বাঙ্গালির মুক্তি সংগ্রামের স্মৃতির স্থাপতি টঙ্গীবাড়ীর সৈয়দ মাইনুল

জাহাঙ্গীর আলম: ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধেও ৩০ লাখ শহীদের স্মৃতি ধরে রাখার জন্য ঢাকার সাভারে জাতীয় স্মৃতিসৌধ নির্মানের পরিকল্পনা গ্রহন করে বাংলাদেশ সরকার। গনর্পূত বিভাগ পরিকল্পিত জাতীয় স্মৃতি সৌধের জন্য নকশা আহ্বান করে বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করে। মুন্সীগঞ্জ জেলার টঙ্গীবাড়ীর ২৬ বছর বয়সের সৈয়দ মাইনুল হোসেন তখন তরুন স্থপতি। তিনি তখন কাজ করছিলেন বাংলাদেশ কনসালট্যান্ট লিমিটেড এ জুনিয়র স্থপতি হিসেব। ১৯৬৫ সালের ভারত-পাকিস্থান ১৯৭১ সনের পাকিস্থান-বাংলাদেশর যুদ্ধেও নির্মমতা দেখে তিনি কল্পনায় অনুভব করে সেই উপলব্ধি থেকেই স্মৃতি সৌধের নকশা করে জমা দেন দুই বারের আহ্বানকৃত ৫৭টি নকশার মধ্যে তার নকশাই প্রথম হয়। তার করা নকশায় নির্মিত হয় অমর স্থাপনা জাতীয় স্মৃতিসৌধ। তার নকশা অনুযায়ী স্মৃতিসৌধের বেদিমূল থেকে উঠে দাড়িয়েছে সাতটি ত্রিকোন কলাম, যার মধ্যে সবচেয়ে বড়টি ১৫০ ফুট উচু।

এই সাতটি কলামে বাংলাদেশের মুক্তি সংগ্রামের সাতটি পর‌্যায় সূচিত হয়েছে। স্তম্ভের সাতটি ত্রিকোন কলাম বিভিন্ন উচ্চতার। ইংরেজী এল আকৃতির স্তম্ভটি একেক পাশ থেকে একেক ধরনের দৃশ্যমান। সবচেয়ে বড় স্তটির সবচেয়ে ছোট বেজ, আর সবচেয়ে ছোট স্তম্ভটির সবচেয়ে বড় বেজ। ছোট দেওয়াল দিয়ে পরবর্তী ধাপের দেওয়াল গুলো বেষ্টিত। স্তম্ভের সামনে ও চারপাশে ধাপে ধাপে জলাধারের ব্যবস্থা, হ্যালিপ্যাড সবুজ বেষ্টনি সহ অনেক দৃষ্টি নন্দন বিষয় যুক্ত হয়। ১৯৭৯ সালে প্রকল্পের কাজ শুরু হয়। মূল কলাম সাতটি কংক্রিটের ঢালাই। বাকি চত্বরের সকল নকশায় লাল ইটের ব্যবহার স্থাপনাটিকে দৃষ্টিনন্দন করেছে। কংক্রিটের সাতটি কলাম ১৯৫২ থেকে ১৯৭১ সাল পর্যন্ত বাংলাদেশ স্বাধীনতা সংগ্রামের বড় বড় সাতটি আতœত্যাগ ও আন্দোলনের প্রতীক।

একেবাওে নিচের খাঁজটি ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনের প্রতীক, তারপরের খাঁজটি ১৯৫৪ সালের যুক্তফ্রন্টের নির্বাচনের প্রতীক, পরেরটি ১৯৫৮ সালে সামরিক আইউব বিরোধী আন্দোলন, পরেরটি ১৯৬২ সালের ছাত্র আন্দোলন, পরেরটি ১৯৬৬ সালের ছয় দফা, পরেরটি ১৯৬৯ সালের আগরতলা ষড়যন্ত্রেও মামলার বিরুদ্ধে গন আন্দোলন এবং একেবারে উচু খাঁজটি ১৯৭১ সালের স্বাধীনতা যুদ্ধেও প্রতীক। সাতটি বড় অন্দোলনকে সাতটি খাঁেজ অত্যন্ত নান্দনিকভাবে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে।

স্থাপতি সৈয়দ মাইনুল হোসেন ১৯৫২ সালের ৫ই মে মুন্সীগঞ্জ জেলার টঙ্গীবাড়ী থানার দামপাড়া গ্রামে জন্ম গ্রহন করেন। সৈয়দ মাইনুল হোসেনের দাদা ছিলেন সাহিত্যিক সৈয়দ এমদাদ আলী আর নানা কবি গোলাম মোস্তফা বাবা সৈয়দ মুজিবুল হক এবং মায়ের নাম সৈয়দা রাশিদা হক এর তিন সন্তানের মধ্যে মাইনুল বড়। তিনি বাবার চাকুরির কারনে ফরিদপুর মিশন প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকে প্রতিষ্ঠানিক শিক্ষা শুরু করেন। প্রাথমিক শিক্ষা শেষে ১৯৬২ সালে তিনি ভর্তি হন ফরিদপুর জেলা স্কুলে। ১৯৬৭ সালে উচ্চ মাধ্যমিক পাশ করেন ১৯৭০ সালে বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় থেকে তিনি স্থাপত্য বিদ্যায়(নকশা) ভর্তি হণ। তিনি ১৯৭৬ সালে প্রথম শ্রেনীতে স্থাপত্য বিদ্যা পাশ করেন। সৈয়দ মাইনুল হোসেন ১৯৮২ সালে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধহন। তার দুই মেয়ে সৈয়দা তাহরিমা ও সৈয়দা তানজিলা হোসেন।

বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পরপরই শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে নতুন সরকার মহান মুক্তিযুদ্ধের শহীদদের স্মৃতি ধরে রাখার জন্য সাভারে জাতীয় স্মৃতিসৌধ নির্মানের পরিকল্পনা করেন। আর ১৯৭২ সালের ১৬ই ডিসেম্বর বাংলাদেশের প্রথম বিজয় দিবসে প্রধানমন্ত্রী শেখ মুজিবুর রহমান জাতীয় স্মৃতি সৌধের ভিত্তি প্রস্তর স্থাপন করেন। তার পর তিন ধাপে এই দীর্ঘ স্থাপত্য পরিকল্পনার কাজ ১৯৮২ সালে শেষ হয়। ১৯৮২ সালে রাষ্ট্রপতি জেনারেল এরশাদ জাতীয় স্মৃতি সৌধ উদ্ভোধন করেন। দুঃখের বিষয় হল সেই অনুষ্ঠানে স্থাপতি মাইনুলকে রাষ্ট্রীয় ভাবে আমন্ত্রন করা হয়নি। রাষ্ট্রীয় তথাকথিত ভিআইপিরা চলে যাওয়ার পর সেখানে গিয়ে জনতার কাতারে দাড়িয়ে তখন স্মৃতি সৌধটি দেখেছিলেন স্থাপতি মাইনুল। বাঙ্গীলির মুক্তি সংগ্রামের অমর নির্দশন জাতীয় স্মৃতিসৌধের স্থাপতি ৬২ বছর বয়সে ১০ই নভেম্বর ২০১৪ইং হার্ট অ্যাটাকে প্রায় নিরবেই চলে যান না ফেরার দেশে। সৈয়দ মাইনুল হোসেনের খালাতো ভাই জুলফিকার রহমান বলেন ‘‘ মাইনুল আর আমি ছিলাম সমান বয়সের সে ছোট বেলা থেকে কম কথা বলত, চুপচাপ থাকত। পড়াশুনায় ও ছিল প্রখর মেধাবী।’’

১৯৭৬ সাল থেকে ২২ বছরের কর্ম জীবনে সৈয়দ মাইনুল হোসেন ৩৮টি বড় বড় স্থাপনা নকশা করেন। তার উল্লেখ্যযোগ্য নকশা গুলো হল: জাতীয় স্মৃতিসৌধ (১৯৭৮), জাতীয় যাদুঘর ঢাকা (১৯৮২), ভোকেশনাল টিচার্স ট্রেনিং ইনষ্টিটিউট ও ভোকেশনাল ট্রেনিং ইনষ্টিটিউট (১৯৭৭), বাংলাদেশ বার কাউন্সিল ভবন (১৯৭৮), চট্রগ্রাম ইপিজেড এর অফিস ভবন (১৯৮০), শিল্পকলা একাডেমীর বারো’শ আসন বিশিষ্ট অডিটোরিয়াম এবং উত্তরা মডেল টাউন আবাসিক প্রকল্প (১৯৮৫)। এই মহান শিল্পী ১৯৮৮ সালে রাষ্ট্রীয় ভাবে একুশে পদক ও ২০০৭ সালে শেলটেক পদকে ভূষিত হন। তার ভাইপো নাফিজ বিন জাফর ২০০৮ সালে বাংলাদেশ থেকে একমাত্র অস্কার পুরস্কার প্রাপ্ত ব্যাক্তি যিনি অ্যাকাডেমি অব মোশন পিকচার আর্টস অ্যান্ড সায়েন্স বিভাগে বিজ্ঞান ও প্রকৌশল পুরস্কার জয়লাভ করেন। বাঙ্গালী জাতি চিরদিন এই মহান শিল্পীকে শ্রদ্ধার সাথে স্মরন করবে। তারা সবাই এই মহান মানুষটিকে হৃদয়ের অন্তস্থল থেকে শ্রদ্ধা জানাবে।

বিক্রমপুর চিত্র

Comments are closed.