ওরা ১১ জন : ‘আমরা তোমাদের ভুলবো না’

বাংলাদেশের মানুষ ও ইতিহাসকে ভালোবেসে এ দেশের জনজীবনের সার্থক রূপকার হতে পেরেছেন যে কজন মুষ্ঠিমেয় চলচ্চিত্র পরিচালক তাদের অন্যতম চাষী নজরুল ইসলাম। তিনি সফল পরিচালক। ২৭ টিরও বেশি চলচ্চিত্র পরিচালনা করেছেন। কিন্তু তার সবচেয়ে বড় পরিচয় মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে নির্মিত প্রথম চলচ্চিত্রের পরিচালক তিনি।

সাহিত্যভিত্তিক চলচ্চিত্র নির্মাণেও তিনি পথিকৃৎ।

চাষী নজরুল ইসলামের পরিচালনায় ১৯৭২ সালে মুক্তি পায় ‘ওরা ১১ জন’। এটি তার পরিচালিত প্রথম চলচ্চিত্র। এতে বাস্তব জীবনের মুক্তিযোদ্ধা খসরু প্রধান ভূমিকায় অভিনয় করেছিলেন। ৭ই মার্চের জনসভায় বঙ্গবন্ধুর ঐতিহাসিক ভাষণের অংশবিশেষ এ ছবিতে দেখানো হয়। যুদ্ধের দৃশ্য চিত্রায়ণে এ ছবিতে সত্যিকারের গ্রেনেড ও অন্যান্য অস্ত্র ব্যবহৃত হয়েছিল। মুরাদ, হেলাল, নান্টু নামে আরও তিনজন মুক্তিযোদ্ধা এ ছবিতে অভিনয় করেন। রাজ্জাক, শাবানা, খলিলুল্লাহ খান, আলতাফ, নূতনের মতো পেশাদার অভিনয় শিল্পীরাও ছিলেন অবশ্য।

রাজাকারের ভূমিকায় এটিএম শামসুজ্জামান এবং পাকিস্তানি ঘাতকের চরিত্রে ছিলেন সে সময়ের বিখ্যাত খলনায়ক রাজু আহমেদ। রাজু আহমেদ পরবর্তীতে এক সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন এ ছবিটি মুক্তি পাওয়ার পর অনেকদিন তিনি প্রকাশ্যে চলতে পারেননি। তাকে দেখলেই জনতা তার উদ্দেশ্যে ঘৃণা প্রকাশ করতো। এ ধরনের ঘটনা নিঃসন্দেহে একজন পরিচালকের সার্থকতার নিদর্শন। ‘ওরা ১১ জন’ চলচ্চিত্রে কলিম শরাফীর কণ্ঠে ‘ও আমার দেশের মাটি’ গানটি এবং পর্দায় মুক্তিযোদ্ধা খসরুর বাড়ি ফেরার দৃশ্যে গ্রামীণ প্রকৃতির চিত্রায়ন অপূর্ব ব্যঞ্জনাময়। ‘এক সাগর রক্তের বিনিময়ে’ গানটি এবং বীরাঙ্গনারূপী নূতনের মৃত্যুর চিত্রায়নও অসাধারণ।

সাহিত্যনির্ভর চলচ্চিত্র নির্মাণেও চাষী নজরুল ইসলাম দারুণ সফল। শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের ‘দেবদাস’ উপন্যাস অবলম্বনে হিন্দি, বাংলা, তামিল, অহমিয়া ও অন্যান্য ভাষা মিলিয়ে ৫০টিরও বেশি চলচ্চিত্র নির্মিত হয়েছে বিভিন্ন সময়ে। এর মধ্যে মূল উপন্যাসের সবচেয়ে বিশ্বস্ত চিত্রায়ন ঘটেছে ১৯৮২ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত চাষী নজরুল ইসলাম পরিচালিত ‘দেবদাস’ চলচ্চিত্রে। এতে বুলবুল আহমেদ, কবরী, আনোয়ারা ও রহমান অভিনয় করেছিলেন দেবদাস, পার্বতী, চন্দ্রমুখী ও চুনিলাল এর ভূমিকায়। পরিচালকের মুন্সিয়ানায় বুলবুল আহমেদ ও কবরী দর্শকের চোখে হয়ে উঠেছিলেন সত্যিকারের দেবদাস ও পার্বতী । চাষী নজরুল ইসলাম ২০১৩ সালে ‘দেবদাস’-এর রিমেইক করেন।

শরৎচন্দ্রের উপন্যাস অবলম্বনে ‘শুভদা’, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ছোটগল্প অবলম্বনে ‘শাস্তি’, ‘সুভা’, রাবেয়া খাতুনের উপন্যাস অবলম্বনে ‘মেঘের পরে মেঘ’, সেলিনা হোসেনের উপন্যাস অবলম্বনে ‘হাঙ্গর, নদী, গ্রেনেড’ নির্মাণ করেছেন তিনি। শেষের দুটি মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক চলচ্চিত্র।

ব্যতিক্রমী বেশ কয়েকটি বাণিজ্যিক ধারার চলচ্চিত্রের জনক তিনি। যেমন, কণ্ঠশিল্পী রুনা রায়লার জীবনভিত্তিক চলচ্চিত্র ‘শিল্পী’ যেটিতে অভিনয় করেছিলেন রুনা লায়লা নিজেই।

তার পরিচালিত লোককাহিনিভিত্তিক ‘বেহুলা লখীন্দর’ এবং জীবনীভিত্তিক ‘হাসন রাজা’ বাণিজ্যিক ধারার হয়েও শিল্পসম্মত।

চাষী নজরুল ইসলামের জন্ম ১৯৪১ সালের ২৩শে অক্টোবর বিক্রমপুরের শ্রীনগরে। প্রকৌশলী বাবার কর্মসূত্রে শৈশবের অনেকগুলো দিন কেটেছে জামশেদপুরের টাটানগরে। প্রগতিশীল পরিবারে জন্ম হওয়ায় শৈশব থেকেই সাংস্কৃতিক আবহে লালিত হন তিনি। তার নামকরণ করেছিলেন শেরে বাংলা একে ফজলুল হক। ১৯৬১ সালে বিখ্যাত পরিচালক ফতেহ লোহানীর সহকারী পরিচালক হিসেবে কাজ শুরু করেন ‘আছিয়া’ চলচ্চিত্রে। এরপর প্রখ্যাত সাংবাদিক ও চলচ্চিত্রকার ওবায়েদ-উল-হকের সহকারী হিসাবে ১৯৬৩ সালে ‘দুই দিগন্ত’ চলচ্চিত্রে কাজ করেছেন। বীরত্বের সঙ্গে যুদ্ধ করেছেন মহান মুক্তিযুদ্ধে। মুক্তিযোদ্ধা ছিলেন বলেই মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক চলচ্চিত্র নির্মাণে আগ্রহ প্রকাশ করেছেন সবসময় এবং বাস্তবানুগভাবে রূপালি পর্দায় যুদ্ধকে তুলে ধরতে সক্ষম হয়েছেন।

‘বিরহব্যথা’, ‘বাজীমাত’, ‘ভালোমানুষ’, ‘মিয়াভাই’, ‘মহাযুদ্ধ’, বাসনা’, ‘দুই পুরুষ’সহ ব্যবসাসফল বিভিন্ন চলচ্চিত্র নির্মাণ করেছেন তিনি।

চাষী নজরুল ইসলাম চলচ্চিত্রে অবদানের জন্য ২০০৪ সালে একুশে পদক পেয়েছেন। ১৯৮৬ সালে ‘শুভদা’ এবং ১৯৯৭ সালে ‘হাঙ্গর, নদী, গ্রেনেড’ চলচ্চিত্রের জন্য শ্রেষ্ঠ পরিচালক হিসেবে জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার পান। অর্ধশতকের বেশি দীর্ঘ ক্যারিয়ারে পেয়েছেন আরও অনেক পুরস্কার ও সম্মাননা।

এদেশের চলচ্চিত্রভুবনে তার অবদান অনেক। তার প্রয়াণে যে স্থান শূন্য হলো তা আর পূরণ হওয়ার নয়। তবে বাংলাদেশের চলচ্চিত্রের ইতিহাসে তার নাম চিরদিনই স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকবে।

বিডিনিউজ

Comments are closed.