মেট্রোরেল বিল-২০১৫ অনুমোদন: যানজট থেকে মুক্তির আশায় নগরবাসী

জাতীয় সংসদে কণ্ঠভোটে পাস হলো ‘মেট্রোরেল বিল-২০১৫’। সোমবার সন্ধ্যায় সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রী ওবায়দুল কাদের বিলটি উত্থাপন করলে তা কণ্ঠভোটে পাস হয়। এর আগে স্বতন্ত্র সদস্যরা এ বিলের একাধিক সংশোধনী প্রস্তাব আনলেও তা নাকচ হয়ে যায়।

মেট্রোরেলের কারণে নগরবাসী বেশ কিছু সুবিধা ভোগ করতে পারবেন। মুক্তি পাবেন নগরজীবনের অন্যতম সমস্যা যানজট থেকে। ভয়াবহ যানজটের নগরীতে পরিণত হয়েছে ঢাকা। বর্তমান বিশ্বের ঘনবসতিপূর্ণ শহরগুলোর মধ্যে ঢাকা অন্যতম।

২০০৯ সালে রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (রাজউক) আওতাভুক্ত এলাকায় এ জনসংখ্যা দাঁড়ায় ১ কোটি ৪৫ লাখে। ২০২৫ সাল নাগাদ ঢাকা মেট্রোপলিটনে জনসংখ্যা দাঁড়াবে ২ কোটি ৫৪ লাখে।

এছাড়া প্রতিদিন ঢাকার পার্শ্ববর্তী শহর যেমন নরসিংদী, মানিকগঞ্জ, নারায়ণগঞ্জ, গাজীপুর, মুন্সীগঞ্জ থেকে লাখ লাখ লোক ঢাকায় যাতায়াত করছে।

তার ওপর প্রতিদিন ঢাকায় জনসংখ্যা বাড়ছে। বাড়ছে যানবাহন ও ঘরবাড়ি। এ ভয়াবহ পরিস্থিতি নিরসনে যা করণীয়, তা হলো দ্রুত গণপরিবহন ব্যবস্থা চালু করা।

যানজটের এই অসহনীয় যন্ত্রণা থেকে রাজধানীবাসীর মুক্তির জন্য মেট্রোরেল নির্মাণের পরামর্শ আসে কৌশলগত পরিবহন পরিকল্পনায় (এসটিপি)।

পাশাপাশি বাস র‌্যাপিড ট্রানজিট (বিআরটি) সুপারিশও করা হয় ওই মহাপরিকল্পনায়।

যানজট নিরসনের উপায় ও গণপরিবহন হিসেবে এ দুই ব্যবস্থা বিশ্বে সমাদৃত।

নিজস্ব অর্থে বড় প্রকল্প বাস্তবায়ন সম্ভব নয় বলে সে সময় থেকে দাতাদের খোঁজ শুরু হয়। দাতাদের আশ্বাস পাওয়ার পর শুরু হয় সম্ভাব্যতা যাচাই। এতেই পেরিয়ে যায় প্রায় পাঁচ বছর।

২০১২ সালের ১৮ ডিসেম্বর জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের (একনেক) সভায় প্রকল্পটি অনুমোদন হয়। প্রকল্পের প্রাক্কলিত সময় ১২ বছর। এমআরটি-৬ নির্মাণেও ঋণ দিচ্ছে জাইকা। গত বছরের ফেব্রুয়ারিতে সরকারের সঙ্গে জাইকার এ-সংশ্লিষ্ট চুক্তি হয়। এর পর প্রকল্পটির পরামর্শকও নিয়োগ দেয়া হয়।

পরিকল্পনা অনুযায়ী, মেট্রোরেলের নকশা প্রণয়ন ও জমি অধিগ্রহণে সময় লাগবে তিন বছর। পাশাপাশি চলবে ঠিকাদার নিয়োগ প্রক্রিয়া। প্রথম ধাপে ২০১৯ সালের মধ্যে পল্লবী থেকে সোনারগাঁও হোটেল পর্যন্ত ১১ কিলোমিটার মেট্রোরেল নির্মাণ শেষ হবে। পরের বছর চালু হবে সোনারগাঁও থেকে মতিঝিল পর্যন্ত।

মেট্রোরেল নির্মাণে এত সময় লাগার কারণ হচ্ছে মেট্রোরেল দীর্ঘমেয়াদি ও ব্যয়বহুল। পাশ্ববর্তী দেশ ভারতে কয়েকটি বড় শহরে মেট্রোরেল আছে।

দিল্লি মেট্রো নির্মাণে সময় লাগে ২৬ বছর, কলকাতায় মেট্রো নির্মাণ হয় ১৮ বছরে আর মুম্বাইয়ে লাগে ২২ বছর।

মেট্রোরেলের স্টেশনগুলো হচ্ছে উত্তরা উত্তর, উত্তরা সেন্টার, উত্তরা দক্ষিণ, পল্লবী, আইএলটি, মিরপুর সেকশন-১০, কাজীপাড়া, তালতলা, আগারগাঁও, খামারবাড়ি, ফার্মগেট, সোনারগাঁও, জাতীয় জাদুঘর, দোয়েল চত্বর, প্রেস ক্লাব, জাতীয় স্টেডিয়াম ও বাংলাদেশ ব্যাংক।

প্রতিটি স্টেশনেই যাত্রীরা ওঠানামা করতে পারবে। স্টেশনে ট্রেন থামবে সাড়ে ৩ মিনিট।

উত্তরা মডেল টাউনের তৃতীয় পর্যায়ের এলাকায় মেট্রোরেলের প্রধান ডিপো স্থাপন করা হবে।

তবে মাটি বা মাটির নিচ দিয়ে এ রেল চলবে না। এটি চলবে ফ্লাইওভারের মতো উড়ালপথে। আর এর স্টপেজেও হবে মাটির ওপরে। সিঁড়ি বেয়ে স্টপেজে উঠে ট্রেনে চড়তে হবে।

মেট্রোরেল চালুর ফলে ঢাকায় মতিঝিল থেকে মিরপুর ও উত্তরা রুটে রাজধানীবাসীর যাতায়াত অনেক সহজ হবে। বলা হচ্ছে, মাত্র ৩৬ মিনিটেই মতিঝিল থেকে উত্তরা যাওয়া সম্ভব হবে।

এ দুই রুটে যানবাহন চলাচলও অনেক কমবে। মেট্রোরেল ঘণ্টায় প্রায় ৬০ হাজার যাত্রী পরিবহন করতে পারবে। ১০ বা ২০ মিনিট অন্তর উভয় দিক থেকে ট্রেন ছাড়বে। তাই বলা যায় ঢাকার এক প্রান্ত থেকে আরেক প্রান্তে সংযোগ সৃষ্টিকারী মেট্রোরেল শহরের যানজট হ্রাসে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।

যানজটের কারণে এখন উত্তরা থেকে মতিঝিলে আসতে সময় লাগে ৩ থেকে সাড়ে ৩ ঘণ্টা। কিন্তু মেট্রোরেল চালু হলে এ পথ পাড়ি দেয়া যাবে মাত্র ৩৭ মিনিটে, যা মানুষের ভোগান্তি বহুলাংশে কমিয়ে আনবে। তাছাড়া বাস ও অন্যান্য পরিবহনের চেয়ে ভাড়াও কম হবে মেট্রোরেলে।

যোগাযোগ বিশেষজ্ঞ ড. এস এম সালেহউদ্দিন এর মতে, মেট্রোরেল প্রতি ঘণ্টায় ৮০,০০০ যাত্রী পরিবহন করতে পারবে। ফলে মেট্রোরেল স্থাপিত হলে রাস্তায় যাত্রী এবং পরিবহন উভয়ের ওপরই চাপ কমবে।

তিনি আরো বলেন, কোনো শহরে ১ কোটির ওপর জনসংখ্যা থাকলেই মেট্রোরেলের মতো গণপরিবহন বৃদ্ধি করা উচিত, তাতে যাত্রী পরিবহনের চাপ সামলানো সহজ হতে পারে।

জাইকার প্রাথমিক স্টাডিতে দেখা যায়, মেট্রোরেল চালু হলে রাজধানীতে মতিঝিল-মিরপুর রুটে প্রাইভেট কার ও বাস চলাচল প্রায় শূন্যের কোটায় নেমে আসবে। আর মেট্রোরেলের কারণে মতিঝিল-উত্তরা রুটেও যানবাহন কমবে প্রায় ৫০ শতাংশ। এতে রাজধানীতে দৈনিক প্রায় দুই হাজার যানবাহন চলাচল কমবে।

তবে কিছু জটিলতাও রয়েছে মেট্রোরেল প্রকল্পে।

মেট্রোরেলের রুট ও ডিপোর অবস্থান পরিবর্তন করা হয়েছে। মেয়র হানিফ (গুলিস্তান-যাত্রাবাড়ী) ফ্লাইওভারের কারণে দৈর্ঘ্যও কমানো হয়েছে প্রায় দুই কিলোমিটার। এতে যাত্রাবাড়ীর পরিবর্তে মতিঝিলেই শেষ হচ্ছে মেট্রোরেলের গন্তব্য। জমি অধিগ্রহণে সমস্যা রোধে কঠোর আইন করা হয়েছে। পদ্মা বা যমুনা সেতুর জমি অধিগ্রহণের সময়ও এ ধরনের আইন করা হয়েছিল, যা উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নে জরুরি।

এদিকে এমআরটি-৪-এর রুটে শুরু করা হচ্ছে ঢাকা এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে নির্মাণ। অথচ উত্তরা থেকে কমলাপুর বিদ্যমান রেলপথের ওপর এমআরটি-৪ নির্মাণের কথা এসটিপিতে বলা ছিল। এরপর সে পথে এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে নির্মাণের কথা ছিল। তবে এখনই এক্সপ্রেসওয়ে নির্মাণের ফলে তা আর সম্ভব হবে না। আর মৌচাক মোড়ে অত্যাধিক বহুতল ভবন নির্মাণের ফলে সেখানে অস্বাভাবিক রকমের বাঁক নিতে হয়। এতে বিমানবন্দর সড়ক থেকে মগবাজার, মৌচাক হয়ে কমলাপুর পর্যন্ত এমআরটি-৫ নির্মাণের পরিকল্পনাও বাদ দিতে হবে।

ঢাকা বর্তমানে দ্রুত সম্প্রসারণশীল একটি শহর। ঢাকা আরবান ট্রান্সপোর্ট নেটওয়ার্ক ডেভেলপমেন্ট স্টাডির (ডিএইচইউটিএস) তথ্যমতে, ঢাকা মেট্রোপলিটন এলাকায় প্রতিদিন ব্যক্তিগত যাতায়াতের (ট্রিপ) সংখ্যা প্রায় ২ কোটি ৩০ লাখ। প্রতি বছর এ ট্রিপ ৩ দশমিক ৮ শতাংশ হারে বাড়ছে। এ কারণে গত কয়েক বছরে ঢাকার পরিবহন ব্যবস্থাকে ঢেলে সাজানোর জন্য নানা ধরনের প্রকল্প নেয়া হয়েছে। এর মধ্যে ক্লিন এয়ার সাসটেইনেবল এনভায়রনমেন্ট প্রজেক্টের অধীনে বিমানবন্দর সড়ক থেকে সদরঘাট পর্যন্ত চালু করা হবে বিআরটি-১।

মেট্রোরেল চালু হলে গাজীপুর-বিমানবন্দর সড়কে যানবাহনের চাপ অনেক কমে যাবে। তবে এর পূর্ণ সুবিধা পেতে বিমানবন্দর সড়ক থেকে সদরঘাট বিমানবন্দর সড়ক থেকে সোজা মহাখালী হয়ে মগবাজার, মালিবাগ, গুলিস্তান হয়ে সদরঘাট পর্যন্ত ২২ কিলোমিটার দীর্ঘ হবে।

শীর্ষ নিউজ

Comments are closed.