ক্ষতিপূরণের টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে সরকারি কর্মচারীরা : পদ্মা সেতু

কথায় অাছে, ‘তুমি একটা ওমলেট বানাতে পারবে না, যতক্ষণ না ডিমটা ভাঙছো’। ঠিক তেমনই মাদারীপুরের হাজারো দরিদ্র পরিবার তাদের জীবনযাত্রা অাজীবনের জন্য পরিবর্তন হবে- এই অাশায় পদ্মা সেতুর জন্য তাদের জমি দিয়ে দিয়েছেন। এসব পরিবারের মধ্যে অনেকেই নদী ভাঙনে তাদের জমি হারিয়েছেন। তারপরও নিজেদের জীবন মানের উন্নয়ন হবে এ আশাতেই তাদের শেষ সম্বল জমিটুকুও সরকারকে দিয়েছেন। কিন্তু তাদের সে আশা ফিকে হয়ে আসছে এক শ্রেণির অসাধু সরকারি কর্মচারীদের জন্য।

যখন সরকার ভূমি অধিগ্রহণের সিদ্ধান্ত নেয় তখন জমির অাকারের ভিত্তিতে স্থানীয়দের অার্থিক ক্ষতিপূরণ দেওয়ারও প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল। এ অনুযায়ী, সরকারের নীতি-নির্ধারণী প্রক্রিয়ার মাধ্যমে বণ্টন এবং ক্ষতিপূরণের জন্য তহবিল দেওয়ার কথা ছিল। কিন্তু ক্ষতিপূরণ বিতরণের সময় কিছু নিম্নস্তরের সরকারি কর্মচারী অবৈধভাবে এসব দরিদ্র পরিবারগুলোর টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে বলে অভিযোগ ওঠেছে।

এরইমধ্যে সরকার পদ্মা সেতুর জন্য ৫০ শতাংশেরও বেশি ভূমি অধিগ্রহণ করেছে। যার মধ্যে অধিকাংশ জমিই মাদারীপুরের বেশ কয়েকটি উপজেলার স্থানীয় জনগণের। যা সেতু সংলগ্ন সড়ক ও নদী শাসনের জন্য বাঁধ নির্মাণ কাজে ব্যবহৃত হবে।

পদ্মা সেতুর জন্য ভূমি অধিগ্রহণ বাবদ ওই এল‌‌াকার ক্ষতিগ্রস্ত ৬ হাজার ১০২টি পরিবারের জন্য ক্ষতিপূরণ হিসেবে ৩০০ কোটি টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। কিন্তু তাদের অনেকেই অভিযোগ করেছেন, ক্ষতিপূরণ বাবদ এই অর্থ তোলার জন্য তাদের স্থানীয় সরকারের কিছু কর্মচারীকে মোট টাকার ১০ থেকে ১৫ শতাংশ পর্যন্ত ঘুষ দিতে হচ্ছে। যারা এই ঘুষ দিতে অস্বীকার করছেন তারা এখনও ক্ষতিপূরণের টাকা পায়নি। উপরন্তু হয়রানির শিকার হতে হচ্ছে।

কথা হয়, মাদারীপুরের শীবচর উপজেলার বাকহোরেরকান্দি এবং দক্ষিণ চরজানাজাত গ্রামের ৫০টি পরিবারের সঙ্গে। তারা প্রত্যেকের অভিযোগ, ঘুষ দিয়েই তাদের ক্ষতিপূরণের টাকা নিতে হয়েছে।

দক্ষিণ চরজানাজাত গ্রামের বাসিন্দা কাউসার সরকার বলেন, ‘অামার জমি অধিগ্রহণের জন্য সরকার ১৯ লাখ টাকা বরাদ্দ করে। যখন অামি জেলা প্রশাসকের (ডিসি) অফিসে যোগাযোগ করলাম তখন সেখানকার কর্মচারী মহিউদ্দিন মোট টাকার ১০ শতাংশ ঘুষ না দিলে ক্ষতিপূরণ দিতে অস্বীকৃতি জানায়। পরে সরকারি ফি’র কথা বলে অামার মোট টাকা থেকে ৭ লাখ টাকা রেখে দেওয়া হয়।’

একই উপজেলার মাদবরচর ইউনিয়নের বাসিন্দা সেলিম বেপারি জানান, তার ভূমি অধিগ্রহণের জন্য ক্ষতিপূরণ হিসেবে সরকার পৃথকভাবে দুটি বিল করেছিল। এরমধ্যে একটি জমিতে ছিলো তার বসতভিটা অার অন্যটি ছিলো খামার।

তিনি বলেন, ‘অামি অামার বসতভিটার ক্ষতিপূরণ বাবদ ৩ লাখ ৮০ হাজার টাকা পাওয়ার কথা। কিন্তু অামি সেই টাকা অানতে পনের থেকে বিশ বার ডিসি অফিসে গিয়েছি। সবশেষে অামি সেই ক্ষতিপূরণের টাকা পেয়েছি। কিন্তু তার জন্য মহিউদ্দিনকে নগদ ৬০ হাজার টাকা দিতে হয়েছে।’

তিনি অারও অভিযোগ করেন, ঘুষের বিনিময়ে তার খামারের জমি মহিউদ্দিন নিজের এক ধনী প্রতিবেশীকে দিয়ে দিয়েছেন। সেলিম নিজে যখন তার প্রতিবাদ করেছেন, তখন মহিউদ্দিন তাকে গ্রেফতারের ভয় দেখিয়েছেন। তারপর সেই ভয়েই সেলিম অার তার কাছে ক্ষতিপূরণ চাইতে যাননি।

সরকারি এই ক্ষতিপূরণ পাওয়ার জন্য অবশ্য বেশ কিছু দলিল জমা দেওয়ার প্রয়োজন পড়ে। এরমধ্যে স্থানীয় ভূমি অফিস থেকে হালনাগাদ করা জমি সংক্রান্ত কাগজপত্র, নাগরিক সনদ বা স্থানীয় ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান কর্তৃক সত্যায়িত উত্তরাধিকার সার্টিফিকেট ও জমির সহ-মালিকদের কাছ থেকে অনাপত্তিমূলক হলফনামা।

দক্ষিণ চরজানাজাতের বাসিন্দা বিউটি বলেন, ‘অামার বাবা মারা গেছেন ১৯ বছর অাগে। গত ১৫ বছর অাগে অামরা অামাদের বসতভিটা তৈরি করেছি। জমিটি সরকার অধিগ্রহণ করেছে। কিন্তু অামরা ঘুষ না দেওয়া তার ক্ষতিপূরণ এখনও পাইনি। ফলে এখন অামরা উপায়হীন হয়ে পড়েছি। অামরা যদি এই টাকাটা না পাই অার অামাদের যদি উচ্ছেদ করা হয় তাহলে অামরা কোথায় গিয়ে দাঁড়াবো?’
একই গ্রামের অারেক ক্ষতিগ্রস্ত রিপন মিয়া বলেন, ‘যারা ঘুষ দিতে পেরেছে তারা টাকা পেয়েছে। কিন্তু অামি দিনমজুর। সারা দিনে বড়জোর অায় করি ২০০ টাকা। তাহলে কীভাবে অামি ঘুষ দিয়ে ওই টাকাটা উদ্ধার করবো?’

এমনই অারেক ভূক্তভোগী মমতাজ বেগম। যার দেখা মেলে মাদারীপুরের ডিসি অফিসের সামনে। তিনি জানান, গত এক মাস ধরে তিনি ডিসি অফিসে অাসছেন যাচ্ছেন। তিনি বলেন, ‘সরকার এরইমধ্যে অামার ঘর-জমি সব নিয়ে নিয়েছে। যদি অামি ক্ষতিপূরণের টাকাটা না পাই, তাহলে কোথায় গিয়ে দাঁড়াব? যখনই অামি এখানে অাসি তখনি তারা অামাকে টাকা নিয়ে অাসতে বলে। তারা অামার কাছে প্রতি ১ লাখ টাকায় ১০ হাজার টাকা দিতে হবে জানিয়েছে।’ এভাবে ডিসি অফিসের কর্মকর্তারা কোটি কোটি অাটা অায় করছে বলেও অভিযোগ করেন তিনি।

কাওড়াকান্দি লঞ্চ টার্মিনালের বেইলি ব্রিজ সংলগ্ন এলাকায় বাস করেন দোলন মিয়া। তিনি জানান, ডিসি অফিসের সার্ভেয়ার মহিউদ্দিন তার কাছ থেকে ৮০ হাজার টাকা নিয়েছেন। কিন্তু তারপরও তিনি এখনও তার ক্ষতিপূরণের টাকা বুঝে পাননি।

অফিযোগ পাওয়া গেছে, যদি কেউ ঘুষ না দেয় তাহলে সার্ভেয়ার মহিউদ্দিন ও তার অর্ধস্তনরা নানা যুক্তি খাড়া করে। ক্ষতিপূরণ নিতে অাসা লোকজনকে বলেন, তাদের কাগজপত্র ঠিক নেই। সেগুলো ঠিক করে নিয়ে অাসতে বা এখনও তার ক্ষতিপূরণের কাগজপত্র প্রস্তুত হয়নি। কিন্তু যখনই ঘুষ মেলে তখন ক্ষতিপূরণের জন্য পুরো কাগজপত্র না থাকলেও চলে। ক্ষতিগ্রস্তরা অভিযোগ করেছেন, ডিসি অফিসের ভূমি বিভাগের কর্মচারীদের অধিকাংশই এই দুর্নীতির সঙ্গে জড়িত।

বিষয়টি নিয়ে সার্ভেয়ার মহিউদ্দিনের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি ওপেন চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিয়ে বলেন, ‘কে ঘুষ নিয়েছে তার কোনও প্রমাণ অাছে? কেনও তাহলে ক্ষতিগ্রস্তরা ডিসি বা ভূমি বিভাগের প্রধান কর্মকর্তার বরাবর অভিযোগ করছে না? এখানে ম্যাজিস্ট্রেট ও সহকারী জেলা প্রশাসক অাছেন। যদি অামি তাদের কাছ থেকে কোনও ঘুষ নিয়েও থাকি তাহলে তার দলিল বা প্রমাণ কি অাছে?’

এ বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে স্থানীয় ভূমি অফিসের নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক নিম্ন পদস্থ কর্মকর্তা বলেন, ‘এই মুহূর্তে যদি অামার চাকরি চলেও যায় তাতেও অামি চিন্তিত নই। অামি অামার বাকি জীবনের জন্য যথেস্ট পরিমাণ টাকা অায় করে নিয়েছি।’

এ ব্যাপারে মাদারীপুরের জেলা প্রশাসক জিএসএম জাফরুল্লাহকে জিজ্ঞেস করা হলে তিনি জানান, অভিযোগ ওঠার পর তার অধীনে থাকা ভূমি বিভাগের সার্ভেয়ার মহিউদ্দিনসহ বেশ কিছু কর্মকর্তাকে সম্প্রতি অন্যত্র ট্রান্সফার করা হয়েছে। কিন্তু সার্ভেয়ার মহিউদ্দিন যদি কিছু না করে থাকেন তাহলে ঠিক কী কারণে তাকে বদলি করা হলো সে বিষয়ে ডিসি জাফরুল্লাহ স্পষ্ট করে কিছু বলেননি।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ডিসি অফিসের অারেক কর্মচারী বলেন, ‘ভূমি বিভাগের অধিকাংশ সার্ভেয়ারেরই বিপুল পরিমাণ অবৈধ সম্পদ অাছে। সার্ভেয়ার মহিউদ্দিনের একার অধীনেই কমপক্ষে ২ হাজার ক্ষতিপূরণের দাবিদার অাছেন। এই বাবদ তিনি এখন পর্যন্ত কমপক্ষে ৭৫ লাখ টাকা অায় করেছেন। কিন্তু অামি যতদূর জানি তিনি এসব টাকা কোনও ব্যাংকে রাখেননি। তিনি এসব টাকা বিভিন্ন ভাগে ভাগ করে তার অাত্মীয়দের কাছে রেখেছেন।’

গত ১৩ নভেম্বর উপজেলার শুক্কুর হাওলাদার কান্দি গ্রামের বাসিন্দা রশিদ শিকদার ডিসি অফিসে এসব নিয়ে লিখিত অভিযোগ দায়ের করেন। তার অভিযোগ, সার্ভেয়ার মহিউদ্দিন ও কিছু কর্মকর্তা ক্ষতিপূরণের দাবিদারদের প্রতি জনের কাছ থেকে ১০-২০ শতাংশ টাকা রেখে দিচ্ছেন। ডিসি’র অ্যাকাউন্টে এই টাকা জমা থাকবে বলে দাবিদারদের জানিয়েছে তারা।

এরপর মহিউদ্দিন ও কিছু কর্মকর্তার নাম উল্লেখ করে একই ধরনের অভিযোগ রশিদ শিকদার দায়ের করেন পদ্মা সেতুর প্রকল্প পরিচালক এবং দুর্নীতি দমন কমিশন বরাবর। অভিযোগে তাদের বিরুদ্ধে ঘুষ গ্রহণ ছাড়াও অারও বলা হয়, কেউ এর প্রতিবাদ করলে অভিযুক্তরা স্থানীয় সংসদ সদস্যের নাম উল্লেখ করে তাদের হুমকি দেন।

বাংলা ট্রিবিউন

Comments are closed.