বিপ্লবী সত্যেন সেন : সোনারঙ্গের সোনার মানুষ

গোলাম আশরাফ খান উজ্জ্বল: সবাই আমরা তাকে চিনি বিপ্লবী হিসেব। সত্যিকার অর্থেই তিনি বিপ্লবী। মেহনতি ও দুঃখী মানুষের জন্য নিজেকে উৎসর্গ করেছেন আমৃত্যু। জীবনের অধিকাংশ সময়ই তিনি জেলে থেকেছেন। স্বাধীনতার কথা বলতে গিয়ে ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনে অংশগ্রহণের দায়ে বিএ পরীক্ষার পরই তিনি গ্রেফতার হন। কারণ তিনি ছিলেন ব্রিটিশবিরোধী যুগান্তর দলের সদস্য। এই বিপ্লবী ও দেশদরদি মানুষটি হলেন সত্যেন সেন।

সত্যেন সেনের জন্ম তারিখ নিয়ে দুটি মত প্রচলিত আছে। কাজল বন্দোপাধ্যায় ও নজরুল আলম জীবন কথা নামক গ্রন্থে লেখেন ২৮ মার্চ ১৯০৭ খ্রিস্টাব্দ। ড. সৌমিত্র শেখর সত্যেন সেন গ্রস্থে লেখেন ২৮ মে ১৯০৭ খ্রিস্টাব্দ। মুন্সীগঞ্জ জেলার টঙ্গীবাড়ী উপজেলার সোনারং গ্রামের বিখ্যাত সেন পরিবারে তার জন্ম। পিতা রমনী মোহন সেন।

১৩ বছর বয়েসে সত্যেন সেনের পিতার মৃত্যু হয়। তাই বলে থেমে থাকেনি সত্যেনের লেখাপড়া। সোনারং হাইস্কুলের প্রাথমিক শাখা দিয়ে শিক্ষা জীবন শুরু। ছাত্রাবস্থায় জেল খেটেছেন। আর জেলে থেকেই এমএ পাস করেছেন। পদ্না, মেঘনা, ধলেশ্বরীর উর্বর মাটির মুন্সীগঞ্জের এ সন্তানের উচ্চশিক্ষা গ্রহণে কোন সমস্যা হয়নি। শুধু সংকল্পের কারণে।

সত্যেন সেন অষ্টম শ্রেণীর ছাত্র থাকাবস্থায় এক বিপ্লবীর সঙ্গে তার কথা হয়। তার কাছ থেকেই তিনি দেশপ্রেম, স্বাধীনতা ও সংস্কৃতি সম্পর্কে দীক্ষা গ্রহণ করেন। তার শৈশবের সেই গুরুর নাম মাহাংগু বানিয়া বাউ। এই মাহাংগু বানিয়া বাউকে সত্যেন কথা দিয়েছিলেন বড় হয়ে দেশের কাজ করবেন। তার কথা তিনি অক্ষরে অক্ষরে পালন করেছেন।

দেশের কাজ করতে গিয়ে ১৯৩১ সালে বিএ পরীক্ষা দেয়ার পর তিনি গ্রেফতার হন। এবার ১৯৩১ সালে গ্রেফতার হয়ে প্রথম আলীপুর জেলে পরে বহরমপুর জেলে কারাবাস করেন। জেলে থেকেই সত্যেন সেন ১৯৩৩ সালে ইতিহাসে এমএ পাস করেন। তার জেল হয় ৫ বছরের। এই জেল জীবনে তিনি মার্কসবাদ গভীরভাবে অধ্যয়ন করেন। এই আদর্শকে জীবনের দর্শন হিসেবে গ্রহণ করেন।

১৯৩৮ সালে মুক্তি পেয়ে এ বিপ্লবী বীর সোজা চলে আসেন মুন্সীগঞ্জের সোনারং গ্রামে। কৃষক আন্দোলন গড়ে তোলার লক্ষ্যে কাজ শুরু করেন। এখানে সহযোদ্ধা হিসেবে পেয়ে যান প্রখ্যাত কৃষক নেতা জিতেন ঘোষকে। ১৯৪৭ সালে দেশ ভাগ হয়। অর্থাৎ ভারত-পাকিস্তান নামে দুটি দেশের সৃষ্টি হয়। অনেক হিন্দু বাংলাদেশ ছেড়ে ভারত চলে যায়। কিন্তু সত্যেন সেন আর জিতেন ঘোষরা জন্মভূমি বাংলা ত্যাগ করতে পারলেন না। থেকে গেলেন এদেশে।

১৯৪৯ সালে বনগ্রামের বাসা হতে আবার গ্রেফতার হন সত্যেন সেন। ছাড়া পেলেন ১৯৫৩ সালে। এবার কারাবাস করেন রাজশাহী ও ঢাকা জেলে। তিনি একাধারে কারাগারে ৪০ দিন অনশন করেন। সব মিলিয়ে তিনি ধর্মঘট ও অনশন করেন ৫৮ দিন। বিভিন্ন মেয়াদে সত্যেন সেন পাকিস্তানি শাসনামলে ১৪ বছর কারাভোগ করেন।

দীর্ঘ কারাভোগ ও নির্যাতনে সত্যেন সেনের স্বাস্থ্য ভেঙে যায়। অসুস্থ হয়ে পড়েন তিনি। তাই বলে কিন্তু তার সাহিত্য সাধনা বন্ধ হয়ে যায়নি। তিনি ছিলেন কৃষক নেতা ও সাহিত্যিক। লিখেছেন অনেক কবিতা ও গান। তার একটি কবিতার কয়েকটি চরণ এখানে তুলে ধরা হলো_ মানুষের কাছে পেয়েছি যে বানী / তা দিয়ে রচি গান / মানুষের লাগি ঢেলে দিয়ে যাব / মানুষের দেয়া প্রাণ / তিনি অজস্র গ্রন্থ রচনা করে গেছেন। তার বিখ্যাত কয়েকটি গ্রন্থের নাম এখানে তুলে ধরা হলো_ পাপের সন্তান, উত্তরণ, সেয়ানা, আলবেরুনী, পদচিহ্ন, ভোরে বিহঙ্গী, অপরাজেয়, অভিশপ্ত নাগরী, রুদ্ধদ্বার মুক্ত প্রাণ, অভিযাত্রী, গ্রামবাংলার পথে পথে। সত্যেন সেনের লেখায় স্থান পেয়েছে ইতিহাস, সংগ্রাম, রাজনীতি, বিপ্লব, বিজ্ঞান, ধর্ম ও শিশু সাহিত্য। বাংলাদেশের বিখ্যাত সাংস্কৃতিক সংগঠন উদীচীর প্রতিষ্ঠাতা তিনি।

সত্যেন সেন সাহিত্যে স্বীকৃতি হিসেবে ১৯৮৬ সালে ২১ শে পদক (মরণোত্তর) লাভ করেন। এছাড়া পাপের সন্তান বইয়ের জন্য ১৯৬৯ সালে আদমজী সাহিত্য পুরুস্কার, ১৯৭০ সালে বাংলা একাডেমি পুরস্কার লাভ করেন সত্যেন সেন। যে সত্যেন সেন চির কুমার থাকলেন দেশ ও জাতির জন্য। মানুষ আজ তার গ্রামের বাড়ি সোনারংয়ের বাস্তুভিটা দখল করে নিচ্ছে। সত্যেন সেনের স্বপ্ন ধূলোয় মেশানো যাবে না। সৃষ্টি হতে হবে আরও অনেক সত্যেন সেনকে। সত্যেন সেন জীবনের প্রতিটি সময় ব্যয় করতেন দেশ ও জাতির জন্য। অর্থাৎ সত্যেন সেন শান্তি নিকেতনের পূর্বপল্লীতে বোনের বাসায় শেষনিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। ঝঞ্ঝাতাড়িত ও কর্মব্যস্ত জীবনের পরিসমাপ্তি ঘটে ৫ জানুয়ারি ১৯৮১।

[লেখক : সাংবাদিক ও প্রাবন্ধিক]

সংবাদ