পদ্মা সেতু : ড্রেজিং স্পয়েল নিয়ে বিপাকে কর্তৃপক্ষ

পদ্মার ড্রেজিংয়ের মাটি বিশাল বোঝা হয়ে দাঁড়িয়েছে। প্রায় দুই কোটি ঘনমিটার মাটি (ড্রেজিং স্পয়েল) ফেলার জন্য আরও জায়গা চাই। এজন্য স্থান নির্ধারণ ও স্থানীয়দের ক্ষতিপূরণ দেয়া নিয়ে হিমশিম খাচ্ছেন প্রকল্প সংশ্লিষ্টরা। বিষয়টি নিয়ে সংশ্লিষ্ট জেলা প্রশাসন, ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান ও প্রকল্পের কর্মকর্তারা একাধিকবার বৈঠক করেও সুরাহা করতে পারেননি। এদিকে বনানীর সেতু ভবনের প্রকল্প অফিসে বসেই পদ্মা সেতু নির্মাণ কার্যক্রমের চিত্র সরাসরি দেখতে প্রকল্প এলাকায় ক্যামেরা বসানোর উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। প্রকল্প সূত্র এ তথ্য জানিয়েছে।

জানতে চাওয়া হলে পদ্মা বহুমুখী সেতু প্রকল্পের পরিচালক মো. শফিকুল ইসলাম যুগান্তরকে বলেন, এখন ড্রেজিং চলছে। ড্রেজিং স্পয়েল ফেলার জন্য জমি দেয়া হয়েছে। আরও জমির প্রয়োজন হবে। তবে কোন স্থানে আরও কী পরিমাণ জমির প্রয়োজনÑ তা আমরা সার্ভে করছি। পাশাপাশি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান ও কনসালটেন্ট প্রতিষ্ঠান কাজ করছে। বিষয়টি নিয়ে সংশ্লিষ্ট জেলা প্রশাসকদের সঙ্গেও কথা হয়েছে। তিনি বলেন, ড্রেজিং স্পয়েল ফেলার জন্য এখনই একসঙ্গে পুরো জমির দরকার নেই। পর্যায়ক্রমে জমির প্রয়োজন হবে। আমরা সেই ব্যবস্থা করছি। এটি চলমান প্রক্রিয়া। আশা করছি জমি নিয়ে সমস্যা হবে না।

প্রকল্প সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানায়, পদ্মা সেতুর অ্যালাইনমেন্ট অনুযায়ী নদীর দুই পাড়ে ১২টি করে মোট ২৪টি প্রান্তিক পিলার বসাতে হবে। ভাসমান জাহাজে ভারি মেশিনের সাহায্যে এসব পিলার স্থাপন করা হবে। জাহাজ চলাচলের জন্য পদ্মা নদীর দুই পাড়ে জমি কেটে ২৫০ ফুট প্রশস্ত নৌ চ্যানেল তৈরি করতে হবে, যা মধ্যম আকারের নদীর সমান। মাওয়া এলাকায় চ্যানেলের দৈর্ঘ্য হবে প্রায় ১৫০ মিটার এবং জাজিরা এলাকায় ৩০০ মিটার। এছাড়া পদ্মা নদীর বুকে জেগে ওঠা চর কাটতে হবে। সব মিলিয়ে ড্রেজিংয়ের মাধ্যমে প্রায় ২ কোটি ঘনমিটার স্পয়েল অপসারণ করতে হবে। ড্রেজার থেকে পাইপের মাধ্যমে ড্রেজিং এলাকা কিছু দূরে স্পয়েল ফেলতে হয়। বর্তমানে দুই পাড়েই সেতুর নিজস্ব জমি রয়েছে। এরপরও ড্রেজিং স্পয়েল ফেলার জন্য বাড়তি জমির প্রয়োজন হবে। বিশাল পরিমাণের ওই ড্রেজিং স্পয়েল ফেলার জমি নির্ধারণ নিয়ে বিপাকে পড়েছেন সেতু কর্তৃপক্ষ। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা আরও জানান, পদ্মা সেতু নির্মাণের জন্য মাওয়া ও জাজিরা অংশে জমি অধিগ্রহণ রয়েছে। কিন্তু ওই জমিতে এত বিপুল পরিমাণ পলি ফেলা সম্ভব হবে না। চরের জমিতে ফসল চাষ করেন স্থানীয়রা। কিছু জমি জেলা প্রশাসন লিজ দিয়েছে। ওই সব লিজ বাতিল করে কৃষকদের ক্ষতিপূরণ দিয়ে জমি নেয়ার চিন্তাভাবনা চলছে। জমি নির্ধারণে রোববার শরীয়তপুর জেলা প্রশাসন ও সেতু বিভাগের কর্মকর্তারা সরেজমিন পরিদর্শন করেছেন। সূত্র আরও জানায়, বর্তমানে পদ্মা নদীর মাঝিরচরে ড্রেজিং কার্যক্রম চলছে। বর্তমানে ওই চরে ডাইক তৈরি করে ড্রেজিং স্পয়েল ফেলা হচ্ছে।

প্রকল্প কর্মকর্তাদের সঙ্গে আলাপ করে জানা যায়, বর্তমানে মাটির পরীক্ষা, জিওটেকনিক্যাল ইনভেস্টিগেশন এবং জরিপ কাজ চলছে। পাশাপাশি চলছে চীনের ন্যানটংয়ে ট্রায়াল পাইলের স্টিল ফেবরিকেশনের কাজ। শিগগিরই ট্রায়াল পাইল বাংলাদেশে এসে পৌঁছবে বলে আশা করছে সেতু কর্তৃপক্ষ। নদীশাসন কাজে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান সাইনোহাইড্রো কর্পোরেশনের সঙ্গে ১০ নভেম্বর চুক্তি হয়েছে। এ প্রতিষ্ঠানটি সার্ভে ও সেটিং আউটের কাজ চলছে। জাজিরা কনস্ট্রাকশন ইয়ার্ডে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের অফিস ও স্টোর রুম নির্মাণের কাজ চলছে। এই অফিস থেকেই নদীশাসন কার্যক্রম পরিচালনা করা হবে। সব মিলে মূল সেতু নির্মাণ কাজের অগ্রগতি শতকরা একভাগ।
এদিকে প্রকল্পের আর্থিক অগ্রগতি সম্পর্কে গত ডিসেম্বরের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ওই সময় পর্যন্ত ৬ হাজার ১৫০ কোটি ৭১ লাখ টাকা ব্যয় হয়েছে। বর্তমানে প্রকল্পের ব্যয় ধরা হয়েছে ২০ হাজার ৫০৭ কোটি ২০ লাখ টাকা। তবে পদ্মা সেতু বহুমুখী প্রকল্পের ব্যয় আরেক দফা বাড়তে যাচ্ছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে। এবার ৫ হাজার কোটি টাকা ব্যয় বাড়তে পারে। এ লক্ষ্যে সেতু প্রকল্পের ডিপিপি আরেকবার সংশোধন করা হচ্ছে। প্রকল্পের কর্মকর্তাদের মতে, এত বড় প্রকল্প কখনও বাংলাদেশে এককভাবে বাস্তবায়ন হয়নি। তাই এ প্রকল্পের ব্যয় কয়েক দফা বাড়তে পারে। সেক্ষেত্রে বিশেষ বিবেচনায় পরিকল্পনা মন্ত্রণালয় অনুমোদন না দিলে বাস্তবায়নে জটিলতা সৃষ্টি হতে পারে।

সম্প্রতি প্রকল্প এলাকা ঘুরে দেখা যায়, সেতু নির্মাণে পদ্মার দুই পাড়ে কর্মযজ্ঞ চলছে। সেতুর জন্য বড় বড় শেড নির্মাণের কাজ করছে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান। মাওয়ায় বড় বড় বার্জে ক্রেন বসানো হয়েছে ভারি বস্তু উঠানো-নামানোর জন্য। এক্সকেভেটরসহ ভারি মেশিনের সাহায্যে এপ্রোচ সড়ক নির্মাণ কাজ চলছে। পদ্মা সেতু প্রকল্পের সর্বশেষ গত ১২ জানুয়ারির অগ্রগতির প্রতিবেদন অনুযায়ী, পদ্মা বহুমুখী সেতু প্রকল্পের জাজিরা এপ্রোচ সড়ক নির্মাণ কাজের অগ্রগতি ৩০ ভাগ ও মাওয়া এপ্রোচ সড়ক নির্মাণ অগ্রগতি ২২ দশমিক ৫ ভাগ। আগামী বছরের অক্টোবরে জাজিরা এপ্রোচ সড়ক ও জুলাইয়ে মাওয়া এপ্রোচ সড়কের কাজ শেষ হওয়ার সময়সীমা নির্ধারিত রয়েছে। মালয়েশিয়ার কোম্পানি এইচসিএমের সঙ্গে জয়েন্টভেঞ্চারে বাংলাদেশী কোম্পানি আবদুল মোনেম লিমিটেড ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান হিসেবে প্যাকেজ দুটিতে কাজ করছে। সার্ভিস এরিয়ার-২ নির্মাণ কাজের অগ্রগতি ১৫ ভাগ। ২০১৭ সালের জুলাইয়ে সার্ভিস এরিয়া-২ কাজ শেষ করার সময় নির্ধারিত রয়েছে। এ অংশের কাজ করছে এককভাবে আবদুল মোনেম লিমিটেড। ভূমি অধিগ্রহণের কাজ ৯৯ ভাগ শেষ হয়েছে।

যুগান্তর

Comments are closed.