নতুন বাড়ি পদ্মাসেতুতে, ভিটে ছ‍াড়ার কষ্ট কাটছে

মুরগিটি ডিম পেড়েছে ১০টি। ছোট্ট সানকিতে বসে তা দিচ্ছে এখন। সেটি আবার খাঁচায় ঘেরা। অনেক মানুষ, চিৎকার, হৈচৈ দেখে জায়গা ছেড়েছে। যে বাড়িটায় ডিম পেড়েছে, সে বাড়িটায় গৃহস্থরা আর এখানে থাকছেন না, তারা উঠছেন নতুন বাড়িতে। পুরনো বাড়িতে খোসাবদ্ধ হয়ে আসা নতুন বাড়িতেই পৃথিবীর আলো দেখবে বাচ্চাগুলো।

নতুন বাড়িতে নতুন সূর্যোদয়-সূর্যাস্ত দেখার অপেক্ষায় পুরনো বাড়ি ছাড়ছেন পদ্মাপাড়ের জাজিরা অঞ্চলের লোকজন। কারওবা বাপ-দাদার স্মৃতির ভিটা, কারওবা যুগ কয়েক আগে নিজে গায়ে-গতরে খেঁটে গড়ে তোলা ভিটে ছাড়ার শোক থাকছে, তবে এসব শোক উবে যাচ্ছে নতুন বাড়িতে ওঠার উচ্ছ্বাসে। এসব দুঃখ ঘুচে যাচ্ছে দেশের দু’টি ভাগকে এক করতে যাওয়া পদ্মাসেতু নির্মিত হওয়ার প্রত্যাশার আলোয়।

পদ্মাপাড়ের শরীয়তপুরের জাজিরা অঞ্চল সরেজমিনে পরিদর্শনে গিয়ে এমনই পুরনো বাড়ি ভেঙে নতুন বাড়িতে ওঠার শোকানন্দের মুখাবয়ব দেখা গেল।

মাওয়া ঘাট থেকে ট্রলারে মিনিট চল্লিশেকের দূরত্বে জাজিরার নাওডোবা গ্রাম। ফুলে-ফসলে-পশু-পাখিতে ঐশ্বর্যময়। আশপাশের অধিকাংশই এখন বিরান ভিটে। অযত্নে পড়ে থাকা কাঁচামরিচ, বেগুনের গাছ, গাঁয়ের সরল বধূর মতো কচি লাউডগা শুধু জানান দিচ্ছে কেউ ছিলো এখানে। শালিক-ফিঙে-ঘুঘু বেশ সানন্দে ঘুরছে-ফিরছে। মানুষগুলোর মধ্যে অনেকটা অস্থিরতা, ভিটে ছাড়ার শোকের সঙ্গে মিশে গেছে নতুন শহুরে বাড়িতে স্বপ্ন গড়ার আনন্দ।


নদীর তীরঘেঁষা এ গাঁয়ের একটি বাড়ির খুঁটি তোলার কাজ করছিলেন ষাটোর্ধ্ব জামাল মোল্লা।

আগ বাড়িয়েই তিনি কথা বলা শুরু করলেন, ‘সরকারি লোক নাকি টিভির (সাংবাদিক) লোক?’ সাংবাদিক পরিচয় পাওয়ার পর বলতে শুরু করলেন, এই গ্রামের আরও ৩০০-৪০০ বাড়ি ভেঙে পুনর্বাসন এলাকায় নতুন বাড়ি বানানো হচ্ছে।

বলছিলেন, ২০০৪ সালে তিনি পদ্মাপাড় ঘেঁষে এই বাড়ি গড়েছিলেন। কিন্তু তার বাড়ি পদ্মাসেতু প্রকল্পের আওতায় পড়ে যাওয়ায় ছাড়তে হচ্ছে বাড়িটি।

৯২ শতক জমি প্রকল্প কর্তৃপক্ষকে ছেড়ে দেওয়ার বিনিময়ে অর্থ পেয়েছেন, এখন পরিবার-পরিজন নিয়ে দিয়ারা নাওডোবায় নতুন শহুরে ধাঁচের বাড়িতে উঠছেন। অনুভূতি কেমন?

স্বাধীনতার পর কেনা এ ভিটের স্মৃতির পাতা খুলে অনেক কথাই বলেন। খানিক অভিযোগেরও সুর তোলেন। তবে পুরনো বাড়ি ছাড়ার কষ্টটাই প্রকাশ পেয়ে যায় বেশি, সেটা আড়াল করতে প্রকাশ করেন নতুন বাড়িতে ওঠার উচ্ছ্বাস।

বলেন, এইখানে খাবারের সব দানাপানি নিজেই উৎপাদন করতাম, এখন অনেক কিছুই কিনতে হবে। তবে, সেখানে (নতুন পুনর্বাসন এলাকা) অনেক সুযোগ-সুবিধা আছে। স্কুল-মসজিদ আছে, পানি-বিদ্যুতের ব্যবস্থা আছে। দিন তো চলবেই।

জামাল মোল্লা যখন কথা বলছিলেন, কিছুটা দূরে দাঁড়িয়ে তা শুনছিলেন একই বাড়ির তৈয়ব আলী মোল্লা (৬৫)। জামাল মোল্লার কথার শেষ বুঝতে পেরেই কথার সুতো ধরেন তিনি, এই বাড়ির মতো এই গ্রামও আমার দীর্ঘদিনের পিরিতের মতো। নদীর পাড়ে ভূঁই খাত, বোরো ধান চাষ করতাম। এখন নতুন জায়গায় এইসব পামু কই? তবে এখানে যেটা পাইতাম না-এই বিদ্যুৎ, পানি, স্কুল, মসজিদ- সেসব সেখানে পামু। এইটা ভালো কথা।

তবে, খানিক অভিযোগ খানিক উচ্ছ্বাসের অন্তে দু’জনই স্বপ্নের পদ্মাসেতুর জন্য ত্যাগের কথা বলেন, অনেক দিনের স্মৃতির ভিটা ছাড়তাছি কেবল দু’পারের মানুষকে এক করার আনন্দের কথা ভেবে।

জামাল মোল্লা ও তৈয়ব আলী মোল্লার বাড়ি ভেঙে নতুন বাড়িতে ওঠানোর কাজ করছিলেন ৫-৬ জন শ্রমিক। দুপুর বেলায় তাদের আউশ ধানের মোটা চালের রঙিন ভাতের সঙ্গে খেতে দেওয়া হয়েছে ভিটেয় পালিত দেশি মুরগির মাংসের তরকারি। খাওয়ার মাঝেই তাদের দু’একজন বাড়ি স্থানান্তরের গল্প বলছিলেন।

কথায় কথায় দুপুরের খাবারের নিমন্ত্রণও পাওয়া গেল। তবে সময় স্বল্পতার কথা ভেবে পা বাড়াতে হলো আরেক বাড়িতে।

এই বাড়িরও স্থানান্তরের প্রথম দফার কাজ শেষ। অর্থাৎ ভাঙার কাজ শেষ, এখন পুনর্বাসন কেন্দ্রে গড়ার কাজ হবে। বাড়ির কর্তাব্যক্তিরা নতুন বাড়িতে কাজ করছেন জানিয়ে কর্ত্রীরা বললেন, পুরনো বাড়ি ছাড়ার বিনিময়ে তাদের যা প্রাপ্য ছিল প্রশাসন তার প্রায় সবই দিয়েছে। এখন নতুন বাড়িতে জীবন-যাপনটা এ রকম স্বাভাবিক হলেই হলো।

এই বাড়ি ছেড়ে সামনের দিকে মিনিট দুয়েক হাঁটার পর আরেকটি ভাঙা বাড়ি সামনে পড়লো। বাড়িটি থেকে আসবাবপত্র ট্রাক্টরে চড়িয়ে সরানো হচ্ছিল।

আগ বাড়িয়ে এলেন কর্মব্যস্ত সিরাজুল ইসলাম (৩০)। যে বাড়ির আসবাবপত্র সরানো হচ্ছে সে বাড়ির কর্তা আবদুর রাজ্জাকের ভাগিনা তিনি।

পুরনো বাড়ি ভাঙার শোক প্রকাশ করলেন বেশি সিরাজুলই। ওই এলাকায় দেখামেলা স্বল্পশিক্ষিত এই তরুণ বললেন, আমার জন্ম-বেড়ে ওঠা যেখানে সে জায়গা ত্যাগ করা কষ্টের। তাছাড়া, নতুন জায়গায় মানিয়ে নেওয়া যাবে কিনা সে দুঃশ্চিন্তাও রয়েছে। এখানে যেসব খাদ্যশস্য নিজেরাই উৎপাদন করা যেত, এখন ফসলি জমি হারানোর কারণে হয়তো সেসব খাদ্যশস্য কিনেই খেতে হবে। তবে, এখন যে আর পদ্মার বুকে ফসলি জমি হারানোর আশঙ্কায় ভুগতে হবে না সেটাতেও সান্ত্বনা খুঁজলেন তিনি।

কেবল দক্ষিণাঞ্চলের কোটি মানুষের জন্যই এই বিরাট ত্যাগে বিশেষ শোক লাগছে না বলে মন্তব্য করেন এ তরুণ।

আর দেশের দু’অঞ্চলের মানুষকে এক করতে নির্মাণাধীন স্বপ্নের পদ্মাসেতুর কাজ যেন দ্রুতই শেষ হয় সেজন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের দৃষ্টি আকর্ষণ করেন সিরাজুল।

সিরাজুলের কাছ থেকে মাটি পরীক্ষা কেন্দ্রের স্থান জেনে নিয়ে সামনে মিনিট দশেক হাঁটতেই আরেকটি ভাঙা বাড়ি চোখে পড়লো। এই বাড়িতে পৌঁছানোর আগে কয়েকটি বিরান ভিটে দেখে যে কারও হৃদয়ই খাঁ খাঁ করে উঠবে।

তবে, যারা এই বাড়ি ছেড়েছেন বা ছাড়ছেন তারা যে পরিস্থিতির সঙ্গে মানিয়ে নিচ্ছেন বেশ- তা বুঝিয়ে দিলেন সত্তরোর্ধ্ব নূরজাহান বেগম।

অস্পষ্ট ভাষায় বোঝালেন, তাদের যে জায়গা পদ্মাসেতু প্রকল্পে পড়েছে তার সমপরিমাণ ক্ষতিপূরণ দেওয়ার চেষ্টা করেছে সরকার। পুরনো বাড়িতে অনেক সুযোগ সুবিধা না থাকলেও নতুন বাড়িতে এখন বিদ্যুৎ-পানি-স্কুল-মসজিদের ব্যবস্থা করে দেওয়া হয়েছে। উঁচু পুনর্বাসন এলাকা হওয়ায় ভারি বৃষ্টিপাতে বাড়ি বন্যায় তলিয়ে যাওয়ার আশঙ্কা নেই, বন্যা মৌসুমে পদ্মায় বিলীন হওয়ার ভয় নেই।

শহুরে ধাঁচের বাড়িতে অনেক নাগরিক সুবিধাপ্রাপ্তিতে সন্তান ও উত্তরসূরিদের ভবিষ্যৎ নিয়ে স্বপ্ন দেখার কথা শোনালেন বৃদ্ধা নূরজাহান।

পদ্মাসেতু হয়ে গেলে এই স্বপ্ন দেখার পরিধিও বিস্তৃতি লাভ করবে বোঝাতে চাইলেন তিনি।

পুরো এলাকা ঘুরে মনে হবে- একটি অধ্যায়, একটি প্রজন্ম শেষ হয়ে উঁকি দিচ্ছে নতুন ভবিষ্যৎ। সে ভবিষ্যত আলোকোজ্জ্বল। সেতু একটি বন্ধন। এই বন্ধন ভিটেছাড়া মানুষগুলোকে দিচ্ছে নতুন পথের সন্ধান। পদ্মাসেতু তাদের কাছে ব্যক্তিস্বার্থপরতায় আবদ্ধ নয়, কোটি মানুষের স্বপ্নপূরণে উদারনৈতিকতা।

বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর

Comments are closed.