আগুন-সন্ত্রাসীদের বিচার চাই

কমল কর্মকার: বাংলাদেশে এখন চলছে বিএনপি-জামায়াত জোটের ‘শান্তিপূর্ণ’ অবরোধ। ‘শান্তিপূর্ণ’ কথাটা যে কতটা হাস্যকর ও প্রহসনপূর্ণ হতে পারে, তা হাড়ে হাড়ে উপলব্ধি করছেন দেশবাসী। উপলব্ধি করছেন রাজধানীবাসী, বিশেষ করে আমাদের মতো ছা-পোষা অফিসযাত্রীরা। কী যে শান্তি নিয়ে বাসের সিটে মাথা হেলিয়ে নাক ডেকে ঘুমিয়ে শান্তিতে অফিসে আসছি আমরা! আহা শান্তি! (অবশ্য এক দিক দিয়ে শান্তিই বটে- সংসারের টানাটানি, অভাব-অনটন নিয়ে কোনো দুশ্চিন্তাই এ সময় মাথায় আসছে না। আগুনে পুড়ে কাবাব হওয়ার ভয়টাই তাড়া করছে সর্বক্ষণ)। এই শান্তিপূর্ণ অবরোধ আর কত দিন চলবে!

কীসের জন্য এ অবরোধ? গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের জন্য? একেক বার অবশ্য মনে হয়, সত্যিই তো! তারা তো পুরোপুরি গণতান্ত্রিক অধিকার ভোগ করতে পারছে না। সমাবেশ করতে পারছে না। কিন্তু তারা গণতান্ত্রিক অধিকার পাচ্ছে না বলে কি জনগণকে পুড়িয়ে কাবাব বানিয়ে, সারা দেশ জ্বালিয়ে দিয়ে তাদের অধিকার আদায় করবে? বিএনপি-জামায়াত জোট বলে থাকে যে জনগণের অধিকার আদায়ের জন্য তারা আন্দোলন করছে। জনগণের অধিকার আদায়ের জন্যই যদি এ আন্দোলন হয়, তাহলে জনগণকে পুড়িয়ে কেন? আর কোনো পন্থা কি নেই? এ প্রশ্নের ধরাবাঁধা একটা রাজনৈতিক উত্তর তাদের ঠোঁটের ডগায় প্রস্তুতই থাকে। তা হলো ‘এটা সরকারের কাজ’! এটা যে সরকারের কাজ, কীভাবে বিশ্বাস করি? ৫ জানুয়ারি নির্বাচনের সময় স্কুল, যানবাহন আর মানুষ পুড়িয়েও তারা বলেছিল, এটা সরকার পুড়িয়েছে। ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলা করে তৎকালীন বিরোধীদলীয় নেতা শেখ হাসিনাকে হত্যার চেষ্টা করা হলো। অনেক নেতা-কর্মী নিহত হলেন, অনেকে পঙ্গু হয়ে গেলেন চিরজীবনের জন্য। তখনো বিএনপি বলেছিল এটা আওয়ামী লীগই করেছে, বিএনপি সরকারকে বেকায়দায় ফেলার জন্য। কিন্তু সত্য কখনো গোপন থাকে না। কারা হামলা করেছে তা শেষ পর্যন্ত জানা গেছে। তাহলে বিএনপি-জামায়াত জোটের কথা কীভাবে বিশ্বাস করব?

রাষ্ট্রবিজ্ঞানের ছাত্র হিসেবে গণতন্ত্রের এক সংজ্ঞায় পড়েছিলাম যে গণতন্ত্র এমন একটি পদ্ধতি, যা কখনো পুরোপুরি কার্যকর করা যায় না। আমাদের মতো উন্নয়নশীল দেশে কি হঠাৎ করে যুক্তরাষ্ট্র বা ভারতের মতো গণতন্ত্র এসে যাবে? গণতন্ত্র হঠাৎ করে কার্যকর হওয়ার বিষয় নয়। এর জন্য দীর্ঘদিনের চর্চা থাকতে হয়। আমাদের দেশ সেই পাকিস্তান আমল থেকে বেশিরভাগ সময় সেনাশাসিত ছিল। সেই শাসনের ধকলটা এত সহজে কাটিয়ে ওঠা সহজ নয়! তবে সম্ভব। এর জন্য সব রাজনৈতিক দলকেই সবার আগে নিজেদের আচরণে গণতান্ত্রিক হতে হবে।

নব্বইয়ের পর থেকে আমরা তো অনেক গণতন্ত্রই দেখলাম। গণতন্ত্রের সুযোগ নিয়ে যুদ্ধাপরাধীরাও মন্ত্রী হয়েছে। দেদার লুটপাট হয়েছে। কিন্তু দেশের বিদ্যুৎ উৎপাদন বাড়েনি, উন্নয়ন হয়নি।

তা ছাড়া পাকা ধানখেতে ইঁদুরের গণতন্ত্রে আমি বিশ্বাসী নই। কৃষকের পাকা ধান খাওয়ার অধিকার ইঁদুরকে দিয়ে দেব? নব্বইয়ের পর থেকে বড় দুই দলেরই তো গণতন্ত্র আমরা দেখলাম। তার ফিরিস্তি দিয়ে লেখার পরিসর বাড়াব না।

এ দেশ স্বাধীন হয়েছে অনেক রক্তের বিনিময়ে। একটা চেতনাকে বুকে ধারণ করে, বুকে রক্তক্ষরণ নিয়ে, প্রায় ঘরে ঘরে প্রিয়জনকে হারানোর বেদনাসহ অমানুষিক যন্ত্রণা সহ্য করে বাংলাদেশের স্বাধীনতা অর্জিত হয়। তখনো স্বাধীনতাবিরোধী একটা চক্র ছিল। ১৫ আগস্টের হত্যাকাণ্ডের পর এই স্বাধীনতাবিরোধী শক্তিটা বেশিরভাগ সময় এই দেশ শাসন করেছে। দীর্ঘ সময় ধরে তারা স্বাধীনতাবিরোধী শক্তিটাকে সংগঠিত ও শক্তিশালী করেছে। নতুন প্রজন্মের একটা অংশকে ভুলপথে বা পেছনে হাঁটার নীতিতে চালনা করেছে। স্বাধীনতার চার দশক পরেও কি সেই নীতিতে দেশ চলতে পারে? আমার অভিমত হলো, পারে না। ক্ষমতায় যে-ই থাকুক, স্বাধীনতার চেতনার উল্টোস্রোতে দেশ চালাতে পারে না।

বর্তমান সময়ে যখন অর্থনীতিসহ বিভিন্ন উন্নয়নসূচকে বাংলাদেশ ভারত-পাকিস্তানের চেয়েও অনেক ক্ষেত্রে ওপরে অবস্থান করছে, বিদ্যুতের সমস্যা প্রায় সমাধান হয়ে গেছে, তখন এই জ্বালাও-পোড়াওয়ের আন্দোলন কিছুটা সন্দেহের উদ্রেক করে বৈকি! কাদের স্বার্থে এ জ্বালাও-পোড়াও? অর্থনৈতিক সূচক ভালো থাকলে আন্দোলন দানা বাঁধে না। বিএনপি-জামায়াত জোটকে এটা বুঝতে হবে। আন্দোলনের সময় এখনো আসেনি। অনেক সময় পাবেন আপনারা। এবার থামুন।

কিছুদিন আগেও ‘টক শো’ নামক টিভি অনুষ্ঠানগুলো বেশ জনপ্রিয় ছিল। বর্তমানে এর জনপ্রিয়তা অন্তিম দশায় পৌঁছেছে। একজন প্রাজ্ঞ প্রাক্তন প্রগতিশীল ‘টকবাজ’ চলমান আন্দোলন নিয়ে বলেছেন, যানবাহনে অগ্নিসংযোগকারীরা সন্ত্রাসী নয়। স্বদেশি আন্দোলনে ক্ষুদিরাম, সূর্য সেনদেরও সন্ত্রাসী বলা হতো! হায় রে, টকবাজি! কোথায় স্বর্গের তারা আর কোথায় …!

টকবাজ মহাশয় কি জানেন না, ক্ষুদিরাম-সূর্য সেনরা স্বদেশকে ইংরেজদের হাত থেকে স্বাধীন করার জন্য জীবন দিয়েছেন, বোমা মেরেছেন শাসক ইংরেজদের ওপর? জনগণকে পুড়িয়ে কাবাব বানাননি তারা। তারা ছিলেন জনগণের নয়নের মণি।

টক শোর সেই প্রাজ্ঞজনের মন্তব্য অনুযায়ী তো আগুন-সন্ত্রাসীদের তাহলে সূর্য সেনদের মতো সূর্যসৈনিক পদবি দিয়ে পুরস্কৃত করতে হয়! বঙ্গবন্ধুর খুনিদের যেমনটা করা হয়েছিল!

আমার সাদাসিধা দাবি, দেশের চলমান ‘শান্তিপূর্ণ অবরোধ’-এর অবসান ঘটাতে হবে এবং তা অচিরেই। দেশের মানুষ ভীতসন্ত্রস্ত হয়ে রাস্তায় বের হচ্ছে। পেটের তাগিদে। শ্রবজীবীদের দুঃখদুর্দশার কথা ভাবতে হবে। এটা করতে হবে সরকারকেই। কারণ জনগণের জানমাল রক্ষার দায়িত্ব সরকারের। সরকার কোন পন্থায় করবে তা তাদের সিদ্ধান্তের বিষয়। জনগণ এ অবস্থা থেকে মুক্তি চায়।

যাদের নির্মমভাবে পোড়ানো হয়েছে, যাদের বীভৎসভাবে পুড়িয়ে হত্যা করা হয়েছে তাদের পরিবারকে কী সান্ত্বনা দেব আমরা। সেই আগুন-সন্ত্রাসীদের কঠোর শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে।

আর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কথা হলো : ‘শান্তিপূর্ণ অবরোধ’ দিয়ে মানুষ পুড়িয়ে যদি দাবি আদায় করা যায়, তা হবে ভয়াবহ নতুন একটা রাজনৈতিক সংস্কৃতি। এটা ভয়াবহ একটা দৃষ্টান্ত হয়ে যাবে। ভবিষ্যতে এই অপকৌশলের আশ্রয় নেবে সব রাজনৈতিক দল। দাবি আদায়ের জন্য যখন-তখন ছোলা মুরগির মতো জ্যান্ত মানুষ পুড়িয়ে দলগুলো দাবি আদায়ে রত হবে। ভাবা যায়! বাংলাদেশের গণতন্ত্রের সংস্কৃতিতে এমনিতেই অনেক কালিমা মাখা হয়ে গেছে। আর কত! সেই পুরোনো কালিমাগুলো ধুয়েমুছে শুচিশুভ্র হওয়ার সময় এখনই। মুক্তিযুদ্ধের চেতনা নিয়ে এগিয়ে যেতে হবে সবাইকে।

সুতরাং আর যাতে কোনো মানুষকে নির্মমভাবে পুড়ে মরতে না হয়, দ্রুত সে ব্যবস্থা নিতে হবে। আগুন-সন্ত্রাসীদের বিচার করে কঠোর শাস্তি দিতে হবে।

লেখক : কবি ও সাংবাদিক

রাইজিংবিডি

Comments are closed.