নিজ দেশীয় কূটনীতিককে জাপান প্রবাসীদের বিদায় সংবর্ধনা

রাহমান মনি: জাপানস্থ বাংলাদেশ দূতাবাসের প্রথম সচিব শাহ্নাজ রানুকে বিদায় সংবর্ধনা জানিয়েছে বাংলাদেশ কম্যুনিটি জাপান। ২৯ নভেম্বর ২০১১ সালে শাহ্নাজ রানু চাকরি জীবনে বহির্বিশ্বে প্রথম হিসেবে জাপানে নিয়োগ পান। তিন বছর মেয়াদ শেষে ভারতের কলকাতাতে বদলি হন। ১৭ জানুয়ারি ২০১৫ তিনি জাপান ত্যাগ করবেন।

সাধারণত দূতাবাস এবং প্রবাসীদের মধ্যে সম্পর্কটা শীতল থাকে। প্রবাসীরা মনে করেন, দূতাবাস তাদের জন্য কিছুই করেন না। এসব আমলা খালি বসে বসে বেতন নেন। তবে দূতাবাসের কাছে প্রবাসীদের চাহিদা কিন্তু তেমন বড় কিছুই না। কেউ চাকরি, ব্যবসা, বাসস্থান বা আহারের জন্য দূতাবাসে সাধারণত ধরনা দেন না একেবারেই বিপদে না পড়লে। প্রয়োজনীয় সনদ সত্যায়িত, পাসপোর্ট বিষয়ক কাজ ছাড়া কেউ দূতাবাসে যানও না সাধারণত।

আবার দূতাবাস মনে করে প্রবাসীদের জন্য কাজ করতে করতে তারা পেরেশান। তবুও তাদের মন জয় করতে পারেন না। দূতাবাসের চোখে প্রবাসীরা হচ্ছেন কামলা। এই আমলা এবং কামলার সম্পর্ক অনেকটা দা-কুমড়ার মতো।

এত কিছু সত্ত্বেও কিছু কিছু আমলা বা সৎ অফিসার আসেন যারা সত্যিকার অর্থেই দেশের স্বার্থে যোগ্যতা বজায় রেখেই কাজ করেন এবং নিজ যোগ্যতায় প্রবাসীদের মন জয় করে তাদের হৃদয়ে স্থান করে নেন। প্রবাসীরাও ওইসব অফিসারকে খুব আপন করে নেন। তাদের চলে যাওয়ায় প্রবাসীদের হৃদয়ে রক্তক্ষরণ হয়। চোখে জল আসে। এ যেন যেতে নাহি দিব হায়, তবু যেতে দিতে হয়, তবু চলে যায়। তেমনি এক অফিসারের নাম শাহ্নাজ রানু। অত্যন্ত মেধাবী এবং চৌকস এই অফিসার সম্প্রতি প্রমোশন পেয়ে দূতাবাসের প্রথম সচিবের পদোন্নতি পান।

৭ ডিসেম্বর টোকিওর ওজি হোকু তোপিয়া হলে আয়োজিত এই বিদায় সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে সর্বস্তরের পেশাজীবী, সামাজিক, সাংস্কৃতিক এবং বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতৃবৃন্দ অংশগ্রহণ করেন। এটি একটি বিরল ঘটনা।

মুন্শী সুলতানা রেনু আজাদের সভাপতিত্বে বিদায় সংবর্ধনা অনুষ্ঠানটি পরিচালনা করেন শিল্পী কামরুল হাসান লিপু। সভার শুরুতেই কিংবদন্তি অভিনেতা সদ্য প্রয়াত খলিলুল্লাহর সম্মানে দাঁড়িয়ে এক মিনিট নীরবতা পালন করা হয়।

আলোচনা সভায় বক্তব্য রাখেন সালেহ্ মোঃ আরিফ, মীর রেজাউল করিম রেজা, মুনশী কে. আজাদ, খন্দকার আসলাম হিরা, ফারহানা স্বপ্না, জুয়েল আহসান কামরুল, কাজী ইনসানুল হক, রাহমান মনি, কাজী এনামুল হক, সনত্ বড়–য়া, পপি ঘোষ, লিনা বড়–য়া, আলমগীর হোসেন মিঠু, হোসাইন মুনীর, দেলোয়ার হোসেন, সাদী আহমেদ, লাকী হাসান, স্বাধীন হোসেন, এ জেড এম জালাল, টুটুল, সুলতানা আজাদ রেনু, লিপিকা চৌধুরী, রশ্মি, লাবণ্য প্রমুখ।

শাহনাজ রানু বাংলাদেশ দূতাবাস পরিচালিত ‘বাংলা ভাষা ও সংস্কৃতি কেন্দ্র’র পরিচালক ছিলেন। কেন্দ্রের শিক্ষার্থী খুদে বন্ধুরা তাকে ফুলেল বিদায়ী শুভেচ্ছা জানান। শাহনাজ রানু একাধারে একজন কবি। লেখক-সাংবাদিক ফোরাম কর্তৃক দেয়া সংবর্ধনার ছবি বাঁধাই করে তার হাতে তুলে দেন আওয়ামী লীগ সভাপতি সালেহ মোঃ আরিফ এবং বিএনপির সাধারণ সম্পাদক মীর রেজাউল করিম রেজা। প্রবাসী কমিউনিটির পক্ষ থেকে সম্মাননা ক্রেস্ট উপহার দেয়া হয় তাকে। সম্মাননা ক্রেস্টটি শাহনাজ রানুর হাতে তুলে দেন সর্বজন শ্রদ্ধেয় মুনশী কে. আজাদ।

বক্তারা শাহনাজ রানুর ভূয়সী প্রশংসা করে বলেন, তার মতো দক্ষ, পরোপকারী কূটনীতিক খুব কমই এসেছেন জাপানে। তিনি দল-মত, ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সকলের জন্য সমানভাবে কাজ করে সকলের হৃদয়ে স্থান করে নিয়েছেন। সব কূটনীতিককেই প্রবাসীরা বিদায়ী সংবর্ধনা দেন না, আবার যারা ভালো কাজ করেন তাদের দিতে কার্পণ্যও করেন না।

বক্তারা বলেন, ইতিপূর্বে আল্লামা সিদ্দিকী, জসীম উদ্দিন, মনিরুল ইসলাম, মনসুর ফায়জুল্লাহ, নাজমুল হুদা কূটনীতিক হিসেবে প্রবাসীদের ভালোবাসায় সিক্ত হয়েছিলেন। শাহনাজ রানু তার সর্বশেষ সংযোজন।

বিদায়ী সংবর্ধনায় সিক্ত শাহনাজ রানু বলেন, ‘আপনাদের এই ভালোবাসা বলে প্রকাশ করার মতো নয়। শুধু অনুভব করার মতো। জাপান প্রবাসীদের অনুভূতি এবং ভালোবাসা আমার কাছে একটি মুক্তার মালার মতো জীবনের ঝুলিতে অর্জিত হয়েছে। এমন সুন্দর, সহযোগিতামূলক এবং বন্ধুভাবাপন্ন কমিউনিটি পৃথিবীর আর কোথাও আছে কিনা আমার জানা নেই। আমি সততার সঙ্গে কাজ করার চেষ্টা করেছি। কূটনীতির পাশাপাশি প্রবাসীদের সেবা দেয়াও কাজের একটি অংশ।’

উল্লেখ্য, টোকিও দূতাবাসে এমআরপি প্রকল্প চালু হলে একজন দক্ষ, মেধাবী ও চৌকস অফিসার হিসেবে শাহ্নাজ রানুকে টিমপ্রধান করে দায়িত্ব অর্পণ করা হয়। দায়িত্ব পেয়ে শাহ্নাজ রানু বেশ দক্ষতার সঙ্গে এবং সহযোগিতামূলক কাজ করে প্রবাসীদের আরও কাছাকাছি পৌঁছতে সক্ষম হন।

rahmanmoni@gmail.com

সাপ্তাহিক

Comments are closed.