সহকর্মিদের স্মৃতির পাতায় গুণী নির্মাতা চাষী নজরুল

১১ জানুয়ারি ভোর ৬টায় না ফেরার দেশে চলে যান গুণী নির্মাতা চাষী নজরুল ইসলাম। তাকে নিয়ে স্মৃতিচারণা করেছেন তারই কাছের কিছু মানুষ। স্মৃতিচারণাগুলো তুলে ধরা হলো এখানে।

চাষী তো আর আসবে না: কাজী হায়াৎ
চাষীকে নিয়ে কি বলবো? চাষী তো আর আসবে না। তিনি একাধারে একজন মুক্তিযোদ্ধা, চলচ্চিত্র নির্মাতা ও রাজনীতি সচেতন মানুষ ছিলেন। তাই তার হাত ধরেই এদেশে মুক্তিযুদ্ধ ও সাহিত্য নির্ভর বাণিজ্যিক ছবি নির্মাণ শুরু হয়। বেঁচে থাকতে চাষী তার কর্মের স্বীকৃতি স্বরূপ জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার ও একুশে পদক লাভ করেছেন। তারপরও না পাওয়ার বেদনাটা থেকেই যায়। আমরা তাকে প্রাপ্য সম্মান দিতে পারিনি। এটা আমাদের জন্যে কষ্টের।

একে একে সবাই চলে যাচ্ছে: এটিএম শামসুজ্জামান
কিছুদিন আগে খলিল ভাই আমাদের ছেড়ে চলে গেছেন, এবার গেলেন চাষী ভাই। একে একে সবাই চলে যাচ্ছে। একদিন আমরাও থাকবো না। কিন্তু অনেকের মনের মধ্যে কষ্ট নিয়ে পর পারে পাড়ি দিচ্ছে এটা ভাবলেই খারাপ লাগে। যে মানুষগুলো চলচ্চিত্র নিয়ে ভাবতেন, কাজ করতেন তাদের প্রয়াণে আমাদের কিছু যায় আসে না। তারপরও বলবো ভালো থাকুন চাষী ভাই।

যেকোনো শিল্পীকে আপন করে নিতেন: ববিতা
মাত্র এক সপ্তাহ আগে অসুস্থ চাষী ভাইকে দেখতে আমরা তিন বোন মিলে ল্যাব এইড হাসপাতালে গিয়েছিলাম। সেসময় চলচ্চিত্র নিয়ে টুকটাক কথা হলেও, তার অসুস্থতার বিষয়ে কোনো কথা বলিনি। কারণ আমরা ততক্ষণে জেনে গিয়েছিলাম যে, চাষী ভাই শিগগিরই আমাদের ছেড়ে চলে যাবেন। কিন্তু এতো তাড়াতাড়ি এটা হবে তা ভাবতে পারিনি। চলচ্চিত্র অঙ্গনের মানুষ হিসেবে চাষী ভাইয়ের সঙ্গে সম্পর্ক গড়ে উঠলেও, পেশার মধ্যে আমাদের সম্পর্কটা আটকে ছিল না। কারণ তিনি আমাদের পরিবারের একজন হয়ে উঠেছিলেন। প্রয়োজনে-অপ্রয়োজনে আমরা একে অপরের বাসায় যেতাম, খোঁজ খবর নিতাম। তবে আশির দশকে আমার প্রযোজনায় ‘লেডি স্মাগলার’ ছবিটি পরিচালনা করেছিলেন তিনি। কিন্তু ছবিটি মুক্তি দেওয়ার আগেই নেগেটিভ চুরি হয়ে যায়। ফলে আমি মহা বিপদে পরে যাই। এ সময় আমার পাশে এসে দাঁড়িয়েছিলেন চাষী ভাই। তার চেষ্টাতেই নেগেটিভটি উদ্ধার করতে পারি। মূলত যেকোনো শিল্পীর বিপদেই তিনি ছুঁটে যেতেন, আপন করে নিতেন।

মার খাওয়ার ভয়ে তার ছবি করা হয়নি: ওমর সানি
চাষী ভাইয়ের বেশ কয়েকটি ছবিতে মৌসুমী অভিনয় করলেও, আমার সেই সৌভাগ্য হয়নি। যদিও একবার তার সঙ্গে কাজ করার প্রস্তাব পেয়েছিলাম। কিন্তু তার হাতে মার খাওয়ার ভয়ে তখন আর ছবিটি করিনি। আজ খুব আফসোস হচ্ছে যে, এমন একজন পরিচালকের সঙ্গে আমি কাজ করতে পারলাম না।
চাষী ভাইয়ের বিশেষ একটি গুণ ছিলো। তিনি তিন পায়ে হাটতেন। তার অতিরিক্ত পা’টি হলো চলচ্চিত্র। যেখানেই যেতেন চলচ্চিত্র তার সঙ্গী হতো। তার মতো একজনের প্রয়াণে আমাদের চলচ্চিত্র অঙ্গনে যে শূন্যতা তৈরি হয়েছে তা পূরণ হবে না।

সত্যি সত্যি রাজা বনে গিয়েছিলাম: হেলাল খান
চাষী ভাইকে সবাই যে ভাবে চেনেন আমি, তাদের চেয়ে আমি একটু ভিন্ন ভাবে চিনি। কারণে তার সঙ্গে চলচ্চিত্রের পাশাপাশি রাজনীতির মাঠেও কাধে কাধ মিলিয়ে লড়াই করেছি। তবে আমার প্রযোজনায় নির্মিত ‘হাসন রাজা’ ছবির মাধ্যিমে তার সঙ্গে আমার সর্ম্পক গড়ে উঠে। চাষী ভাইয়ের পরিচালনা ছবিতে আমি ‘হাসন রাজা’র চরিত্রে অভিনয় করেছিলাম। এই ছবির কারণে এখনও অনেকে আমাকে হাসন রাজা নামে ডাকে। মূলত চাষী ভাইয়ের কল্যাণেই সত্যি সত্যি রাজা বনে গিয়েছিলাম।

অভিভাবক বলতে কেউ থাকলো না: খসরু
চাষী নজরুল ইসলাম চলচ্চিত্র নির্মাণের মধ্যে নিজেকে সীমাবদ্ধ রাখেননি। তিনি সব সময় বাংলা চলচ্চিত্রের উন্নয়ন তথা এফডিসির আধুনিকায়নসহ, চলচ্চিত্রকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার আন্দোলন করেছেন। তিনিই প্রথম মুক্তিযুদ্ধকে পূর্ণদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্রের রূপ দিয়েছিলেন। তার দেখানো পথেই অন্যরা হেঁটে সুনাম কুঁড়িয়েছেন। তাই চাষী ভাইকে চলচ্চিত্রের অভিভাবক বলা যায়। তার মৃত্যুতে আমাদের অভিভাবক বলতে কেউ থাকলো না। আমি তার আত্মার শান্তি কামনা করছি।

বাংলামেইল