আরও কিছু উচ্ছেদের ইতিহাস

মেঘনার চরে চরে
ফারুক ওয়াসিফ: বালুদস্যুদের গুলিতে আহত মিসির আ​লী। কিন্তু বয়স হুমায়ূন আহমেদের বিখ্যাত চরিত্র ‘হিমু’র সমান। সে বাংলাদেশের উপেক্ষিত চরবাসীর একজন। ছেলেটার এখন থাকার কথা ছিল ওমানে, এ বাবদ তিরিশ হাজার টাকা জমাও দিয়েছে এজেন্টের কাছে। কিন্তু পেটে গুলি নিয়ে এখন সে পড়ে আছে মেঘনার বকচরে তার বাড়ির বেড়ার ঘরে। গত বছরের এমন সময়ে গুলি খেয়েছিল তরুণী তানিয়া। এ বছর গুলিবিদ্ধ হয়েছে সাতজন। গুলি চলছে, কিন্তু মামলা পর্যন্ত হচ্ছে না। আর বিচার তো চাঁদের পাথর, কে তাদের সেটা এনে দেবে?

রাজধানী থেকে মুন্সিগঞ্জ বেশি দূরে নয়। তাহলেও আইন-আদালত-প্রশাসনের হাত মেঘনা পেরোতেই দম হারায়। সোনারগাঁ থেকে মুন্সিগঞ্জ হয়ে দাউদকান্দি অবধি মেঘনার চরাঞ্চলে মানুষ আছে, মানবিকতা নেই; সম্পদ আছে, সভ্যতা নেই। সভ্যতার পরপারে তাদের কেবল তারাই আছে। সেই ‘তারা’ও এতই গরিব, এতই বর্জিত যে তাদের ‘নাই’ ধরে নিয়েই রাজনীতি-প্রশাসন দিব্যি চলতে পারে।

চলছিলও তা–ই। মেঘনা নদীর প্রতাপশালী বালু-সিন্ডিকেট চরের জমিতে লাভের বালু দেখে, মানুষ দেখে না। আইনের চোখ নাকি অন্ধ, কিন্তু বধির নয়। কিন্তু মেঘনার চারঞ্চলে তা দেখেও না, শোনেও না কারও ফরিয়াদ। তাই গত ৩০ অক্টোবর বালুদস্যুদের নির্বিচার গুলিতে সাতজন আহত হলেও বালু কাটা বন্ধ হলো না, বন্দুকবাজেরা গ্রেপ্তার হলো না। এ অবস্থাতেই মিসির আলীর বাবা শুকুর আলী হালদার বিচার চাইলেন না, শুধু বললেন, ‘আমাগো গাঙ আমরা ফেরত চাই!’

চরের জমিতে বাড়িঘর তোলা ও চাষাবাদের একটা নিয়ম আছে। ঘরবাড়ি তোলা হয় চরের একেবারে মাঝখানের উঁচু জমিতে, চাষের জমি থাকে সামনে-পেছনে। কিন্তু বকচরের সামনেরটা লোপাট, পেছনটায় রজতরেখা নদী ও জলাভূমি। ড্রেজারের কামড়ে চরটার একপাশ উবে গেছে। এখন ঘরবাড়ির কাছেই থইথই পানি। প্রায় এক মাইল জায়গাজুড়ে ১০০ হাত করে জমি কেটে নিলে কত হাজার টন বালু হয়! কত শত কোটি টাকা হয় তার দাম? শত কোটি টাকার ব্যবসার লকলকে লোভের সামনে মাত্র কয়েক শ লোকের জীবন! বালুই টাকা, বালুই নদী। মানুষের জমি-জীবন! ফুহ!

গত বছর গুলিবিদ্ধ তানিয়ার মা বিচার পাননি, পেয়েছেন মামলা না করার হুমকি। দারোগাকেও দিতে হয়েছে ১৫০০ টাকা। সেটা দেখেই এবারের গুলিবিদ্ধরা এক্কেবারে নীরব। একই অবস্থা প্রবাসফেরত মো.কবীরেরও। ছয় বছর আগে ড্রেজারে জমি খেয়ে নিলে বাড়িসমেত আরও পেছনে হটেন তাঁরা। প্রতিবেশী কৃষক হালিম শিকদারের ভয় আরও বেশি, ‘যেভাবে কাটতে আছে, ঘর আর কি, গ্রামটাই থাকব না!’

গ্রামজুড়েই থমথমে ভয়। সারা দিন শিশু-বৃদ্ধ-নারী-পুরুষ জমিতে কাজ করেন। একটু দূরেই চরঘেঁষা নদীতে চলে ড্রেজার-সন্ত্রাস। বালুখোরদের স্পিডবোট নদীতে টহল দেয়। জেলেরা মাছ ধরতে পারেন না। জয়নাল মিয়ার বিক্ষোভ, ‘দুই বছর ধইরা গাঙে যাইতে পারি না, গরিব মানুষ না খায়া মরতাছে।’ আসবার পথে নদীতে এ রকম এক স্পিডবোড সাঁই করে চলে গিয়েছিল আমাদের পাশ দিয়ে। তাতে যুবক বয়সী ছয়–সাতজন। কঠিন মুখ সবার। সহযাত্রীদের কথা বন্ধ হয়ে যায়। দুই মাস আগে এ রকম স্পিডবোট থেকেই নদীতীরে সমবেত চরবাসীর ওপর গুলি চলে। হতভাগ্য মিসির আলী তাদেরই একজন।

২.
আসার পথে ষাটনলের উল্টো দিকে মাঝনদীতে প্রায় পঞ্চাশটি ড্রেজারের একটি বহর দেখতে পাই। খুদে ব্যবসায়ী ওসমান জানালেন, ‘ওইহানে ছিল বায়রা বকচর, অহন নাই।’ পানিতে মাথা তোলা মাটির শেষভাগটা কেটে নিয়ে গেছে; তা–ও দুই বছর হলো। এখন চলছে তলার মাটি তোলার কাজ। ঘরবাড়ি-সংসার ভেঙে মানুষগুলো কোথায় যে চলে গেছে! সরকারের কোনো দপ্তরই সেই খবর রাখেনি। বৃদ্ধ কৃষক গিয়াসউদ্দিনের ৮০ শতক জমি গেছে। এ রকম অজস্র পরিবার জমি হারিয়েছে। এঁদের যতজন মুখ খুলেছেন, ততজনই জানিয়েছেন, ‘ইলেকশনে (৫ জানুয়ারি) যেই আওয়ামী লীগ পাস করল, সেই থেকে ড্রেজারের আজাব বাড়ছে বেশি। অহন তারা কাউরে ডর করে না।’

সোনারগাঁয়ের মায়াদ্বীপ-নুনেরটেক থেকে শুরু করে রামপ্রসাদের চর, চর আবদুল্লাহ হয়ে চর হোগলা, চর কিশোরগঞ্জ—সবখানেই দেখেছি ইউনিয়ন পরিষদের সদস্যরা গ্রামবাসীর পাশে দাঁড়ান বটে, চেয়ারম্যান থাকেন বিপরীত পক্ষে। বকচরে জানা গেল স্বয়ং চেয়ারম্যানও প্রতিবাদ করতে গিয়ে দুই দফা মার খেয়েছেন। প্রান্তিক মানুষেরা সব দেশেই রাষ্ট্রহীন জীবন কাটায়, কিন্তু আর কোন দেশে এভাবে তাদের ‘দ্যাশছাড়া’ করা হয়? নিজেদের ছোট্ট চরগুলোই তাদের ‘বাংলাদ্যাশ’। সেই দ্যাশটুকুও যদি না থাকে, তবে কি জাতিসংঘ তাদের দেশহীন মানুষের তালিকাভুক্ত করবে? সোনারগাঁয়ের মায়াদ্বীপের বালু সিন্ডিকেটের সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে জাতিসংঘ মানবাধিকার কমিশন থেকে চিঠি আসে। তাতে কিছুদিন সন্ত্রাস চাপা থাকলেও এখন আবার যেই-কি-সেই। নাগরিক মহলে তা–ও সোনারগাঁ-মায়াদ্বীপের নাম জানাজানি আছে। বকচরের দুঃখের কাহিনি তো কেউই তেমন জানে না।

৩.
সন্ধ্যার পরে মেঘনার ওই জায়গাটা ভীতিকর। মাঝেমধ্যেই মুখোশধারী ডাকাতেরা দেখা দেয়। তাই সন্ধ্যার মুখে বকচরের পেছন দিয়ে লম্বা পা ফেলে ফিরছিলাম। আইলের মতো পথ। চরাচরজুড়ে মশারির মতো কুয়াশার পর্দা নামছে। দূরে রজতরেখা নদী দিবসের শেষ আলোয় মলিন সাদা শাড়ির মতো দোলে। কিছু বক আর কাক ঘরে ফিরছে। হঠাৎ পেছন থেকে ডাক, ‘ভাই-ই-ই’। দেখি, তিন তরুণ দৌড়ে আসছে, তাদের পেছনে বয়সী আরও একজন। না থেমেই বললাম, ‘আপনারা আগায়া আসেন, তাড়াতাড়ি নৌকা ধরতে হবে।’ ওরা এল। হাঁফাতে হাঁফাতে অনেক কথাই বলল। তাদের ভাষা সর্বজনীন, অর্থ না বুঝলেও বিশ্বের যে কেউই সেই ভাষা বুঝবে।

এর নাম হাহাকার, এর নাম প্রতিবাদ, এর নাম করুণ কাকুতি। ইংরেজিতে বললে এটা যেন ডুবতে থাকা জাহাজের নাবিকের সাহায্য চাওয়ার সংকেত— এসওএস: সেইভ আওয়ার সৌলস, আমাদের জীবন বাঁচান! এদের একজন এবার জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির সুযোগ পেয়েছে। বাকি দুজন গ্রামেই থাকে, চাষবাস করে। ওরা ভীত, কারণ ওরা গুজব শুনেছে: বালুশ্রমিকদের কাউকে হত্যা করে গত অক্টোবরের প্রতিবাদীদের নামে হত্যার মামলা দেওয়া হবে। যদি তা-ই হয়, তাহলে বন্দী বা ফেরার হয়ে পুরুষেরা গ্রামছাড়া হতে বাধ্য হবে। গুজব হলেও ভয়টা উড়িয়ে দেওয়া যায় না। মনে পড়ল রামপ্রসাদের চরের এক কৃষকের কথা: ‘আইনের লাইগ্যাই তো আমরা পারি না। আইন তো আমাগো লাইগ্যা না!’

বিপন্ন মানুষকে আশ্বাস দিতে হয়। কিন্তু কী আশ্বাস দেব? অনেক দূর হেঁটে ওরা আমাকে তুলে দিল রজতরেখা নদীর এক মাঝির নৌকায়। সেখান থেকে আধা ঘণ্টার পথ ওপারের চিতলিয়া বাজার। কুয়াশার নদীর মধ্যে সুনসান পরিবেশে কেবল নৌকা চলার শব্দ। নদীর দুপাশে চরাচরব্যাপী বিল, তার পরে অস্পষ্ট গাছপালায় ঢাকা জনবসতি। মনে হলো, এই কি সেই বৈকুণ্ঠ, যা দিয়ে পরপারে যাওয়া যায়!

চিতলিয়া বাজারে গিয়ে মনে হলো ‘সভ্যতায়’ ফিরলাম। সেই সভ্যতা, যেখানে বাতি জ্বলে, টাকা কথা বলে, ক্ষমতার কল যেখানে দিনরাত চলে। সেখানেই পরিচয় চিতলিয়ার বাসিন্দা খালেক ঢালীর সাথে। দিনের শেষ কথাটা তাঁরই: ‘আগে বকচরের জমি আমরা খাইতাম, অহন ড্রেজারে খায়!’
এই ‘আমরা’ কারা?

ঘন কুয়াশার অন্ধকারে সিএনজিচালিত অটোরিকশায় করে মুন্সিগঞ্জ শহরে পৌঁছালাম রাত আটটায়। সেখান থেকে ধলেশ্বরী সেতুর দিকে যেতে যেতে দেখি, মুন্সিগঞ্জ হানাদারমুক্ত দিবস উদ্যাপনে বিরাট প্যান্ডেল বসেছে। সভা তখন শেষ। কিন্তু মঞ্চের বিরাট ব্যানারে নেতাদের নাম ও ছবি! বকচরে, ষাটনলে তো এঁদের কথাই শুনেছি। বালু সিন্ডিকেটের নাকি এঁরাই রক্ষক! স্থানীয় আওয়ামী লীগের নেতা।

তানিয়ার জন্য, মিসিরের জন্য, রজতরেখা নদীর পাড়ে দেখা হওয়া ওই তিন তরুণের জন্য, বালু সিন্ডিকেটের গ্রাসে বিপন্ন জেলে ও কৃষকদের জন্য আবার ভয় হলো। এত বড় শক্তির বিরুদ্ধে ওরা কি পারবে?

ফারুক ওয়াসিফ: সাংবাদিক ও লেখক।
bagharu@gmail.com

প্রথম আলো

Comments are closed.