বিস্ময় ভেঙে বিশ্বরেকর্ডের পথে বাংলাদেশ

‘হোয়্যার ইজ দ্য রিভার? দিস ইজ অ্যা সি!’ (কোথায় নদী, এটাতো সাগর)– পদ্মাপাড়ে এসে এমন বিস্ময় প্রকাশ করেছিলেন মালেশিয়ার প্রকৌশলীরা। সেই বিস্ময় দিয়েই বিশ্ব রেকর্ড গড়ার পথে এখন বাংলাদেশ। বিশ্বের কোথাও এত গভীর আর এরকম বড় কোন নদীর তলদেশে সেতুর কাজ গড়ায়নি। সেই হিসেবে পদ্মাসেতু হবে বিশ্বের প্রথম বড় কোন সেতু যার ভিত্তি (পাইল) ১২০ ফুট গভীরে প্রোথিত হচ্ছে। চীনের তৈরি পাইলগুলো জার্মানির তৈরি হাইড্রোলিক হ্যামার দিয়ে পিঠিয়ে মাটির তলদেশে নিয়ে যাওয়া হবে।

মালেশিয়ার প্রকৌশলীদের আশ্চর্য্য হবার কথা উল্লেখ করেই বাংলানিউজের সঙ্গে এসব বিষয়ে কথা বললেন পদ্মাসেতু প্রকল্পের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী মো. কামরুজ্জামান।

আর বিশ্বের অন্যান্য সেতুর পরিসংখ্যান এবং পদ্মাসেতুর কাজে নিয়োজিত চায়না মেজর ব্রিজের তথ্য উল্লেখ করে পদ্মা সেতু প্রকল্পের নির্বাহী প্রকৌশলী তোফাজ্জেল হোসেন বাংলানিউজকে বলেন, ‘কোন নদীর উপর এটাই বিশ্বের সবচেয়ে বড় কোন সেতু হচ্ছে। আর সেতুতে যে আকারের পাইল ব্যবহার করা হবে তা এখন পর্যন্ত বিশ্বের অন্য কোন সেতুতেই দেওয়া হয়নি।

বিশ্বের বড় বড় সেতু দেখার অভিজ্ঞতা জানিয়ে পদ্মাসেতু প্রকল্পের এই তত্বাবধায়ক প্রকৌশলী জানান, মিসিসিপি সবেচেয় লম্বা নদীর ব্রিজ, এর পরের অবস্থানে আছে কঙ্গো ব্রিজ। সেই দিক থেকে দৈর্ঘ্যের হিসেবে তৃতীয় হবে পদ্মাসেতু। তবে মিসিসিপি আর কঙ্গো সেতুতে ব্যবহৃত পাইল ৬০ মিটারের বেশি গভীরে যায়নি। পদ্মাসেতুর পাইল যেমন আকারে হবে বিশ্বের সবচেয়ে বড় তেমনি এগুলো যাবে ১৫০ ফুট গভীরে। যা হবে কোন সেতু তৈরিতে প্রথম নজির।

আর এটাকে পদ্মাসেতু প্রকল্পের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবেও বিবেচনা করা হচ্ছে। তোফাজ্জেল হোসেন বলেন, ‘পাইল বসাতে সফল হলেই পদ্মাসেতুর কাজ সহজ হয়ে যাবে। তখন করা হবে সাব-স্ট্রাকচার ও সুপার স্ট্রাকচার (উপরের অংশ) নির্মাণের কাজ।

ডিজাইন অনুযায়ী, পদ্মাবহুমুখী সেতু হবে দ্বিতল। পদ্মানদীর উপর দিয়ে যার দৈর্ঘ্য হবে ৬ দশমিক ১৫ কিলোমিটার।

তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী আরও জানান, পদ্মাসেতুর পাইলগুলো চীনের নানটোং-এর স্টিল কাটার ফেব্রিকেট ওয়ার্কশপে তৈরি হচ্ছে। মাওয়া ঘাটে চায়না মেজর ব্রিজের ওয়ার্কশপে এগুলো জোড়া দেবার কাজ করবেন তাদেরই প্রকৌশলী ও শ্রমিকরা । এরপর শুরু হবে বসানোর কাজ।

তিনি জানান, এসব পাইল এখনও আসার পথে রয়েছে। তবে পরীক্ষামূলকভাবে প্রাথমিক পাইল বসানোর কাজ শুরু হবে জানুয়ারিতে। এর পাঁচ মাস পর মূল পাইল বসানো শুরু হবে। যা শেষ হতে লাগবে দেড় থেকে দুই বছর।

পদ্মাসেতু এলাকা মাওয়া ও জাজিরায় শুক্রবার সারাদিন ঘুরে দেখা গেছে, পদ্মানদীর যে স্থান দিয়ে সেতু হবে ঠিক সেই স্থানগুলো আলাদা করে চিহ্নিত করে ফেলা হচ্ছে। নদীর তীরবর্তী ও মাঝখানে সেতুর স্থানে আলাদা চ্যানেলও তৈরি করা হয়েছে।

সেতুবিভাগ সূত্র জানায়, নদীতে ১০০ মিটার প্রশস্ত অ্যালাইনমেন্ট চ্যানেল তৈরি প্রায় সম্পন্ন। আর নদীর মাঝখানে যেখানে যেখানে চর আছে সেখান দিয়ইে চ্যানেলগুলো তৈরি হয়েছে।

মাওয়া এবং জাজিরা পদ্মার দু’ইপাশের চর ঘুরে দেখা যায়, দুটি ওয়ার্কশপ নির্মাণের কাজ দ্রুতগতিতে চলছে। দেয়াল ঘিরে মাটি দিয়ে উঁচু করে বিশাল অংশে গড়ে উঠেছে ওয়ার্কশপ। ওয়ার্কশপের মধ্যে চায়না মেজর ব্রিজের শ্রমিকদের থাকার জন্য ঘর তৈরির কাজ চলছে। বেশ কয়েকটি ঘর তৈরিও সম্পন্ন।

মাওয়া ওয়ার্কশপ ঘুরে দেখা যায়, স্টিলের পাইলগুলো জোড়া দেবার কাজ করা হবে এই ওয়ার্কশপে। এসব পাইল স্টিল দিয়ে তৈরি যার ভেতরে রয়েছে কংক্রিট। স্টিলগুলো ওয়েল্ডিং করাও হবে ওয়ার্কশপে। তারপর ওয়ার্কশপ থেকে ক্রেনে তুলে নদীর গভীরে বসিয়ে দেওয়া হবে।

সম্প্রতি পদ্মাসেতুর প্রকল্প পরিচালক শফিকুল ইসলামসহ প্রকল্পের একটি টিম চিনের ন্যানটং ওয়ার্কশপ ঘুরে দেখে এসেছেন পাইল তৈরির কাজ।

এই টিমের একজন প্রকৌশলী বাংলানিউজকে জানান, পাইলগুলো অত্যন্ত উন্নত মানসম্পন্ন পদ্ধতিতে তৈরি হচ্ছে। এ মাসের শেষের দিকে ১২ টি ট্রায়াল পাইল রওয়ানা দেবে চীন থেকে। ১৫ দিন শেষে চট্রগ্রাম বন্দরে এসে ভিড়বে পাইলবাহী জাহাজ। সেখান থেকে নিয়ে আসা হবে মাওয়ায়।

প্রকৌশলী আরও জানান, একেকটি পাইলের ব্যাসার্ধ (ডায়াগ্রাম)১০ ফুট। তিন হাজার টন ওজনের এই হ্যামার এর আগে কোথাও ব্যবহৃত হতে দেখা যায়নি।

পদ্মাসেতু প্রকল্প সূত্র জানায়, পদ্মাসেতুর কাজের মোবিলাইশেজনের প্রক্রিয়া শেষ। দু’তিনটি মাটি পরীক্ষাও ইতোমধ্যে শেষ হয়েছে। জানুয়ারির শেষের দিকে টেস্ট পাইল (পরীক্ষামূলক ভিত্তি) বসানোর কাজ শুরুর সঙ্গে সঙ্গে সাব-স্ট্রাকচার ও সুপার স্ট্রাকচার তৈরি হতে থাকবে মাওয়া ও জাজিরা ওয়ার্কশপে।

১৫০ ফুট গভীর আর বিশাল আকারের পাইল যেমন বিশ্বের অন্যান্য সেতুর রেকর্ড ভঙ্গ করে দিচ্ছে তেমনি দেশেও এরকম বড় সেতুর কাজও এই প্রথম হচ্ছে। অনেকগুলো কারণে পদ্মাসেতু বিশ্বের অন্যান্য সেতু থেকে ব্যতিক্রমী বৈশিষ্ট্যের হবে।

এর কারণ ব্যাখা করে পদ্মাসেতু প্রকল্পের একজন উর্ধতন প্রকৌশলী বাংলানিউজকে বলেন, অন্যান্য দেশের নদীর মাটি শক্ত। কিন্তু পদ্মা নদীগর্ভে যে মাটি তাতে কাঁদার পরিমাণ বেশি। আর পদ্মাসেতুর গভীরের মাটিতে ‘মাইকা’র (মাটির কালো এবং সাদা অংশ) পরিমাণ বেশি বলে এর চাপ ধারণ ক্ষমতা কম। এজন্য এত গভীরে পাইল যেতে হচ্ছে। অন্যন্য দেশের নদীতে কাঁদার পরিমাণ কম তাতে পাথর-বালুর মিশ্রন থাকে।

এছাড়া পদ্মা নদীতে গভীর খাদ তৈরি হয়। যেগুলো বর্ষায় ১৫০ ফুট গভীর হয়ে পড়ে। যা অত্যন্ত বিপদজনক। তাই এখানে পাইল বসানো বড়ই কঠিন কাজ । একই সঙ্গে এর খরস্রোতাভাব অন্য নদীর সঙ্গে এর ভিন্নতা নিদের্শ করে যা সেতু তৈরির ক্ষেত্রে বড় বাধা।

সেতু প্রকল্প সূত্র জানায়, পদ্মাসেতু হবে কম্পোজিট ব্রিজ অর্থাৎ কংক্রিট এবং স্টিলের মিশ্রনে তৈরি হবে সেতু। এর উপর দিয়ে গেলে মনে হবে যমুনা সেতু আর নীচের দিকে গেলে মনে হবে হার্ডিঞ্জ ব্রিজের মত। এই সেতু হবে দ্বিতল। যার দৈর্ঘ্য হবে ৬ দশমিক ১৫ কিলোমিটার। সেতুর বেশিরভাগ কাজই হবে স্টিল আর কংক্রিট দিয়ে। এর স্থাপত্য কাঠামো এমন যে পানির নিচে ৪০ তলা ভবনের সমান কাঠামো থাকবে । পদ্মার দু’দিক থেকে ছয় লেনের সংযোগ সড়ক এসে যুক্ত হবে মূল সেতুতে।

পদ্মাসেতুর সাব ও সুপার স্ট্রাকচার তৈরিতে বেশি সময় লাগবে না বলে মনে করছেন চায়না মেজর ব্রিজের প্রকৌশলীরা ও সেতু বিভাগের বিশেষজ্ঞরা।

সেতু বিভাগ জানায়, ৬ দশমিক ১৫ কিলোমিটারের সুপার স্ট্রাকচার কাঠামোতে ৪১টি স্পাইন ক্রেনে তুলে নিয়ে পাইলের উপর বসিয়ে দেয়া হবে।

পদ্মা বহুমুখী সেতু প্রকল্পের ডেটলাইন অনুযায়ী, ৮ নভেম্বর থেকে মুল সেতু অংশের কাজে নেমেছে চায়না মেজর ব্রিজ। মূল ব্রিজের মালামাল নিয়ে আসার জন্য তাদের হাতে এখনও ছয় মাস সময় আছে। তবে তার আগেই চায়না মেজর ব্রিজ মূল ব্রিজের মালামাল মাওয়া ঘাটে এনেছে আরও মালামাল আসার পথে। সেতুর পাইল বসানোর জন্য হাইড্রোলিক হ্যামার আসছে জার্মান ও সিঙ্গাপুর থেকে।

পদ্মা সেতু প্রকল্পের প্রকল্প পরিচালক মো. শফিকুল ইসলাম জানান, পদ্মাসেতুর কাজ এখন পুরোপুরি দৃশ্যমান। নদীতে চলছে মূল সেতু নির্মাণের প্রাথমিক কাজ। তার আগে পদ্মাসেতু প্রকল্পের অ্যাপ্রোচ রোড-১ জাজিরা অংশের ২৮ ভাগ কাজ শেষ হয়েছে। অ্যাপ্রোচ রোড-২ মাওয়া ঘাট অংশের ২০ ভাগ কাজ শেষ হয়েছে। সার্ভিস এরিয়া ২—এর ২০ ভাগ শেষ। ২০১৮ সালের ডিসেম্বরেই যানবাহন চলাচলের জন্য পদ্মাসেতু খুলে দেয়া হবে।

‘শুক্রবারের সরেজমিন’র প্রথম স্পট ছিলো পদ্মার এপার মাওয়া ওপারের জাজিরা অংশ। পদ্মাসেতুর বিশাল কর্মযজ্ঞ চলছে সেখানে। বাংলানিউজ টিম গত শুক্রবার মাইলের পর মাইল হেঁটে, গাড়িতে, ভ্যানে, ট্রলারে চেপে দেখে এসেছে সেতুর কাজের অগ্রগতি। টিমে ছিলেন হেড অব নিউজ মাহমুদ মেনন, সিনিয়র নিউজরুম এডিটর আসিফ আজিজ, নিউজরুম এডিটর হুসাইন আজাদ, স্টাফ করেসপন্ডেন্ট সাব্বির আহমেদ, শাহেদ ইরশাদ ও উর্মি মাহবুব, সিনিয়র ফটো করেসপন্ডেন্ট শোয়েব মিথুন ও স্টাফ ফটো করেসপন্ডেন্ট নূর।

মাহমুদ মেনন ও সাব্বির আহমেদ
বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর