এক প্রবাসীর স্ত্রীর কান্না আর আমাদের বাস্তবতা…

এডভোকেট ব.ম শামীম: টঙ্গীবাড়ী থানায় ডিউটি অফিসারের রুমে বসে আছি। ইতিমধ্যে থানায় প্রবেশ করলেন মালয়শিয়া প্রবাশির স্ত্রীর জেসমিন। নাক মুখ দিয়ে রক্ত ঝড়ছে তার সাথে ঝড়ছে চোখ দিয়ে অঝর পানি আর শুধু আর্তনাদের অকুণ্ঠ স্বরে স্যার আমারে মাইরা শেষ করে ফেলছে আমি বিচার চাই স্যার আমি বিচার চাই। ডিউটি অফিসার বললেন আপনে আগে চিৎকিসা করেন সুস্থ হন তারপর আসেন আমি আপনার সাথে পুলিশ পাঠাচ্ছি। না জেসমিন নাছোর বান্দা তার শরীরের সব রক্ত পড়ে শেষ হয়ে যাক তারর্পও সে আগে বিচার চায় তারপর চিৎকিসা। স্বামী প্রবাসী এক অসহায় মহিলার অর্তনাদ যে কতো করুন তা চোখে না দেখলো বোঝার উপায় নাই। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কাছে এই অর্তনাদ ছাড়া আর কিইবা করার আছে তার।

ছোট দুটি বাচ্চা নিয়ে জেসমিন বসবাস করেন টঙ্গীবাড়ী উপজেলার পাইকপাড়া গ্রামে। অতি তুচ্ছ ঘটনাকে কেন্দ্র করে তার ভাসুর নজরুল ইসলাম ও তার দুই ছেলে আশিক ও আকাশ মেরে রক্তাক্ত করে বাড়ি থেকে তাড়িয়ে দিয়েছে তাকে। তার পিতার বাড়ি নরসিংদি জেলার ভৌরব উপজেলায়। প্রায় ৮ পূর্বে বিয়ে হয় তার ৩ বছর যাবৎ স্বামী জানে আলম মালয়শিয়া প্রবাস জীবন করছেন। এই অসহায় মহিলার উপর প্রায় নির্যাতন করে ভাসুরের পরিবারের লোকজন। ২০ জানুয়ারী মঙ্গলবার সকাল বেলায় তার ছোট বাচ্চার সাথে ভাসুরের ছোট অপর একটি বাচ্চার ঝগড়ার সুত্র ধরে অমানবিক নির্যাতন করে শরীরে রক্ত ঝড়িয়ে বাড়ি থেকে বের করে দেওয়া হয়েছে তাকে।

বাবার বাড়ি দূরে হ্ওয়াতে থানা ছাড়া আর কোথায়ও য্ওায়ার স্থান নেই তার। সে থানায় এসেছে ন্যায় বিচারের আসায়। তাই শরীরের সব রক্ত ঝড়িয়েও ন্যায় বিচার চায় সে। ডিউটি অফিসার তাকে ধমক্কাচ্ছে আপনে আগে চিকিৎসা করান। অমানবিক অত্যাচারের শিকার এই মহিলা বিচার দাবীর কাছে তার শরীর দিয়ে পড়া রক্ত যেন একবারে তুচ্ছ। যেভাবে রক্ত ঝড়ছে দেখে আর স্থীর থাকতে পারলাম না আমি। তার সাথে একটি মানুষ ও নেই তাকে সান্তনা দেওয়ায় কিংবা ডাক্তার দেখানোর মতো। আমি বললাম আপনি হাসপাতাল চিনেন। সে অসহায় এর মতো তাকিয়ে রইলো আমার দিকে।

বুঝলাম এ সমস্ত প্রবাসীর স্ত্রীদের সাধারণত বাড়িতেই সংসার ছেলে মেয়ে নিয়ে ব্যাস্ত থাকতে হয়। স্বামী বাড়িতে না থাকায় সন্তান নিয়ে সব সময় বাড়তি চিন্তায় ও কাজ নিয়ে ব্যাস্ত থাকেন তারা। তাদের উপজেলা সদর হাসপাতাল চিনার কথা নয়। আমি বললাম চলেন আমার সাথে নিয়ে গেলাম হাসপাতালে চিকিৎসা করালাম। তার পুড়ো মুখ-মন্ডল এবং মাথায় অঘাতের চিহ্ন। কর্তব্যরত ডাক্তার বললেন আপনি ভর্তি থাকেন আপনার অবস্থাতো বেশি ভালো না। জেসমিন জানালো বাড়িতে তার ছোট ছোট দুটি ছেলে রয়েছে হয়তো এতক্ষনে মাকে না দেখতে পেয়ে কান্না করছে তারা তাকে এক্ষুনি ফেরতে হবে। হায়রে প্রবাসীর নাড়ির দায়বদ্ধতা স্বামী নাই দেশে তাই সন্তানদের দেখার মতোও কেউ নেই। মোটামুটি চিকিৎসা শেষ করে আমার একটি ভিজিটিং কার্ড তার হাতে দিয়ে প্রয়োজনে আমাকে ফোন করতে বলে তাকে থানায় পাঠায় দিলাম অভিযোগ লিখার জন্য। আমার ব্যাস্ততার কারনে সাথে যেতে পারলম না।

তথন দুপুর আড়াইটা হোটেলে ভাত খাচ্ছি হঠাৎ করে একটি ফোন আসলো আমার মোবাইলে। আমি মোবাইলে কান্নার স্বর ছাড়া আর কোন শব্দই শুনতে পারছিনা। আমি মোবাইলকারীকে বারবার তার নাম জানতে চাচ্ছি এবং কাদছে কেন অনেকবার জানতে চাওয়ার পর সে বললো ভাই আমি জেসমিন। আমি বাড়ি ফেরার পর ওরা আমারে আবার মেরে বাড়িতে আটকাইয়া রাখছে। আমি বললাম কেন আপনারে আবার মারলো। জেসমিন বললো, আমি থানায় অভিযোগ করছি তারা কেমনে জানি জাইন্না হালাইছে তাই আমারে আবার মাইরা ঘরের মধ্যে আটকাইয়া রাখছে। আমি বললাম আপনি পুলিশ নিয়ে বাড়ি যাননাই কেন? ভাই পুলিশতো আসে নাই তারা বলছে পরে আসবে। আমি বললাম আপনি বসে থেকে পুলিশ নিয়ে যাবেননা।

জেসমিন, ভাই আমার বাড়িতে দুটি ছোট ছোট ছেলে একটি বুকের দুধ খায় তাদের জন্যইতো এ বাড়িতে আমি ফিরে আইছি তানাহলে আর কোনদিন আমি এ বাড়িতে ফিরতাম না। শুনে স্তব্ধ হয়ে গেলাম আমি। ইচ্ছা হচ্ছিল আমার ছুটে যাই জেসমিনের বাড়িতে। ভাবলাম আমি একা গিয়ে কি করবো ওখানকার লোকজনের কাছে শুনেছি জেসমিনের ভাসুর নজরুলের পরিবারের লোকজন খুব খারাপ প্রকৃতির লোক। কি করব আমি বিধাতার কাছে চোখ বুঝে পার্থনা করলাম হে আল্লাহ আমায় একগুচ্ছ অস্ত্র দেও এ সমস্ত নরপশুদের বিরুদ্ধে যুদ্ধে নামি। দম বন্ধ হয়ে আসলো আমার আবার ভাবলাম না জেসমিনের জন্য কিছু করা প্রয়োজন ভাবলাম কাউকে সাথে নিয়ে জেসমিনের বাসায় যাই। আবার ভাবলাম না আমারা ওখানে গেলে আবার কি কান্ড ঘটে যায় তার চেয়ে থানায় ফোন করে দেখি। ডিউটি অফিসারকে ফোন করলাম।

বললাম আপনারা জেসমিনের সাথে জাননাই কেন? ওকেতো আবার মেরে অবরুদ্ধ করে রাখা হয়েছে। ডিউটি অফিসার বললো ভাই অবরোধ ডিউটি থাকায় পুলিশ সব ব্যাস্ত। কাকে পাঠাবো থানায়তো কোন অফিসার নাই। আমার ডিউটি শেষ হলে কাল না হয় আমি নিজেই গিয়ে বিষয়টি দেখে আসবো। আমি ভাবলাম ঠিকইতো পুলিশ অফিসাররা অবরোধসহ জরুরী অন্যান্য ডিউটি পালন করছে, ডিউটি অফিসারের কথায় মনে হলো মায়া তাদেরও জেসমিনের প্রতি আছে। আরা মায় হবেইনা কেন ওই মহিলাকে যেভাবে মেরে রক্তাক্ত করে বাড়ি থেকে বের করে দেওয়া হয়েছে রক্ত ঝরা অবস্থায় একা থানায় এসেছে অভিযোগ করার জন্য দেখলে যে কোন ব্যাক্তিরই মায়া হওয়ারই কথা। পুলিশতো মানুষই মায়াতো হবেই। মানুষ মানুষের জন্য মায়া হবে এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু মানুষরুপি নজরুল পরিবারের নরপশুগুলোর একটু মায়া হয়না একটি অসহায় মহিলাকে বার বার নির্যাতন ও রক্তাক্ত করতে।

তাছাড়া জেসমিনতো দুরের কেউ নয় তার আপন ছোট ভাইয়ের স্ত্রী । এই বর্বর মানুসগুলোর যার প্রতিবাদ করার শক্তি নাই সাধারণ একটি মহিলাকে বারবার নির্যাতন করছে অতি তুচ্ছ কারনে। জেসমিন প্রবাসী স্বামীর মতো এদেশের লক্ষ লক্ষ মানুষ প্রবাসে অর্থ উপর্জন করে এদেশের অর্থনৈতিক অবস্থাকে সচল রাখছে। এদেশের মানুষ এদেশের অর্থনীতিতে তাদের অবদান সবচেয়ে বেশি। যাদের অবদানের কারনে আজ দেশ জাতি বিশ্বের বুকে মাথা তুলে দিন দিন দাড়াচ্ছে। আর সেই পরিবারের সদস্যরা দেশে বিভিন্নভাবে নির্যাতানের স্বীকার হচ্ছেন। একদিকে স্বামীকে কাছে না পাওয়ার যন্ত্রনা অন্য দিকে সংসার ও সন্তান নিয়ে স্ত্রীদের বাড়িতে পিতা এবং মাতা উভয় দায়িত্ব পালন করা কতোটা কষ্টসাধ্য তা আমাদের চারপাশের প্রবাসীর স্ত্রীদের দিকে তাকালেই বুজাযায়।

প্রতিদিনই কখনো সন্তানকে নিয়ে বিদ্যালয়ের পথে হাটছে প্রবাসীর স্ত্রী কখনো লম্বা ব্যাগ হাতে বাড়ি ফিরছে বাজার নিয়ে। কখনো দেখা যায় ব্যাংকের সামনে লম্বা লাইনে দাড়িয়ে স্বামীর বিদেশ হতে পাঠানো টাকা তুলছে তারা। তারপরে সংসারের রান্নাবান্না সন্তান লালন পালনসহ বাকী কাজ্ও করতে হচ্ছে তাকে। কখনোবা সন্তানের আপদে বিপদে পিতার মতো যুদ্ধে নামতে হয় তাকে। স্বামী বাড়িতে না থাকায় প্রায়ই আসে-পাশের লোকজনের কাছ হতে কটুক্তি সহ্য করতে হচ্ছে। তারপরেও সংসার নামের কঠিন বাস্তবতার পথে প্রতিদিন হাটতে হয় তাকে।

আসুন এ সমস্ত প্রবাসীর স্ত্রীদের প্রতি আমাদের সহযোগীতার হাতটি বাড়িয়ে দেই সুগম করি তাদের চলার পথ। যাদের ঘামে যাদের উপার্জনে সভ্যতার উচ্চ শিখর আর সমৃদ্ধির পথে এগিয়ে যাচ্ছে এদেশ। জেসমিনের মতো অসহায় প্রবাসীর স্ত্রীদের প্রতি আমাদের কি কোন দায়িত্ব নেই। তারাতো আমাদের মতোই মানুষ, আমাদের সমাজে আমাদের চারপাশেইতো বসবাস করে তারা। তারাতো আমাদেরই বোন, ভাবি করোবা মা। আসুন আমরা আমাদের চারপাশের প্রবাসীর সংসারের প্রতি একটু সুদিষ্টি দেই। যাতে জেসমিনের মতো লাঞ্চনা আর বঞ্চনার শিকার হতে না হয় আর কোন প্রবাসীর স্ত্রীকে।

বিক্রমপুরচিত্র

Comments are closed.