চড়া কর দিয়েও সেবা পাচ্ছেন না মুন্সীগঞ্জ পৌরবাসী

কর্মকর্তারা অফিস করেন ইচ্ছা মাফিক
আকাশ চৌধুরী: মুন্সীগঞ্জ পৌরসভা প্রথম শ্রেণীতে উন্নীত, হলেও জনসেবার মান বাড়েনি। শুধু নামেই প্রথম শ্রেণীর পৌরসভা। পুরনো পরিসংখ্যানেই চলছে পৌর সভার কার্যক্রম। উচ্চ হারে কর নেয়া হলেও পৌরবাসী বঞ্চিত হচ্ছে সব ধরনের পৌর সুযোগ-সুবিধা থেকে। যার ফলে প্রতিদিনই লোকজনকে নানা প্রয়োজনে পৌরসভায় এসে দুর্ভোগ ও হয়রানির শিকার হচ্ছে। কর্মকর্তা ও কর্মচারীরা অফিস করেন ইচ্ছে মতো। অফিসিয়াল সময় ও নিয়মানুবর্তিতা মেনে চলার কোনো বালাই নেই কর্মকর্তাদের। প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তার পদটি দীর্ঘদিন যাবত শূন্য থাকায় কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে। অনেকেই ঢাকা থেকে অনিয়মিতভাবে অফিস করে থাকেন বলেও অভিযোগ রয়েছে।

যার ফলে নানা কাজে লোকজন পৌরসভায় এসে কর্মকর্তাদের অফিসে না পেয়ে ব্যর্থ মন নিয়ে ফিরে যাচ্ছেন। মুন্সীগঞ্জ পৌরসভা প্রতিষ্ঠিত হয় ১৯৭২ সালের ২২ জানুয়ারী। বয়সের দিক থেকে এই পৌর সভার বয়স ৩২ বছর পেরিয়ে গেছে। ২০০৮ সালের হিসাব মতে এই পৌরসভার আয়তন ১০ দশমিক ৮৫ বর্গ কিলোমিটার। নোটিশ বোর্ডে টাঙ্গানো এই পৌরসভার সার্বিক চিত্র তুলে ধরে একটি পরিসংখ্যান দেয়া রয়েছে ২০০৮ সালের। গত ৬ বছরে মুন্সীগঞ্জ পৌরসভার নতুন কোনো পরিসংখ্যান পাওয়া যায়নি। ওই সময়ের পরিসংখ্যান অনুযায়ী পৌরসভার ৯টি ওয়ার্ডে মোট জনসংখ্যা রয়েছে ৫৭ হাজার ৭শ ২৮জন।

অথচ গত ৬ বছরে পৌর সভায় জনসংখ্যা বেড়েছে অনেক। পরিবর্তন হয়েছে অনেক কর্মকর্তার। নতুনভাবে নির্বাচিত হয়েছে মেয়র ও কমিশনাররা। অথচ পৌরসভার নতুন করে কোনো পরিসংখ্যান টাঙ্গানো হয়নি বোর্ডে। ১৯৯৪ সালে পৌরসভাটি প্রথম শ্রেণীতে উন্নীত হলেও বাস্তবতার সঙ্গে মিল নেই। পৌর শহরের সার্বিক চিত্র সেই মান্ধাতা আমলের মতোই চলছে।

যত্রতত্র ময়লা আবর্জনার স্তুপ, সুয়ারেজ খালের বেহাল দশা, ডাস্টবিনের যথাযথ ব্যবহার না হওয়া, জরাজীর্ণ রাস্তাঘাট, সোডিয়াম লাইটিংয়ের দুরবস্থা, নিয়মিত পয়:নিস্কাশন না হওয়ায় পৌরবাসীর দুর্ভোগ দিনদিন বাড়ছে। নিম্নমান হচ্ছে জীবনযাত্রার মান। নির্দিষ্ট রিকসা স্ট্যান্ড না থাকায় যততত্র গড়ে উঠেছে অবৈধ রিকসা স্ট্যান্ড। বাড়ছে অবৈধ রিকসার সংখ্যা। ৬ বছর আগের পরিসংখ্যানে উল্লেখ রয়েছে শহরে চলাচলরত অবৈধ রিকসার সংখ্যা সাড়ে ৮শ’ আর বৈধ ৬শ’।

গত ৬ বছরে রিকসার সংখ্যাও বহুগুন বেড়েছে। অথচ সেই পরিসংখ্যান নেই পৌরসভার বোর্ডে। এতে করে এই ছোট শহরটিতে যানজটের ঘটনা সার্বক্ষণিক হয়ে দাড়িয়েছে। এছাড়া শহরের বিভিন্ন স্থানে গড়ে উঠেছে অবৈধভাবে বাস, টেম্পু, অটো রিকসা ও সিএনজি চালিত যানের স্ট্যান্ড। এগুলো নিয়ন্ত্রণ করারও যেন কেউ নেই। পৌর শহরের বিভিন্ন স্থানে কাঁচা ল্যাট্রিনের ব্যবহার বাড়ছে। গণশৌচাগার না থাকায় লোকজন যত্রতত্র মূলমূত্র ত্যাগ করছে। এতে পরিবেশ হচ্ছে দূষিত।

শহরবাসী অস্বাস্থ্যকর জীবনযাপন করছেন। এতে করে এই শহরে নানা জটিল রোগে আক্রান্ত মানুষের সংখ্যাও দিনদিন বেড়ে চলেছে। দীর্ঘদিনেও নেয়া হচ্ছে না মশা নিধনের কোনো পদক্ষেপ। এতে মশার উপদ্রবে অতিষ্ট এই পৌরবাসী। অথচ মশা নিধনের নামেও বিপুল টাকা সরকারিভাবে ব্যয় দেখানো হচ্ছে। ভেঙ্গে পড়েছে এই শহরের ড্রেনেজ ব্যবস্থা। ৬ বছর আগের সেই পরিসংখ্যানে দেখা যায় এই পৌরসভায় আর সিসি পাইপ ড্রেন রয়েছে ১৮ কিলোমিটার। তার মধ্যে পাকা ড্রেন ৫ দশমিক ৯৮ কিলোমিটার আর কাচা ৩৯ কি.মি.। পাকা ডাস্টবিনের সংখ্যা ২৭টি।

এসব ডাস্টবিন কাগজেপত্রে থাকলেও পৌর শহরে অস্তিত্ব খুঁজে পাওয়া যায় না। ময়লা আবর্জনায় ভরে দীর্ঘদিন যাবত ব্যবহারের অনুপযোগী হয়ে রয়েছে ভাঙ্গা ডাস্টবিনগুলো। আর এ কারনে পৌরবাসী তাদের ময়লা আবর্জনা যেখানে সেখানে ফেলে শহরকে অপরিচ্ছন্ন ও অস্বাস্থ্যকর করে তুলছে। সেগুলো নিয়মিত পরিস্কারও করা হয় না। পরিসংখ্যানে উল্লেখ করা হয়েছে এই পৌরসভায় কমিউনিটি সেন্টার ৩টি, হাসপাতাল ১টি, মা ও শিশু কেন্দ্র ১টি, ক্লিনিক ৩টি, হাট বাজার ৫টি, পৌর সুপার মার্কেটের দোকান সংখ্যা ৪৬টি, পৌর মার্কেট ২৪৫টি, পাবলিক রিকসা ও বাসস্ট্যান্ড ১টি, পৌর কবর ১টি, পারিবারিক কবরস্থান ৫০টি, স্টেডিয়াম ১টি, হোল্ডিং ৭০৫২টি, স্যানিটেশন সুবিধাপ্রাপ্ত মানুষ ১২২৯০জন, স্বাস্থ্য সম্মত ল্যাট্টিন ১১৫৪৫টি, অস্বাস্থ্যকর ৭৪৫টি, স্বাস্থ্যসম্মত ৫০৯টি, বিদ্যুৎ পোস্ট ৯৮২টি, রিকসার লাইসেন্স ২ হাজার, রিকসা চালকের লাইসেন্স ৪১০ টি, ভ্যানগাড়ীর লাইসেন্স ২শ’টি, ঠেলাগাড়ী ১০টি ট্রেড লাইসেন্স ২ হাজার, নলকূপ ৬৮টি, অকেজো নলকূপ ২টি, নির্মানাধীন ৫০টি।

এই পৌর শহরে দৈনিক পানির চাহিদা রয়েছে ২৮ লাখ গ্যালন, সরবরাহ দেয়া হচ্ছে ৬ দশমিক ৪৮ লাখ গ্যালন পানি। হস্তচালিত নলকূপ ৫৩২টি ও অকেজো ৩৮টি। এই পৌর শহরে গত ৬ বছরে মানুষ বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে সবকিছুরই চাহিদা বেড়েছে। কিন্তু বাড়ানো হয়নি পৌরবাসীর সুযোগ-সুবিধা। এ ব্যাপারে মুন্সীগঞ্জ পৌর সভার নির্বাহী প্রকৌশলী খন্দকার মো: আক্তার হায়দারের কাছে জানতে চাইলে তিনি কিছুই বলতে পারবেন না বলে জানান এবং পৌর মেয়রের সঙ্গে কথা বলার পরামর্শ দেন।

মুন্সিগঞ্জেরকাগজ

Comments are closed.