স্মরণীয় ব্যক্তিত্ব আব্দুল হাকিম বিক্রমপুরী

আব্দুল হাকিম বিক্রমপুরী ১৩০০ সালের অগ্রহায়ণ মাসে মুন্সীগঞ্জ শহরের কোর্র্টগাঁও গ্রামে জন্ম গ্রহণ করেন। তাঁর পিতা মরহুম কাজী ইব্রাহীম হোসেন ছিলেন একজন বিত্তশালী ও প্রভাব প্রতিপত্তিশালী তালুকদার। কাজী ইব্রাহীম হোসেন একজন দয়ালু ও শিক্ষানুরাগী ব্যক্তি ছিলেন। তিনি মুন্সীগঞ্জের প্রাচীন বিদ্যালয় মুন্সীগঞ্জ বহুমুখী উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠার সাথে জড়িত ছিলেন।

আব্দুল হাকিম বিক্রমপুরী ১৯১৫ সালে ম্যাট্রিক পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন এবং ঢাকা কলেজে তাঁর শিক্ষা জীবন সমাপ্ত করে কলকাতায় গমন করেন। সেখানে শুরু হয় তাঁর সাহিত্য জীবন। তিনি কলকাতা হতে প্রকাশিত মৌলানা মনিরুজ্জামান ইসলামাবাদীর সম্পাদনায় প্রকাশিত ‘সুলতান’ পত্রিকায় সহসম্পাদক হিসেবে যোগ দেন। ওই সময়ে তাঁর লিখিত বিভিন্ন রচনাবলী প্রবাসী, সওগাত, মুসলিম সাহিত্য পত্রিকা, সাধনা, সাধী ও মর্মবাণী, সাপ্তাহিক মোহাম্মদী, ভারতবর্ষ ও অন্যান্য প্রসিদ্ধ পত্রিকায় প্রকাশিত হয়।

বাংলা ১৩৩১ সালে মুন্সীগঞ্জে নাটোরের মহারাজা শ্রী জগদীশ নাথ রায়ের সভাপতিত্বে মুন্সীগঞ্জে যে বঙ্গীয় সাহিত্য সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয় আব্দুল হাকিম বিক্রমপুরী ছিলেন তার উদ্যোক্তা। অনুরূপ ১৩২২ সালের ১১ পৌষ মুন্সীগঞ্জে আচার্য জগদীশ চন্দ্র বসুর সভাপতিত্বে যে সাহিত্য সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়, তারও উদ্যোক্তা ছিলেন তিনি। ওই সময় শ্রী শরৎ চন্দ্র চট্টোপাধ্যায়, শ্রী রমা প্রসাদ চন্দ্র, ডঃ মুহাম্মদ শহিদুল্লা, ডঃ রমেশ চন্দ্র মজুমদার প্রমুখ খ্যাতিমান লেখক ও মনীষীবৃন্দ এই উপলক্ষে মুন্সীগঞ্জে আগমন করেন।

ওই সময় তিনি প্রখ্যাত কথা সাহিত্যিক শ্রী শরৎ চন্দ্র চট্টোপাধ্যায়কে মুসলমান সমাজ নিয়ে কিছু লেখার অনুরোধ জানালে শ্রী শরৎ চন্দ্র চট্টোপাধ্যায় তার বিখ্যাত গল্প ‘মহেশ’ রচনা করেন। উল্লেখ্য সে সময় মুসলমান সমাজ শিক্ষা দিক্ষা ও অর্থনৈতিকভাবে দারুন পিছিয়ে ছিলো। বিক্রমপুরী তার পিতার অর্থ বিত্ত ও প্রতিপত্তিকে কাজে লাগিয়ে মুসলমান সমাজকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার ব্রত গ্রহন করেন। বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা হতে শুরু করে বহু মুসলিম মেধাবী দরিদ্র ছাত্রকে তিনি তার বাড়িতে রেখে বিনা খরচে লেখা পড়ার সুযোগ করে দেন।

এদের মধ্যে অনেকে পরবর্তীতে তৎকালিন পাকিস্থান সরকারের প্রশাসনের অত্যন্ত উচ্চ পর্যায়ে অধিষ্ঠিত হন। তিনি প্রসিদ্ধ ঐতিহাসিক ও সুসাহিত্যিক শ্রী যোগেন্দ্র নাথ গুপ্তের সহয়তায় “বিক্রমপুরের কথা’ নামে একখানি গ্রন্থ প্রণয়ন করেন। তাঁর রচিত সাহিত্যকথা,চীনে ইসলাম,ফুলের ডালি উল্লেখযোগ্য সাহিত্যকর্ম। তাঁর সম্পাদনায় ‘গ্রামের কথা’ নামে একটি মাসিক পত্রিকাও মুন্সীগঞ্জ থেকে ঐ সময় প্রকাশিত হতো। বিক্রমপুরী তার সমাজ সেবা ও সাহিত্য জীবনের পাশাপাশি রাজনীতির সাথে সম্পৃক্ত হন।

প্রথমে তিনি শেরে বাংলা এ,কে ফজলুল হকের সান্নিধ্যে আসেন এবং কৃষক প্রজা পার্টির সাথে যুক্ত হন। ১৯৩৫ সালের ভারত শাসন আইন অনুসারে ১৯৩৭ সালে যখন বঙ্গীয় আইন পরিষদ ও আইন সভার নির্বাচন হয় তখন তিনি কৃষক প্রজা পার্টীর মনোনিত প্রার্থী হিসেবে মুন্সীগঞ্জ থেকে বিপুল ভোটে অবিভক্ত বাংলার আইন পরিষদের সভ্য নির্বাচিত হন। ১৯৪৬ সালের নির্বাচনেও বিপুল ভেটে জয়ী হওয়ার পর তিনি একাদিক্রমে ৫৪ সাল পর্যন্ত আইন সভার সভ্য ছিলেন।

এ কে ফজলুল হক যখন মুসলিম লীগে যোগদান করে অবিভক্ত বাংলার প্রধানমন্ত্রী হন তখন আব্দুল হাকিম বিক্রমপুরীও মুসলীম লীগে যোগদেন। রাজনীতিতে সততা এবং নিষ্ঠার জন্য শেরে বাংলা একে ফজলুল হক আব্দুল হাকিম বিক্রমপুরীকে অত্যন্ত শ্রদ্ধা ও সমীহ করতেন। সে সময় অখন্ড ভারতের অবিভক্ত বাংলার পার্লামেন্টে তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন।

সুদীর্ঘ ১৮ বছর অবিভক্ত বাংলা ও পূর্ব পাকিস্থান আইন পরিষদের সদস্য থাকাকালীন সময়ে তিনি প্রজাস্বত্ব আইন,প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষা আইন,মাদ্রাসা শিক্ষা আইন, ঋণ সালিশী বোর্ড আইন,মহাজনী উচ্ছেদ আইন ও জমিদারী প্রথা উচ্ছেদ আইন সহ অসংখ্য জনকল্যাণ মূলক কাজে সক্রিয় ও সার্থক অংশ গ্রহণ করেন। প্রসঙ্গতঃ উল্লেখ্য যে, তাঁরই পরামর্শ অনুযায়ী ১৯৩৮ সালে এর ২৬ (জি) ধারাটি সংযোজিত হয়। তিনি বাংলা প্রদেশ হতে নিখিল ভারত মুসলীম লীগ কাউন্সিলের কেন্দ্রীয় সদস্য মনোনিত হন এবং ১৯৪৬ সালে মোহাম্মদ আলী জিন্না’র সভাপতিত্বে দিল্লীতে অনুষ্ঠিত মুসলীম লীগ কনভেনশনে বাংলা প্রদেশের প্রতিনিধি হিসাবে যোগদান করেন।

এ সময় বৃটিশ সরকার তাঁকে খান বাহাদুর খেতাবে ভূষিত করতে চাইলে তিনি তা প্রত্যাখান করেন। তিনি বৃহত্তর ঢাকা জেলা মুসলীম লীগের সাধারণ সম্পাদক ও সভাপতি হিসাবে দীর্ঘকাল অধিষ্ঠিত ছিলেন। তিনি ১৯৫৯ সালে মন্ত্রীর পদমর্যাদায় পূর্ব পাকিস্থান প্রাদেশিক গভর্নরের উপদেষ্ঠা হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৬৩ সালে তিনি তৎকালিন মুন্সীগঞ্জ মহকুমা ও ফরিদপুরের কিছু অংশ নিয়ে গঠিত নির্বাচনী এলাকা থেকে বিপুল ভোটে পাকিস্থান জাতীয় পরিষদের সদস্য ( এম এন এ) নির্বাচিত হন। এ সময় তিনি পাকিস্থান জাতীয় পরিষদে পূর্ব পাকিস্থানের বিভিন্ন সমস্যার কথা তুলে বক্তব্য রাখেন।

জনাব বিক্রমপুরী তাঁর সুদীর্ঘ জীবনে বহু শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের প্রতিষ্ঠাতা ও সাহায্যকারী। তিনি মুন্সীগঞ্জে কয়েকটি রিডিং ক্লাবের প্রতিষ্ঠা করা ছাড়াও‘মুসলিম ইনস্টিটিউট’ নামে একটি পাঠাগার প্রতিষ্ঠা করেন। তিনি তার নিজ বাড়ীতেও পরিবারের সদস্যদের জন্য একটি পাঠাগার প্রতিষ্ঠা করেন, যেখানে অনেক দূর্লভ প্রাচীন বই পুস্তকের সমাহার ছিল। কাজী কমরুদ্দিন উচ্চ বিদ্যালয় (কে, কে, সরকারি বিদ্যানিকেতন), কোর্টগাঁও উচ্চ বালিকা বিদ্যালয়, চর ডুমুরিয়া এম,স্কুল তিনি প্রতিষ্ঠা করেন। তিনি নিজ গ্রাম কোর্টগাঁওএ দুইটি প্রাথমিক বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করেন এবং মুন্সীগঞ্জ জেলায় বহু প্রাথমিক বিদ্যালয় স্থাপনে অবদান রাখেন। তারই চেষ্টায় ও অর্থানুকূল্যে গজারিয়া ভবেরচর হাই স্কুল, চিতলিয়া এম,ই,স্কুল এবং সৈয়দপুর মাদ্রাসার প্রতিষ্ঠা হয়। তিনি মুন্সীগঞ্জ মহিলা কলেজ প্রতিষ্ঠার অন্যতম উদ্যোক্তা ছিলেন। এছাড়া তিনি চর ডুমুরিয়া ও গজারিয়ার ভবের চরে দাতব্য চিকিৎসালয় প্রতিষ্ঠা করেন।

আব্দুল হাকিম বিক্রমপুরী নামের মানুষটি ছিলেন একজন সমাজসেবক, রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব ও সুসাহিত্যিক। তিনি ছিলেন বিক্রমপুর তথা বাংলাদেশের গর্ব। সমাজসেবায় বিশেষ অবদানের জন্য বিক্রমপুর ফাউন্ডেশন ১৯৮৩ সালে তাঁকে স্বর্ণপদক প্রদান করেন। ১৯৮৭ সালের ৪ জুলাই বাধ্যর্কজনিত রোগে আক্রান্ত হয়ে ঢাকা পিজি হাসপাতালে তিনি ইন্তেকাল করেন। তার মৃত্যুতে সংসদে শোক প্রস্তাব আনা হয় এবং তৎকালিন প্রধান মন্ত্রী মিজানুর রহমান চৌধুরী শোক প্রস্তাব পেশ ও মোনাজাত পরিচালনা করেন। মৃত্যুকালে তার বয়স হয়েছিলো ৯৭ বছর। তিনি ছিলেন চির অকৃতদার।

সংকলনে অধ্যক্ষ হাওলাদার আব্দুর রাজ্জাক
সভাপতি আব্দুল হাকিম বিক্রমপুরী স্মৃতি সংসদ

ধন্যবাদ নাছির উদ্দিন এলান ভাইকে

Comments are closed.