‘ওরা ১১ জন’ এর মাঝেই বেঁচে থাকবেন তিনি

চলে গেলেন বিশিষ্ট চলচ্চিত্র পরিচালক, বোদ্ধা ও মুক্তিযোদ্ধা চাষী নজরুল ইসলাম। তিনি দীর্ঘদিন ধরে ফুসফুসের ক্যান্সারে ভুগছিলেন। দেশ-বিদেশের বিভিন্ন হাসপাতালে চিকিৎসাও নিয়েছেন। গত ৭ জানুয়ারি তার শারীরিক অবস্থার ব্যাপক অবনতি ঘটলে ল্যাব এইড হাসপাতালের নিবিড় পর্যবেক্ষণ কেন্দ্রে (আইসিইউ) তাকে নেওয়া হয়। সেখানেই শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন তিনি। তার আগেই তিনি ৭৩ বছরের এক বর্ণাঢ্য জীবন-পথ পেরণ।

এই গুনী ব্যক্তিত্ব ১৯৪১ সালের ২৩ অক্টোবর বিক্রমপুরের শ্রীনগর থানার সমষপুর গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। বাবা-মায়ের জৈষ্ঠ্যপুত্র ছিলেন তিনি। বাবা মোসলেহ উদ্দিন আহম্মদ, ভারতের বিহারে টাটা আয়রন এন্ড স্টীল কোম্পানির ইঞ্জিনিয়ার ছিলেন। শেরেবাংলা এ কে ফজলুল হক চাষী নজরুল ইসলামের নামকরণ করেন বলে জানা যায়। চাষীর মামা চাষী ইমাম উদ্দিন শেরেবাংলা এ কে ফজলুল হকের সঙ্গে রাজনীতি করতেন। সহচরীর অনুরোধে ফজলুল হক তার ভাগ্নের নামকরণ করেন।

বিক্রমপুরের সমষপুর গ্রামে জন্মগ্রহণ করলেও চাষীর শৈশব-কৈশোর কাটে বাবার চাকরিস্থল জামশেদপুরে। আরডি টাটা হাইস্কুল থেকে তিনি ইলেভেন পাস করেন। ১৯৫৮ সালে চাষীর বাবা অসুস্থ হয়ে পড়লে সপরিবারে বিক্রমপুরে ফিরে আসে সবাই। সেখানেই কিছুদিন পর চাষীর বাবা মারা যান। পিতার শোক ভুলে যাওয়ার আগেই সংসারে বড় ছেলে হিসেবে সব দায়ভার তার কাঁধে এসে পড়ে। সেই চাপে এজি অফিসে পোস্ট-সর্টার হিসেবে তিনি চাকরী শুরু করেন, ১৯৬৯ সাল পর্যন্ত সেখানেই চাকরি করতেন তিনি। এফডিসি মাত্র গড়ে উঠছে তখন। চাষীর খালাত দুলাভাই আউয়াল সাহেব বিখ্যাত সিনেমা পরিচালক ফতেহ্ লোহানীর প্রধান সহকারী ছিলেন। চাষী চাকরির ফাঁকে ফাঁকে তার সঙ্গে যোগাযোগ রাখতেন, একইসঙ্গে নাটকে অভিনয় শুরু করেন। একদিন সুযোগ এলে আওয়াল সাহেব চাষীকে পরিচয় করিয়ে দিলেন ফতেহ লোহানীর সঙ্গে। ফতেহ লোহানী তখন ‘আছিয়া’ চলচ্চিত্রের কাজে ব্যস্ত ছিলেন। চাষীকে ছোট্ট একটা রোলে সে ছবিতে নিলেন। কিন্তু পরদিনই লোহানী চাষীকে সে ছবির সহকারী পরিচালকের দায়িত্ব দেন। ১৯৬১’র জুন মাসে চাষী চলচ্চিত্রে কাজ শুরু করলেন। সেই শুরু, এর পর ১৯৬৩-তে কাজ করেছেন প্রখ্যাত সাংবাদিক ও চলচ্চিত্রাকার ওবায়েদ-উল-হকের সহকারী হিসাবে ‘দুইদিগন্ত’ সমাপ্ত করলেন। এর মধ্যেই এল ১৯৭১। মুক্তিযুদ্ধে যোগ দিলেন চাষী। যুদ্ধ শেষে বাংলাদেশের প্রথম মুক্তিযুদ্ধভিক্তিক চলচ্চিত্র ‘ওরা ১১ জন’ নির্মাণ করলেন। ‘ওরা ১১ জন’ স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক চলচ্চিত্র। ১৯৭২ সালে ঐ ছবির মাধ্যমে পরিচালক হিসেবে চাষী নজরুলের আত্মপ্রকাশ ঘটে। ১৯৬৯ সালের ১৬ সেপ্টেম্বর দেশের অন্যতম বিখ্যাত কাজী পরিবারের কে.জি. আহমেদের মেয়ে জোৎস্না কাজীকে বিয়ে করেন চাষী নজরুল ইসলাম।

নিজ পরিচালনায় ‘সংগ্রাম’, ‘ভালো মানুষ’, ‘বাজিমাত’, ‘বেহুলা লক্ষিন্দর’, ‘পদ্মা মেঘনা যমুনা’, ‘হাঙর নদী গ্রেনেড’, ‘শাস্তি’, ‘সুভা’র মতো সিনেমা তিনি নির্মাণ করেন। ১৯৮২ সালে বুলবুল-কবরী-আনোয়ারাকে নিয়ে নির্মাণ করেছিলেন ‘দেবদাস’। ২০১৩ সালে শাকিব খান-অপু বিশ্বাস-মৌসুমীকে নিয়ে আবারও দেবদাস পূনঃনির্মাণ করেন তিনি।

১৯৮৬ সালে ‘শুভদা’ ও ১৯৯৭ সালে ‘হাঙর নদী গ্রেনেড’ চলচ্চিত্রের জন্য তিনি শ্রেষ্ঠ পরিচালক হিসেবে জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার পেয়েছেন। ২০০৪ সালে পেয়েছেন একুশে পদকও পান। বাংলাদেশ চলচ্চিত্র পরিচালক সমিতিতে চারবারের মত সভাপতি নির্বাচিত হয়েছিলেন তিনি। এ ছাড়া বিভিন্ন সময়ে দেশের বহু ক্রীড়া ও সাংস্কৃতিক সংগঠনের গুরুত্বপূর্ণ পদে ছিলেন তিনি।

গণতান্ত্রিক অধিকারে তিনি রাজনৈতিক মতাদর্শের একটি পথ বেঁছে নিয়েছিলেন। কিন্তু তিনি নির্বিশেষে একজন গুনী মানুষ হিসেবে সমাদৃত ছিলেন সবার কাছে। স্বাধীনতা উত্তর সময়ে দেশের সাংস্কৃতিক জগতকে সাবালক করার পেছনে তার ভূমিকা ছিল অনেক। তা ছাড়া স্বাধীনতা যুদ্ধে অংশগ্রহণ ও তা নিয়ে চলচ্চিত্র নির্মাণ দেশের প্রতি তার অন্যরকম এক আবেগকে ফুঁটিয়ে তুলেছে। দেশত্ববোধ, দায়বদ্ধতা ও বলিষ্ঠ রাজনৈতিক চেতনা থেকে যে আবেগের জন্ম। তিনি যেহেতু আপাদমস্তক একজন সৃষ্টিশীল মানুষ তাই তার সৃষ্টির মাঝেই তাকে আমরা খুঁজে পাব। তার দেহের মরণ হলেও ‘ওরা ১১ জন’-এর মাঝেই বেঁচে থাকবেন তিনি।

দ্য রিপোর্ট