দুর্নীতির আখড়ায় পরিণত সিরাজদিখানের পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি

নির্বাচনকে সামনে রেখে কর্মকর্তারা সক্রিয়
মোজাম্মেল হোসেন সজল: মুন্সীগঞ্জের সিরাজদিখান পল্লী বিদু্যুৎ সমিতি দুর্নীতির আখড়ায় পরিণত হয়েছে। খোদ সমিতি লোকজনই জড়িয়ে পড়েছে মিটার, খুটি ও তার বাণিজ্যে। সমিতির লোকজনের যোগসাজশে গড়ে উঠা দালাল চক্রের কাছে জিম্মি হয়ে পড়েছে গ্রাহক সেবা। দালালদের টাকা দিয়েও বছরের পর বছর মিটার ও বিদ্যুৎ সংযোগ পাচ্ছেনা গ্রাহকরা। গ্রাহকদের টাকা পকেটে নিয়ে দেই, দিচ্ছি বলে গ্রাহকদের হয়রানি করে চলেছে। পল্লী বিদ্যুতের এক শ্রেণীর অসাধু কর্মকর্তা কর্মচারীদের যোগসাজসেই চলছে এ ওপেন বাণিজ্য। ঘুষ বাণিজ্যের কাছে গ্রাহক সেবা এখানে শূণ্যে নেমে এসেছে। আর এসব বাণিজ্যের কারণে রাজনৈতিক পরিচয়ের লোকজন যে কোন মূল্যে মুন্সীগঞ্জ পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির কার্যকরী কমিটির সভাপতিসহ পরিচালক হচ্ছেন। সমিতির নির্বাচনে জোরজবরদস্তির ঘটনাও ঘটছে।

অভিযোগ উঠেছে, নিজ এলাকায় ভোট কেন্দ্র ও ভোটারদের ভয়ভীতি প্রদর্শন করে পরপর তিনবার বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় সমিতির কার্যকরী কমিটির সভাপতি হয়েছেন সিরাজদিখানের জাকির হোসেন। পরিচালক হিসেবে রয়েছেন মাহবুবুর রহমান মিন্টু। সমিতির নিয়মানুয়ায়ী আগে এলাকার বিদ্যুৎ গ্রাহকদের ভোটে এরিয়া ভিত্তিক নির্বাচনে জয়লাভ করতে হয়। এতে ৯ জন পরিচালক নির্বাচিত হয় ও ৩ জন মহিলাকে বিনাভোটে আরইবি অনুমোদন করে ১২ সদস্যের পরিচালক নির্বাচিত করেন। পরে পরিচালকদের ১২ সদস্যের ভোটে কার্যকরী কমিটি গঠিত হয়। এরমধ্যে সভাপতি একজন, সহ-সভাপতি একজন, কোষাধ্যক্ষ একজন ও সচিব হন একজন। বাকি ৮জন হন পরিচালক। আরইবির ৩ জন মহিলা পরিচালক থাকায় পল্লী বিদ্যুৎ অফিস কর্মকর্তারাও এতে খবরদারি করেন। তাদের যোগসাজশে সমিতির সভাপতিসহ কার্যকরী কমিটি গঠিত হয়।

জানা গেছে, বিগত দিনগুলোতে সিরাজদিখানের ৫ ও ৬ নং এরিয়া ভিত্তিক নির্বাচনে সমিতির বর্তমান সভাপতি আওয়ামী লীগ সমর্থিত জাকির হোসেন ও বিএনপি সমর্থিত পরিচালক মাহবুবুর রহমান মিন্টু প্রভাবখাটিয়ে নিজ বাড়ির এলাকায় ভোট কেন্দ্র বসিয়ে ভোটারদের ভয়ভীতি দেখিয়ে জয়লাভ করেন। সমিতির নিয়মমতে, যদিও প্রার্থীর নিজ এলাকায় ভোট কেন্দ্র বসানোর কোন নিয়ম নেই। এদিকে, এবারও সেরকম আয়োজন চলছে বলে অন্য প্রার্থীদের অভিযোগ। আগামী ২১ শে জানুয়ারি সিরাজদিখানে সমিতির বর্তমান সভাপতি জাকির হোসেন (৫ নং এরিয়া) ও ২২ শে জানুয়ারি পরিচালক মাহবুবুর রহমান মিন্টু (৬ নং এরিয়া) নির্বাচনের দিনক্ষণ নির্ধারণ করা হয়েছে। প্রথমে সমিতির পরিচালক হতে হলে তাদেরকে ওই এলাকার এরিয়াভিত্তিক নির্বাচনে বিদ্যুৎ গ্রাহকদের ভোটে জয়লাভ করতে হবে। আর এ নির্বাচনে জয়লাভ করার জন্য এবারও তাদের নিজ নিজ এলাকায় ভোটকেন্দ্র বসানোর চেষ্ঠা করছেন। এতে করে অন্যান্য প্রার্থীদের মধ্যে ক্ষোভ বিরাজ করছেন। এরিয়া ভিত্তিক নির্বাচনের পর আগামী ২৯ শে জানুয়ারি মুন্সীগঞ্জ পল্লী বিদ্যুৎ অফিসে অনুষ্ঠিত হবে সমিতির কার্যকরী কমিটির নির্বাচন।

এদিকে, বর্তমান কমিটির সভাপতি ও পরিচালক হওয়ার পর থেকেই তাদের বিরুদ্ধে ঘুষ-বাণিজ্যের বিস্তর অভিযোগ এলাকাবাসীর।

এদিকে, ভূক্তভোগী গ্রাহকদের অভিযোগ, সিরাজদিখান উপজেলা পল্লী বিদ্যুৎ অফিসে সময়মত টাকা জমা দিয়েও গ্রহকরা বিদ্যুৎ সংযোগসহ মিটার পাচ্ছেননা। ২০-৩০ জনের একটি দালাল চক্রের কাছে জিম্মি হয়ে পড়েছে পল্লী বিদ্যুৎ অফিস। দালাল ছাড়া এখানে কোন কাজ হয়না। আবার দালাদের কাছে টাকা দিয়েও বছরের পর বছর সংযোগ পাচ্ছেনা গ্রাহকরা। পল্লী বিদ্যুতের সংযোগ পেতে মিটারের মূল্য ৬শ’ টাকা আর সদস্য ফরমের মূল্য ১ শ’ টাকা। সবমিলিয়ে মোট ৭ শ’ টাকা জমা দেবার বিধান থাকলেও এখানে গ্রাহকদের কাছ থেকে হাতিয়ে নেওয়া হচ্ছে ১০ থেকে ১২ হাজার টাকা। প্রায় ২ বছর পূর্বে বালুরচর ইউনিয়নের মোল্লা কান্দি গ্রামের কোরবান আলীর ছেলে মো. সেলিম ১টি মিটারের জন্য ১২ হাজার টাকা দেয় পল্লী বিদ্যুতের দালাল হামিদুলের কাছে। কিন্তু দেই দিচ্ছি বলে ২ বছর হয়ে গেলেও আজও পর্যন্ত সে মিটার পায়নি। এ ব্যাপারে হামিদুলের সাথে যোগাযোগ করা হলে সে পল্লী বিদ্যুতের সদস্য সেবক পরিচয় দিয়ে স্বীকার করে খুব শীঘ্রই মিটারেরর ব্যবস্থা করে দিবে।

একটি সূত্র জানিয়েছে পল্লী বিদ্যুতের ওয়ারিং পরিদর্শক আশরাফুল ইসলাম ও কর্মচারী ইসমাইল হোসেনের সাথে যোগসাজসে এসব দালালরা নিরীহ গ্রাহকদের কাছ থেকে লাখ লাখ টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে।

এ ব্যাপারে মুন্সীগঞ্জ পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির সভাপতি জাকির হোসেন বলেন, এলাকায় কিছু অনাকাঙ্খিত ঘটনার জন্য লোকজন আমার বিরুদ্ধে ঘুষ-বাণিজ্যের অভিযোগ ছড়াচ্ছে। এসব ঘটনার সঙ্গে আমি ও সমিতির কোন কর্মকর্তা জড়িত নয়।

নির্বাচন প্রসঙ্গে তিনি বলেন, এলাকার যোগাযোগ ব্যবস্থার উপর নির্ভর করে এরিয়াভিত্তিক নির্বচনের ভোট কেন্দ্র কোথায় হবে। যে এলাকার লোকজন সহজেই ভোট কেন্দ্রে যেতে পারে সেখানে ভোট কেন্দ্র স্থাপন করা হয়।

উপজেলা পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির ডিজিএম দেব কুমার মালো জানান, আমাদের কাছে প্রায় ৪ হাজার বিদ্যুৎ গ্রাহকের আবেদন জমা রয়েছে। ৩-৪ বছর বিদ্যুৎ সংযোগ বন্ধ থাকার পর গত জুন মাস থেকে ১৫০০বিদ্যুৎ সংযোগ মিটার দেয়া হয়েছে। ৭শ’ মিটার সংযোগ দেয়ার প্রক্রিয়াধীন রয়েছে।

তিনি আরও বলেন, গ্রাহকরা সকালে আবেদন করে বিকেলে সংযোগ দেয়ার ব্যবস্থা করতে হবে। এবং এটাই হওয়ার নিয়ম ছিল। কিন্তু দিনের পর দিন ঘুরে গ্রাহকরা বিদ্যুৎ সংযোগ না পাওয়ায় নানা ধরণের অভিযোগ শুনতে হয় আমাদের।

মুন্সীগঞ্জ বার্তা

Comments are closed.