শত বিড়ম্বনা নিয়ে তুরাগের পথে মুসল্লিরা

বিশ্ব ইজতেমা কাল
ভোগান্তি নিয়ে রাজধানীর সন্নিকটে কহর দরিয়া-খ্যাত টঙ্গীর তুরাগের পথে হাজার হাজার মুসল্লি। অনেকে মাইলের পর মাইল হেঁটে ইজতেমার মাঠে পৌঁছান। গতকাল পর্যন্ত ইজতেমার মাঠে বিগত বছরের মতো মুসল্লির সমাগম ঘটেনি। এ ছাড়া বিদেশি মেহমানরাও যানবাহন না পেয়ে বিমানবন্দর থেকে পায়ে হেঁটে টঙ্গীতে পৌঁছেছেন। এভাবে দেশের বিভিন্ন জেলা, উপজেলা ও গ্রামাঞ্চল থেকে আন্তঃজেলার বাস ও লঞ্চ না পেয়ে অনেকে পণ্য পরিবহনের ট্রাকে চেপে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে টঙ্গীর মাঠে আসছেন। আজ থেকে মুসল্লির এই স্রোত থাকবে টঙ্গীর দিকে। এ ছাড়া বিশ্ব ইজতেমা উপলক্ষে অবরোধ কর্মসূচি প্রত্যাহার করার জন্য বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন ধর্মমন্ত্রী অধ্যক্ষ মতিউর রহমান।

আগামীকাল (শুক্রবার) ফজরের নামাজের পর আমবয়ানের মধ্য দিয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হবে বিশ্ব তাবলিগ জামাতের বার্ষিক মহাসম্মেলন বিশ্ব ইজতেমা। মুসলিম জাহানের দ্বিতীয় বৃহত্তম ধর্মীয় মহাসম্মেলনের ৫০তম বিশ্ব ইজতেমার আয়োজন। এরই মধ্যে দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চল থেকে মুসল্লিরা প্রয়োজনীয় দ্রব্যসামগ্রী নিয়ে ইজতেমা ময়দানে জড়ো হচ্ছেন। অসংখ্য মুসল্লির পদচারণায় টঙ্গী নগরী নতুন প্রাণ পেতে শুরু করেছে। ৯ জানুয়ারি শুরু হয়ে ১১ জানুয়ারি রবিবার আখেরি মোনাজাতের মধ্য দিয়ে শেষ হবে বিশ্ব ইজতেমার প্রথম পর্ব। এরপর চারদিন বিরতি দিয়ে ১৬ জানুয়ারি শুরু হবে দ্বিতীয় পর্ব। ১৮ জানুয়ারি রবিবার আখেরি মোনাজাতের মধ্য দিয়ে শেষ হবে বিশ্ব ইজতেমা। এবারও আগত মুসল্লিরা জেলাওয়ারি খিত্তায় অবস্থান করবেন।

এ ছাড়া গতকাল ভোর থেকে দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চল থেকেও জামাতবন্দী হাজার হাজার মুসল্লি ইজতেমা ময়দানে এসে জেলাওয়ারি খিত্তায় অবস্থান নিতে শুরু করেছেন। গতকাল টঙ্গীর ইজতেমার ময়দান ঘুরে পাওয়া গেছে এসব তথ্য। ১৪ নম্বর খিত্তায় কথা হয় সিরাজগঞ্জের উল্লাপাড়া থেকে আগত ইয়াছিন আলীর সঙ্গে। তিনি ক্ষোভের সঙ্গে বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, অবরোধের কারণে আমি মাইলের পর মাইল হেঁটেছি। আবার দ্বিগুণ ভাড়া দিয়ে কিছু পথ ট্রাকে চেপে ঢাকায় আসতে বাধ্য হয়েছি। এভাবে অনেক মুসল্লি তাদের কষ্ট ও দুর্ভোগের বর্ণনা দেন। তাবলিগ কমিটির দাবি সারা দেশে অবরোধের কারণে পথে পথে হাজার হাজার মুসল্লি যানবাহন না পেয়ে আটকা পড়েছেন।

প্রতি বছরের মতো এবারও উর্দু ভাষায় বয়ান করবেন প্যানেলভুক্ত দেশি-বিদেশি আলেম ও মুফতিগণ। পাশাপাশি বিভিন্ন দেশ থেকে আসা মুসল্লিদের সুবিধার্থে বয়ানের সঙ্গে সঙ্গে বাংলা ও আরবি ভাষায় তর্জমা করা হবে। তুরাগ নদের তীরবর্তী ১৬০ একর জমির বিস্তৃত ময়দানের উত্তর-পশ্চিমে তৈরি হয়েছে বয়ানমঞ্চ। বিদেশি মুসল্লিদের জন্য ইজতেমা ময়দানের উত্তর-পশ্চিম কোণে বিদ্যুৎ, গ্যাস ও টেলিফোন সংযোগসহ আলাদা টিনশেড নির্মাণ করা হয়েছে। এ ছাড়া একটি রাজনৈতিক দলের অবরোধের মতো কর্মসূচির কারণে নোয়াখালী, ফেনী, মাদারীপুর, শরীয়তপুর ও ফরিদপুরসহ বিভিন্ন জেলার মুসল্লিরা গতকাল সকাল থেকেই ইজতেমা ময়দানে প্রবেশ করতে শুরু করেছেন। এবার নিরাপত্তার কথা বিবেচনা করে দুই পর্বের দুই দিন ঢাকা-ময়মনসিংহ ও ঢাকা-আশুলিয়া মহাসড়ক ভোর থেকে দুপুর সাড়ে ১২টা পর্যন্ত বন্ধ থাকবে।
৯ জানুয়ারি শুক্রবার আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হয়ে বিশ্ব ইজতেমার প্রথম পর্বের কার্যক্রম ১১ জানুয়ারি দুপুরে অর্থাৎ জোহরের নামাজের আগেই যে কোনো এক সময় আখেরি মোনাজাতের মধ্য দিয়ে মুসলিম জাহানের দ্বিতীয় বৃহত্তম সম্মেলন বিশ্ব ইজতেমার প্রথম পর্বের সমাপ্তি ঘটবে। এ ছাড়া মুসল্লিদের অবাধ প্রবেশ নিশ্চিত করতে সেনাবাহিনীর ইঞ্জিনিয়ারিং কোরের সদস্যরা তুরাগ নদীতে নয়টি ভাসমান পন্টুন সেতু নির্মাণ করেছেন।

আগত মুসল্লিদের সুষ্ঠুভাবে বয়ান শোনার জন্য পুরো মাঠে শব্দ প্রতিধ্বনি রোধক প্রায় ৩০০টি বিশেষ ছাতা মাইক স্থাপন করা হয়েছে। এদিকে মরণঘাতী ইবোলা ভাইরাস আক্রান্ত পাঁচটি দেশের নাগরিককে স্ব-স্ব দেশের দূতাবাসের মাধ্যমে নিরুৎসাহিত করা হচ্ছে। ইজতেমার মাঠ ঘুরে আরও দেখা যায়, বিশ্বের প্রায় ১০টি দেশের প্রায় এক হাজার বিদেশি মুসল্লি মাঠে পৌঁছেছেন। তারা এখন আল্লাহর নির্দেশিত হুকুম, আহকাম পালন ও জিকির আসকারে মশগুল থাকছেন। জানতে চাইলে গাজীপুর জেলা পুলিশ সুপার হারুনুর অর রশিদ বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, কঠোর নিরাপত্তা বলয়ে থাকবে ইজতেমা ময়দান। মুসল্লিদের নিরাপত্তায় ময়দান ঘিরে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্য মোতায়েন করা হয়েছে। ভ্রাম্যমাণ আদালত সার্বিক আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় কাজ করবেন।প্রথম দফায় খিত্তাওয়ারি মুসল্লিদের অবস্থান : ইজতেমার প্রথম দফায় ঢাকার উত্তর থেকে দেশের উত্তরভাগের মুসল্লিরা অংশগ্রহণ করবেন।

এর মধ্যে ১ নং খিত্তায় গাজীপুর-১, ২ নং খিত্তায় গাজীপুর-২, ৩-১৩ নং খিত্তায় ঢাকা-৩ থেকে (ঢাকা-১, ২ বাদে) ১২, ১৪ নং খিত্তায় সিরাজগঞ্জ, ১৫ নং খিত্তায় নরসিংদী, ১৬ নং খিত্তায় ফরিদপুর, ১৭ নং রাজবাড়ী, ১৮ নং খিত্তায় শরীয়তপুর, ১৯ নং খিত্তায় কিশোরগঞ্জ, ২০ নং খিত্তায় নাটোর, ২১ নং খিত্তায় শেরপুর, ২২ নং খিত্তায় দিনাজপুর, ২৩ নং খিত্তায় হবিগঞ্জ, ২৪ নং খিত্তায় রংপুর, ২৫ নং খিত্তায় লালমনিরহাট, ২৬ নং খিত্তায় গাইবান্ধা, ২৭ নং খিত্তায় জয়পুরহাট, ২৮ নং খিত্তায় রাজশাহী, ২৯ নং খিত্তায় সিলেট, ৩০ নং খিত্তায় চাঁদপুর, ৩১ নং খিত্তায় ফেনী, ৩২ নং খিত্তায় চট্টগ্রাম, ৩৩ নং খিত্তায় বান্দারবান, খাগড়াছড়ি, রাঙ্গামাটি, ৩৪ নং খিত্তায় বাগেরহাট, ৩৫ নং খিত্তায় নড়াইল, ৩৬ নং খিত্তায় চুয়াডাঙ্গা, ৩৭ নং খিত্তায় যশোর, ৩৮ নং খিত্তায় ভোলা, ৩৯ নং খিত্তায় বরগুনা ও ৪০ নং খিত্তায় ঝালকাঠি জেলার মুসল্লিরা অবস্থান করবেন।

দ্বিতীয় পর্বে খিত্তাওয়ারি মুসল্লিদের অবস্থান : খিত্তা নং- ১ (নারায়ণগঞ্জ-১), খিত্তা নং- ২ (নারায়ণগঞ্জ-২), খিত্তা নং- ৩ (ঢাকা-১, হালকা-৩০১-৩২৫), খিত্তা নং- ৪ (ঢাকা-২, হালকা-৬০১-৬৩৯), খিত্তা নং- ৫ (কক্সবাজার), খিত্তা নং- ৬ (মানিকগঞ্জ), খিত্তা নং- ৭ (পিরোজপুর), খিত্তা নং-৮ (পটুয়াখালী), খিত্তা নং ৯(১) (টাঙ্গাইল-ক), খিত্তা নং ৯(২) (টাঙ্গাইল-খ), খিত্তা নং-১০(১) (জামালপুর-ক), খিত্তা নং-১০(২) (জামালপুর-খ), খিত্তা নং-১১ (বরিশাল), খিত্তা নং ১২ (নেত্রকোণা), খিত্তা নং-১৩ (কুমিল্লা), খিত্তা নং-১৪ (মেহেরপুর), খিত্তা নং- ১৫ (ঝিনাইদহ), খিত্তা নং- ১৬ (ময়মনসিংহ-১), খিত্তা নং- ১৭ (ময়মনসিংহ-২), খিত্তা নং- ১৮ (ময়মনসিংহ-৩), খিত্তা নং- ১৯ (লক্ষ্মীপুর), খিত্তা নং- ২০ (বি.বাড়ীয়া), খিত্তা নং-২১ (কুড়িগ্রাম), খিত্তা নং- ২২ (নোয়াখালী), খিত্তা নং- ২৩ (নীলফামারী), খিত্তা নং- ২৪ (ঠাকুরগাঁও), খিত্তা নং- ২৫ (পঞ্চগড়), খিত্তা নং- ২৬ (চাঁপাইনবাবগঞ্জ), খিত্তা নং- ২৭ (বগুড়া), খিত্তা নং-২৮ (পাবনা), খিত্তা নং- ২৯ (নওগাঁ), খিত্তা নং-৩০ (মুন্সীগঞ্জ-১), খিত্তা নং- ৩১ (মুন্সীগঞ্জ-২), খিত্তা নং- ৩২ (মাদারীপুর), খিত্তা নং-৩৩ (গোপালগঞ্জ), খিত্তা নং- ৩৪ (সাতক্ষীরা), খিত্তা নং-৩৫ (মাগুরা), খিত্তা নং- ৩৬ (খুলনা), খিত্তা নং- ৩৭ (সুনামগঞ্জ), খিত্তা নং- ৩৮ (মৌলভী বাজার), ৩৯ (কুষ্টিয়া)।

আইনশৃঙ্খলা জোরদার : বিশ্ব ইজতেমা উপলক্ষে টঙ্গীতে আইনশৃঙ্খলা জোরদার করা হয়েছে। ৫ সেক্টরে ভাগ করে চার স্তরের নিরাপত্তায় ইজতেমার ময়দানসহ আশপাশের এলাকায় অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে। ইজতেমা মাঠের সার্বিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে আজ থেকে প্রায় ১৬ হাজার পুলিশসহ র‌্যাব, সাদা পোশাকধারী বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থার সদস্যদের মোতায়েন করা হবে। নিরাপত্তা জোরদার করতে র‌্যাবের কমিউনিকেশন এন্ড ইন্টিলিজেন্টস উইংয়ের পক্ষ থেকে ১৮টি প্রবেশপথসহ চারপাশের গুরুত্বপূর্ণ স্থানে বসানো হয়েছে পর্যাপ্তসংখ্যক ক্লোজ সার্কিট ক্যামেরা।

আরও থাকছে মেটাল ডিটেক্টর, বাইনোকুলার ও নাইটভিশন গগলস। এ ছাড়া প্রতিটি খিত্তায় বিশেষ টুপি পরিহিত ও সাদা পোশাকধারী দুই জন করে গোয়েন্দা সদস্য অবস্থান করবেন। এ ছাড়াও তারা ইজতেমা মাঠসহ আশপাশের কোথায় কি হচ্ছে না হচ্ছে প্রত্যক্ষ করার জন্য ক্লোজ ডোর ল্যাপটপ ও কম্পিউটারের স্ক্রিনে সার্বক্ষণিক নজর রাখবেন। নিরাপত্তার স্বার্থে বিভিন্ন স্থানে বসানো হয়েছে র‌্যাবের নয়টি ও পুলিশের পাঁচটি পর্যবেক্ষণ টাওয়ার। সেখান থেকে সার্বক্ষণিক বিশ্ব ইজতেমা ময়দানের পর্যবেক্ষণ করবেন।

বাংলাদেশ প্রতিদিন