স্মৃতিচারণ : ‘চাষীর শূন্যতা পূরণ হওয়ার নয়’

গুণীজন যেদিক দিয়ে যান রেখে যান তার পায়ের চিহ্ন। বাংলাদেশের চলচ্চিত্র নিয়ে কথা বলতে গেলেই অনিবার্যভাবে যার কথা চলে আসবে তিনি চলচ্চিত্রকার চাষী নজরুল ইসলাম। সোমবার সকালে তাকে শেষবারের মতো দেখতে হাজির হয়েছিলেন চলচ্চিত্র অঙ্গনের মানুষেরা। চাষী নজরুলের সঙ্গে জড়িয়ে আছে যাদের অসংখ্য স্মৃতি। দ্য রিপোর্টের পাঠকদের জন্য তুলে ধরা হলো তারকাদের ভারাক্রান্ত মনের কিছু অনুভূতি।

আমরা এতিম হয়ে গেলাম : সুচরিতা
চলচ্চিত্রকে অভিভাবকহীন করে আমাদের ছেড়ে চলে গেলেন চাষী ভাই। বিশ্বাস করতে ভীষণ কষ্ট হচ্ছে তিনি আমাদের ছেড়ে চলে গেছেন। চাষী নজরুল ইসলাম একজন স্পষ্টভাষী ব্যক্তি ছিলেন। যা বলতেন মুখের উপরেই বলে দিতেন। চলচ্চিত্রে এমন স্পষ্টভাষী আর কেউ নেই। পরিচালক হিসেবে শিল্পীদের স্বাধীনতা দিতে জানতেন তিনি। অনেক সময় নিজে অভিনয় করে দেখিয়ে দিতেন। তিনি যেমন কঠিন ছিলেন তেমনই সহজ ছিলেন।

চাষী ভাইয়ের কারণেই পার পেয়ে গেছি : চম্পা
চাষী নজরুল ইসলাম ভিন্ন ধরনের চলচ্চিত্র নির্মাণ করতেন। আমার অভিনয় জীবনের শুরুর দিকে যখন আমি অভিনয়ের অ-ও জানি না, ঠিক সে সময় অভিনয় করলাম চাষী ভাইয়ের ‘বিষবৃক্ষ’ চলচ্চিত্রে। বঙ্কিমের উপন্যাসের এমন কঠিন একটা চরিত্রে অভিনয় করা কঠিন ব্যাপার ছিলো। শুধু চাষী ভাইয়ের কারণেই পার পেয়ে গেছি। তার শাস্তি চলচ্চিত্রে অভিনয় করে জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার পেয়েছি তার কাছে অভিনয় শিখে। তিনি বকা দিয়ে কাজ আদায় করে নিতেন। চাষী ভাইয়ে সঙ্গে আরও অনেক চলচ্চিত্রে অভিনয় করার ইচ্ছে ছিলো, সে ইচ্ছে আর পূর্ণ হলো না।

চাষীর শূন্যতা পূরণ হবার নয় : কাজী হায়াত
চাষী নজরুল ইসলামকে নিয়ে কথা বলতে শুরু করলে শেষ করা যাবে না। তিনি আমার আত্মীয় ছিলেন। আমার পারিবারিক বন্ধু ছিলেন। আমার অভিভাবক ছিলেন। পারিবারিকভাবেই আমাদের সম্পর্ক অনেক গভীর ছিলো। বিপদে আপদে সব সময় আমার পাশে ছিলেন। চলচ্চিত্রকার চাষীকে মূল্যায়ন করতে হলে প্রথমেই তার ‘ওরা এগারো জন’ চলচ্চিত্রের কথা বলেতে হয়। মুক্তিযুদ্ধের চলচ্চিত্র নির্মাণের কাজটি তিনিই শুরু করেছিলেন। তিনিই সর্বাধিক সাহিত্য নির্ভর চলচ্চিত্র নির্মাণ করেছেন এবং পুরস্কৃতও হয়েছেন। তার শূন্যতা পূরণ হবার নয়।

তাকে হারানো আমাদের অপূরণীয় ক্ষতি : আহমেদ শরীফ
আমরা একজন গুণি পরিচালককে হারিয়েছি, এটা আমাদের সবার জন্য কষ্টকর, চলচ্চিত্র ইন্ডাস্ট্রির জন্য কষ্টকর। আমি চাষী ভাইয়ের ৭-৮টির মতো চলচ্চিত্রে অভিনয় করেছি। তার সঙ্গে আমার অন্তরঙ্গ সম্পর্ক ছিলো। আমরা বিভিন্ন সময় আউটডোর শুটিংয়ের জন্য বাইরে থেকেছি। তার ‘মিয়া ভাই’ চলচ্চিত্রে অভিনয় করেছি। চাষী নজরুলকে হারিয়ে আমাদের অপূরণীয় ক্ষতি হয়েছে। তিনি সব সময় শৈল্পিক চলচ্চিত্র দিয়ে দর্শকদের কাছে টেনেছেন। আমি তার আত্মার মাগফিরাত কামনা করছি।

চাষী ভাইয়ের একটা বড় গুণ ছিলো : ইলিয়াস কাঞ্চন
চাষী ভাই অনেক জোরে কথা বলতেন। তিনি কখনোই আড়ালে কারও সমালোচনা করতেন না। কারও কোনো কিছু তার কাছে খারাপ লাগলে তাকে মুখের উপরে বলে দিতেন। আমরা আমাদের চলচ্চিত্রের একজন অভিভাবককে হারালাম। এই গুণের কারণেই তিনি কারও পছন্দের আবার কারও অপছন্দের ছিলেন। দোয়া করি তিনি যেখানেই থাকুন ভালো থাকুন।

তিনি আমাকে আশীর্বাদ করেছিলেন : মিশা সওদাগর
চাষী ভাই তখন সেন্সর বোর্ডে ছিলেন। আমি এক চলচ্চিত্রে হিজরার চরিত্রে অভিনয় করেছিলাম। সেন্সর বোর্ডে আমার অভিনয় দেখে তিনি আমাকে আশীর্বাদ করেছিলেন। আমাকে বলেছিলেন ‘তুই একজন পরিপূর্ণ অভিনেতা’। সবসময় আমাদের খোঁজখবর রাখতেন চাষী ভাই। তাকে সব সময় মিস করবো।

তিনি ছিলেন আমাদের বন্ধুর মতো : ফেরদৌস
চাষী ভাইয়ের সঙ্গে আমার সর্বশেষ দেখা হয় তিন মাস আগে চ্যানেল আই এর একটি অনুষ্ঠানে। খুব ভালো মানুষ ছিলেন। একজন সিনিয়র চলচ্চিত্র পরিচালক হয়েও আমাদের সঙ্গে বন্ধুর মতো মিশতেন। তাকে অনেক রাগি মনে হলেও তিনি আসলেই এত বেশি রাগি ছিলেন না। তার একটি মাত্র চলচ্চিত্রে অভিনয় করেছি। চলচ্চিত্রের নাম ‘ধ্রুবতারা’। আমার প্রথম মুক্তিযুদ্ধের চলচ্চিত্র এটি। তার মতো বন্ধুসুলভ মানুষ খুব কমই দেখেছি।

দ্য রিপোর্ট

Comments are closed.