শ্রীনগরে মৌ চাষ : যাই মধু আহরণে…

মো. মাসুদ খান:‘মৌমাছি মৌমাছি/কোথা যাও নাচি নাচি/দাঁড়াও না একবার ভাই,/ওই ফুল ফোটে বনে, যাই মধু আহরণে, দাঁড়াবার সময়তো নাই…।’ কবিতার পঙ্ক্তিমালার মতোই বাস্তবে ব্যস্ততার যেন শেষ নেই। মধুসমৃদ্ধ ফুলের খোঁজে ওরা ব্যস্ত থাকে দিনভর। চষে বেড়ায় দূর-দূরান্ত। উদ্দেশ্য একটাই- মধু সংগ্রহ করতে হবে। আর ওরা নিজেদের অজান্তেই ঘটিয়ে চলে ফুলের পরাগায়ণের কাজটি।

বাস্তবতা হলো, সময়ের পরিক্রমায় মৌমাছির শ্রমও যেন কমে এসেছে। এখন আর দূরের কোনো বন-বাগানে ফুলের খোঁজে ওদের দীর্ঘ পথ উড়ে যেতে হচ্ছে না। একশ্রেণির বাণিজ্যিক মৌচাষি পালিত মৌমাছি নিয়ে যাচ্ছে ফসলের ফুল ফোটা জমিতে। আর সেখানে অজস্র ফুল থেকে মধু আহরণ করে মৌচাকে জমা করছে মৌমাছির দল। এতে মৌচাষি আর্থিকভাবে লাভবান হচ্ছে। পাশাপাশি কৃষকও বাড়তি উপার্জনসহ পরাগায়ণের মাধমে জমিতে বাড়তি ফসল উৎপাদন করছে। মৌমাছির আহরিত মধু আবার নিয়ে আসা হচ্ছে নানা কৌশলে। সহজ এই পন্থায় কৃষকের এখন বাড়তি আয়।

সরিষা চাষের পাশাপাশি মৌমাছির খামার করে স্বাবলম্বী হচ্ছে মুন্সীগঞ্জের শ্রীনগর উপজেলার সাতগাঁও গ্রামের কৃষকরা। বিস্তীর্ণ জমিজুড়ে এখন মনকাড়া সরিষা ফুলের হলদে রঙের মেলা। সেখানেই চলছে মৌমাছির মধু আহরণের কর্মযজ্ঞ। দিনভর মৌমাছি তিল তিল করে মধু এনে জমাচ্ছে মৌ চাষির পেতে রাখা বাক্সে। আর সেই বাক্স থেকে সুকৌশলে মধু কেটে বের করে আনছেন মৌ চাষি। এ দৃশ্য এখন এই এলাকায় নিত্যদিনের।

হেমন্তের অগ্রহায়ণ থেকেই মধু সংগ্রহের মৌসুম শুরু হয়ে গেছে। আর এখন শীতের পৌষে ভরা মৌসুম। মৌমাছি আর কৃষকের ব্যস্ততা যেন প্রকৃতির নয়নাভিরাম হলুদ রাজ্যে একাকার হয়ে গেছে। ভোরের শিশির বিন্দু ঝরছে ফুলে ফুলে। ভোরের সূর্য উঠতেই শুরু হয়ে যায় মৌমাছির মধু সংগ্রহের ব্যস্ততা। তা চলে সূর্যের আলো নিভে যাওয়ার আগ মুহূর্ত পর্যন্ত। আর সকাল, দুপুর, বিকেল প্রতিটি ক্ষণেই যেন প্রকৃতির নানা রূপ ভর করে সাতগাঁওয়ের এই মধুপল্লীতে।

মুন্সীগঞ্জের শ্রীনগরের সাতগাঁও গ্রামের সরিষাক্ষেতে বাণিজ্যিকভাবে চলছে মৌ চাষ।

ঢাকার সুরিটোলার মৌ চাষি বেলায়েত হোসেন বংশ পরম্পরায় বাণিজ্যিকভাবে মৌমাছির চাষ করছেন। ছোট-বড় মিলিয়ে মৌমাছির চারটি ভ্রাম্যমাণ বাক্সবন্দি খামার রয়েছে তাঁর। দেশের চারটি অঞ্চল থেকে তিনি এখন ফসলি জমিতে বাক্সবন্দি মৌমাছি নিয়ে গিয়ে মধু সংগ্রহ করছেন। ৬১টি বাক্সেরএমনই একটি ছোট মৌমাছির খামার নিয়ে বসেছেন শ্রীনগরের সাতগাঁও গ্রামের সরিষার জমিতে। মৌমাছিগুলো বাক্স থেকে নির্দিষ্ট পথে বের হয়ে সরিষা ক্ষেতের ফুলে ফুলে বসে মধু সংগ্রহ করে ফিরে আসছে বাক্সে। আর বাক্সের ভেতরে থাকা বিশেষ ফ্রেমে মৌচাকে মধু জমা করছে। প্রতিটি বাক্সে রয়েছে সাত থেকে ১০টি ফ্রেম।

বেলায়েত হোসেন জানান, ২৫ দিন ধরে তিনি সাতগাঁওয়ের সরিষা জমি থেকে মৌমাছির আহরিত মধু সংগ্রহ করছেন। প্রতি পাঁচ-ছয় দিন পর পর বাক্সের ফ্রেম থেকে মৌচাক কেটে মধু সংগ্রহ করে চলেছেন। প্রতিটি বাক্সে ১০ থেকে ১২ কেজি মধু পেয়ে থাকেন তিনি। চার বছর ধরে এই অঞ্চলে বাণিজ্যিকভাবে মধু সংগ্রহ করে তিনি আজ স্বাবলম্বী। কাজের স্বীকৃতিস্বরূপ দুই বছর আগে জাতীয় প্রেসক্লাবে মৌ সম্মেলনে তিনি শ্রেষ্ঠ মৌ চাষির পুরস্কার জিতে নিয়েছেন।

জেলা কৃষিবিদ কাজী হাবিবুর রহমান জানান, মৌমাছির এই চাষ শুধু মৌ চাষিকেই স্বাবলম্বী করছে না। বরং দেশের শস্য উৎপাদন বৃদ্ধি করছে। সরিষা ক্ষেতে মৌমাছি এক ফুল থেকে মধু সংগ্রহ করে অন্য ফুলে গিয়ে বসছে। এতে মৌমাছির পায়ে পায়ে এক ফুল থেকে অন্য ফুলে পরাগায়ণ হচ্ছে। এতে ফসলের উৎপাদন বেড়ে যাচ্ছে ১৫ থেকে ২০ ভাগ।

উল্লেখ্য, বহির্বিশ্বে ফসলের পরাগায়ণের জন্য এ জাতীয় মৌ চাষিদের অর্থ দিয়ে জমিতে নিয়ে যেতে হয়। আর আমাদের দেশে উল্টো জমির মালিককে টাকা দিয়ে জমি থেকে মধু আহরণ করতে হচ্ছে। অনেকটা অসচেতনতা থেকেই কৃষকরা তাদের জমিতে এসব মৌমাছির মধু সংগ্রহে বাধা দিয়ে থাকে। তাদের ধারণা, শস্য ক্ষেত থেকে মৌমাছি মধু নিয়ে গেলে শস্যের উৎপাদন ব্যাহত হবে। এ জন্য কৃষকদের সচেতন করতে জাতীয় উদ্যোগ দরকার বলে অভিজ্ঞরা মনে করেন।

কালের কন্ঠ