পদ্মার প্রথম পিলার পয়েন্ট টিবিসেভনবি

পদ্মাসেতুর পিলারের জন্য প্রথম চিহ্ন পড়েছে। নম্বর টিবিসেভনবি। মাটি পরীক্ষার সকল দিক সম্পন্ন করে এই পিলার বসানোর স্থান নির্ধারণ করা হয়েছে। ইটের গাঁথুনি দিয়ে ছোট্ট একটি প্ল্যাটফর্ম। তাতেই লিখে দেওয়া হয়েছে কোড নাম্বার। এখানেই এই কোড মেনে বসবে পিলার। মাটির নিচে শক্ত গাঁথুনিতে প্রোথিত হবে পদ্মাসেতুর ভিত। কিছুই নয়, তাও যেনো অনেক কিছু। ওই ছোট্ট চিহ্নটি দেখতেই মানুষের ভিড়। নিজেদের মধ্যে বলাবলি- ‘এইখানে একটা পিলার পড়বে!’ তাদের চোখেমুখে স্বপ্নের সেতু বাস্তবায়নের উচ্ছ্বাস।

মাওয়া ঘাটের যেই পয়েন্টে ২০০১ সালের ৪ জুলাই প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা পদ্মাসেতুর ভিত্তি গেড়েছিলেন, সেই ভিত্তিস্তম্ভ কাকের টেনে আনা ময়লা, আর মাওয়ার ধুলোর রাজ্যে জমে যাওয়া আস্তরের ভেতর থেকেও জ্বলজ্বল করে উঁকি দিয়ে জানান দিচ্ছে- ১৩টি বছর কেটে গেলেও সেতু এখন বাস্তবায়নের পথে।

শুক্রবার মাওয়া ও জাজিরা অংশে ঘুরে দেখা গেলো বিশাল কর্মযজ্ঞ। অধিকাংশই সেতু সম্পর্কিত। অ্যাপ্রোচ সড়ক তৈরির ‍কাজ চলছে। সেখানে বড় বড় ক্রেন আর কংক্রিটের মিকশ্চার মেশিনের ঘড়ঘড়ানি। তবে মূল সেতুর কাজের সঙ্গে সরাসরি সম্পৃক্ত এই সয়েল টেস্ট (মাটি পরীক্ষা)’র কাজ।

এপাড়ে মাওয়া অংশে ৭০ থেকে ৮০টি পয়েন্টে ওপাড়ে জাজিরা অংশেও একই সমান পয়েন্টে সয়েল টেস্ট সম্পন্ন করে, কোড বসিয়ে নির্দেশনা দেওয়া হবে। আর তার ভিত্তিতেই পিলার বসবে।

প্রথম পিলারটি যেখানে বসানোর জন্য স্থান নির্ধারণ হয়েছে তার অদূরেই চলছে আরেকটি পিলারের জন্য মাটি পরীক্ষার কাজ। চীনা প্রকৌশলীরা দুটি দলে ভাগ হয়ে কাজ করছে। একটি নদীর পাড়েই যে পিলার বসবে সেখানে। অপরটি আরেকটু দূরে। নদীর কাছের পয়েন্টে সয়েল টেস্ট অনেকখানি এগিয়ে গেছে বলে জানালেন তদারকির দায়িত্ব থাকা চীনা প্রকৌশলী ইয়ান সাই ফান।

প্রতিটি পয়েণ্টে বোর হোল তৈরি করে নিচের মাটির জিওটেকনিক্যাল ইনভেস্টিগেশন (ভূ-কারিগরি অনুসন্ধান) সম্পন্ন করা ও তার ভিত্তিতে পিলার গঠনের পদ্ধতি বাতলে দেওয়াওই এই কর্মযজ্ঞের মূল উদ্দেশ্য।

ইয়ান সাই ফান দিলেন কিছু কারিগরি তথ্যও। বললেন প্রতিটি গর্তে বিভিন্ন ধরনের পরীক্ষা চলছে। কোন পেনেট্রোমিটার টেস্ট- সিপিটি, সেল্ফ বোরিং প্রেসারমিটার টেস্ট-এসবিপিটি, সেলফ পেনেট্রেশন টেস্ট- এসপিটি, হাই ভ্যালু পেনেস্ট্রেশন টেস্ট-এইচপিটি, ডিলাটোমিটার টেস্ট-ডিএমটি। এসব পরীক্ষা সম্পন্ন করতে পাইপের ভেতর দিয়ে মাটির নিচে পাঠিয়ে দেওয়া হচ্ছে বিশেষ সেন্সর বসানো যন্ত্র। যা কোনোটি ৬৫ মিটার কোনোটি ১৩০ মিটার গভীরে গিয়ে তথ্য দিচ্ছে।

সে তথ্য সরাসরি কম্পিউটার স্ক্রিনে গ্রাফিক্সের মাধ্যমে তুলে ধরছে মাটির মূল চিত্র।

জাজিরা অংশেও একই কাজ চলছে। সেখানে প্রথম পয়েন্টে সয়েল টেস্ট সম্পন্ন করার কাজটি তদারকি করছিলেন অপর চীনা প্রকৌশলী পোইস ইও। তিনি দেখালেন কম্পিউটারের স্ক্রিনে ভেসে আসা তথ্য গুলো তারা নোট নিচ্ছেন। মাটির ১.২ মিটার থেকে শুরু করে ৫৮.৯৫ মিটার গভীর পর্যন্ত অন্তত ৬৭টি বার সিপিটি, এসবিপিটি, এসপিটি, এইচপিটি ও ডিএমটির রিডিং রাখা হয়েছে।

মি. পোইস জানালেন, পুরো প্রক্রিয়াটি কম্পিউটারইজড। যুক্তরাজ্য, জার্মানি কিংবা চীনের নিজেদের তৈরি অত্যাধুনিক মেশিন ব্যবহৃত হচ্ছে এই কাজে।

সয়েল টেস্টের কাজ সম্পন্ন করছে চীনের সেতু প্রকৌশলী প্রতিষ্ঠান ব্রিজ রেজোনেন্স ডিজাইন ইন্সটিটিউট-বিআরডিআই।

ইয়ান সাই ফান, পোইজ ইও এরা দুজনই ওই প্রতিষ্ঠানের হয়ে কাজ করছেন। দুই পাড়ে চীনা প্রকৌশলীদের অন্তত ১৫ জন করে ৩০ জন প্রকৌশলী এই কাজে নিয়োজিত রয়েছেন। প্রতিটি পয়েন্টে সয়েল টেস্টের কাজে চীনা শ্রমিক রয়েছে আরও চার/পাঁচ জন করে। আর এর সঙ্গে বাংলাদেশি শ্রমিকও কাজ করছে প্রতিটি পয়েন্টেই। এদেরও সংখ্যা চার/পাঁচ জন করে।

বাংলাদেশি শ্রমিকদের একজন শামীম, বয়স বিশের কোটায়। তার সঙ্গে কথা হলো। অন্যদের চেয়ে একটু বেশিই চটপটে মনে হলো। বেশ আস্থার সঙ্গে বললেন, চীনাদের সঙ্গে তার কাজ করতে সমস্যা হচ্ছে না। ওদের ভাষাও তিনি ধীরে ধীরে আতস্থ করে ফেলছেন।

এত দ্রুত ভাষা বুঝতে পারছেন! এমন বিষ্ময়ে শামীমের উত্তর, না বুঝে উপায় আছে। সামান্য ‘পাইপ’ শব্দটি ইংরেজিতে বুঝতে পারেন না এই চীনা শ্রমিকরা। কাজ করার জন্য আমাদেরই শিখে নিতে হয়েছে এটার নাম ‘গুয়ান’।

শামীমের সঙ্গী আল-আমিন, শাহজানদেরও একই মত।

এর আগে ড্রেজিংয়ের কাজ করেছেন পদ্মার গভীরে, এখানকার মাটির চরিত্র তার জানা, বেশ আস্থার সঙ্গে জানালেন বাংলাদেশি এই শ্রমিক।

সয়েল টেস্ট সম্পন্ন হওয়ার পরেই মূল ব্রিজের কাজ শুরু হবে। আর সে লক্ষ্যে কাজটি চলছে পুরোদমে। পিলারের প্রতিটি পয়েন্টে পরীক্ষা সম্পন্ন করে টিবি৭বি’র মতো একের পর এক নম্বর পড়বে টিবি৭এ, টিবি৭সি। আর সঙ্গে দেওয়া হবে নির্দেশিকা। সেই নির্দেশিকা ধরেই এগিয়ে যাবে পদ্মাসেতুর নির্মাণ।

মাহমুদ মেনন ও সাব্বির আহমেদ
বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর