আবারও লঞ্চ দুর্ঘটনা : পিনাক দুর্ঘটনায় দায়ীদের শাস্তি হয়নি

নকশায় ত্রুটি, তদারকির অভাব, অতিরিক্ত যাত্রী পরিবহন, অদক্ষ চালকদের কারণে দেশে প্রায়ই নৌযান দুর্ঘটনা ঘটছে। কিন্তু সরকারি প্রতিষ্ঠানসহ এ দুর্ঘটনার জন্য দায়ীদের শাস্তির মুখোমুখি হতে হয় না। সর্বশেষ পিনাক লঞ্চ-৬ দুর্ঘটনার জন্য দায়ী কারও শাস্তি হয়নি। এ ঘটনায় গঠিত তদন্ত কমিটি পাঁচ মাসেরও বেশি সময় আগে প্রতিবেদন দিলেও কোনো সুপারিশ বাস্তবায়ন করা হয়নি।

নৌ-পরিবহন মন্ত্রী জানালেন, লোকবল সংকট থাকায় পিনাক দুর্ঘটনায় দায়ীদের কাউকে কাউকে বরখাস্ত করে সে আদেশ আবার তুলে নিতে হয়েছে।

শাস্তি না পাওয়ার ধারাবাহিকতায় রবিবার পদ্মা নদীতে আবারও ঘটল প্রাণনাশী লঞ্চ দুর্ঘটনা। মানিকগঞ্জ জেলার পাটুরিয়া ঘাট থেকে ‘এম ভি মোস্তফা’ নামের যাত্রীবাহী লঞ্চ দৌলতদিয়া যাওয়ার পথে মালবাহী নৌযান ‘এম ভি নার্গিস-১’ এর ধাক্কায় পদ্মা নদীতে ডুবে যায়।

রবিবার রাত ১২ পর্যন্ত ৪৮টি লাশ উদ্ধার করা হয়। এ ঘটনায়ও তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে।

গত ৪ আগস্ট মাদারীপুরের কাওড়াকান্দি ঘাট থেকে মুন্সীগঞ্জের মাওয়া ঘাটের উদ্দেশ্যে ছেড়ে আসা পিনাক-৬ নামের যাত্রীবাহী লঞ্চ পদ্মায় ডুবে যায়। এ দুর্ঘটনায় ৪৯ জনের লাশ উদ্ধার করা হলেও লঞ্চটি উদ্ধার করা সম্ভব হয়নি।

লঞ্চ ডুবে যাওয়ার দিনই নৌ-পরিবহন মন্ত্রণালয় নূর-উর-রহমানকে প্রধান করে একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়। পরে ১৪ সেপ্টেম্বর গঠিত কমিটি নৌ-পরিবহন সচিবের কাছে প্রতিবেদন জমা দেয়।

কমিটি ৬৩ পৃষ্ঠার তদন্ত প্রতিবেদন দাখিল করে। প্রতিবেদনে এ দুর্ঘটনার জন্য দায়ী ব্যক্তিদের চিহ্নিত করে শাস্তির সুপারিশ করে কমিটি। এ ছাড়া

প্রতিবেদনে নৌ দুর্ঘটনা রোধে বিভিন্ন সুপারিশ করা হয়।

প্রতিবেদনে লঞ্চ মালিক, চালকসহ দুর্ঘটনার জন্য বিআইডব্লিউটিএ’র মাওয়া নদী বন্দরের পরিবহন পরিদর্শন মো. জাহাঙ্গীর ভুইয়া ও পরিচালক (নৌ নিরাপত্তা ও ট্রাফিক) শফিকুল হক ও যুগ্ম-পরিচালক (নৌ নিট্রা) মো. রফিকুলের ইসলামকে দায়ী করা হয়।

বার্ষিক সার্ভেতে ত্রুটি থাকার পরও চলাচলের জন্য সময় বর্ধিত করে টোকেন ইস্যু করার এবং সার্ভে সনদ ইস্যুর জন্য ডিক্লারেশন ফরম মহাপরিচালকের কাছে না পাঠিয়ে দায়িত্ব অবহেলার জন্য ইঞ্জিনিয়ার এ্যান্ড শিপ সার্ভেয়ার মীর্জা সাইফুর রহমানকেও দায়ী করে কমিটি।

পিনাক-৬ লঞ্চের নকশা তৈরি, পরবর্তীতে স্ট্যাবিলিটি বুকলেট প্রণয়ন ও

ইনক্লাইনিং টেস্ট রিপোর্টের মাধ্যমে ইঞ্জিনিয়ার মো. সাইদুর রহমান ‘সন্তোষজনক’ বলার পর পরবর্তীতে লঞ্চটি ডুবে যায়। এ জন্য তিনিও দায়ী বলে জানায় কমিটি।

এদের কারও বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। দু’এক জনকে সাময়িক বরখাস্ত করা হলেও কিছুদিন পরই তা উঠিয়ে নেওয়া হয়।

নৌ-পরিবহন মন্ত্রী শাজাহান খান এ বিষয়ে দ্য রিপোর্টকে বলেন, ‘তদন্ত কমিটির সুপারিশ বাস্তবায়নের জন্য সংশ্লিষ্ট ডিপার্টমেন্টের (বিআইডব্লিউটিএ, সমুদ্র পরিবহন অধিদফতর) কাছে পাঠানো হয়। কতটুকু বাস্তবায়ন হয়েছে এ মুহূর্তে বলতে পারব না।’

কারও বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি— জানালে মন্ত্রী বলেন, ‘কী করব আমাদের সার্ভেয়ার, ইন্সপেক্টর নেই, লোকবল সংকট। বাধ্য হয়ে সাসপেনশন উইথড্র (বরখাস্ত আদেশ তুল দেওয়া) করতে হয়।’

রবিবারের লঞ্চ দুর্ঘটনা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘এই যে দিনের বেলা কার্গোর ধাক্কায় লঞ্চ ডুবল, কতগুলো মানুষ মরল। কী জবাব দেব আমি মানুষের কাছে। কী জবাব দেওয়ার আছে মন্ত্রণালয়ের, সংশ্লিষ্ট বিভাগের। আমাদের সচেতন হতে হবে।’

বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআইডব্লিউটিএ) চেয়ারম্যান মোহাম্মদ শামছুদ্দোহা খন্দকার দ্য রিপোর্টকে বলেন, ‘সুপারিশ অনুযায়ী পরিদর্শক জাহাঙ্গীর ভূঁইয়াকে সাসপেন্ড করা হয়েছে। নৌ-নিরাপত্তা বিভাগের পরিচালককে সাসপেন্ড প্রক্রিয়া চলছে। এ ছাড়া কমিটির নিরাপত্তামূলক সুপারিশ বাস্তবায়নের প্রক্রিয়া চলছে।’

অসুস্থ প্রতিযোগিতা ও চালকের দায়িত্বহীনতার কারণে রবিবার পদ্মায় লঞ্চটি ডুবেছে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, জাহাঙ্গীর এখনও চাকরিতে বহাল রয়েছেন। তিনি টঙ্গী নদীবন্দরে পরিদর্শকের দায়িত্ব পালন করছেন। বিআইডব্লিউটিএর পরিচালক (নৌ নিরাপত্তা ও ট্রাফিক) মো. শফিকুল হক এ বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।

ইঞ্জিনিয়ার এ্যান্ড শিপ সার্ভেয়ার মীর্জা সাইফুর রহমানের বিষয়ে জানতে চাইলে সমুদ্র পরিবহন অধিদফতরের চিফ ইঞ্জিনিয়ার এ্যান্ড শিপ সার্ভেয়ার এ কে এম ফখরুল ইসলাম দ্য রিপোর্টকে বলেন, ‘সাইফুর রহমান চার মাস সাসপেনশনে (সাময়িক বরখাস্ত) ছিলেন। এরপর তার বিরুদ্ধে সাসপেনশন আদেশ তুলে নেওয়া হয়।’

এর আগে মুন্সীগঞ্জের গজারিয়ার রসুলপুরে মেঘনা নদীতে গত ১৫ মে এমভি মিরাজ-৪ লঞ্চডুবির ঘটনা ঘটে। এতে নারী, শিশুসহ ৫৬ জন যাত্রীর মর্মান্তিক মৃত্যু ঘটে। দুর্ঘটনার কারণ উদঘাটন, দায়ী ব্যক্তিদের চিহ্নিত করা ও অন্যান্য বিষয়ে রিপোর্ট দিতে গত ১৮ মে বিআইডব্লিউটিএ কর্তৃপক্ষ চার সদস্যের একটি কমিটি গঠন করে। লঞ্চটির মাস্টার, নির্মাণ ত্রুটি, মালিক, নকশা অনুমোদনকারী এবং সুপারভিশন, সার্ভে ও রেজিস্ট্রেশন সনদ প্রদানকারীদের এ জন্য দায়ী করে কমিটি। ওই কমিটি ভবিষ্যতে লঞ্চডুবি ঠেকাতে ২৮ দফা সুপারিশও করেছে। এ কমিটির সুপারিশ বস্তাবায়নেও কোনো পদক্ষেপ নেয়নি সরকার।

২০১২ সালে মেঘনায় এমভি শরীয়তপুর-১ ডুবে গেলে ১৪৭ জন মারা যান। এই ঘটনা তদন্তে গঠিত কমিটি লঞ্চ দুর্ঘটনা রোধে কার্যকর ব্যবস্থা নিতে সুপারিশ করে। সুপারিশে চালকের প্রশিক্ষণ, অতিরিক্ত যাত্রী পরিবহন নিয়ন্ত্রণ, পথে পথে পরিদর্শক নিয়োগ, সর্বোপরি লঞ্চ নির্মাণের সময় নকশা যথাযথভাবে মেনে চলা হয়েছে কিনা তা গুরুত্বের সঙ্গে তদারকি করার কথা বলা হয়।

গত বছরের মে মাসে ১৩টি উপকূলীয় সংগঠন যৌথভাবে এক সংবাদ সম্মেলনে জানায়, ১৯৭৭ সাল থেকে ২০১৪ সাল পর্যন্ত ৩৭ বছরে মোট ৪১৬টি নৌ-দুর্ঘটনা ঘটেছে। এ সব দুর্ঘটনায় মোট পাঁচ হাজারেরও বেশি মানুষ মারা গেছেন।

সেখানে আরও জানানো হয়েছিল স্বাধীনতার পর থেকে নৌ-দুর্ঘটনার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট মোট ২০ হাজার মামলা করা হয়েছে। কিন্তু তার মধ্যে ২০০ মামলা নিষ্পত্তি হয়েছে। যার অধিকাংশ মামলাই কেউ শাস্তি পায়নি।

দ্য রিপোর্ট

Comments are closed.