সমৃদ্ধ এক জনপদ : বিক্রমপুর থেকে মুন্সিগঞ্জ

নাদিম মাহমুদঃ বিক্রমপুর পরগনা বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকা থেকে ১২ মাইল দক্ষিণে অবস্থিত। বর্তমানে এ অঞ্চলটি মুন্সিগঞ্জ জেলার অন্তর্গত। বিক্রমপুর বাংলার একটি ঐতিহাসিক এলাকা। প্রাচীনকাল থেকেই এই অঞ্চল বৌদ্ধ জ্ঞানচর্চার জন্য এবং পরবর্তী সময়ে সাংস্কৃতিক প্রভাবের জন্য সুপরিচিত ছিল। ধারণা করা হয়, বৈদিক যুগ থেকে ভাওয়াল ও সোনারগাঁও রাজধানী হিসেবে আবির্ভূত হওয়ার আগ পর্যন্ত এটিই ছিল বাংলার প্রাচীনতম রাজধানী। বিক্রমপুর ছিল রাজা বিক্রমাদিত্যের রাজধানী।

বিক্রমপুর নামের উৎপত্তি
ধারণা করা হয় বিক্রমপুর নামের উৎপত্তি বিক্রমাদিত্য থেকে। বিক্রমাদিত্য হিন্দু পুরাণের একজন রাজা ছিলেন। তবে বেশ কয়েকজন শাসক চন্দ্রগুপ্ত, ধর্মপাল, সম্রাট হেমু প্রমুখ বিক্রমাদিত্য পদবি গ্রহণ করেছিলেন। তাই এটি পরিষ্কার নয়, কার নামে বিক্রমপুরের নামকরণ করা হয়েছিল।

বিক্রমপুর নামের ‘বিক্রম’ অর্থ সাহস বা বীরত্ব এবং ‘পুর’ অর্থ নগর বা এলাকা যা উপমহাদেশে বিভিন্ন অঞ্চল বা এলাকার নামের শেষাংশ হিসেবে সাধারণত ব্যবহার করা হয়।

বর্তমানে বিক্রমপুর অঞ্চলের কোনো প্রশাসনিক স্বীকৃতি নেই। মুন্সিগঞ্জ জেলার একটি অংশের মানুষ নিজেদের ঐতিহাসিক বিক্রমপুরের অধিবাসী বলে দাবি করে। বিক্রমপুর নগরের অবস্থান ছিল এ রকম পশ্চিমে পদ্মা, উত্তর ও পূর্বে ধলেশ্বরী এবং দক্ষিণে আড়িয়ল খাঁ ও মেঘনা নদীর সংযোগস্থল।

১৭৮১ সালের একটি মানচিত্রে দেখা যায়, কালীগঙ্গা নদী এ অঞ্চলের মাঝখান দিয়ে প্রবাহিত যা এলাকাটিকে দুটি অংশে বিভক্ত করেছিল উত্তর বিক্রমপুর এবং দক্ষিণ বিক্রমপুর। এ সময় বিক্রমপুরের বিস্তৃতি ছিল পূর্ব-পশ্চিমে ৩০৪০ মাইল এবং উত্তর-দক্ষিণে প্রায় ৮১০ মাইল। ক্রমাগত নদী ভাঙনের ফলে প্রাচীন বিক্রমপুর শহর এবং এর পুরাতাত্ত্বিক নিদর্শনসমূহ পুরোটাই কালের আবর্তে বিলীন হয়ে গেছে। সেনবংশীয় রাজাদের রাজধানী বিক্রমপুর। ইতিহাসে খ্রিস্টীয় অষ্টম ও নবম শতাব্দীতে বিক্রমপুর বাংলার রাজধানী হিসেবে দেখতে পাই। বিশাল বিক্রমপুর ‘নগরী’ কোথায়, কোন কোন এলাকা নিয়ে তা জানার ইচ্ছা সবারই। বিভিন্ন তাম্রশাসন, দানপত্র ও শিলালিপি থেকে জানা যায়, রামপাল, সুখবাসপুর, জোড়ার দেউল, সোনারং, পানহাটা, রামশিং, সরস্বতী, বড় কেওয়ার, চাপাতলী, মহাকালী, আটপাড়া, দেওভোগ, বজ্রযোগিনী, সুয়াপাড়া, বাড়–লিয়া, আলদী, কল্যাণসিংহ, ধামারণ, নৈরপুকুরপাড়, মানিকেশ্বর, কপালদুয়ার, পঞ্চসার, ইদ্রাকপুর, নাটেশ্বর ও তিলারদি গ্রাম নিয়ে শহর বিক্রমপুর ছিল।

বাংলাদেশ, ভারতের পশ্চিমবঙ্গ, আসাম, ত্রিপুরা ও উত্তর প্রদেশে শাসনপত্র বিক্রমপুর নগরী হতেই জারি করা হতো। ১১৭৮ সালের আগস্ট থেকে ১৪৮৩ সাল পর্যন্ত মুসলমান তুর্কিরা এবং ১৪৮৩-১৫৫০ সাল থেকে সুলতানি, মোগল ও ত্রিপুরা রাজাদের দ্বারা বিক্রমপুর ধ্বংস হয়। ত্রিপুরা রাজ ধনমাণিক্য ১৫১৮ সালের দিকে বিক্রমপুরের রামপাল বিধ্বস্ত করেন।

প্রাচীন কিছু ইতিহাস
২৬৯ সাল থেকে খ্রিস্টপূর্ব ২৩২ সাল পর্যন্ত প্রায় সারা উপমহাদেশ শাসন করেছিলেন মৌর্য সাম্রাজ্যের সম্রাট অশোক। গৌতম বুদ্ধের অনুসারী হিসেবে তিনি সাম্রাজ্য শাসন করেছিলেন। যার মধ্যে সাম্রাজ্যের পূর্বে অবস্থিত বিক্রমপুরও ছিল। পরবর্তী সময়ে পাল রাজারা বিক্রমপুরে এসে এ অঞ্চল শাসন করেন।

পাল সাম্রাজ্যের দ্বিতীয় রাজা ধর্মপাল ৭৭০ থেকে ৮১০ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত তার রাজত্বকালে বিক্রমপুরে একটি বৌদ্ধ বিহার নির্মাণ করেন। তার মৃত্যুর পর তার ছেলে দেবপাল ৮৫০ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত এ অঞ্চল শাসন করেন। পরবর্তী সময়ে এ এলাকা পর্যায়ক্রমে শাসন করেন মহেন্দ্রপাল, বিগ্রহপাল, নারায়ণপাল, রাজ্যপাল, গোপাল, মহীপাল, ন্যায়পাল, শুরাপাল, রামপাল, কুমারপাল, মদনপাল। সেন সাম্রাজ্যের দ্বারা ক্রমাগত আক্রান্ত হলে ১১৭৪ সালে পাল সাম্রাজ্য ভেঙে পড়ে।

মোগল স¤্রাট আকবর ১৫৭২ থেকে ১৫৮০ সালের প্রশাসনিক সংস্কারের সময় বিক্রমপুরকে একটি পরগনা হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করেন। এটি ছিল সুবা বাংলার সোনারগাঁও সরকারের ৫২টি পরগনার মধ্যে একটি। আকবরের আমলে চাঁদ রায় এবং কেদার রায় বিক্রমপুরের জমিদার ছিলেন। বারভূঁইয়াদের বিরুদ্ধে অভিযান চলাকালে মোগল সুবেদার মানসিংহ ১৬০০ সালের শুরুর দিকে কেদার রায়কে হত্যা করেন।

মুন্সিগঞ্জ জেলার নামকরণ
মোগল শাসনামলে মুন্সিগঞ্জের নাম ছিল ইদ্রাকপুর। ষোড়শ শতাব্দীর মাঝামাঝি সময় ইদ্রাকপুর কেল্লার ফৌজদারের নাম ছিল ইদ্রাক। ধারণা করা হয়, তার নামানুসারেই তখন এখানকার নাম হয়েছিল ইদ্রাকপুর। চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের সময় রামপালের কাজী কসবা গ্রামের মুন্সি এনায়েত আলীর জমিদারভুক্ত হওয়ার পর তার ‘মুন্সি’ নাম থেকে ইদ্রাকপুরের নাম মুন্সিগঞ্জ হিসেবে অভিহিত হয়। আবার অনেকের মতে, মোগল শাসনামলে এলাকার ফৌজদারি আদালতের প্রধান হায়দার আলী মুন্সির নামানুসারে মুন্সিগঞ্জ নামের উৎপত্তি । আবার অন্য এক জনশ্রুতিতে জানা যায়, শোলঘর ও বজ্রযোগিনী এলাকার মুন্সি উপাধিধারী হিন্দু জমিদারের নামানুসারে এই এলাকার নাম হয় মুন্সিগঞ্জ।

সুলেমান খানের সঙ্গে চাঁদ রায়ের যুদ্ধ
১৫৯৩ সাল পর্যন্ত ভূষণা বিক্রমপুর রাজা চাঁদ রায় কেদার রায়ের নিয়ন্ত্রণে ছিলেন। সুলেমান খানের সঙ্গে চাঁদ রায়ের রক্তক্ষয়ী এক যুদ্ধ হয়। যুদ্ধে চাঁদ রায় ১৫৯৩ সালের ১১ ফেব্রুয়ারি নিহত হন। পরে ঈশা খাঁ ও কেদার রায় ভূষণা বিক্রমপুরের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে আসেন। রামপাল নগরী মুসলমান শাসক ও ত্রিপুরা রাজাদের দ্বারা ধ্বংস হলে বিক্রমপুরের পরবর্তী রাজারা শ্রীপুরকে ‘রাজধানী’ শহর হিসেবে তৈরি করে। কিন্তু পুরো অঞ্চলই বিক্রমপুর নামে অবহিত হয়। চাঁদ রায় ও কেদার রায়ের সঙ্গে মোগল সেনাপতি মানসিংহ ও ইসলাম খানের যুদ্ধ হয় বিধায় উল্লিখিত রাজাদের নাম মোগল ইতিহাসে সংরক্ষিত আছে।

শ্রীপুরের অবস্থান হলো মুন্সিগঞ্জ সদর থানা থেকে সোজা দক্ষিণে ১০ মাইল। অর্থাৎ মেঘনা নদীর পশ্চিমাংশে প্রাচীন কালীগঙ্গা নদীর উত্তরাংশে একটি চরাভূমিই শ্রীপুর। এখানে চাঁদ রায়-কেদার রায়ের রাজবাড়ি ছিল। এ শ্রীপুর নগরীটি মুন্সিগঞ্জ ও নড়িয়া উপজেলার কয়েকটি গ্রাম নিয়ে গঠিত ছিল। মুন্সিগঞ্জের দিঘিরপাড়, শিলই, শরিশাবন, কামারখাড়া ও কেদারপুর নিয়ে শ্রীপুর নগরীর অবস্থান ছিল। যা পদ্মার গতি পরিবর্তনের ১৮৬৯ সালের কোন এক সময় ধ্বংসপ্রাপ্ত হয়। এজন্যই পদ্মা নদীর স্থানীয় নাম কীর্তিনাশা। ১৮৪৫ সালের মার্চ মাসে ব্রিটিশ সরকার যখন মুন্সিগঞ্জকে মহকুমায় উন্নীত করে তখন শ্রীপুরের হেডকোয়ার্টার ও থানা ছিল ‘রাজাবাড়ি’।

অর্থাৎ মুন্সিগঞ্জ, শ্রীনগর, রাজাবাড়ি ও মূলফতগঞ্জে হলো সাবডিভিশন মুন্সিগঞ্জ। ১৬০৩ সালে এক রক্তক্ষয়ী যুদ্ধে শ্রীপুরের সর্বশেষ রাজা কেদার রায় মোগলদের হাতে নিহত হন। আর তখন থেকেই বিলুপ্তি ঘটে বিক্রমপুরের স্বাধীনতা। রেনেল কর্তৃক অঙ্কিত বিক্রমপুর মানচিত্রে সিরাজাবাদের ঠিক দক্ষিণেই অবস্থান ছিল রাজাবাড়ির। জিরামপুর, হাতামারী, কার্তিকপুর, সিরাজাবাদ, শরিশাবন, স্বর্ণগ্রাম, কবুতরখোলা, কেদারপুর (শরীয়তপুর), ডাইনলাঙ্গা, জয়পুর দ্বীপগুলো নিয়ে ‘রাজাবাড়ি’ অবস্থান ছিল। এখানে রাজপ্রাসাদ ও দুর্গ ছিল। ছিল বিশালাকার মঠ। ১৮৪৫ সালে যখন মুন্সিগঞ্জকে মহকুমা করা হয় তখন শ্রীপুরের হেডকোয়ার্টার ছিল রাজাবাড়ি। আর রাজাবাড়িটিই ব্রিটিশ সরকার থানায় উন্নীত করে (১৮৪৫ সালের মার্চে)। ১৮৬৯ সালের ১০ জানুয়ারি ভারত-বাংলাদেশে যে ভূমিকম্প হয় তাতে পদ্মা দিক পরিবর্তন করে এবং শ্রীপুর ও রাজাবাড়ি সম্পূর্ণ ধ্বংস হয়।

ইতিহাস ঐতিহ্যে সমৃদ্ধ এক জনপদ
পদ্মা, মেঘনা, ধলেশ্বরী, ইছামতি নদীর দ্বীপ জেলা মুন্সিগঞ্জ। আজকের মুন্সিগঞ্জ কিংবদন্তি ইতিহাসের মহান এবং গর্বিত ভূ-ভাগ। এই ভূ-ভাগ প্রাচীন চন্দ্র রাজাদের তাম্র শাসনের অঞ্জলী থেকে শুরু করে পাল, সেন, মোগল, বারভূঁইয়াদের কীর্তিত্বে উজ্জ্বল হয়ে একটি স্বাধীন বঙ্গ রাজ্যের রাজধানী বিক্রমপুরের কীর্তিময় অংশ। মুন্সিগঞ্জ তাই বাংলাদেশের জন্য গৌরবের ইতিহাস। ৬টি উপজেলা, ২টি পৌরসভা, ৬৭টি ইউনিয়ন আর ৯৫৭টি গ্রাম নিয়ে ৯৫৪.৯৬ বর্গকিলোমিটারের ঐতিহ্যম-িত ভূখ- মুন্সিগঞ্জ। ইতিহাসের পাতায় বিক্রমপুর একটি জ্ঞানী তাপসজনের মিলন কেন্দ্র।

এখানে জন্মেছেন দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাস, সাহিত্যিক সৈয়দ এমদাদ আলী, সরোজনী নাইডু, ইংলিশ চ্যানেল বিজয়ী ব্রজেন দাস, বৈজ্ঞানিক জগদীশ চন্দ্র বসু, অতীশ দিপঙ্করের মতো জগদ্বিখ্যাত ব্যক্তি। এমনকি বাবা আদম শহীদের মতো ইসলামী ব্যক্তিত্বের পদচারণা এক কথায় তাঁর প্রচেষ্টার ফসল আজ মুন্সিগঞ্জের ইসলাম বা মুসলমান এলাকা মুন্সিগঞ্জ বিক্রমপুর। আজকের মুন্সিগঞ্জ জেলা প্রাচীন বাংলার গৌরবময় স্থান বিক্রমপুরের অংশ। ১৯৪৫ সালে ব্রিটিশ ভারতের প্রশাসনিক সুবিধার্থে মুন্সিগঞ্জ থানা ও মহকুমা হিসেবে উন্নীত করা হয়। ১৯৮৪ সালের ১ মার্চ মুন্সিগঞ্জ জেলায় রূপান্তরিত হয়। মুন্সিগঞ্জ জেলা ২৩০২৯ মিনিট থেকে ২৩০৪৫ মিনিট উত্তর অক্ষাংশ এবং ৯০০১০ মিনিট থেকে ৯০০৪৩ মিনিট পূর্ব দ্রাঘিমাংশের মধ্যে অবস্থিত।

মুন্সিগঞ্জের কিছু তথ্য
মুন্সিগঞ্জ সমতল এলাকা নয়। জেলার কিছু কিছু অঞ্চল যথেষ্ট উঁচু যদিও জেলায় কোনো পাহাড় নেই। মুন্সিগঞ্জের বেশির ভাগ এলাকা নিম্নভূমি যা বর্ষাকালে পানিতে ডুবে যায়। মুন্সিগঞ্জের জলবায়ু সমভাবাপন্ন। তবে আর্দ্রতা এর অন্যতম বৈশিষ্ট্য। এখানকার জলবায়ু ঋতু বিশেষ পরিবর্তনশীল। এটি বর্ষাপ্রধান এলাকা। গ্রীষ্মকালে অনেক স্থান পানিশূন্য হয়ে পড়ে। ঝড়-বৃষ্টির প্রকোপও এ অঞ্চলে যথেষ্ট। শীতকালে শীতের তীব্রতা দেশের অন্যান্য স্থানের মতো তত প্রবল নয়। এলাকাটি নাতিশীতোষ্ণ অঞ্চলভুক্ত। পূর্বে কুমিল্লা জেলার দাউদকান্দি ও হোমনা উপজেলা, চাঁদপুর জেলার মতলব উপজেলা যা মুন্সিগঞ্জের সঙ্গে প্রবাহিত মেঘনা নদীর দ্বারা বিভাজিত। পশ্চিমে শরীয়তপুর, মাদারীপুর, কেরানীগঞ্জ ও দোহার উপজেলা এবং নারায়ণগঞ্জ জেলার বন্দর উপজেলা। দক্ষিণে পদ্মা যার অপর পাশে শরীয়তপুর জেলা।

ঢাকা টাইমস