বসুন্ধরা আদ্-দ্বীন হাসপাতাল : শ্রীনগরের দরিদ্র মানুষের কাছে

তিনতলা ভবনজুড়েই মানুষের ঠাসাঠাসি। মাঠেও লম্বা সারি। ভবনের প্রতিটি কক্ষের ভেতরে ও দরজার সামনে ভিড়। হঠাৎ দেখলে মনে হয় যেন ভোট চলছে। তবে খটকা লাগে শিশুদের উপস্থিতিতে। বিভিন্ন বয়সের নারী-পুরুষের সঙ্গে ভিড় করে আছে শিশু-কিশোররাও। কিন্তু ভবনের করিডরে কক্ষগুলোর প্রবেশমুখে কোথাও ‘মেডিসিন বিভাগ’ কোথাও বা ‘শিশু বিভাগ’, ‘চক্ষু বিভাগ’, ‘সার্জারি বিভাগ’ কিংবা ‘গাইনি বিভাগ’ লেখা দেখে ভুল ভাঙে।

এ দৃশ্য কোনো হাসপাতালের পরিবেশের সঙ্গে মিলে যায়। ভবনের সামনে দাঁড়ানো কয়েকটি অ্যাম্বুল্যান্স আর কক্ষে কক্ষে অ্যাপ্রোন গায়ে ডাক্তারদের ব্যস্ততায় রীতিমতো হাসপাতালই হয়ে ওঠে ‘উত্তর বালাশুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়’ প্রাঙ্গণ। রোগীদের হাতে হাতে ডাক্তারের প্রেসক্রিপশন আর ওষুধ। আবার দ্বিতীয় তলার একটি কক্ষে দেখা যায়, চলছে অস্ত্রোপচার।

শনিবার সকাল থেকে বিকেল পর্যন্ত মুন্সীগঞ্জের শ্রীনগর উপজেলার বালাশুর এলাকার দরিদ্র মানুষের জন্য এভাবেই ‘ফ্রি মেডিক্যাল ক্যাম্প’-এর ব্যবস্থা করে কেরানীগঞ্জের বসুন্ধরা রিভারভিউ প্রকল্পের বসুন্ধরা আদ্-দ্বীন মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ। বালাশুর এলাকার স্থানীয় সমাজসেবী এস এম মোস্তাফিজুর রহমান মোস্তাক সরকারের উদ্যোগে সকাল থেকে বিকেল পর্যন্ত চলে চিকিৎসা কার্যক্রম।

চক্ষু বিভাগ থেকে ডাক্তারের প্রেসক্রিপশন হাতে নিয়ে পাশের ‘মেডিসিন শপ’-এ যাওয়ার পথে বালাশুরের হাসিনা বেগম বলেন, ‘আগেরতনই ডায়াবেটিসে ভুগতাছি। চোখের সমস্যা আছে। ভালো কোনো ডাক্তার দেখাইতে যাইতে পারি না। এইহানে ভালো ডাক্তার আইছে হুইন্যা আইলাম। খুব উপকার অইলো। ডাক্তার দেহাইলাম বিনা টাকায়, আবার এহন ওষুধও দিবো মাগনা।’

স্থানীয় নতুন বাজার এলাকার সাহিদা বেগম চার বছরের শিশু সানজিদাকে নিয়ে আসেন মেডিক্যাল ক্যাম্পের শিশু বিভাগে। ডাক্তার তাকে দেখে তিনটি ওষুধ লিখে দেন। হাতে ‘জে মক্স’ নামের একটি সিরাপ আর দুই ধরনের ওষুধ নিয়ে বেরিয়ে আসেন ভবন থেকে। মাঠে দাঁড়িয়ে সাহিদা বলেন, ‘সরকারি হাসপাতাল অনেক দূরে। বাচ্চাডায় অনেক দিন ধইর‌‍াই অসুখে ভোগতাছে। পয়সার অভাবে ঢাকায় যাইতে পারি না। আন্দাজে ওষুধের দোকান দিয়া ওষুধ খাওয়াইতাম। আইজকা এইখানে বড় ডাক্তার পাইয়া খুব খুশি।’

দোতলার একটি কক্ষ থেকে এক শিশুকে কোলে নিয়ে নেমে আসেন খবির মোল্লা। কী হয়েছে জানতে চাইলে খবির অনেকটা উল্লসিত হয়ে বলেন, ‘বিনা পয়সায় পোলাডার মুসলমানি করাইলাম। কোনো সমস্যা অয় নাই। দুই-তিনজন বড় ডাক্তার মিল্যা বাচ্চাগো মুসলমানি করত্যাছে। এমন সুযোগ পাওয়ার কথা আগে কল্পনাও করি নাই।’

বসুন্ধরা আদ্-দ্বীন হাসপাতালের সহকারী পরিচালক ডা. ওয়াহিদা হাসিন কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আমরা প্রতি মাসেই বিভিন্ন এলাকায় দরিদ্র জনগোষ্ঠীর কাছে গিয়ে তাদেরকে বিনা মূল্যে চিকিৎসাসেবা পৌঁছে দেওয়ার চেষ্টা করি। এতে মানুষও যেমন সেবা পায়, তেমনি সরকারের চিকিৎসা কার্যক্রমেও সহায়ক হয়ে থাকে।’

ওই কর্মকর্তা বলেন, ‘যারা অর্থের অভাবে দূরে গিয়ে উন্নত কোনো চিকিৎসা সুবিধা ভোগ করতে পারে না-আমরা তাদের কাছে ছুটে যাই চিকিৎসা নিয়ে।’

বালাশুরের চিকিৎসা ক্যাম্প সম্পর্কে ডা. ওয়াহিদা জানান, মোট ৬৫০ জনকে চিকিৎসা দেওয়া হয়েছে; যাদের মধ্যে ৩১৩ জন ছিল চোখের রোগী, ১০৮ জন নিয়েছে মেডিসিন বিভাগের চিকিৎসা, ৪২ জন নারী পেয়েছেন গাইনি চিকিৎসা, ৭৪ জনকে দেওয়া হয়েছে বিভিন্ন ধরনের সার্জারি চিকিৎসা। এ ছাড়া ২২ শিশুকে বিনা খরচে মুসলমানির জন্য তালিকাভুক্ত করে তাদের মধ্য থেকে গতকাল ছয় শিশুর মুসলমানি সম্পন্ন করা হয়েছে, বাকিদের আগামী শনিবার মুসলমানি করা হবে। এ ছাড়া সব রোগীকেই চিকিৎসকদের পরামর্শপত্রের বেশির ভাগ ওষুধ বিনা মূল্যে সরবরাহ করা হয়েছে। পাশাপাশি কয়েকজন রোগীকে জরুরি চিকিৎসার জন্য বিনা খরচে চিকিৎসার জন্য বসুন্ধরা আদ্-দ্বীন হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়। ওই হাসপাতালের চক্ষু বিশেষজ্ঞ ডা. রুহুল আমিন, গাইনি বিশেষজ্ঞ ডা. নাদিরা সুলতানা, শিশুরোগ বিশেষজ্ঞ ডা. দীপা সাহা, মেডিসিন বিশেষজ্ঞ ডা. সেলিম মাহমুদসহ আরো বেশ কয়েকজন বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক এই ফ্রি মেডিক্যাল ক্যাম্পে চিকিৎসা দেন।

কালের কণ্ঠ

Comments are closed.