পিনাক-৬-এর নথিপত্র গায়েব!

পিনাক-৬-এর নথিপত্র গায়েব দুর্ঘটনায় ডুবে যাওয়া এমভি মিরাজ-৪ ও এমভি পিনাক-৬-এর নথিপত্র গায়েব হয়ে গেছে! দুদক থেকেই মিলেছে এমন অভিযোগ। যার কারণে দুই লঞ্চের যাবতীয় নথিপত্র বারবার তলব করা হলেও দুর্নীতি দমন কমিশনকে (দুদক) কাগজপত্র সরবরাহ করতে পারছে না সমুদ্র পরিবহণ অধিদপ্তর। দুদকের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা এই তথ্য নিশ্চিত করেছেন।

২০১৪ সালের ১৫ মে ও ৪ আগস্ট যথাক্রমে পদ্মায় পিনাক-৬ ও মুন্সীগঞ্জে এমভি মিরাজ-৪ লঞ্চডুবির ঘটনায় শতাধিক মানুষের প্রাণহানি ঘটে। নিখোঁজ হন কয়েক শ যাত্রী।

এর পরই গত অক্টোবরে দায়িত্বে অবহেলার অভিযোগে সাময়িক বরখাস্ত হওয়া সমুদ্র পরিবহণ অধিদপ্তরের শিপ সার্ভেয়ার মির্জা সাইফুর রহমানের নানা অনিয়মের অভিযোগ অনুসন্ধানে নামে দুদক। এরই মধ্যে সরকারের গঠিত তদন্ত কমিটির অনুসন্ধানে তার বিরুদ্ধে মিলেছে অভিযোগের সত্যতা।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক দুদকের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা জানান, বারবার লঞ্চ দুটির নথিপত্র চাওয়া হলেও এখন পর্যন্ত সমুদ্র পরিবহণ অধিদপ্তর কোনো নথিপত্র সরবরাহ করতে পারেনি।

এ বিষয়ে তিনি আরো জানান, দপ্তর থেকে জানানো হয়, তারা ওই দুটো লঞ্চের নথিপত্র খুঁজে পাচ্ছেন না। তাই সরবরাহ করতে দেরি হচ্ছে। সর্বশেষ ১১ জানুয়ারি সমুদ্র পরিবহণ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক বরাবর আবারও চিঠি দেওয়া হয়। চিঠিতে ২০১৩ সালের এপ্রিল থেকে ২০১৪ সালের জুলাই মাস পর্যন্ত মির্জা সাইফুর রহমান কর্তৃক নৌযান রেজিস্ট্রেশন প্রদানসংক্রান্ত যাবতীয় নথি চাওয়া হয়েছে। এর মধ্যে এমভি মিরাজ-৪ ও এমভি পিনাক-৬-সহ ৫৬টি নৌযানের নাম উল্লেখ করা হয়েছে। ওই সব নৌযান রেজিস্ট্রেশনের সঙ্গে আয়কর নথির ছায়ালিপি, জাহাজের ওজন, নৌযানের স্টাবিলিটি, বুকলেট, নকশা অনুমোদন ও ফিটনেস-সংক্রান্ত যাবতীয় কাগজপত্র চাওয়া হয়েছে।

শিপ সার্ভেয়ার মির্জা সাইফুর রহমানের দুর্নীতির বিষয়ে জানা যায়, তিনি গত বছরের ১৩ মার্চ সমুদ্র পরিবহণ অধিদপ্তরে সার্ভেয়ার পদে যোগদানের পর চলতি বছরের জুলাই মাস পর্যন্ত ৩ হাজার ৪৫টি নৌযান সার্ভে করেন। পাশাপাশি তিনি একই সময়ে ২৭৮টি কার্গো, ট্যাংকার জাহাজের রেজিস্ট্রেশন দেন।

এর মধ্যে অধিকাংশ জাহাজ তিনি সরেজমিনে পরিদর্শন না করে সার্ভে ও রেজিস্ট্রেশন সম্পন্ন করেন। এতে নৌযানের ভুয়া স্টাবিলিটি বুকলেট এবং অনেক নৌযানের অনিয়মিত আয়কর জাল করে নথিতে দাখিল করে সার্ভে ও রেজিস্ট্রেশন সম্পন্ন করেছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। জাহাজ রেজিস্ট্রেশনে দুর্নীতির মাধ্যমে মালিক হয়েছেন বিপুল ধনসম্পদের।

লঞ্চডুবির ঘটনায় গঠিত তদন্ত কমিটির প্রতিবেদন অনুসারে, গত ৪ আগস্ট মুন্সীগঞ্জে পদ্মা নদীর মাওয়া ঘাটের কাছে এমএল পিনাক-৬ লঞ্চডুবির ঘটনা ঘটে। এতে ৪৯ জনের মৃতদেহ উদ্ধার করা হলেও লঞ্চটি উদ্ধার করা সম্ভব হয়নি।

এ ঘটনায় তদন্ত কমিটি ২০১৪ সালের ১৪ সেপ্টেম্বর জমা দেওয়া প্রতিবেদনে অতিরিক্ত যাত্রী পরিবহণ, অদক্ষ চালক, নকশায় ত্রুটি এবং লঞ্চটির কাগজপত্রেও নানা রকম অনিয়ম উল্লেখ করা হয়েছে। এজন্য বিআইডব্লিউটিএর ও সমুদ্র পরিবহণ অধিদপ্তরের পাঁচ কর্মকর্তার অনিয়ম ও অবহেলাকে দায়ী করা হয়েছে।

অনুরূপভাবে গত মে মাসে মুন্সীগঞ্জে এমভি মিরাজ-৪ নামের আরো একটি লঞ্চ ডুবে ৫৬ জনের প্রাণহানি ঘটে। নৌবাণিজ্য অধিদপ্তরের প্রকৌশলী ও জাহাজ জরিপকারক এ এফ এম সিরাজুল ইসলামের নেতৃত্বে গঠিত তিন সদস্যের তদন্ত কমিটি গত ২৪ জুন দাখিলকৃত প্রতিবেদনেও দুর্ঘটনার জন্য সাইফুর রহমানকে দায়ী করা হয়।

দুর্ঘটনার জন্য মির্জা সাইফুরকে দায়ী করে তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়, গত ২৮ এপ্রিল পিনাক-৬ লঞ্চ নিয়মিত বার্ষিক সার্ভের সময় প্রথমে ছয়টি ত্রুটি চিহ্নিত করে ৪৫ দিনের সাময়িক চলাচলের অনুমতিপত্র (টোকেন) দেওয়া হয়। পরে ওই টোকেনে আরো ৩০ দিন সময় বাড়ানো হয়। পুনরায় সার্ভে করে আরো ৪৫ দিন চলাচলের অনুমতি দেওয়া হয়। অন্যান্য ক্ষেত্রেও একইভাবে একাধিক লঞ্চ বা জাহাজকে একাধিক টোকেন দেওয়া হয়েছে। অনিয়ম করে পরিপূর্ণ মেরামত ছাড়াই এভাবে অস্থায়ী চলাচলের অনুমতি দেওয়া লঞ্চ দুর্ঘটনার একটি কারণ।

প্রতিবেদনে আরো বলা হয়েছে, আইনে ৪৫ দিনের বেশি টোকেন দেওয়ার সুযোগ নেই জেনেও মির্জা সাইফুর বারবার সময় বাড়িয়ে টোকেন ইস্যু করেন। এমনকি সার্ভে সনদ ইস্যুর জন্য ডিক্লারেশন ফরম সমুদ্র পরিবহণ অধিদপ্তরের মহাপরিচালকের কাছে না পাঠিয়ে দায়িত্বে অবহেলা করেছেন তিনি।

রিপোর্টে বিআইডব্লিউটিএর কয়েক কর্মকর্তাকে দায়ী করে বলা হয়েছে, ঈদ মৌসুমে মাওয়া, কাওড়াকান্দি ও কাঁঠালবাড়ী ঘাটে যাত্রীসমাগম বেশি হয় জেনেও ওই সব স্থানে সাময়িকভাবে অতিরিক্ত ট্রাফিক ইন্সপেক্টর না দেওয়ায় বা ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে অবহিত না করে দায়িত্বে অবহেলার জন্য বিআইডব্লিটিএর পরিচালক (নৌ-নিট্রা) শফিকুল হক ও যুগ্ম-পরিচালক (নৌ-নিট্রা) মো. রফিকুল ইসলাম দায়ী।

এ ছাড়া আরো যেসব নৌযান রেজিস্ট্রেশনে অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে সেগুলো হচ্ছে : এমভি বোরহান কবীর, যার সাবেক নাম এমভি জয়খান ৫; এমএল বাদল, যার সাবেক নাম এমএল রুমা; এমভি আলতাফ ১; এমভি এনএ ৬; এমভি নজিব বেপারী; এমভি রিভার ড্রিম ৬; এমভি আল ইত্তেহাদ ২ ও ৩; ওটি কিংফিশার ৭, ৮, ১০; এনভি সুমনা ৩; এমভি সুন্দরবন ১১; এমভি এইচপিএল ১ ও ২; ওটি হযরত বাহাদুর শাহ; এমভি হাজী ইমন আলী; ওটি আতিফা জাহান; ওটি দারিন দাশাব ১; এমভি সান্নিধ্য; ওটি রিদা; ওটি রিদা ১; ওটি আফসারা; এমভি জেসি ২; এমভি সিটি ২৬; এমভি সম্রাট ২; এমভি প্রিন্স আওলাদ ২ ও ৪; এমভি ফারহান ৩ ও ৪; এমভি শাহরাস্তি ৩; এমভি শাহিন রিফাত ১; এমভি সোনার তরী; এমভি ইমাম হাসান ২; ওটি গোল্ডেন পোস; এমভি বালশুর ১; এমভি নিউ স্টার ৫ ও ৬; এমভি মারমেইড; ওটি জাওয়াত; এমভি রিপন; এমভি ইয়াদ; এমভি প্রিন্স অব হাসান হোসেন ১; এমভি আরদি ১; এমভি ময়ূর ৭; এমভি জাবেদ ১১; এমভি বনী হাসান; এমভি ঈগল ৩ ও ৪; এমএভি বোরহান কবীর; ওটি ওশান প্রিন্স; ওটি ওশান স্টার; এমভি শান্তা রূপা ৪ ও ৫; এমভি ওয়াটার বাজ ৩, ৪, ৫ ও ৬; এমভি জাবেদ ১২; ওটি নোভা; এমভি আক্তার বানু; এমএল বাদশা; এমভি মিতালী ৪; এমভি আকাশ ১৩; ওটি মেঘবতী; এমভি মানিক ৯; এমভি নিউ সাব্বির ২ ও ৩; এমভি সর্দার বাড়ী; এমভি বি সেইল; এমভি ইদ্রিস মোল্লা; এমভি মান ৭; এমভি মামিন আমিন; এমভি রাজহংস ৮ ইত্যাদি।

দুদকের সহকারী পরিচালক শেখ আবদুস ছালাম অভিযোগটি অনুসন্ধান করছেন।

এশিয়াবার্তা

Comments are closed.