হেমন্তের বিকেলে জীব-বৈচিত্র্যের সাথে পরিচিত হতে পরিবেশবাদিদের ভ্রমণ

নাসির উদ্দিন: দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে আসা পরিবেশবিদগণ এই হেমন্ত ঋতুর বিকেলে বেড়াতে এসেছিলেন মুন্সীগঞ্জ জেলার গজারিয়া উপজেলায়। শুক্রবার ছুটির দিনে তারা বুড়িগঙ্গা, ধলেশ্বরী আর মেঘনা নদীতে বেড়াতে এসে আনন্দ উচ্ছাসে মেতেছেন।

পরিবেশবিদরা হেমন্তের শেষে আকস্মিক ঝেঁকে বসা প্রচন্ড শীতেও তাদের ভ্রমণ পিপাসাকে উপভোগ করেছেন নিজেদেরমত করে। মধ্য দুপুরেও সূয্যের্র কোন তাপ ছিল না। এমনি দিনে বাংলাদেশের প্রায় সকল জেলার পরিবেশবাদিদের মিলনমেলা অনুষ্ঠিত হলো উপজেলার মেঘনা নদীর তীরে। নারী ও শিশুসহ সব বয়সীরা সপরিবারে উপভোগ করেছেন নদীর অপরূপ দৃশ্য ও গ্রামের মনোরম ছবি। পরিচিত হতে চেয়েছেন জীব-বৈচিত্র্যের সাথেও।

নদী ঘুরে ভ্রমণ পিয়াসীরা মেঘনা নদীর তীরে নৌযানটি নোঙ্গর করেন। মুন্সীগঞ্জের গজারিয়া উপজেলায় মেঘনা নদীর তীরে তাদের বহনকারী বিশাল আয়তনের লঞ্চ ‘রণদূত’ রেখে বেরিয়ে পরেন গ্রামে। নদী তীরের প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের মিলনমেলা দেখে মুগ্ধ হন তারা। নদীর তীরে গ্রামগুলোতে নবান্ন আর পিঠা পায়েসের ধূম। মৌ মৌ ঘ্রানেই তা বোঝা গেছে। পাখির কলকাকলি আর রবি ফসল আলু, টমেটো ও কপিসহ নানা সবজির আবাদ নিয়েও তারা উৎসুক ছিলেন। এর মধ্যে রাখালের গরু চড়ানো, নৌকায় করে গরুর খাবার সংগ্রহ এবং উৎপাদিত কৃষিপণ্য বাজারজাতকরণ সবই প্রত্যক্ষ করেন। এ ভিন্ন এক পরিবেশ।

ঢাকার মোহাম্মদপুরের বাসিন্দা কামরুন নাহার মুক্তি জানালেন, গ্রামের মানুষের এ ব্যস্ততার মধ্যেও যেন নান্দনিকতার কমতি নেই। ইট পাথরের নগর জীবনের চেয়ে উপজেলার নয়ানগর, ইস্পানিরচর ও দৌলতদিয়া গ্রামের মানুষের জীবন যাপন একটু আলাদা। সেজে-গুজে সুন্দর পোষাক পরা এসব মানুষ যখন গ্রামের মেঠোপথ পার হচ্ছেন, তখন নদীর তীরে কৃষক-কৃষানীদের সাধারণ পোষাকের মানুষগুলোর থেকে তফাৎ মনে হয়নি। কখনও মনে হয়েছে ওই কৃষানীরাই বেশী সুন্দর। শুধু দেখতেই নয়, আন্তরিকতায়ও।

আন্তর্জাতিক সেবা সংগঠন এপেক্স বাংলাদেশের সাথে সম্পৃক্ত কামরুন নাহার বলেন, এসব কৃষকের ঘাম ঝরানোর ফসলেই জোটে শহুরে মানুষের আহার। শহরে থাকলেও অনগ্রসর এবং গ্রামের মানুষের মধ্যেও অনেক সেবা দিয়ে থাকে তাদের সংগঠনটি। তাই সংগঠনটির সারা দেশের ১০৪টি শাখা রয়েছে। সংগঠনের সভাপতি ও বিভিন্ন পর্যায়ের কর্মকর্তারা ছুটির দিনে একত্রিত হয়েছেন প্রকৃতির অপরূপ সৌন্দর্য দেখতে। এ সংগঠনটি পরিবেশ নিয়েও কাজ করছে। সেবা, সুনাগরিক ও সৌহার্দ্য এ তিনটি বিষয়ে কাজ করছেন তারা। এ লক্ষ্যে তাদের এ সফর।

সকালে ঢাকার সদরঘাট থেকে বড় একটি বড় লঞ্চে করে তারা বের হন। পরিবারের শিশুদের নদী এবং জীব-বৈচিত্র্যের সাথে পরিচয় করে দেয়াও ছিল এ আয়োজনের একটি অংশ।

সংগঠনটির কেন্দ্রীয় কমিটির আগামী বছরের জন্য নির্বাচিত সভাপতি সৈয়দ নুরুর রহমান জানান, ‘পরিবার হচ্ছে সবচেয়ে বড় বিশ্ববিদ্যালয়। পরিবার থেকেই আমাদের নৈতিকতা এবং মূল্যবোধের জাগরণ ঘটে। তাই পরিবারের মধ্যে শৃঙ্খলা এবং সাধারণ মানুষের ও জীব-বৈচিত্র্যের সাথে পরিচয় হওয়া প্রয়োজন। তাই দেশের সব জেলার মানুষের সাথে সপরিবারে অংশগ্রহণে একটি দেশজ সংস্কৃতির মেলবন্ধনের সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে।

তিনি জানান, প্রতি বছরই এ আয়োজনটি হয়ে থাকে। চলন্ত নৌযানেই সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। চলতি বছর সভাপতিত্ব করছেন মো. আসলাম হোসাইন।

ভ্রমণে সঙ্গীত, ক্রীড়াসহ নানা অনুষ্ঠানের আয়োজন ছিল। আবার এপেক্স পরিবারের যেসব শিক্ষার্থীরা ভালো ফলাফল করেছে, তাদের সংবর্ধনাও দেয়া হয়। হেমন্তের পড়ন্ত বিকেলে দৃশ্য দেখার জন্য যেন হাতছানি ছিল সংবর্ধিতদের। সকলের চোখ তখন বাইরের দিকে। সূর্যের আলো ধীরে ধীরে ম্লান হলো। হেমন্তের সন্ধ্যের শিশির ঝরছে। ধলেশ্বরীর বুক চিরে তারা রওনা হন রাজধানী ঢাকার দিকে।

নির্মল আনন্দ উপভোগ করে ধলেশ্বরী পাড়ি দিয়ে বুড়িগঙ্গায় প্রবেশ করতেই ছড়িয়ে পড়ে সেই চিরচেনা দুর্গন্ধময় পরিবেশ। তখন শিশু অর্নব তার পিতাকে প্রশ্ন করে, ‘বাবা এই নদীটা এতো পঁচা কেন ? এই পানি সুন্দর করা যায় না? বাবা খোর্শেদ উল আলম অরুন উত্তরে বলেন ‘বাবা তোমার মতো এই অনুভবটুকু যদি আমাদের মতো সচেতনদের মধ্যে থাকতো, তবে বুড়িগঙ্গাটিকে আগেই বাঁচানো যেতো’।

লঞ্চে উপস্থিত আরিফুর রহমান বলেন, ‘এখনও নদীগুলো রক্ষায় কার্যকরী ব্যবস্থা গ্রহণ করা না হলে, নদীমাতৃক প্রিয় বাংলাদেশের অপূরণীয় ক্ষতি হয়ে যাবে। বুড়িগঙ্গা এখন এতোটাই বিব্রতকর অবস্থায় ফেলেছে যে, বিদেশী অতিথিদের নিয়ে এখন নৌ বিহার শুরু করতে হয় মেরি এন্ডারসনের পরিবর্তে ৩৮ কিলোমিটার দূরে মুন্সীগঞ্জের মাওয়া ঘাট থেকে’।

পরে ভ্রমণ যাত্রীরা রাতে সদরঘাটে অবতণন করে, স্ব স্ব গন্তব্যে চলে যান।

বাসস