শিল্পাচলের কবি ফাহিম ফিরোজ

আশরাফ ইকবাল: শেকড়ের সন্ধানে বিক্রমপুরের বিভিন্ন ঐহিত্যবাহী স্থান দর্শনের জন্য হন্য হয়ে ছুটে চলছি এক উপজেলা থেকে অন্য উপজেলায়। বিভিন্ন গ্রামের, সমাজের, পরিবেশের, সংস্কৃতির, ধর্মের, বর্ণের প্রভৃতির মানুষের সাথে মিশে অভিজ্ঞতার ঝুলি সমৃদ্ধ হচ্ছে নি:সন্দেহে! ইদ্রাকপুর কেল্লা থেকে শুরু করে শ্যামসিদ্ধি মঠ, পাওলদিয়া মঠ, শুলপুর গীর্যা, পদ্মহেম ধাম লালন সাধু সঙ্ঘ, শেখের নগর কালী মন্দির, সিরাজদিখানের উল্লেখযোগ্য কয়েকটি পূজামন্ডপ, সিরাজদিখানের সব হাই স্কুল ও কলেজ, বিক্রমপুর জাদুঘর, টঙ্গিবাড়ির বানারী হাই স্কুল, স্যার জগদিশচন্দ্র বসুর বাড়ি, ড. হুমায়ুন আজাদের বাড়ি, জোড়া পুকুর, পদ্মা রিসোর্ট, পদ্মা চর, পাথরঘাটা, বিভিন্ন ইটের খলা, আড়িয়ল বিল, ৬ থানা-উপজেলা পরিষদ, বিক্রমপুরে বড় ও বিখ্যাত দীঘীসহ অন্যান্য স্থাপনা ও পুরাকীর্তি ঘুরে দেখি।

অনেকদিন আগে লৌহজং উপজেলা পরিষদে যাওয়ার পথে দূর থেকে ‘জাঙ্গালিয়া জামে মসজিদ’ নামে একটি মনোরম স্থাপনা দেখে মটর সাইকেল থামিয়ে দেই। সাথে বিক্রমপুরের প্রাচীন নদ-নদী ও খাল নিয়ে গবেষণায় রত রমজান মাহমুদ এবং মুন্সিগঞ্জ-বিক্রমপুর লেখক ফোরামের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মো. নাসির উদ্দিন ছিল। রমজান মাহমুদ ঝুলি থেকে ঝট করে ক্যামেরা বের করেই হুট করে কয়েকটি শুট নিয়ে নিল। আমিও নিজের ক্যামেরায় কয়েকটি ছবি ধারণ করে নিলাম। সামনে এগুতেই ‘আটিগাঁও যাত্রিক সংসদ’ নামে একটি ক্লাবের সুন্দর সাইনবোর্ড দৃষ্টিগোচর হল। সেটি অতিক্রম করে ছিমছাম পথ দিয়ে বাইক নিয়ে এগুচ্ছি। একটি ব্রীজ দেখা গেল। অদূরেই বিশাল এক পুরানা দালান। নিশানা সুউচ্চে। বাড়িটি যেন মুড়ে দেয়া হয়েছে নানা জাতের গাছ দিয়ে। হয়ত কোন এক শিল্পীর বাড়ি। বাড়িটির প্রত্যেক দিকে শিল্পের ছোঁয়া বিরাজমান। সামনে বিশাল পুকুর। পুকুরের মাঝখানে একটা লগি পোঁতা। লগির মাথায় মাছরাঙা অথবা পানকোড়ি বসার জন্য পুতে রাখা হয়েছে। হাসে জলকেলি করছে। পাশেই ধান খেত। বাড়ির ঢালু অংশে নানা রঙবেরঙ্গের ফুল ফুটে আছে। আম, নাড়কেল, দেবদারুসহ নাম না জানা আরও কত কি! যে কেউ এক নজর দেখে এই বাড়ির প্রেমে পড়ে যাবে।

মুন্সিগঞ্জ-বিক্রমপুর লেখক ফোরামের প্রথম প্রকাশনা ‘প্রভাত’ নামক সংকলন বের করার জন্য সদস্য ও উপদেষ্টামন্ডলী কাজ করছেন। আমিও এর জন্য কিছু করার চেষ্টা করছি। কয়েকজন লেখক থেকে লেখাও সংগ্রহ করেছি। অনেক লেখক আমাদের সংকলনে লেখা দিয়েছেন। কিছু বিদগ্ধ লেখকের লেখা বাদ পড়ায় তাদের খোঁজে বের হলাম। লৌহজং কলেজের ভাইস প্রিন্সিপাল সহিদ মামা, হরগঙ্গা কলেজের সাবেক উপাধ্যক্ষ মো. শাহজাহান মিয়াসহ অনেকেই রবিন্দ্র গবেষক ড. জমির হোসেনের লেখা নেওয়ার পরামর্শ দিলেন। নাম্বার সংগ্রহ করে যোগাযোগ করলাম। তাঁর সাথে দেখা হল, কথা হল। তিনি আমাদের লক্ষ্য-উদ্দেশ্য, কর্মসুচি ও কর্মপদ্ধতি দেখে বিস্তর পরামর্শ দিয়ে আমাদের ফোরামের সাথে কাজ করার আগ্রহ প্রকাশ করলেন। গবেষক ফাহিম ফিরোজের সাথে যোগাযোগ করারও পরামর্শ দিলেন। এর আগে লৌহজং-এর সাংবাদিক গোলাম মঞ্জুরে মাওলা অপু, মুন্সিগঞ্জ-বিক্রমপুর লেখক ফোরামের সহ-সভাপতি শেখ রাসেল ফখরুদ্দীনও তার ব্যাপারে অনেক প্রশংসা করায় প্রচার বিমুখ নিভৃততচারী গবেষক ফাহিম ফিরোজের প্রতি অন্যরকম আকর্ষণ কাজ করছে। তাঁর নাম্বার সংগ্রহ করে কয়েকদিন যোগাযোগ করি। একদিন আমাকে তার বাড়ি অথবা অফিসে যেখানে ইচ্ছা সেখানে আসতে বললেন।

কোন একদিন আমি ও রমজান মাহমুদ একসাথে রাত কাটাই। আমরা একত্রিত হলেই বিক্রমপুরের কোন না কোন গবেষক নিয়ে গল্প করি। সহসা গল্পের মাঝে গবেষক ফাহিম ফিরোজের কথা উঠে এল। কথায় কথায় আমার মোবাইল দিয়ে রমজান মাহমুদ তাকে ফোন দিলেন। পরদিন বিকেল ৩ টায় আমাদেরকে দেখা করার জন্য সময় দিলেন। কিভাবে যাব, কাকে সাথে নিব কিছুই ঠিক করিনি। সিদ্ধান্ত হল নাসিরকে নিব। দূর্ভাগ্য! ফোন ধরল না নাসির। অগত্যা সিরাজদিখান প্রেসক্লাবের কোষাধ্যক্ষ আসলাম মোল্লাকে ফোন দিলাম। তিনি যথা সময়ে মটর সাইকেল নিয়ে চলে এলেন। তাকে নিয়েই রওনা দিলাম গবেষক ও কবি ফাহিম ফিরোজের বাসায়। তিনি আমাদেরকে মধ্য আটিগাঁও যেতে বললেন। আগের দৃশ্যগুলি স্মৃতিতে আনছি আর পুলকিত হচ্ছি। এ-ও ভাবছি যদি সেই মনোরম বাড়িটি ফাহিম ফিরোজের হয়!

গবেষককে কল দিতেই ওই বাড়িতে আসার জন্য বললেন। বাড়ির কাছে এসে দেখি বড় করে কালো অক্ষরে লেখা ‘শিল্পাচল’। সবাই মুগ্ধ। আমি বললাম কনফার্ম হয়ে নেই এই বাড়ি ফাহিম ফিরোজের কি না। আমার কথা ছিনিয়ে নিয়ে রমজান মাহমুদ বললেন আপনি নিশ্চিত থাকেন এটিই গবেষকের বাড়ি। মোবাইল হাতে নিয়ে কল দিতেই বার্ধক্যে উপনীত এক জীর্ণকায় টিঙটিঙে লোক বাড়ির তোরণ দিয়ে বেরিয়ে এলেন। প্রথমে আমাদেরকে অভ্যর্থনা জানালেন। সবার চেহারায় চিন্তার ছাপ ফুটে উঠল। ইনিই গবেষক! পরিচয় হলাম। ভিতরে আসতে বলে আমাদেরকে উন্মুক্ত আঙ্গিনায় প্লাস্টিকের চেয়ারে বসতে দেয়া হল। অনেক আগে দূর থেকে এক ঝলক দেখা ঠিক সেই নাড়িকেল গাছের নিচে। আড্ডা বেশ জমে উঠল। আড্ডার বিষয় হল:- বিক্রমপুরের নদ-নদী, খাল, ইতিহাস-ঐতিহ্য, পুরাতত্ত্ব ও ব্যক্তিত্ব। গবেষক ও বিক্রমপুর বিষয়ে অনেক জানা হল। তার জ্ঞানের পরিধি অনেক একথা বলার অপেক্ষা রাখে না।

একটি কথা না বললেই নয়। গবেষক যখন শিল্পাচলে ঢুকলেন এই ফাঁকে রমজান মাহমুদ বলেই উঠলেন ভাই এত গবেষণা করলে মাথা ঠিক থাকবে না। এ দেখি বিশাল পন্ডিত। বেশিক্ষণ থাকলে মাথা নষ্ট হয়ে যাবে। বলারও কারণ আছে তিনি একাধারে বলা শুরু করছেন কোন খাল কে খনন করছে। কোন রাজার কত ছেলে নাম সহ বলে দিচ্ছেন। কোন খাল খনন করতে গিয়ে কত লোক হত্যা করছেন তাও। আমরা যা প্রশ্ন করছি তার সন্তোষজনক উত্তর পাচ্ছি। মনে হচ্ছে সবই তার আয়ত্তে রয়েছে।

তার ২টি মেয়ে আছে। ফারহানা বিনতে ফাহিম ও সারা বিনতে ফাহিম নামে। ওরাও খুব শৈল্পীক মনোভাবাপন্ন। তিনি ১৯৮০ সালে লেখালেখি শুরু করেন। তার কবিতা প্রথম ইত্তেফাকে ছাপা হয়। এর পর থেকে তার লেখালেখি থেমে নেই। যুগ যুগ ধরে তিনি বিক্রমপুর নিয়ে গবেষণা করছেন। তার রচিত ১২ টি বইয়ের মধ্যে কয়েকটি আমাদেরকে দেখালেন। ৬টি কবিতার বই, সিরাজ উদ্দৌলার উপর ১ টি, ছোটদের জন্য ৩ টি ও সম্পাদিত ২ টি বই বের হয়েছে। দেখতে পেলাম তার নামে ১ টি ব্রীজ ও রাস্তা রয়েছে। তিনি দৈনিক ইনকিলাবের সাহিত্য পাতায় ২১ বছর ধরে কাজ করছেন।

আড্ডার একপর্যায়ে ব্যক্তিগত লাইব্রেরীতে নিয়ে গেলেন। সেখানে তাকে দেওয়া অসংখ্য সম্মাননা স্মারক, মানপত্র, বিক্রমপুরের প্রাচীন আকর গ্রন্থ এখানে-সেখানে পড়ে থাকতে দেখা গেল। তিনি আমাদেরকে ১২ হাত মাটির নিচ থেকে কুড়িয়ে পাওয় বিভিন্ন আমলের মাটির তৈজসপত্র দেখালেন। আমরা মন্ত্রমুগ্ধের মত দেখতে থাকলাম ও ছবি তুললাম। তার পাশের রুমে টেবিলের উপর আর্ট করা একটি সুন্দর ছবি দেখতে পেলাম। ওটি নাকি গবেষকের মেয়ের ছবি তার স্ত্রীর কাছে জানতে পারলাম। বুঝা গেল সারা খুব ভাল আঁকিয়ে। নিজের ছবি নিজেই এঁকেছে। অসাধারণ হয়েছে! আমার ক্যামেরায় ছবিটি ধারণ করলাম। সব শেষে শিল্পাচলের সামনে দাড়িয়ে অনেক ছবি তুলা হল। জানিনা আবার এমন প্রিয় মুহূর্ত আাসবে কিনা!

অনেক কিছু জানার ছিল যা একদিন সম্ভব নয়। সদর গেট দিয়ে বের হয়ে তিনি আমাদেরকে রাস্তা পর্যন্ত এগিয়ে দিলেন। এমন মুক্ত মনের উদারচেতা ও বিশাল হৃদয়ের একজন গবেষক ও কবির কাছ থেকে বিদায় নিলাম। জানিনা আবার কবে দেখা হবে, আড্ডা হবে!

লেখক:- সাংগঠনিক সম্পাদক, সিরাজদিখান প্রেসক্লাব