আমি ভাল আছি : চাষী নজরুল ইসলাম

‘উনারতো তেমন কিছুই হয়নি! শিগগিরিই সুস্থ হয়ে উঠবেন। আবারও প্রাণবন্ত হয়ে আপনাদের সঙ্গে আড্ডা দেবেন। এফডিসিতে যাবেন। আগের মতোই ছুটোছুটি করবেন। সবাই তার সুস্থতার জন্য দোয়া করবেন।’— আবেগে আপ্লুত হয়ে কথাগুলো বলছিলেন স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম মুক্তিযুদ্ধ ভিত্তিক চলচ্চিত্র ‘ওরা ১১ জন’ এর নির্মাতা চাষী নজরুল ইসলামের সহধর্মিণী জোৎস্না কাজী। ১৪ ডিসেম্বর বিকেলে তিনি এ সব কথা বলেন।

তবে তার আগেই অনেকটা কাকতালীয়ভাবেই দেখা হয়ে যায় চাষী নজরুল ইসলামের সঙ্গে। আগের দিন তার খবর নিতে যাই ল্যাব এইড হাসপাতালে। দেখা করতে চাইলে রিসিপশনিস্ট সরাসরি না-ই করে দিলেন। ডাক্তার ও তার পরিবারের পক্ষ থেকেই বাইরের কারও দেখা করার উপর নিষেধাজ্ঞা রয়েছে। ‘তাকে কোনো কিছু বলার থাকলে কিংবা তার বিষয়ে কোনো মন্তব্য থাকলে রেজিস্ট্রার খাতায় লিখে রেখে যান’— বলে খাতা এগিয়ে দিলেন।

আমি তার সামনে দাঁড়িয়ে ফোন দিলাম চাষী নজরুলের ফোন নাম্বারে। ফোন রিসিভ করলেন জোৎস্না কাজী। উনিও বললেন একই কথা, ‘তার সঙ্গে কথা বলা যাবে না। তবে দেখা করতে পারেন কিছুক্ষণ পর। এখন তাকে একটা টেস্টের জন্য এক্সরে কক্ষে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে।’ এ দিকে রিসিপশন থেকে জানানো হলো সন্ধ্যার পর দেখা করতে পারব।

অপেক্ষা করার জন্য হাসপাতালের রিসিপশন ত্যাগ করছি। ঠিক এই সময় চোখে পড়ল একজন ভদ্রলোককে হুইল চেয়ারে ঠেলে আনা হচ্ছে। চেয়ারে বসে আছেন ‘ওরা ১১ জন’, ‘সংগ্রাম’ ও ‘হাঙর নদী গ্রেনেড’ এর পরিচালক চাষী নজরুল ইসলাম। হুইল চেয়ার গিয়ে থামল এক্সরে কক্ষের সামনে।

ধীর পায়ে তার পাশে দাঁড়ালাম। ‘এখন কেমন বোধ করছেন?’ চাষী নজরুল ধীর কণ্ঠে উত্তর দিলেন, ‘আমি ভাল আছি। আগের তুলনায় কিছুটা ভাল বোধ করছি। এখন কিছুটা সুস্থ।’ আরও জানালেন এখন বুকের এক্সরে হবে। একজন নার্স এসে তাকে ভেতরে নিয়ে গেলেন।

চাষী নজরুলের সঙ্গে ছিলেন আত্মীয় মো. রফিক। তিনি জানান, গত মে মাস থেকেই অসুস্থ চাষী নজরুল ইসলাম। ছয় মাস থেকে চিকিৎসাধীন রয়েছেন। বেশ কিছুদিন ব্যংককে চিকিৎসা নিয়েছেন। এরই মধ্যে ১৪টি কেমোথেরাপি দেওয়া হয়েছে। ১১টি রেডিওথেরাপি দেওয়া হয়েছে, আরও চারটি দেওয়া হবে। ‘সরকারের পক্ষ থেকে খোঁজ খবর নেওয়া হয়েছে?’— এ প্রশ্নের উত্তরে বললেন, ‘প্রধানমন্ত্রীর পক্ষ খেকে তার খোঁজ-খবর নেওয়া হয়েছে। তাকে সহযোগিতাও করতে চেয়েছেন। কিন্তু চাষী নজরুল ইসলাম বলেছেন, সহযোগিতার প্রয়োজন নেই।’

লিভার ক্যান্সারে আক্রান্ত এ নির্মাতা ৮ ডিসেম্বর রাজধানীর ল্যাবএইড হাসপাতালে ভর্তি হন। আগেরদিন রাতে পেটের ব্যথা বেড়ে যাওয়ায় তাকে হাসপাতালে নিয়ে আসা হয়। প্রফেসর ডা. সৈয়দ আকরামের তত্ত্বাবধানে চিকিৎসা নিচ্ছেন তিনি।

এক নজরে চাষী নজরুল ইসলাম : ১৯৪১ সালের ২৩ অক্টোবর বিক্রমপুরের সমষপুর গ্রামে চাষী নজরুল ইসলাম জন্মগ্রহণ করেন। তিনি বাবা-মায়ের বড় সন্তান। বাবা মোসলেহ উদ্দিন আহম্মদ ভারতের বিহারে টাটা আয়রন অ্যান্ড স্টিল কোম্পানির ইঞ্জিনিয়ার ছিলেন।

তিন মাস বয়সে মায়ের সঙ্গে বাবার কর্মস্থল জামশেদপুরে গিয়ে চার বছর ছিলেন। এরপর কিছুদিনের জন্য বিক্রমপুরে ফিরে আসেন। এরপর আবারও জামশেদপুরে। চাষী নজরুল ইসলামের শৈশবের অধিকাংশ সময় কেটেছে এখানেই। জীবনের ১৮টি বছর তিনি কাটিয়েছেন এই জামশেদপুরে।

১৯৬১ সালে ফতেহ লোহানীর পরিচালনায় ‘আছিয়া’ চলচ্চিত্রে সহকারী পরিচালক হিসেবে চাষী নজরুল ইসলামের চলচ্চিত্রে অভিষেক ঘটে। ১৯৬৩ সালে প্রখ্যাত সাংবাদিক ও চলচ্চিত্রকার ওবায়েদ-উল-হক সরকারের সহকারী হিসেবে ‘দুই দিগন্ত’ চলচ্চিত্রে কাজ করেন। স্বাধীনতা যুদ্ধের পর নির্মাণ করেন ‘ওরা ১১ জন’। এটি তার পরিচালিত প্রথম চলচ্চিত্র।

চাষী নজরুল ইসলাম পরিচালিত উল্লেখযোগ্য সিনেমার মধ্যে রয়েছে ওরা ১১ জন, সংগ্রাম, বাজিমাত, দেবদাস, চন্দ্রনাথ, বেহুলা লক্ষিন্দর, বিরহ ব্যথা, বাসনা, দাঙ্গা ফ্যাসাদ, পদ্মা মেঘনা যমুনা, শিল্পী, হাঙর নদী গ্রেনেড, হাছন রাজা, মেঘের পরে মেঘ, শাস্তি, সুভা, দুই পুরুষ ও রঙিন দেবদাস।

চাষী নজরুল ইসলাম চারবার বাংলাদেশ চলচ্চিত্র পরিচালক সমিতির সভাপতি নির্বাচিত হন। পরিচালনার স্বীকৃতি হিসেবে অর্জন করেন একুশে পদক (২০০৪), বাংলাদেশ সিনে জার্নালিস্ট এ্যাসোসিয়েশন এ্যাওয়ার্ড, জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার (১৯৮৬, ১৯৯৭), শের-ই-বাংলা স্মৃতি পুরস্কার, বাংলাদেশ ন্যাশনাল ইয়ুথ অর্গানাইজেশন ফেডারেশন এ্যাওয়ার্ড, স্যার জগদীশ চন্দ্র বসু স্বর্ণপদক, জহির রায়হান স্বর্ণপদক, বিনোদন বিচিত্রা এ্যাওয়ার্ড ও জেনেসিস নজরুল সম্মাননা পদক।

দ্য রিপোর্ট