসাবে লেজুড়বৃত্তি। ছাত্ররা সরকারি দলের দিকেই বেশি করে ঝুঁকে থাকে। অথবা থাকতে বাধ্য হয়, কেননা বিপক্ষ দল শিক্ষাঙ্গনে রাজনৈতিক কাজে অংশ নেবে, এমন সুযোগ থাকে না। তারা সাধারণত সাময়িকভাবেও বিতাড়িত হয়ে যায় এবং যারা থাকে তাদের পক্ষে আত্মপরিচয় প্রকাশ করবার সুযোগ থাকে না। মতাদর্শের চর্চা নেই। আছে দলের নাম করে যত রকমের সুযোগ আছে বা তৈরি করা যায়, তা হস্তগত করা। ফলে শিক্ষাঙ্গন থেকে উত্তপ্ত হয়ে উঠে বটে (কারণ সরকার সমর্থকদের দৌরাত্ম্য), কিন্তু জীবন্ত থাকে যে তা বলা যায় না। সরকার বদল হয়, তাতে তা-ব সৃষ্টিকারীদের পরিচয় বদল হয় মাত্র, তা-ব থামে না। বলা বাহুল্য, এই রকম পরিবেশ শিক্ষা লাভের জন্য আর যা-ই হোক মোটেই অনুকূল নয়।

শিক্ষার্থীদের কর্মক্ষেত্রের সঙ্কীর্ণতার ব্যাপারটা তো রইলই, আরও এক ব্যাপার রয়েছে। সেটা হলো শিক্ষা শেষে কর্মসংস্থানের প্রতিশ্র“তির অভাব। বেকারত্ব দেশে সব সময়েই ছিল। কিন্তু আগের দিনে উচ্চশিক্ষা শেষ করতে পারলে জীবিকার একটা না একটা ব্যবস্থা হবে, এই রকমের একটা আশ্বাস উচ্চারিত ভাবে না থাকলেও বিদ্যমান ছিল। ছাত্ররা আশা রাখতে পারত যেকোনো একটা কাজ পেয়ে যাবে। এখন সেই প্রতিশ্র“তি একেবারেই নেই। বরং ছাত্রজীবন শেষ হলেই এখন যা সামনে এসে হাজির হয় তা হলো অনিশ্চয়তা। এই অনিশ্চয়তা শিক্ষার্থীদের শিক্ষা গ্রহণে আগ্রহী করে না, বরং উৎসাহহীন করে ফেলে। উচ্চশিক্ষায় উন্নতির ক্ষেত্রে এটিও অন্তরায় বটে।

শিক্ষায় সমষ্টিগত সাফল্যের পথে মস্ত বড় একটা প্রতিবন্ধক হচ্ছে শিক্ষার মাধ্যম। স্বাধীন বাংলাদেশে মাতৃভাষা শিক্ষার মাধ্যম হবে না, পরাধীনতার কালে এটা ছিল অকল্পনীয়। কিন্তু সেটাই তো ঘটেছে। শিক্ষার মাধ্যম ইংরেজিই রয়ে গেছে। উচ্চশিক্ষার প্রতিষ্ঠানে গ্রন্থাগারের শতকরা ৯৫টি বই-ই ইংরেজি ভাষায় লেখা। শিক্ষার্থীরা ওইসব বই পড়বে এবং পড়ে বুঝবে এতটা ইংরেজি দক্ষতা রাখে না। তারা মূল বইতে যায় না, তৈরি নোট পড়ে। অন্যদিকে বাস্তবতা এটাও যে, মাতৃভাষা ভিন্ন অন্যভাষায় যথার্থ শিক্ষা অর্জন কখনোই সম্ভব নয়। শিক্ষার কোনো স্তরেই না। অন্যভাষার মাধ্যমে প্রাপ্ত শিক্ষা স্বাভাবিক হয় না, গভীরে প্রবেশ করতে ব্যর্থ হয় এবং সৃষ্টিশীলতার যে উন্মেষ ঘটাবে, সেটা পারে না। এ শিক্ষা তাই অধিকাংশ ক্ষেত্রেই খ-িত, অনেক ক্ষেত্রে অগভীর এবং প্রায় সর্বক্ষেত্রে সৃষ্টিবিমুখ।

ব্যাপার আরও আছে। উচ্চশিক্ষা ক্ষেত্রে ব্যয় বরাদ্দ অপর্যাপ্ত। শিক্ষকরা মনে করেন, তারা উপযুক্ত বেতন-ভাতা থেকে বঞ্চিত। যে জন্য তারা অসন্তুষ্ট থাকেন, আয় বৃদ্ধির জন্য ব্যক্তিগত উদ্যোগ গ্রহণ করেন, শ্রেণিকক্ষে শিক্ষাদানের প্রাথমিক কর্তব্য এবং সেই সঙ্গে গবেষণাউভয় কাজেই পরিপূর্ণরূপে মনোযোগী হতে ব্যর্থ হন। সমাজে পুঁজিবাদের আদর্শ কার্যকর, সেখানে অর্থনৈতিকভাবে যিনি দুর্বল, তার পক্ষে সম্মানজনক জীবনযাপন কঠিন, তা তিনি শিক্ষক হিসেবে যতই যোগ্য হোন না কেন।

এই উপাদানগুলোর সবকটি’ই উচ্চশিক্ষা ক্ষেত্রে কথিত সংকট সৃষ্টির জন্য দায়ী। এর সঙ্গে নতুন উপসর্গ হিসেবে যোগ হয়েছে শিক্ষক রাজনীতি। এই রাজনীতি যে উচ্চশিক্ষার জন্য ক্ষতিকর, তা পরিষ্কারভাবেই সত্য। তবে এক্ষেত্রে রাজনীতি এবং দলাদলিকে অবশ্যই পৃথক করে দেখতে হবে। সেটা করলে বুঝতে সহজ হবে যে যাকে ক্ষতিকর হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে তা রাজনীতি নয়, দলাদলি বটে।

শিক্ষকরা এখন দলাদলি করছেন। তারা রাষ্ট্রক্ষমতায় যাওয়া-আসা করে শাসক শ্রেণির এমন দু’টি মূল দলের সমর্থক হয়ে নিজেদের খাড়াখাড়ি বিভক্ত করে ফেলেছেন। তবে সব শিক্ষক নন। অবশ্যই নন। বেশিরভাগ শিক্ষকই এই দলবাজির বাইরে নিজেদের রাখতে চান, কেননা দলবাজির ভিত্তিটা মোটেই মতাদর্শিক নয়, সেটা হচ্ছে স্বার্থগত। দল করলে উঁচু পদ পাওয়া যায়, বিশ্ববিদ্যালয়ের বাইরেও চাকরি জোটে, ভেতরে পদোন্নতি লাভ সহজ হয়। সব শিক্ষকই যে ওই পথে উন্নতি করবেন, এমন নিশ্চয়তা নেই। তারাই করবেন যারা শিক্ষকদের নেতা বলে নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করতে পারবেন। অন্যরা এদের সঙ্গে থাকেন। না-থাকলে বিপদে পড়বেন এবং থাকলে সুবিধা পাবেন, এই রকমের উপলব্ধি থেকে। নেতাদের প্রতি আনুগত্য দেখাতে বাধ্য হন, কিন্তু তাদের প্রতি যে শ্রদ্ধা পোষণ করেন এমন নয়।

শিক্ষকদের দলাদলির এই ঘটনা বিশেষভাবে প্রকট হয়েছে এরশাদ-শাসনের পতনের পরে যখন ভোটের মাধ্যমে সরকার গঠনের পদ্ধতি প্রচলিত হলো তখন থেকেই। নির্বাচিত সরকার নিজের প্রতি সমর্থনের ক্ষেত্রটিকে প্রসারিত করার লক্ষ্যে পেশাজীবীদের দলে টানতে সচেষ্ট হয়েছে। পেশাজীবীদের একাংশেরও আগ্রহ ছিল সরকারি অনুগ্রহ লাভের। এ ব্যাপারে বিএনপি এবং আওয়ামী লীগ উভয়েই ছিল সমানে তৎপর। ওদিকের টান এবং এদিকের আগ বাড়িয়ে যাওয়া, দুয়ের মিলন দেশের সব পেশাজীবীর ক্ষেত্রেই ঘটেছে, এবং দলাদলি শুরু হয়ে গেছে।

চিকিৎসক, আইনজীবী, ব্যবসায়ী এবং প্রকৌশলীদের ভেতর বিভাজন অবশ্যই ক্ষতিকর, কিন্তু সবচেয়ে বেশি ক্ষতিটা যেখানে ঘটে সেটা হলো শিক্ষকদের দলাদলি। যে মেধাবী তরুণটি শিক্ষক হতে চায় তার মধ্যে একটি আদর্শবাদী অনুপ্রেরণা রয়েছে বলে অনুমান করাটা অসংগত নয়। কিন্তু এই তরুণ যখন দেখে শিক্ষক হবার জন্য মনোনয়ন পেতে গেলে মেধাতে কুলাবে না, দলীয় আনুগত্য দরকার হবে, তখন সে হতাশ হয়। হতাশ হয়ে শিক্ষকতার ব্যাপারে অনিশ্চয়তা ও দুর্নীতি দেখে সে অন্য পেশায় চলে যেতে সচেষ্ট হতে পারে। সেটা বরং মন্দের ভালো। কিন্তু সে যদি শিক্ষক হবার জন্য দৃঢ়প্রতিজ্ঞ হয়ে রাজনৈতিক দলে শামিল হয়ে যায়, তাহলে সেটা অত্যন্ত ক্ষতিকর হবেযেমন তার নিজের জন্য তেমনি উচ্চশিক্ষার জন্য।

নিজের মধ্যে সে সুবিধাবাদকে ঢুকতে দেবে, এবং সেই সুবিধাবাদকে লালন-পালন করতে থাকবে। তখন শিক্ষার প্রতি নিষ্ঠার জায়গায় দেখা দেবে দলবাজি করে উন্নতির আকাক্সক্ষা। শিক্ষকের যেটা কাজ সেটা তার কাছে প্রধান থাকবে না। নৈতিকভাবে তার মেরুদ- দুর্বল হয়ে যাবে। দুর্বল মেরুদ- নিয়ে আর যা-ই হওয়া যাক, যথার্থ শিক্ষক হওয়া যায় না। তার প্রতি ছাত্রদের শ্রদ্ধা থাকবে না। তারা ভাববে এই শিক্ষক দলবাজি করে উন্নতি করেছেন, তার নিজের মধ্যে গুণের অভাব, সে জন্যই ইনি দলবাজি করেন। আস্থাও থাকবে না। শিক্ষার্থীদের ভেতর এমন ধারণা জন্মাবে যে ওই শিক্ষকটি দলীয় বিবেচনায় শিক্ষার্থীদের নম্বর বাড়ান ও কমান। শ্রদ্ধা ও আস্থা যার প্রতি নেই, শিক্ষার্থীদের তিনি কী শিক্ষাই বা দেবেন, আর কেমন করেই বা দেবেন। তিনি নিজের ওপরও আস্থা হারিয়ে ফেলবেন, ভেতরে জন্ম নেবে হীনমন্যতা।

অন্যদিকে তিনি অন্য শিক্ষকদের জন্য একটি মারাত্মক রকমের ক্ষতিকর দৃষ্টান্ত স্থাপন করবেন। তাদের মধ্যে মেধা ও জ্ঞানানুশীলনের ব্যাপারে অনীহা দেখা দেবে, কেননা এই বার্তা রটে যাবে যে, উন্নতি করতে হলে জ্ঞানের চর্চার চেয়ে দলের কর্তাদের সন্তোষবিধান জরুরি। শিক্ষাক্ষেত্রে অবক্ষয় দেখা দেবে।
তার মানে অবশ্যই এটা নয় যে, শিক্ষকরা রাজনীতিবিমুখ বা রাজনীতি বিষয়ে অসচেতন থাকবেন। মোটেই না। শিক্ষকরা হচ্ছেন সমাজের সবচেয়ে অগ্রসর অংশ। তারা যদি রাজনীতি সম্পর্কে উদাসীন থাকেন তবে তো দেশে রাজনীতি বিষয়ে অজ্ঞতা বাড়বে এবং রাজনীতিতে নীতিহীন ও অজ্ঞ লোকদের উৎপাতের ও আধিপত্যের পথ আরও প্রশস্ত হবে। রাষ্ট্র যখন আছে তখন রাজনীতি থাকবেই। থাকাটা অপরিহার্য ও অনিবার্য। এই রাজনীতি সম্পর্কে শিক্ষকরা অবশ্যই ভাববেন এবং মতপ্রকাশ করবেন নিজ নিজ পদ্ধতিতে। কোনো শিক্ষক যদি রাজনৈতিক দলের সদস্য হন তাতেও আপত্তির কারণ দেখি না। আপত্তির জায়গাটা হচ্ছে তাত্ত্বিক ও আদর্শিক জ্ঞানকে দলাদলিতে নামিয়ে আনা। শিক্ষকরা রাজনীতিতে থাকবেন, তাতে মতাদর্শগত জায়গাগুলো পরিষ্কার হবে। তাদের লেখা ও কথা থেকে লোকে রাজনীতি সম্পর্কে জ্ঞান লাভ করবে। রাজনীতি কোনো নিষিদ্ধ বিষয় নয়, কিন্তু ওই যে বললাম, তারা সুবিধার লোভে দলাদলিতে নামবেন না। নামলে অন্যায় করবেন, যেমন নিজেদের প্রতি, তেমনি শিক্ষাব্যবস্থা ও শিক্ষার্থীদের প্রতি।

কিন্তু এই বিপজ্জনক অবস্থা থেকে উত্তরণের উপায়টা কী? পরামর্শ, উপদেশ, নিন্দা, ক্ষোভ, এসবে যে কাজ হবে না সেটাতো দেখতেই পাচ্ছি। তাহলে? মানসিকতার পরিবর্তন? কার মানসিকতা কে বদলায়? উত্তরণের উপায়টা আসলে বেশ কঠিন। এক কথায় বলতে গেলে সেটা হলো বর্তমানে যে শ্রেণি আমাদের দেশকে শাসন করেছে তাদের হটিয়ে দিয়ে প্রকৃত গণতান্ত্রিক আদর্শে বিশ্বাস করেন এমন মানুষকে শাসনক্ষমতায় প্রতিষ্ঠিত করা। তেমন মানুষ যদি ক্ষমতায় যান তা হলে দেখা যাবে যে তারা দলবাজি করছেন না, স্বার্থ দেখছেন সমগ্র দেশবাসীর। দেখা যাবে মেধা অনুযায়ী যার যেটা প্রাপ্য তিনি তা পাচ্ছেন। পক্ষপাত ঘটবে না, অন্যায় হস্তক্ষেপ চোখে পড়ছে না। উচ্চশিক্ষার ক্ষেত্রে মস্ত বড় যে অন্তরায় শিক্ষার্থীদের সেই শ্রেণি বৈষম্যও কমে আসবে। এবং শিক্ষার মাধ্যম হবে মাতৃভাষা।

প্রকৃত গণতান্ত্রিক আদর্শ বলতে যা বোঝায় সেটা হলো একটি সমাজবিপ্লবী চেতনা। আমাদের মুক্তিযুদ্ধের ভেতরে ওই চেতনাটাই কাজ করছিল। আমরা শুধু শাসকের বদল চাইনি, চেয়েছি রাষ্ট্রের মালিক হবে জনগণ এবং যারা শাসনক্ষমতায় যাবেন তারা জনগণের স্বার্থ দেখবেন, নিজেদের স্বার্থের পাহারাদার না হয়ে।

সমাজে বৈপ্লবিক পরিবর্তন না আনতে পারলে অন্যান্য সমস্যার মতো উচ্চশিক্ষার মান উন্নয়নের সমস্যারও সমাধান হবে না। কথাটা হতাশাব্যঞ্জক শোনালো কী? কবে সেই মহাকাব্যিক ঘটনা ঘটবে, তার পরে আমরা মুক্ত হব? মুক্তিযুদ্ধই যেখানে আমাদের মুক্ত করতে পারল না, সেখানে আবার কোন অনাগত বৈপ্লবিক পরিবর্তনের সান্ত্বনা-বাক্য উচ্চারণ? আসলে হতাশার কথা নয়, আশারই কথা। মুক্তির স্বপ্ন আমরা দীর্ঘদিন ধরে দেখেছি, ধাপে ধাপে এগিয়েছি, একাত্তরে অনেক কয়টা ধাপ পার হওয়া গেছে। এতটা যখন এগুতে পারলাম তখন আরও কেন পারব না? স্বপ্নতো থাকতেই হবে সামনে, না হলে বাস্তবতাকে বদলানোর মনোবল ও আশা কোথায় পাব?

লেখক : ইমেরিটাস অধ্যাপক, ইংরেজি বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।
সাপ্তাহিক

Comments are closed.