নাগরিক ভাবনা : উদ্ভুদ পরিস্থিতি নিরসনে আলোচনায় বসতেই হবে

মোজাম্মেল হোসেন সজল, জিএমএম অপু, আরিফ হোসেন: দেশের চলমান রাজনৈতিক অস্থিরতায় জনজীবন বিপন্ন। সাধারণ মানুষের মাঝে উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা। খেটে খাওয়া মানুষের অবস্থাতো ভয়াবহ। তারা নিরাপত্তা চায়, স্বস্তি নিয়ে বেঁচে থাকতে চায়। সরকারের পক্ষ থেকে দাবি করা হচ্ছে-সবকিছুই ঠিকঠাক ও স্বাভাবিক চলছে। কিন্তু জনগণ দেখছেন-কিছুই স্বাভাবিক চলছে না। প্রায় প্রতিদিনই কেউ না কেউ সহিংসতায় বা নাশকতায় মারা যাচ্ছেন।

এদিকে, দেশের নাগরিক সমাজ সংলাপে বসতে প্রেসিডেন্ট, প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপির চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়াকে চিঠি দিয়েছেন। কিন্তু পরদিনই (১০ই ফেব্রুয়ারি) সরকারের বাণিজ্যমন্ত্রী তোফায়েল আহমেদ তার দপ্তরে এক সংবাদ সম্মেলনে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে বলেছেন, নাগরিক সমাজের দেয়া প্রস্তাব অবাস্তব ও অগ্রহণযোগ্য।

এদিকে, বিএনপি জানাচ্ছেন, দাবি মেনে না নেয়া পর্যন্ত আন্দোলন চলবে। এই দুই দলের যাতাকলে পিষ্ট হয়ে সাধারণ মানুষ এখন বোমার আগুনে পুড়ছেন, কেউ মারা যাচ্ছেন। আবার দিনমজুররা কর্মহীন হয়ে পথে বসেছে। কিন্তু এর সমাধান কোথায়। এ নিয়ে মুন্সীগঞ্জের বিভিন্ন পেশাজীবী শ্রেণীর মানুষের সঙ্গে কথা হয়েছে। বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে তারাও আতঙ্কিত। তবে, তাদের সবারই কথা-উদ্ভুদ পরিস্থিতি নিরসনে আলোচনায় বসায় কোন বিকল্প নেই। যত তারাতারি সম্ভব আলোচনায় বসে এর সমাধান করতে হবে।

বিক্রমপুর সাহিত্য সাংস্কৃতিক পরিষদের সভাপতি মুজিব রহমান বলেন,
যত দ্রুত সম্ভব গণতান্ত্রিক অবস্থায় ফিরে যাওয়া দরকার। রাজনৈতিক দলের ভেতরও গণতান্ত্রিক পরিবেশ গড়ে তুলতে হবে। দরিদ্র ও অসহায় মানুষের শেষ আশ্রয় হলো গণতন্ত্র।

শিক্ষক কর্মচারী ঐক্যপরিষদের মহাসচিব মুহাম্মদ জাহাঙ্গীর খান বলেন, রাজনৈতিক সঙ্কট রাজনৈতিক ভাবেই সমাধান করতে হবে। এক্ষেত্রে সরকার প্রধান হিসাবে মাননীয় প্রধান মন্ত্রীকেই প্রথম ভূমিকা নিতে হবে। অপরদিকে, বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়াকেও সঙ্কট সমাধানের মনোভাব নিয়ে এগিয়ে আসতে হবে। তা না হলে এমন পরিস্থিতি চলতে থাকলে সাধারণ মানুষের দুর্ভোগ বাড়বে।

শ্রীনগর উপজেলা পূজা উদযাপন কমিটির সভাপতি ও বাজার কমিটির সভাপতি বিজয় চক্রবর্তী বলেন, এভাবে কি একটি দেশ চলতে পারে। ব্যবসা-বাণিজ্য মুখ থুবড়ে পড়ছে। সাধারণ মানুষের মধ্যে আতঙ্ক। চলমান সঙ্কট থেকে মুক্তির জন্য সংলাপের প্রয়োজন। কেউ কাউকে ছাড় দিতে রাজি নয়। এক্ষেত্রে দুই নেত্রীরই সঙ্কট সমাধানে এগিয়ে আসতে হবে।

বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির জেলা সভাপতি শ. ম. কামাল হোসেন বলেন, সংলাপের প্রয়োজনীয়তা আছে কিনা তা নির্ভর করে বৃহত্তর দুই জোট সমস্যা স্বীকার করে কিনা তার ওপর। বর্তমান জোট ও মহাজোট দেশের মানুষের জন্য রাজনীতি করে বলেও মনে হয় না। রাজনীতি হলো একটি ব্রত। রাজনীতিকে তারাই ব্রত হিসেবে নেন-যারা আদর্শ ভিত্তিক রাজনীতি করেন। বর্তমানে আমরা যা দেখছি, তা হলো-একজোটে রাজাকার আর এক জোটে স্বৈরাচার। অর্থাৎ সকল আদর্শ বর্জন করে যেনতেনভাবে ক্ষমতায় যাওয়ার জন্য প্রতিযোগিতা চলছে। সুতরাং-দেশের জাতীয় স্বার্থ রক্ষায় এই মুহুর্তে জাতীয় সংলাপের আয়োজন করা জরুরী বলেই আমি মনে করছি।

কলেজ শিক্ষক ও কবি কাজী আশরাফ বলেন, এরা জনগণের স্বার্থে রাজনীতি করে বলে মনে হয়না। গণতন্ত্রের কেন্দ্র জনগণ। শুধু ক্ষমতায় যাওয়া আর আঁকড়ে থাকার জন্য জনগণকে কষ্ট দেওয়া হচ্ছে। একজন গণতান্ত্রিক ঐতিহ্যের বাইরে চলে যাচ্ছেন, অন্যজন নিষ্ঠুরতা ছাড়িয়ে যাচ্ছেন। এভাবে চলতে পারেনা। সমাধানের বের করতে হবেই। সংলাপ শুরু হলে জনগণ আপাতত মুক্তি পাবে। স্থায়ী সমাধান খুঁজতে হবে। কয়েক বছর পর পর এমন অচলাবস্থ সৃষ্টি হোক-এটা কাম্য নয়। আলোচনা শুরু হোক। আর সহিংসতার বিচার হোক। নাশকতা বন্ধে সব পক্ষের এগিয়ে আসা উচিত। এমন গোয়ার্তুমি জাতি হিসেবে আমাদের মর্যাদা ক্ষুন্ন হয়। সভার আগে চাই জনগণের মুক্তি।

মুন্সীগঞ্জ আইনজীবী সমিতির সাবেক সাধারণ সম্পাদক মো. মাসুদ আলম বলেন, আমাদের দেশের গণতন্ত্র বই-পুস্তকে সীমাবদ্ধ। বাস্তবে গণতন্ত্র বলতে আমার কাছে মনে হয় কোন কিছুই নেই। বর্তমানে মানুষের কোন স্বাধীনতা নেই। সবাই রাজনীতিকদের কাছে জিম্মি হয়ে পড়েছে। দেশের চলমান আন্দোলনে সাধারণ মানুষ অসহায়। বোমা আর পুলিশের আতঙ্কে দেশ এখন অচল। ঘরে-বাইরে সাধারণ মানুষ আতঙ্কে দিন যাপন করছেন। দিনমজুররা কর্মহীন হয়ে না খেয়ে মরার পথে। এই অবস্থায় উত্তরণের জন্য আমি মনে করি সংলাপের কোন বিকল্প নেই। দুই দলের মধ্যে সংলাপ হলে হয়তো দেশের রাজনীতি স্থিতিশীল অবস্থায় ফিরে আসবে। এবং পরিস্থিতি স্বাভাবিক হবে।

লৌহজংয়ের বিশিষ্ট সমাজসেবক ইফতেখার আলী সিসিল বলেছেন, বিরোধী দলের ক্ষমতায় আসার জন্য আমরা জনগণ দায়ী হতে পারি না। তাই পেট্রোল বোমা কোনদিন সরকার পরিবর্র্তনের মাধ্যম হতে পারে না। বিরোধী দল হোক আর সরকার দলই হোক-আন্দোলনের জন্য এমন রাজনৈতিক কৌশল বা পদ্ধতি অবলম্বন করা উচিত যা দেশের সাধারণ জনজীবনে কোনরকম প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি না করে। দেশে এমন পরিবেশের ধারাবাহিকতা থাকা উচিত যাতে দেশের উন্নয়নের কাজে ব্যাঘাত না ঘটে।

তিনি মনে করেন, আমাদের ছেলেমেয়েদের ভবিষ্যততো আমাদেরই দেখতে হবে। তাই দেশের সাধারণ জনগণ ও ভবিষ্যত প্রজন্মের দিকে দল, মত নির্বিশেষে আমাদের সকলেরই লক্ষ্য রাখা উচিত। আর সরকারকেও কঠোর হস্তে পেট্রল বোমা, সহিংসতামূলক কর্মকান্ড দমন করা উচিত বলে তিনি মনে করেন। সংলাপ প্রসঙ্গে ইফতেখার আলী সিসিল মনে করেন, সংলাপ করুক আর নাই করুক-একমাত্র বৈধ নির্র্বাচনই দেশের সরকার পরিবর্র্তনের নির্র্নায়ক হোক। অশুভ শক্তিকে কোনরকম ছাড় দেওয়া যাবে না। এছাড়াও পেট্রল বোমা কোন সরকার পরিবর্র্তনের মাধ্যম হতে পারে না। তাই যে দলই ক্ষমতায় আসুন-সেটা যেন সুষ্ঠু, অবাধ ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের মাধ্যমে হয়।

মুন্সীগঞ্জ-বিক্রমপুর লেখক ফোরামের সাংগঠনিক সম্পাদক তাজুল ইসলাম রাকীব বলেন, আমরা সংলাপ চাই। এর সাথে সহিংসতা বন্ধ হোক-এটাও চাই । সংলাপের মাধ্যমেই শান্তি ফিরে আসবে বলে তিনি মনে করেন।

মুন্সীগঞ্জ বার্তা

Comments are closed.