জাহাজ জরিপকারক মির্জা সাইফুরের বরখাস্ত আদেশ প্রত্যাহার স্থগিত

পিনাক-৬ লঞ্চ ডুবি
পিনাক-৬ লঞ্চ ডুবির ঘটনায় দায়ীদের একজন সমুদ্র পরিবহন অধিদপ্তরের জাহাজ জরিপকারক মির্জা সাইফুর রহমানের বরখাস্ত আদেশ প্রত্যাহার তিন মাসের জন্য স্থগিত করেছে হাইকোর্ট। একই সঙ্গে বরখাস্ত আদেশ প্রত্যাহার কেন বাতিল, অবৈধ ও আইন বহির্ভূত ঘোষণা করা হবে না, তার কারণ জানতে চেয়েও রুল জারি করেছেন আদালত।

একটি রিট আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে বিচারপতি সালমা মাসুদ চৌধুরী ও বিচারপতি মো. খসরুজ্জামান সমন্বয়ে গঠিত বেঞ্চ সম্প্রতি এ আদেশ দেন। জনস্বার্থে রিটটি দায়ের করেন কাজী মমিতুন নাহার।

নৌ-পরিবহন মন্ত্রণালয়ের সচিব ও সমুদ্র পরিবহন অধিদপ্তরের মহাপরিচালকসহ বিবাদী ৭ জনকে চার সপ্তাহের মধ্যে রুলের জবাব দিতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

প্রসঙ্গত, গত ৪ আগস্ট মুন্সিগঞ্জের মাওয়া ঘাটের কাছে পদ্মায় পিনাক-৬ নামের যাত্রীবাহী লঞ্চ ডুবে শতাধিক যাত্রীর সলিল সমাধি ঘটে। নৌ-যানটিতে অনেক ত্রুটি থাকা সত্ত্বেও মির্জা সাইফুর মোটা অংকের টাকার বিনিময়ে অবৈধভাবে এটিকে দফায় দফায় যাত্রী পরিবহনের অনুমতি দিয়েছেন। এর আগে গত মে মাসে মুন্সিগঞ্জে এম ভি মিরাজ-৪ নামে একটি লঞ্চ ডুবে ৫৬ জনের প্রাণহানি ঘটে। যান্ত্রিক ত্রুটিপূর্ণ ওই নৌ-যানটিরও সার্ভের দায়িত্বে ছিলেন মির্জা সাইফুর।

পিনাক ডুবির ঘটনায় মন্ত্রণালয় গঠিত তদন্ত কমিটি সমুদ্র পরিবহন অধিদপ্তরের জাহাজ জরিপকারক মির্জা সাইফুর রহমানের অনিয়ম ও দুর্নীতিকে বিশেষভাবে দায়ী করে। এ পরিপ্রেক্ষিতে গত ২১ সেপ্টেম্বর তাকে সাময়িক বরখাস্ত করে তার বিরুদ্ধে বিভাগীয় মামলা চালু করা হয়। সুনির্দিষ্ট পাঁচটি অভিযোগ উল্লেখপূর্বক গত ২ অক্টোবর অভিযোগনামা মির্জা সাইফুরের কাছে পাঠানো হয়। সমুদ্র পরিবহন অধিদপ্তরের মহা-পরিচালক কমোডোর এম জাকিউর রহমান ভুঁইয়া স্বাক্ষরিত ওই অভিযোগনামার বিষয়ে ১০ দিনের মধ্যে জবাব দিতে মির্জা সাইফুরকে নির্দেশ দেওয়া হয়। মির্জা সাইফুর এর জবাব দিয়েছেন ২২ অক্টোবর।

সমুদ্র পরিবহন অধিদপ্তরের মহাপরিচালক ২৬ অক্টোবর অভিযোগনামাসহ জবাব নৌ-পরিবহন মন্ত্রণালয়ের সচিবের কাছে প্রেরণ করেন। অথচ এরপর মাত্র কয়েকদিনের ব্যবধানেই সব কিছু উল্টে যায়। বিভাগীয় মামলা এবং দুর্নীতি দমন কমিশনের তদন্ত চলমান থাকার পরও ২৫ নভেম্বর মন্ত্রণালয় থেকে জাহাজ জরিপকারক মির্জা সাইফুরের বরখাস্ত আদেশ প্রত্যাহার ও তাকে ঢাকা নদী বন্দরে পদায়নের চিঠি পাঠানো হয়। এদিনই তা কার্যকর হয় এবং মির্জা সাইফুর কর্মস্থলে যোগ দেন।

জানা গেছে, উচ্চপর্যায়ে তদবিরের মুখেই সমুদ্র পরিবহন অধিদপ্তরের মহাপরিচালক কমডোর এম জাকিউর রহমান ভুঁইয়া গত ১৩ নভেম্বর মির্জা সাইফুরের বরখাস্ত আদেশ প্রত্যাহারের অনুরোধ জানিয়ে নৌ-পরিবহন মন্ত্রণালয় সচিবের কাছে পত্র পাঠান। পত্রে পিনাক-৬ লঞ্চ ডুবির ঘটনায় বিভাগীয় মামলা, নৌ-আদালতের বিচারিক কার্যক্রম এবং মির্জা সাইফুর রহমান কর্তৃক সার্ভে ও রেজিস্ট্রেশনকৃত ৫৬টি নৌযানের নথি অনুসন্ধানের জন্য দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) তলবের বিষয়টি উল্লেখ করা হয়েছে। এছাড়া তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়ার জন্য নৌ, সড়ক ও রেলপথ রক্ষা জাতীয় কমিটির আহ্বায়কের জাস্টিস ডিমান্ড নোটিশ প্রেরণের বিষয়টিও তুলে ধরা হয়।

পত্রে মহাপরিচালক আরো উল্লেখ করেন, বিভাগীয় মামলা, দুদকের তদন্ত এবং নৌ-আদালতের বিচারিক কার্যক্রম চলমান থাকাকালীন মির্জা সাইফুরের সাময়িক বরখাস্তের আদেশ প্রত্যাহার এবং তাকে বরিশাল বা খুলনা সার্ভে অফিসে পদায়নের বিষয়ে অনুরোধ করা হলো। অথচ মন্ত্রণালয় মহাপরিচালকের সেই অনুরোধ উপেক্ষা করেই মির্জা সাইফুরকে ঢাকা নদী বন্দরে পদায়নের সিদ্ধান্ত দেন।

সংশ্লিষ্ট সূত্র মতে, নৌ-পরিবহন মন্ত্রণালয়ের আওতাধীন সমুদ্র পরিবহন অধিদপ্তরে মির্জা সাইফুর দুর্নীতির বরপুত্র হিসেবে পরিচিত। নৌ-যান সার্ভে, নকশা ছাড়া রেজিস্ট্রেশন প্রদান, প্রকৌশলী এবং নাবিকদের পরীক্ষা গ্রহণে জালিয়াতির অসংখ্য অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে। অনুমোদিত কোনো নকশা ও স্ট্যাবিলিটি বুকলেট না থাকা সত্ত্বেও উৎকোচের বিনিময়ে জাল ডক সনদ আর ভুয়া কাগজের মাধ্যমে মির্জা সাইফুর রহমান অনেক পুরোনো নৌ-যানকে নিয়ম বহির্ভূতভাবে রেজিস্ট্রেশন নম্বর প্রদান করেছেন। এছাড়া ধারণ ক্ষমতা (গ্রসটন) কম দেখিয়ে নৌ-যান মালিকদের কাছ থেকে নিজে উৎকোচ পেলেও সরকার হারিয়েছে মোটা অংকের রাজস্ব। অন্যদিকে তার দুর্নীতির খেসারতে একের পর এক নৌ-যান ডুবির ঘটনা ঘটলেও তিনি ছিলেন ধরা-ছোঁয়ার বাইরে।

এদিকে নৌযান নিবন্ধনে শত শত কোটি টাকা রাজস্ব ফাঁকিসহ বিভিন্ন অভিযোগের ভিত্তিতে দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) অনুসন্ধানও থমকে আছে। চাহিদামাফিক নথি না পাওয়ায় তদন্ত আটকে আছে বলে দুদক সূত্র জানিয়েছে। দুদকের সহকারী পরিচালক শেখ আবদুস সালাম গত ২১ অক্টোবর ৫৫টি নৌযানের নথি এবং প্রকৌশলী ও জাহাজ জরিপকারক মির্জা সাইফুর কর্তৃক নৌযান রেজিস্ট্রেশন প্রদান সংক্রান্ত যাবতীয় রেকর্ড ও নথি, মির্জা সাইফুরের পরীক্ষক হওয়ার সার্টিফিকেটসহ সংশ্লিষ্ট কাগজপত্র তলব করেন। কাগজপত্র পাবার পর এখন দুদক সেগুলো পর্যালোচনা করে দেখছে। তবে সরবরাহকৃত কাগজের মধ্যে ট্রেজারি চালানসহ বেশ কিছু জাল ডকুমেন্টও রয়েছে বলে দুদক সূত্র জানিয়েছে।

জানা গেছে, মির্জা সাইফুর রহমান ২০১৩ সালের ১৩ মার্চ সমুদ্র পরিবহন অধিদপ্তরে প্রকৌশলী ও জাহাজ জরিপকারক পদে যোগদান করেন। অনিয়ম করেই তিনি প্রথমে চুক্তি-ভিত্তিক নিয়োগ পান। পরবর্তীতে ঢাকা নদী বন্দরের সার্ভেয়ার হিসেবে প্রতিটি নৌ-যানে ব্যাপক অনিয়ম করে সার্ভে ও রেজিস্ট্রেশন কার্য সম্পন্ন করেছেন। নথিপত্র অনুযায়ী দেড় বছরের কম সময় দায়িত্ব পালনকালে তিনি ৩ হাজারের বেশি নৌ-যান সার্ভে করেছেন। সে হিসেবে প্রতি কর্মদিবসে তিনি গড়ে ১০টি নৌযান সার্ভে করেন। ওই নৌযানগুলির তখন অবস্থান ছিল আরিচা, মাওয়া, সদরঘাট, নারায়ণগঞ্জ, গাবতলী, মেঘনা ঘাট ও ভৈরবে। তবে মির্জা সাইফুর সরেজমিনেই সার্ভে করেছেন বলে নথিতে উল্লেখ রয়েছে। সরেজমিনে জাহাজগুলি পরিদর্শন না করে প্রতিটি নৌ-যান থেকে ৫ থেকে ১০ হাজার টাকা এবং রেজিস্ট্রেশনে ৫০ হাজার থেকে ১ লাখ টাকা ঘুষ নেওয়ার অভিযোগও রয়েছে উক্ত কর্মকতার বিরুদ্ধে।

ঢাকাটাইমস