ওয়াসার কমপক্ষে পাঁচশ কোটি টাকা ক্ষতির আশংকা

প্রকল্প অনুমোদনের ১৩ মাস আগে ঢাকা ওয়াসা ঠিকাদারের সঙ্গে চুক্তি করেছে। প্রকল্পের জন্য জমি অধিগ্রহণ এবং পরামর্শক নিয়োগের আগেই তড়িঘড়ি করে নিুমানের পাইপ আমদানি হয়েছে। কাজের জন্য দরপত্র দেয়া হয়নি, ভেটিং হয়নি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে। ঢাকা ওয়াসার পদ্মা জশলদিয়া পানি শোধনাগার শীর্ষক প্রকল্পে এসব ঘটেছে। এতে সরকারের কমপক্ষে পাঁচশ’ কোটি টাকার ক্ষতির আশংকা রয়েছে।

ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে দরকষাকষি (ভেটিং) না করায় কমপক্ষে ৩৫০ কোটি টাকার ক্ষতি হবে। এছাড়া জমি অধিগ্রহণের আগেই বিদেশ থেকে নিুমানের নির্মাণ সামগ্রী (পাইপ) আমদানির জন্য ব্যয় হয়ে যাওয়া টাকার ওপর অতিরিক্ত সুদ গুনতে হবে প্রায় দেড়শ’ কোটি টাকা। সব মিলে সরকারের বড় অংকের টাকার ক্ষতির পাশাপাশি কাজের মান নিয়েও প্রশ্ন উঠবে।

ঢাকা ওয়াসার ব্যবস্থাপনা পরিচালক প্রকৌশলী তাকসিম এ খান এ প্রসঙ্গে যুগান্তরকে বলেন, ‘টোটালি রাবিশ কথা। সব নিয়ম মেনে প্রকল্পের কাজ এগিয়ে নিচ্ছি আমরা।’ তিনি বলেন, ‘একটি দুর্নীতিবাজ চক্র ঢাকা ওয়াসা এবং ব্যক্তিগতভাবে আমাকে হেয়প্রতিপন্ন করার লক্ষ্যে এসব অপপ্রচার চালাচ্ছে। আমি ঢাকা ওয়াসার দায়িত্ব নেয়ার পর থেকে ঢাকা ওয়াসার দুর্নীতি কমেছে; দুর্নীতি বেড়েছে এটা কেউ বলতে পারবে না।’ঢাকা ওয়াসার পদ্মা (জশলদিয়া) প্রথম থেকে প্রকল্প পরিচালকের দায়িত্বে ছিলেন প্রকৌশলী এমএ রশিদ সিদ্দিকী। অনিয়মের প্রতিবাদ করায় তাকে প্রকল্প থেকে সরিয়ে দেয়া হয়েছে।

এসব ব্যাপারে জানতে চাইলে প্রকৌশলী এমএ রশিদ সিদ্দিকী যুগান্তরকে বলেন, ভয়াবহ অনিয়ম হয়েছে পদ্মা জশলদিয়া প্রকল্পে। এই প্রকল্পের কার্যক্রম এখনি বন্ধ করে নতুনভাবে শুরু না করলে দেশের বড় ক্ষতি হয়ে যাবে। নিয়ম লংঘন করে নিুমানের পাইপ আমদানি করা হয়েছে। এখানে সরকার বড় ধরনের আর্থিক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।ঢাকা ওয়াসার পদ্মা (জশলদিয়া) পানি শোধনাগার প্রকল্পের (ফেজ-১) ব্যয় নির্ধারণ করা হয় ৩ হাজার ৫০৮ কোটি ৭৯ লাখ ১৫ হাজার টাকা। এর মধ্যে ২ হাজার ৪২ কোটি ৩৬ লাখ টাকা ঋণ হিসেবে দেবে চায়না এক্সিম ব্যাংক। বাকি অর্থ দেবে বাংলাদেশ সরকার ও ঢাকা ওয়াসা। ঋণের জন্য চায়নার এক্সিম ব্যাংককে ২ দশমিক ৫ শতাংশ হারে সুদ দিতে হবে। সরকার ২০১৩ সালের ৮ অক্টোবর একনেকের বৈঠকে এ সংক্রান্ত প্রকল্প অনুমোদন দেয়। পদ্মার জশলদিয়া পয়েন্টে এই শোধনাগারটি স্থাপন করা হবে।

এখান থেকে পরিশোধিত পানি কেরানীগঞ্জ পর্যন্ত পৌঁছে দেয়ার জন্য বসানো হবে পাইপ। বুড়িগঙ্গা নদীর তলদেশ দিয়ে এই পাইপ নেয়া হবে। এজন্য জশলদিয়া পয়েন্ট এবং কেরানীগঞ্জ পর্যন্ত পাইপ বসানোর জন্য জমির প্রয়োজন হবে। এই জমি অধিগ্রহণের কাজ শুরু করেছে সরকারের সংশ্লিষ্ট কর্র্তৃপক্ষ।সূত্র জানায়, ঋণের শর্তানুযায়ী চাইনিজ প্রতিষ্ঠানকে কাজ দেয়ার বাধ্যবাধকতা আছে। একই সঙ্গে প্রকল্পে ব্যবহৃত পাইপ চায়না থেকে আমদানির শর্তও জুড়ে দেয়া হয়। এ ধরনের প্রকল্পের ক্ষেত্রে নিয়মানুযায়ী আন্তর্জাতিক দরপত্র আহবান করা হয়। বিভিন্ন ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান দরপত্রে অংশগ্রহণ করে। সেখান থেকে যোগ্য ও পছন্দের প্রতিষ্ঠানকে কাজ দেয়া হয়। কিন্তু এক্ষেত্রে কোনো দরপত্রই আহ্বনা করা হয়নি।

অথচ এই প্রকল্পের জন্য চীনের ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান মেসার্স চায়না সিএএমসি ইঞ্জিনিয়ারিং কোম্পানি লিমিটেডের সঙ্গে ঢাকা ওয়াসা চুক্তি করে ২০১২ সালের ২৫ সেপ্টেম্বর। সরকার প্রকল্প অনুমোদন করার ১৩ মাস আগেই ঠিকাদারের সঙ্গে চুক্তি সম্পন্ন করে ঢাকা ওয়াসা। প্রসঙ্গত প্রকল্প অনুমোদন হয় ২০১৩ সালের আট অক্টোবর। ঢাকা ওয়াসার কাজের রীতি অনুযায়ী ঠিকাদারদের সঙ্গে কাজ নিয়ে দরকষাকষি হয়। এতে প্রতি টেন্ডারে কমপক্ষে ১০ শতাংশ হারে দাম কমে থাকে। সে অনুযায়ী এই সাড়ে তিন হাজার কোটি টাকার কাজে কমপক্ষে সাড়ে তিনশ’ কোটি টাকা সরকারের সাশ্রয় হতো। এই ভেটিংয়ের নিয়ম মেনেই ঢাকা ওয়াসার ঠিকাদাররা ব্যবসা করছেন।

একাধিক ঠিকাদারের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, তারা ভেটিংয়ের মতো ঢাকা ওয়াসার প্রচলিত নিয়ম মেনে ব্যবসা করে লাভবান হচ্ছেন। কিন্তু এক্ষেত্রে কোনো ধরনের দরকষাকষি (ভেটিং) ছাড়াই কাজ দেয়ায় ৩৫০ কোটি টাকার বেশি ক্ষতি হবে বলে সংশ্লিষ্টরা আশংকা করছেন।একইভাবে পাইপ কেনার ক্ষেত্রেও সরকারকে কোটি কোটি টাকা গচ্চা দিতে হবে। সূত্র জানায়, ঋণের শর্তানুযায়ী প্রকল্পের মাঝামাঝি সময়ে চায়না থেকে পাইপ কেনার কথা। কিন্তু ঢাকা ওয়াসা ঋণের শর্ত উপেক্ষা করে জমি অধিগ্রহণের চার মাস আগেই চীন থেকে পাইপ নিয়ে এসেছে।

এরই মধ্যে পাইপগুলো চট্টগ্রাম বন্দরে চলে এসেছে। কাজ শুরু করার আগেই চীনা ব্যাংকের টাকায় পাইপ কেনায় সুদ শুরু হয়ে গেছে। অথচ ঢাকা ওয়াসার অধিগ্রহণকৃত জমি বুঝে নিয়ে কনসালটেন্ট নিয়োগ শেষে কাজ শুরু করতে কমপক্ষে এক বছর সময় দরকার। প্রকল্পের প্রাথমিক কাজ শুরুর পর পাইপ আনার সুযোগ ছিল। কিন্তু আগেভাগে পাইপ আমদানির জন্য চায়না এক্সিম ব্যাংককে অতিরিক্ত দেড়শ’ কোটি টাকা সুদ দিতে হবে।

এ প্রসঙ্গে মুন্সীগঞ্জ জেলা প্রশাসক মো. সাইফুল হাসান যুগান্তরকে জানান, ঢাকা ওয়াসার পানি শোধনাগার প্রকল্পের জমি অধিগ্রহণ প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে। কার্যক্রম শেষ হতে এখনও ৩-৪ মাস লাগতে পারে। এরপর ঢাকা ওয়াসাকে জমি বুঝিয়ে দেয়া হবে। সেক্ষেত্রে আগামী বছরের মে-জুন মাস নাগাদ ঢাকা ওয়াসা জমি হাতে পাওয়ার সম্ভাবনা আছে।

সূত্র জানায়, প্রকল্প পরিচালকের পক্ষ থেকে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে পাঠানো এক ই-মেইল বার্তার তথ্যমতে, কে-৯ ক্লাস ডিআই পাইপের টেনশাইল স্ট্রেন্থ সর্বনিু ৪৮০ মেগাপ্যাসকেল, যা গ্রহণযোগ্য সীমার অনেক কম। পাঠানো পাইপের ইল্ড স্ট্রেন্থ পরীক্ষা করা বাধ্যতামূলক থাকলেও তা টেস্ট রিপোর্টে উল্লেখ নেই। মেটালিক জিং অ্যালুমিনিয়াম লেয়ার প্রতি বর্গমিটারে ৪০০ গ্রাম থাকার কথা থাকলেও পাঠানো পাইপের টেস্ট রিপোর্টে পাওয়া গেছে মাত্র ২৪১.০২, যা গ্রহণযোগ্য সীমার কম। প্রকল্প পরিচালক পাইপের শিপমেন্ট বন্ধ রাখার জন্য লিখিতভাবে ঠিকাদারকে চিঠি দেন।

চিঠিতে প্রকল্প পরিচালক আরও বলেন, জমি হস্তান্তর করার পর পাইপের শিপমেন্ট পাঠানোর কথা। অথচ চীনা ঠিকাদার জমি বুঝিয়ে নেয়ার আগেই এবং নিুমানের পাইপ সরবরাহ করেন। জেনেশুনে এই নিুমানের পাইপ গ্রহণ করার জন্য এমডি নিজেই লিখিতভাবে নির্দেশ দেন। প্রকল্প পরিচালক এই পাইপ গ্রহণ করবে না বুঝতে পেরে ঢাকা ওয়াসা এমডির নির্দেশে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান পাইপ পাঠিয়েছেন বলে একাধিক সূত্র নিশ্চিত করেছে।ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক ড. মো. ইফতেখারুজ্জামান এ ব্যাপারে যুগান্তরকে বলেন, ঢাকা ওয়াসার পদ্মা পানি শোধনাগার প্রকল্পের ব্যাপারে যেসব অনিয়মের তথ্য জেনেছি, সেসব তদন্ত করে সরকারের ত্বরিত ব্যবস্থা গ্রহণ করা উচিত। এটা না করা গেলে দেশ ও জনগণের অনেক ক্ষতি হয়ে যাবে। তিনি এ ব্যাপারে সরকারের সংশ্লিষ্টদের এগিয়ে আসার আহবান জানান।

যুগান্তর

Comments are closed.