রাবেয়া খাতুন : স্বপ্নের সংগ্রামী

আহমাদ মাযহার: রাবেয়া খাতুনের যখন সাহিত্যযাত্রার শুরু, তখন পর্যন্ত আত্মবিকাশের আকাঙ্ক্ষায় উন্মুখ নারীদের দু-একজনকে মাত্র বাঙালি মুসলিম মধ্যবিত্ত সমাজে বিচরণ করতে দেখা যেতে শুরু করেছে। বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে লেখাপড়ার সুযোগ পেয়েছেন-এমন নারীর সংখ্যা উল্লেখ করার মতো পর্যায়ে পৌঁছায়নি। তাদের লেখাপড়ার দৌড় বড়জোর মাধ্যমিক স্কুলের দোরগোড়া অবধি। এটুকু সুযোগের পেছনেও আসলে উদ্দেশ্য ছিল তাদের আধুনিক পুরুষতান্ত্রিকতার সহায়ক হিসেবে উপযোগী করে তোলা। কারণ ওই সময়ে প্রধানত নারীদের জীবন ছিল ঘরের ভেতরের সংসার-সীমানায়ই সীমিত। সুতরাং দৃষ্টিভঙ্গিটা ছিল এমন-নারীর উচ্চশিক্ষায় ফায়দা এর চেয়ে বেশি আর কী! পুরুষের মতো মুক্তভাবে নিজের জীবন পরিচালনার সিদ্ধান্ত গ্রহণের অধিকার বলতে গেলে ছিলই না। হয় বাবার, না হয় স্বামীর কাছ থেকে অনুমতি পাওয়ার জন্য তাকে সব সময় অপেক্ষা করতে হয়েছে।

সমাজের সাধারণ আধুনিক শ্রেয়োবোধই ছিল এ রকম-নারীর বাইরে যাওয়ার দরকার হবে নিতান্তই সংসারের প্রয়োজনের খাতিরে। সে জন্যই তাদের শিক্ষার অধিকারও ছিল ততটুকুতেই সীমিত, যতটুকু ঘরের ভেতর থাকলেও তার না হলে চলবে না! বিবাহযোগ্যা হিসেবে এটুকু শিক্ষা তার মূল্য কিছুটা বাড়িয়েছিল বৈকি। কিন্তু পুরুষের সহযোগীর সীমানা অতিক্রম করে যাবে, এতটা শিক্ষিত হওয়া তার চলবে না। রাবেয়া খাতুনের সাহিত্যিক উন্মেষের কালে বাংলাদেশের উদার মধ্যবিত্ত সমাজ নারীর ক্ষমতায়ন এর চেয়ে বেশি গ্রহণ করতে পারেনি। তাঁর সমসাময়িককালের মুসলিম মধ্যবিত্ত সমাজ-প্রতিনিধিদের স্মৃতিকথাগুলো থেকে এমন মনোভঙ্গিরই পরিচয় পাওয়া যায়।

এমনই যখন অবস্থা, তখন একটা মেয়ের পক্ষে কতটুকুই বা স্বপ্ন দেখতে পারা সম্ভব? সুতরাং কিশোরী বয়সে রাবেয়া খাতুন যখন সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন যে পত্রিকায় লেখা পাঠাবেন, তখন সেটাকে দুঃসাহসই বলতে হবে। শুধু দুঃসাহসই নয়, এ এমন এক সাহস-যা তাঁকে উদ্বুদ্ধ করে তুলেছে জীবনব্যাপী সংগ্রামে অবতীর্ণ হতে। তাঁর সাহিত্যচর্চা তাই কেবল সৃষ্টিশীল মানুষের সৃষ্টি প্রক্রিয়া চালিয়ে যাওয়ার সংগ্রামই নয়, তার চেয়েও বেশি কিছু।

এ কথা ঠিক যে সৃষ্টিশীল মানুষমাত্রই অনাবিষ্কৃত অনালোকিত ও অপ্রচল পথে চলতে গিয়ে সংগ্রামে অবতীর্ণ হন। সে অর্থে সৃষ্টিশীল মানুষমাত্রই সংগ্রামী। তা সত্ত্বেও রাবেয়া খাতুনকে ‘স্বপ্নের সংগ্রামী’ বলা হচ্ছে এ কারণে যে তিনি নারী বলে তাঁকে জয় করতে হয়েছে সৃষ্টিশীল মানুষমাত্রের যে মাত্রায় সামাজিক প্রতিকূলতার মুখোমুখি হতে হয়, তার চেয়ে অনেক বেশি বাধা। তাই স্বপ্নের সংগ্রামী হিসেবেই তাঁকে বিবেচনা করে দেখা উচিত।

সাম্প্রতিককালে নারীদের অবস্থানের অনেক উন্নতি হয়েছে। ঘর ছেড়ে বেরিয়ে এসেছে তারা। তা সত্ত্বেও এ কথা বলা যাবে না যে মানুষ হিসেবে বেশির ভাগ ক্ষেত্রে নারীর অবস্থান একজন পুরুষের সমপর্যায়ের। এ অবস্থা থেকে উত্তরণের আকাঙ্ক্ষা থেকেই সৃষ্টি হয়েছে নারীবাদী দৃষ্টিভঙ্গি। কিন্তু মানবিক হয়ে ওঠার জন্য নারীকে কেবল আলাদাভাবে সংগ্রাম করতে হবে-রাবেয়া খাতুন এই সংকীর্ণ অর্থে নিজের জীবনের সামগ্রিক সংগ্রামকে দেখেন না। তাই তাঁর স্বপ্নসংগ্রামী সত্তা কেবল নারীবাদী অবস্থানের নয়। তিনি তাঁর সংগ্রামকে দেখেন সামগ্রিক মানবিক সংগ্রামের অংশ হিসেবে নারী অবস্থান থেকে। সে জন্য পঞ্চাশের দশকের প্রায় অবরুদ্ধ বাঙালি মুসলমান সমাজের নারী প্রতিনিধি হিসেবে রাবেয়া খাতুনের স্বপ্নের এ সংগ্রামকে আলাদাভাবে বিবেচনা করা দরকার। তা না হলে তাঁর সাহিত্যিক জীবনকে সম্পন্ন জীবনদৃষ্টিতে অনুধাবন করা যাবে না।

রাবেয়া খাতুন কিশোরী বয়সে পত্রিকায় লেখা পাঠিয়েছিলেন বলে পরিবারে তীব্র অসন্তোষের সৃষ্টি হয়েছিল। বয়োজ্যেষ্ঠরা মনে করেছিলেন, একটি মেয়ের হাতের লেখা সংসারের বাইরের পুরুষদের দেখা অসামাজিক কাজের তুল্য। এ ঘটনা থেকে অনুভব করা যাচ্ছে যে নারী হিসেবে কী রকম অবরুদ্ধ সমাজের বাসিন্দা ছিলেন তিনি। এ রকম একটা পরিপ্রেক্ষিতে যাঁর বিকাশ, তিনি স্বপ্ন দেখেছেন ঔপন্যাসিক হওয়ার, মুক্তি ঘটাতে চেয়েছেন লেখক সত্তার। কথাসাহিত্য সৃষ্টির মতো ব্যাপক জীবনাভিজ্ঞতানির্ভর কাজের প্রয়াসকে তাই একজন নারীর জীবনের বড় সংগ্রাম হিসেবেই দেখা উচিত! এতে প্রাথমিকভাবে জয়ী না হয়ে একজন নারীর পক্ষে মূল রণক্ষেত্রে অবতীর্ণ হওয়ারই সুযোগ ছিল না তখন!

নারী বলে তাঁকে যে পরিমাণে সংগ্রামশীল হতে হয়েছে সে কথা মনে রেখে রাবেয়া খাতুনের সৃষ্ট সাহিত্যকর্মকে বাড়তি অনুকম্পার চোখে দেখা হোক-এমন প্রত্যাশা তিনি কখনো করেননি! লক্ষণীয় যে বাংলা সাহিত্যচর্চায় নারী-পুরুষ নির্বিশেষে সাতচল্লিশোত্তর ঢাকাকেন্দ্রিক সাহিত্যধারাকে নিরলসভাবে যে কয়েকজন কথাসাহিত্যিক ক্রমাগত ও ধারাবাহিকভাবে পুষ্ট করে তুলেছেন-রাবেয়া খাতুন যে তাঁদের অন্যতম, তা ওয়াকিবহাল ব্যক্তিমাত্রই জানেন। জাতীয় ও আন্তর্জাতিক রাজনীতি-অর্থনীতির প্রভাবে আমাদের সমাজও বিবর্তমান। সেটাকে যে অন্তর্দৃষ্টি দিয়ে তিনি পর্যবেক্ষণ করেছেন এবং অনুধাবন করেছেন, তার নিদর্শন ছড়িয়ে আছে তাঁর বিচিত্র কথাসাহিত্যকর্মে তথা গল্প-উপন্যাসে ও ভ্রমণসাহিত্যে-এমনকি শিশুসাহিত্যের অভিযাত্রায়ও! সমসাময়িকদের মধ্যে নারী-পুরুষ নির্বিশেষে তাঁর মতো এতটা জীবনব্যাপী সক্রিয় ও নিমগ্ন লেখকও দু-একজনের বেশি পাওয়া যাবে না।

ষাট বছরেরও বেশি সময় ধরে নিরবচ্ছিন্নভাবে সক্রিয় থাকায় তাঁর প্রকাশিত বইয়ের সংখ্যাও উল্লেখ করার মতো। পঞ্চাশেরও বেশি উপন্যাসের রচয়িতা বলে ঔপন্যাসিক হিসেবেই হয়তো বেশি পরিচিতি পেয়েছেন। এ পর্যন্ত চার খণ্ডে প্রকাশিত ৪০০ ছোটগল্পের রচয়িতা হিসেবে দেখলে তাঁকে প্রধানত গল্পকার হিসেবেই চেনা যাবে। আবার যদি বলা হয় যে ভ্রমণসাহিত্যের লেখক হিসেবেও তিনি রয়েছেন অগ্রবর্তী, তাহলেও দ্বিমত করার অবকাশ থাকবে না। বাংলাদেশের সাহিত্যের অঙ্গনে সৃষ্টিশীল অনুপ্রেরণায় রচিত তাঁর ভ্রমণসাহিত্যের কথা সংখ্যাপ্রাচুর্য ও স্বাতন্ত্র্য উভয় কারণে আলাদাভাবে উল্লেখের দাবি রাখে। এদিকে তিনি সামনের সারিতেই থাকেন শিশুসাহিত্যের স্রষ্টা হিসেবেও। স্মৃতিকথামূলক রচনাও পরিমাণে কম নয়। সব মিলিয়ে রাবেয়া খাতুন তাঁর সৃষ্টিশীল বিচিত্র সংরূপের মাধ্যমে বাংলাদেশের মধ্যবিত্ত সমাজমানসের অন্তর্গত স্রোতকেই পাঠকদের অনুভবের সীমানায় এনে দেন। সর্বক্ষেত্রেই রয়েছে তাঁর নিজস্ব জীবনোপলব্ধি ও কল্পনাপ্রতিভার সমন্বয়। বাংলাদেশের কথাসাহিত্যের সামগ্রিক অগ্রযাত্রার বিবেচনায় রাবেয়া খাতুনের সাহিত্যিক অবদানকে এ কারণেই তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে হবে।

আমাদের সমালোচনা-সাহিত্য এখনো যথেষ্ট অগ্রসর নয় বলে তাঁর মতো একজন লেখকের যথেষ্ট বিচার ও মূল্যায়ন হয়নি। তাঁর সৃষ্টিকর্মের সামান্য গভীরে গেলেই অনুভব করা যাবে যে অপসৃয়মাণ গ্রামীণ জীবনবোধের সঙ্গে বহমান ও প্রতিসরমাণ নগরজীবনের জটিলতাকে কী চমৎকারিত্বের সঙ্গে তিনি নভেলার অনতিবিস্তৃত পরিসরে ও ছোটগল্পের মিতায়তনে পেরেছেন সম্পন্নভাবে ধারণ করতে। নিজে সংবেদী নারী বলে গ্রামীণ ও নাগরিক জীবনে নারী মনস্তত্ত্বের স্বাতন্ত্র্যকেও তিনি উপলব্ধি করতে পেরেছেন। এ দিকটিকেও আরো অভিনিবেশের সঙ্গে বিচার করে দেখা জরুরি। বাংলাদেশের যুগপৎ গ্রামীণ ও নাগরিক জীবনপ্রবাহকে সন্ধিস্থল থেকে কথাসাহিত্যিক রাবেয়া খাতুন যেভাবে পর্যবেক্ষণ করেছেন, তাকে একদিন গভীরতরভাবে অনুসন্ধান ও বিচার করে দেখা হবে-এ প্রত্যাশা নিশ্চয়ই অতিকল্পনা নয়।

রাবেয়া খাতুনের স্বপ্নের সংগ্রামী যাত্রাপথ দীর্ঘ। চলতে চলতে তিনি তাঁর স্বপ্নকে ক্রমে দুরূহ ও অনর্জনীয় করে তুলেছেন। তাই সস্তা জনপ্রিয়তা পাওয়ার চেষ্টায় ছুটে চলেননি। তা-ই করেছেন, যা করা তাঁর বিবেচনায় সংগত মনে হয়েছে। মিথ্যা স্তুতি কিংবা অন্যায় তিরস্কার তাঁকে ধ্যানমগ্নতা থেকে সরাতে পারেনি। যেন অপ্রাপনীয় সত্যের কঠিনতাকে অর্জন ও দুর্গমতাকে জয় করার রোমাঞ্চ না হলে তাঁর চলে না। এর পশ্চাতেও ক্রিয়াশীল তাঁর সংগ্রামী সত্তার শক্তি। রাবেয়া খাতুনের কর্মিষ্ঠ জীবনের এ রকম শক্তিকে অনুভব করার মধ্য দিয়েই তাঁকে যথার্থ শ্রদ্ধা জানানো যায়! একজন স্বপ্নের সংগ্রামীকে এই রকম অনুভব দিয়ে যদি আমরা শ্রদ্ধা জানাতে পারি, তাহলে হয়তো এ সংগ্রামের চেতাবনি চলমান থাকবে উত্তরাধিকার পরম্পরায়!

কালের কন্ঠ