আরবি শিক্ষার আড়ালে জিহাদি প্রশিক্ষণ

চট্টগ্রামের হাটহাজারীর একটি মাদ্রাসায় আরবি শিক্ষা কোর্সের আড়ালে শিক্ষার্থীদের ‘ডিজিটাল’ পদ্ধতিতে জিহাদের তত্ত্ব ও অস্ত্র বিষয়ে প্রশিক্ষণ দেওয়া হতো। আল কায়েদা প্রধান আয়মান আল জাওয়াহিরির বক্তব্য, শিশুদের অস্ত্র প্রশিক্ষণ, জিহাদ কেন ফরজ- এমন সব অডিও ভিডিও মেমোরি কার্ডের মাধ্যমে আদান প্রদান হয়।

মোবাইলে এসব ভিডিও চিত্র দেখা আর ফেসবুকের চ্যাটবক্সে ছাত্রদের মধ্যে চলে পারস্পরিক যোগাযোগ। আলাপ শেষে মুছে ফেলা হয় এসব কথপোকথন।

বৃহস্পতিবার রাতে উপজেলার আলীপুরের ওই মাদ্রাসায় অভিযান চালিয়ে ২৫ জনকে আটক ও বিভিন্ন সরঞ্জাম উদ্ধারের পর শুক্রবার বিকালে নগরীর পতেঙ্গায় র‌্যাব-৭ এর সদর দপ্তরে সংবাদ সম্মেলন করে এসব প্রশিক্ষণের বিষয়ে গণমাধ্যমকে জানানো হয়।

র‌্যাব-৭ এর অধিনায়ক লে. কর্নেল মিফতাহ উদ্দিন বলেন, ডিজিটাল জিহাদের এ প্রশিক্ষণে আন্তর্জাতিক জঙ্গিগোষ্ঠী আল কায়েদা, আইএস, আল আজহারি, আল শাবাব, আল নুসরার বাংলা অনুবাদ করা বিভিন্ন ভিডিওচিত্রের মাধ্যমে প্রশিক্ষণ দেওয়া হত।

“দেখানো হতো- বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে নির্যাতিত মুসলমানদের ছবি এবং পৃথিবীর নানা প্রান্তে নিহত মুসলিম শিশুদের পরিবারের আহাজারি।”

এই র‌্যাব কর্মকর্তা বলেন, প্রাথমিক উদ্বুদ্ধকরণ শেষে আগ্রহীদের দেখানো হতো শিশুদের অস্ত্র চালনা, উড়োজাহাজ ছিনতাই, একে-৪৭ রাইফেলের কার্যকারিতা, হাতে-হাতে যুদ্ধ, সেনা প্রশিক্ষণ ও বাংলাদেশের এসএসএফের কার্যক্রমসহ বিভিন্ন সমরাস্ত্র প্রশিক্ষণের ভিডিও চিত্র।

“ওই প্রশিক্ষণ কেন্দ্রের নাম আবু বকর মাদ্রাসা হলেও সেখানে মাদ্রাসার মতো কোনো প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা হত না। ৪৫ দিনে আরবি শিক্ষার কোর্সের নামে দেশের বিভিন্ন স্থানের শিক্ষার্থীদের এখানে জড়ো করা হত।”

মিফতাহ উদ্দিন বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, প্রাথমিক উদ্বুদ্ধকরণে আগ্রহী মনে হলে তাদের জিহাদের ভিডিও দেখানো হতো।

“দেশের বিভিন্ন এলাকা থেকে প্রশিক্ষণার্থীদের এখানে জড়ো করা হয়। ডিজিটাল প্রশিক্ষণ শেষে তাদের কোথাও পাঠানো হয়ে থাকতে পারে। সেটাও তদন্ত করতে হবে।”

তবে গ্রেপ্তারকৃতদের জঙ্গি সংগঠনের সঙ্গে সম্পৃক্ততা এবং এদের পৃষ্ঠপোষক ও অর্থজোগানদাতাদের বিষয়ে বিস্তারিত কিছু জানতে পারেনি র‌্যাব।

সংবাদ সম্মেলনে র‌্যাব-৭ এর মেজর জাহাঙ্গীর আলম বলেন, “গ্রেপ্তারকৃতদের মধ্যে তিন জন প্রশিক্ষক। ধারণা করছি, তারা কোনো জঙ্গিগোষ্ঠীর সাথে সম্পৃক্ত। যে তথ্য পেয়েছি তার ভিত্তিতে কাজ চলছে।

“আবু বকর মাদ্রাসার পরিচালক মোহাম্মদ ফাত্তাহ নামের এক ব্যক্তি। তাকে গ্রেপ্তার সম্ভব হয়নি। আল কায়েদা বাংলাদেশে যে শাখা করার ঘোষণা দিয়েছে তার সঙ্গে এদের কোনো সম্পৃক্ততা আছে কি না তাও খতিয়ে দেখা হচ্ছে।”

র‌্যাব-৭ অধিনায়ক মিফতাহ উদ্দিন বলেন, শিক্ষার্থীদের এসব প্রশিক্ষণের নেপথ্যে কোনো জঙ্গি সম্পৃক্ততা রয়েছে। এর জন্য অধিক তদন্ত ও জিজ্ঞাসাবাদ প্রয়োজন।

“পুলিশ প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদের পর আদালতের মাধ্যমে টিএফআই সেলে তাদের জিজ্ঞাসাবাদের আবেদন করতে পারে।”

সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত গ্রেপ্তারকৃত কয়েকজনের কাছে এসব বিষয়ে জানতে চাইলে তারা বলেন, তারা লেখাপড়া করতে এসেছিলেন, এসব বিষয়ে কিছুই জানেন না।

গ্রেপ্তারকৃতদের হাটহাজারী থানায় সোপর্দের পর সন্ত্রাসবিরোধী আইনে মামলা হবে বলে সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়।

বৃহস্পতিবার রাতে আলীপুর সুলতান আহমেদ সড়কের এসকে সাফিনা ভবনের চতুর্থ তলার আল মাদরাসাতুল আবু বকরে অভিযান চালায় র‌্যাব-৭।

জঙ্গি সম্পৃক্ততার অভিযোগে সেখান থেকে আটক করা হয় ২৫ জনকে। সেখান থেকে ২৪ টি মোবাইল, পাঁচটি ট্যাব, দুটি কম্পিউটার, একটি ল্যাপটপসহ কিছু কাগজপত্র এবং কয়েকটি মেমোরি কার্ডে বেশ কিছু ভিডিও চিত্র উদ্ধার করা হয়।

পরে জিজ্ঞাসাবাদ শেষে শুক্রবার ১২ জনকে গ্রেপ্তার দেখানো হয়।

এরা হলেন- শেরপুরের আব্দুর রহমান ইবনে আসাদউল্লাহ (২৩), মোস্তাকিম বিল্লাহ মাশরুর (২১) ও মো. হারুনুর রশিদ (১৯) এবং গোপালগঞ্জের শফিকুল ইসলাম শেখ সালাউদ্দিন (১৯) ও আব্দুল কাইয়ুম শেখ মানছুর ইসলাম (১৮)।

জামালপুরের রফিকুল ইসলাম যুবায়ের (১৯), নেত্রকোনার মো. ইউসুফ (২৩), ময়মনসিংহের মাহমুদুল হাসান (২২), পাবনার শামিম হোসাইন ইসমাইল (১৮), ভোলার নাবিল হোসাইন (১৯), মুন্সিগঞ্জের ওসমান গনি (২০) ও চট্টগ্রামের বাঁশখালীর সিরাজুল মোস্তফা সোলাইমান (১৯)।

বিডিনিউজ

Comments are closed.