নিউইয়র্কের বাংলা ‘বইমেলা’ – ড. জ্যোতিপ্রকাশ দত্ত

প্রবাসী বাঙালির বাংলা বই পাঠের আগ্রহ বুঝি অতুলনীয়। বাংলা গান শোনার কি বাংলা ছবি দেখারও। না হলে এই ১৭ বছরের মধ্যে নিউইয়র্কে ‘মুক্তধারা’র বইমেলা যে পরিচিতি লাভ করেছে কি সেটি যুক্তরাষ্ট্রের অন্যান্য বড় শহরেও যে ছড়িয়ে পড়েছে, তার কোনো কারণ খুঁজে পাওয়া যাবে না। প্রকৃতপক্ষে, নিউইয়র্কের জ্যাকসন হাইটসে মুক্তধারার বই-পত্রপত্রিকা-গান-ছবির বিস্তৃত বিক্রয় কেন্দ্র ছাড়াও আরও কয়েকটি বইপত্র বিক্রয়স্থল আছে। গান কি ছবি তো পাওয়া যায় অনেক দোকানেই আজ।

৪০ বছর আগে নিউইয়র্কে আসি যখন, তখন এমন কিছুই ছিল না। মনে আছে টাইমস স্কয়ারের আলোর রাস্তায় হেঁটে যাওয়ার সেই প্রথম দিনে এক রেকর্ডের দোকান থেকে পূর্ণচন্দ্র বাউলের গান কানে এলে আমি প্রায় সম্মোহিতের মতো সেই দোকানে ঢুকে পড়ি। দেখি মাত্র কিছুকাল আগে প্রচারিত ‘বাউল্স অব বেঙ্গল’ নামের লংপ্লে অ্যালবামটি। এ দেশ থেকেই প্রকাশিত। তবুও ফরটিসেকেন্ড স্ট্রিটের রাস্তায় দাঁড়িয়ে বাউল গান শোনার ৪০ বছর আগের সেই শিহরণ আজও ভুলিনি। অনেককাল আগে উঠে যাওয়া ওই রেকর্ডের দোকানটিতে সেদিন আর কোনো বাংলা রেকর্ড ছিল না। ক্যাসেট তখনও বহু প্রচলিত নয়। স্পুলটেপই তখন সকলে জানেন।

ওই দিনের প্রায় দু’বছর পরে আমি প্রথম বাংলা গানের দুটি লংপ্লেয়িং অ্যালবাম কিনি ম্যানহাটানের সবচেয়ে বড় রেকর্ডের দোকান ‘স্যাম গুডি’ থেকে। কলকাতা থেকে আনা রেকর্ড ‘জেম্স্ ফ্রম টেগোর’ ও ‘হিট্স্ ফ্রম বেঙ্গলি ফিল্মস্’। আমেরিকায় বাংলা গান বাজিয়ে শোনা সেই শুরু আমার।

বাংলা বই কেনা শুরু হয় আরও পরে। অনেক পরে। ইউনিভার্সিটি অব শিকাগো এবং পরে ইউনিভার্সিটি অব মিসৌরিতে অধ্যয়নকালে দেখি বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঠাগারে বাংলা বইয়ের সংগ্রহ থাকলেও কেনার কোনো সুযোগ নেই। পত্রপত্রিকার তো কথাই আসে না। বাংলা বই কি পত্রিকা তখন পড়তাম দেশ থেকে কেউ দু’এক কপি সঙ্গে নিয়ে এলে। বই কেনার প্রথম সুযোগ ঘটে নিউইয়র্কের বঙ্গ সংস্কৃতি সংঘ বিক্রয়ের জন্য কিছুু বই নিয়ে এলে। সে প্রায় ২০ বছর আগের কথা। তার পরেই বিশ্বজিৎ সাহার নিউইয়র্ক আগমন এবং বাংলা বই কি গান কি ছবি পাওয়া শুরু। বইমেলারও।

যদিও বইমেলা শুরুর ব্যাপারটি যত সহজ শোনাচ্ছে, ঠিক তত সহজ ছিল না। বিশ্বজিৎ জানেন, জানি আমিও। চোখের সামনেই মুক্তধারা গড়ে উঠতে দেখেছি বলেই।

দুই.
কার্ডবোর্ড কেটে বানানো ঢাকার শহীদ মিনারের আদল সাঁটা হলো ট্রাইবরো ব্রিজের শুরুতে, নিচে পিলারের গায়ে_ এস্টোরিয়া পার্কে। মধ্যরাতে নিউইয়র্ক শহরের কুইন্সে এসেছিলেন সেই রাতে শতাধিক বাঙালি। নিঃসন্দেহে ফুল, মালা দিয়ে একুশের প্রথম প্রহর উদযাপনের জন্য যুক্তরাষ্ট্রে সেই প্রথম একুশে ফেব্রুয়ারি উদযাপন_ ১৯৯২-এর ২০ ফেব্রুয়ারির শেষে একুশে ফেব্রুয়ারির শুরুতে। প্রচণ্ড ঠাণ্ডা ও তুষারপাত উপেক্ষা করেই এসেছিলেন সকলে। আমিও ছিলাম। ‘বাঙালির চেতনামঞ্চ’ নাম নিয়ে কয়েকজন বাঙালি তরুণের সংগঠন ও ‘মুক্তধারা’ যৌথ উদ্যোগে ওই দিনটি পালনের ব্যবস্থা করেছিল। বিষয়টি এসেছিল বিশ্বজিৎ সাহার মাথা থেকে। তার মুক্তধারা তখন কেবল শুরু হয়েছে। দেশ থেকে বই-পত্রপত্রিকা এনে উডসাইডে নিজের বাসায় রেখে কোনো অনুষ্ঠানস্থলে বিক্রয় অথবা আগ্রহী পাঠকের কাছে ডাকযোগে প্রেরণ_ এই ছিল তখন ‘মুক্তধারা’র কার্যক্রম। জ্যাকসন হাইটসে মুক্তধারার স্টোরফ্রন্ট বা বিক্রয় কেন্দ্র চালু হয় আরও পরে।

১৯৯৩ সালে জাতিসংঘের সামনে অস্থায়ী শহীদ মিনার প্রস্তুত করে একুশের প্রথম প্রহর পালন করে ‘বাঙালির চেতনামঞ্চ’ ও ‘মুক্তধারা’ এবং তারপর থেকে অদ্যাবধি প্রতি বছরই সেটি পালিত হচ্ছে। যদিও গত কয়েক বছর ধরে নিউইয়র্কের অন্যান্য অঞ্চলে বিভিন্ন বাঙালি সংগঠনও পালন করে একুশে ফেব্রুয়ারি।

নিউইয়র্কে ‘৯৩-এর একুশে ফেব্রুয়ারি পালন আরও একটি কারণেও উল্লেখ করার মতো। ‘যুক্তরাষ্ট্র বাংলা সাহিত্য পরিষদ’ নামে তৎকালে প্রবাসী বাংলা সাহিত্যানুরাগী ও লেখককুলের একটি সম্পূর্ণ অনানুষ্ঠানিক সংগঠন গড়ে উঠেছিল। রকফেলার ইউনিভার্সিটির ‘স্কলারস্ রেসিডেন্স’-এর ২৩ তলার হলঘরে সেই প্রথম অনুষ্ঠিত হয় যুক্তরাষ্ট্র বাংলা সাহিত্য পরিষদের আয়োজনে বাংলা সাহিত্য সম্মেলন। বোস্টনে তার নিভৃত আবাস থেকে প্রায় জোর করেই কবি শহীদ কাদরীকে নিয়ে আসা হয় সাহিত্য সম্মেলনে। ঢাকা থেকে এসেছিলেন কবি নির্মলেন্দু গুণও। ওই সাহিত্য সম্মেলন শেষেই শহীদ কাদরীসহ সবাই আমরা জাতিসংঘের সম্মুখে শহীদ মিনারে ফুল দিতে যাই। প্রচণ্ড শীত আর বরফ উপেক্ষা করেই। ‘মুক্তধারা’র বইমেলার উদ্বোধনও করেন শহীদ কাদরী পরদিন। ‘৯২ সালে হয়েছিল প্রথম বইমেলা। সেটির উদ্বোধন করেছিলেন বর্তমান লেখকই।

‘৯২-এর পরে একুশের প্রথম প্রহর পালন ও বইমেলার প্রসার এখন প্রায় সব প্রবাসী বাঙালিই জানেন। জানেন দেশের উৎসাহী সমাজও। নিউইয়র্কের বাইরে বইমেলা বসছে আরও নানা বড় শহরে। যেমন লস অ্যাঞ্জেলস, ডালাস, নিউজার্সি। ডালাসে অনুষ্ঠিত কয়েক বছর আগে একটি বইমেলায় শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায় ও রাবেয়া খাতুনের সঙ্গে আমিও উপস্থিত ছিলাম মঞ্চে।

গত কয়েক বছর ধরে বিশ্বজিৎ সাহা তার কর্মপরিধি আরও বিস্তৃত করেছেন। ‘শ্রেষ্ঠ বাঙালি’ সম্মাননা সভার পরে যুক্ত করেছেন আন্তর্জাতিক বাংলা উৎসব তার কর্মকাণ্ডে_ নিউইয়র্কসহ যুক্তরাষ্ট্রের আরও তিনটি শহরে। ‘মুক্তধারা’র বইমেলার পাশাপাশি চালু করেছেন ‘মুক্তধারা’র বিক্রয় কেন্দ্র অন্যান্য বড় শহরেও। ‘মুক্তধারা’র বইমেলায় ও অন্যান্য আয়োজনে অংশগ্রহণ করেছেন বাংলাদেশ ও পশ্চিমবঙ্গের অনেক প্রতিথযশা লেখক। এসব কথা আজ সবারই জানা। বইমেলার ওপর নানা প্রতিবেদন প্রকাশ হয়েছে নিউইয়র্ক টাইমসসহ এ-দেশ ও-দেশের নানা পত্রপত্রিকায়। বছরে অন্তত একবার যে নিউইয়র্ক শহর প্রবাসে বাংলা সাহিত্য-সংস্কৃতির মিলনমেলায় পরিণত হয় এ কথা আমরা জানি। আর জানি উডসাইডের নিজ বাসায় স্থাপিত ‘মুক্তধারা’কে কীভাবে বিশ্বজিৎ সাহা বিক্রয় কি প্রকাশনা সংস্থার বাইরেও একটি সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডলে স্থাপন করেছেন। প্রচুর শ্রম, স্বেদ ও সহজাত ব্যবসায় চেতনার সমন্বয়ে। জুটেছে অনেক উপহাস কি নিন্দাও তার।

তিন.
প্রবাসী বাঙালির বাংলা বই পাঠাগ্রহের কথাটি বিবেচনা করা যাক এবারে। ‘মুক্তধারা’র সাফল্যের পেছনে সেটি একটি বড় বিবেচ্য বিষয় নিঃসন্দেহে, যেমন বিবেচ্য গত ২০ বছর নিউইয়র্ক শহরে বাঙালি অভিবাসীর বহুগুণ সংখ্যা বৃদ্ধি। যুক্তরাষ্ট্রের অন্যান্য শহরেও। তবুও কিছু কথা থাকে।

যদি ধরা যায় ২০ বছর আগে ‘মুক্তধারা’ চালুর সময়ে নিউইয়র্কে বাংলা ভাষাভাষীর সংখ্যা ছিল কমবেশি ১০ হাজার, আজ অন্তত ওই সংখ্যা আট-দশগুণ বেশি। যদি ধরে নিই, ওই সময়ে বিশ্বজিৎ গড়ে এক বাঙালির কাছে একটি করে বছরে প্রায় দশ হাজার বই বিক্রি করেছেন নিউইয়র্ক শহরে। আজ তাহলে তার বই বিক্রির সংখ্যা কমবেশি এক লাখ কপি হওয়া উচিত। প্রকৃত সংখ্যা বিশ্বজিৎই জানেন। কিন্তু আমার তেমন মনে হয় না। শুধু বই বিক্রি করে চলা সম্ভব ছিল না বলেই ‘মুক্তধারা’কে যোগ করতে হয়েছে অডিওভিডিওর বিপণন। অডিও ক্যাসেট, সিডি, ভিডিও ক্যাসেট, ডিভিডিসহ নানা উপচার। বিক্রয় হয় মুক্তধারায়_ আজ বাংলাদেশ ও পশ্চিমবঙ্গের বিভিন্ন পত্রপত্রিকাসহ স্থানীয় নানা সাপ্তাহিক-মাসিকও। মুক্তধারার নিজের কিছুু গ্রন্থ ও সিডি-ডিভিডি প্রকাশনাও আছে। স্পষ্টতই দেখা যায়, শুধু বাংলা বইয়ের জন্যই নয়, প্রবাসী বাঙালির বৃহত্তর সাংস্কৃতিক তৃপ্তি মেটানোর জন্যও মুক্তধারা ব্রতী। ব্যবসায় সফলও এই কারণেই। যদিও আমার বিশ্বাস ‘মুক্তধারা’র শুরুতে ব্যবসায় চেতনাই বিশ্বজিতের মধ্যে সর্বব্যাপী ছিল না।

১৯৮৫ সালে নিউইয়র্ক থেকে সৈয়দ মোহাম্মদ উল্লাহ যখন সাপ্তাহিক ‘প্রবাসী’ প্রকাশ করেন, তখন অভিবাসী বাঙালির সংখ্যা যেমন যুক্তরাষ্ট্রে কম ছিল, তেমনি ছিল বাংলা পত্রিকা প্রকাশনার সংখ্যাও। ওই কালে কস্ফচিৎ দু’একটি গল্প-কবিতার সংকলন প্রকাশনা ছাড়া কেবল দুটি সংবাদ সাময়িকী প্রকাশের কথাই জানি। একটির মাত্র দুটি সংখ্যা প্রকাশিত হয়েছিল আর একটি চলেছিল কিছুকালই মাত্র। ‘প্রবাসী’ই যুক্তরাষ্ট্রে বাংলা সাংবাদিকতার প্রকৃত আবহ চালু করে। বলা যায় সাহিত্য-সংস্কৃতিরও। তখন বাংলাদেশ কি পশ্চিমবঙ্গ থেকে বাংলা পত্রপত্রিকা পাওয়া যেমন সহজ ছিল না, তেমনি সহজ ছিল না সেসব পত্রপত্রিকা থেকে অনায়াসে গল্প-কবিতা ইত্যাদির পুনর্মুদ্রণ। ‘প্রবাসী’র সাহিত্য বিষয়ক উপকরণ প্রকাশ মূলত যুক্তরাষ্ট্রনির্ভর ছিল। বর্তমান লেখক নিজে ‘প্রবাসী’র সম্পাদকীয় উপদেষ্টা হিসেবে ঘনিষ্ঠভাবে এ কর্মের সঙ্গে ছিলেন বলেই এসব জানা। সাপ্তাহিকীটির জন্য প্রতিবেদন প্রস্তুতও অনেকাংশে নিজস্ব প্রতিবেদকবৃন্দেরই ছিল। দেশের খবর টেলিফোন-ফ্যাক্স-টেলিপ্রিন্টার ইত্যাদি নানা মাধ্যমে সংগ্রহ করতে হতো। ওই সময়ে এরশাদি আমলে, বাংলাদেশের মতোই প্রবাসেও বাংলাদেশে গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠার একটি আন্দোলন প্রবল হতে থাকে। বাংলাদেশের গণতন্ত্রমুখী রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে মিলিয়ে প্রবাসে বাংলাদেশমুখী নানা রাজনৈতিক সভা-সমিতি-সেমিনার ইত্যাদি অনুষ্ঠিত হতে থাকে। সাহিত্য-সংস্কৃতির অঙ্গনেও প্রায় তেমনি। বাংলা সাহিত্য রচনার প্রয়াসের সঙ্গে নানা সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানাদিও আয়োজিত হতে থাকে। ‘প্রবাসী’ প্রকাশের কালে এবং তার পরে এ রকম একটি আবহ বাংলা সংস্কৃতি ও বাঙালিত্ব তুলে ধরার ব্যাপারটি প্রশস্ত করে। বিশ্বজিৎ সাহা এই সময়েই নিউইয়র্কে আসেন এবং ‘প্রবাসী’তে সহকারী সম্পাদক হিসেবে কর্ম শুরু করেন। যেহেতু ঢাকার বাংলা একাডেমির বইমেলা শুরুর প্রাণপুরুষ চিত্তরঞ্জন সাহা ছিলেন বিশ্বজিতের আত্মীয়, নিউইয়র্কে বইমেলা অনুষ্ঠানের আয়োজন বিশ্বজিতের চিন্তায় ছিল বলে ধরে নেওয়া যায়। ‘মুক্তধারা’ চিত্তরঞ্জন সাহার প্রতিষ্ঠান। বলা যায়, নিউইয়র্কের ‘মুক্তধারা’ তারই উত্তরসূরি।

মূল কথা হচ্ছে এ রকম যে, আমার ধারণায় বিশ্বজিৎ সাহা ‘মুক্তধারা’ স্থাপনকালে যত না ব্যবসায়-চেতনায় নিষিক্ত ছিলেন তারও চেয়ে বেশি ছিলেন বাঙালি সাহিত্য-সংস্কৃতির প্রসার ও প্রচারের চেতনায়। গণতন্ত্রকামী বাঙালিত্ব প্রতিষ্ঠায় অবদান রাখাই তার অন্যতম উদ্দেশ্য ছিল বলে আমার বিশ্বাস। নিউইয়র্কে বসবাসরত কিছু বাঙালি তরুণ ‘বাঙালির চেতনামঞ্চ’ কি ‘প্রজন্ম একাত্তর’ নামে তার সঙ্গে এসে যোগ দিলে একুশের প্রথম প্রহর কি বইমেলা এবং শেষে ‘মুক্তধারা’ স্পষ্ট রূপ পায়।

কথাসাহিত্যিক, যুক্তরাষ্ট্র

সমকাল