নদী সংযুক্ত খাল যখন ডোবা, অতঃপর দখল!

ভবতোষ চৌধুরী নুপুর: নদী বেষ্টিত মুন্সীগঞ্জ জেলা সদরের সাথে উপজেলার আশপাশের অন্যান্য জেলার যোগাযোগের সহজতর মাধ্যম হিসেবে নদী সংযুক্ত খাল গুলোর বিশেষ প্রাধান্য ছিলো। কালের বিবর্তন আর কর্তৃপক্ষের বেখেয়ালী উন্নয়নসহ পরিবেশ অধিদপ্তরের গা-ছাড়া কর্মকাণ্ডে হারিয়েছে নদী-নালা, খাল-বিল গুলোর যৌবন।

মুন্সীগঞ্জ শহরের তেমনি কিছু রুপ-যৌবন, বর্ন-গঠন পরিবর্তন করে ফেলা ঐতিহ্যবাহী খালের চিত্র নিয়ে এ প্রতিবেদন- “খাল যখন ডোবা অতঃপর দখল”

মুন্সীগঞ্জ পৌরসভা ‘এ’ গ্রেড পৌরসভায় উন্নিত হওয়ার পর বিভিন্ন সময়ে জরাজীর্ণ খাল গুলো উন্নত শহরের মান রক্ষার্থে পয়োনিষ্কাশন ও জলাবদ্ধতা দূরীকরণে প্রধান মাধ্যম হিসেবে ব্যবহারের পরিকল্পনা নেয়া হয়। এবং ২০০৯ ও ২০১০ সালে মুন্সীরহাট খাল ও গনকপাড়া খাল দুটি এডিবি ও ইস্টিপ- ২ উন্নয়ন প্রকল্পের অর্থায়নে ৪ কোটি ৬ লাখ টাকা ব্যয়ে ড্রেন, রাস্তা ও কালভার্ট নির্মাণের পরিকল্পনা হাতে নেয়া হয়।

মুন্সীগঞ্জ পৌরসভার তথ্য মতে- ‘মুন্সীরহাট খালটি’ মেঘনা নদী থেকে শহরের মধ্যখান দিয়ে প্রবাহিত হয়ে ধলেশ্বরী নদীতে পতিত হয়েছে। এই খালটির উত্তর ইসলামপুর এলাকার সুইপার কলোনি থেকে মুন্সীরহাট এলাকার পাঁঘড়িকান্দি পর্যন্ত প্রায় ১৫০০ মিটার ড্রেনসহ রাস্তা নির্মাণের কাজ শুরু করা হয় ২০০৯ সালে। এশিয়ান উন্নয়ন ব্যংকের অর্থায়নে ২ কোটি ৭০ লক্ষ টাকার কাজটি অসমাপ্ত রেখেই শেষ হয় ২০১০ সালে।

এদিকে, ‘কাটাখালি-গনকপাড়া খাল’ যা টঙ্গীবাড়ি উপজেলার দিঘীরপাড় এলাকাস্থ পদ্মা নদী থেকে শুরু হয়ে শহরের মধ্যদিয়ে প্রবাহিত হয়ে নয়াগাঁও এলাকা সীমানার ধলেশ্বরী নদীতে পতিত হয়।

শহরের পয়োনিষ্কাশন ও জলাবদ্ধতার নিরসনে এশিয়ান উন্নয়ন ব্যংকের ইস্টিপ-২ প্রকল্পের আওতায় ২০০৯ সালে কোর্টগাঁও এলাকা থেকে গনকপাড়া কালভার্ট পর্যন্ত প্রায় ১১৬০ মিটার ব্লক দিয়ে খালের দুইপাশ বেধে ড্রেন করা হয়। এ কাজে ব্যায় করা হয় ১ কোটি ৩৬ লক্ষ টাকা। একাজটি ও প্রায় অসমাপ্ত রেখেই বন্ধ করে দেয়া হয়।

মুন্সীগঞ্জ পৌরসভার উপসহকারী প্রকৌশলী মো. ফেরদৌস আহামেদ জানান, কোটি টাকার প্রকল্প শুধু নাম মাত্রই করা হয়েছে। এদিয়ে কার্যত তেমন কোন উপকার আসেনি। প্রকল্প দুটির ঠিকাদার প্রতিষ্ঠান মেসার্স মিয়াজ নুনা (জেবি) ও বিল্ডার্স ইঞ্জিনিয়ার স্ব স্ব কাজ সমাপ্ত করেছে। কিন্তু বাস্তবতা হলো নামমাত্র কিছু কাজ হয়েছে। অসমাপ্ত রয়েছে বেশিরভাগ কাজই।

বাধ্যকে জরাজীর্ণ খাল গুলো উন্নয়নের নামে বিভিন্ন সময়ে অর্থ লোপাটা আর খাল দখলের কিছু চিত্র দেখা যা সরজমিন গিয়ে। দেখা যায় চলমান খাল গুলো ডোবা বানানোর পক্রিয়া। সরজমিন গিয়ে অভিযোগ পাওয়া যায়, চুপিসারে প্রশাসনিক কর্মকতাদের যোগসাজোশে মালিকানাধীন সম্পত্তির কিংবা লিজ সম্পত্তির সীমানার খালের অংশ ভরাট করা হচ্ছে নিশ্চিন্তে।

এমনকি সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের সহযোগিতায় “আর এস” থেকে “এস এ” পরর্চাসহ নকশা পরিবতর্ন করে সরকারি খালের মালিক বনে গেছে অনেকেই।

সরকারি অর্থায়নে মুন্সীহাট খালের উপর চার থেকে ছয়টি পাকা ব্রীজ ও কালভার্ট রয়েছে। তারপরও প্রশাসনের চোখের সামনেই খালের প্রায় ১০ থেকে ১৫ শতাংশ জায়গা ভরাট করে “আল-আমীন সরকার কম্পেক্স” মার্কেটের সড়ক তৈরী করা হয়েছে। আর এ সুযোগে অনেকেই নিজ জমির পাশের খাল ভরাট করে ফেলছে। খাল হয়ে গেছে নালা-ডোবা ও ময়লা ফেলার ভাগার।

এদিকে, একই চিত্র জেলা প্রশাসক কার্যালয়ের ৫০ গজ দূরত্বে অবস্থিত কাটাখালি খালের। বর্তমানে খালটির চিত্র দেখে বোঝার উপায় নেই যে কখনো এই খালে মালবাহী নৌকা ও যাত্রীবাহী লঞ্চ চলাচল করেছে। খালের যৌবন হারিয়ে আজ ডোবা আর নালার পরিনত হয়েছে। পরিবেশের ভারসাম্য হারিয়ে জীবনযাত্রার মান এখন বিপর্যয়ের মুখে।

জেলা পরিবেশ অধিদপ্তর, জেলা ভূমি অফিস ও জেলা প্রশাসক কার্যালয়ের দুই-চারশত গজের মধ্যেই মুন্সীগঞ্জ শহরে চলছে এসকল দখলদারদের খাল ভরাটের ও দখলের উৎসব।

গত ২৭ অক্টোবর জেলা ভূমি অফিস কর্মকর্তারা গনকপাড়া খালের কিছু অংশ উদ্ধারে যায়। সরজমিন এ নিউজ কভারেজ করতে গিয়ে দেখা যায় কিভাবে ১২ থেকে ১৫ কিঃমিটারের খালটি ডোবা বানানো হয়েছে। বিভিন্ন সময় দলীয় প্রভাব আর কর্তৃপক্ষের শুভদৃষ্টির কারণে খালের জায়গা ভরাট করে সহজ-সরল মানুষদের প্রতারনার ফাঁদে ফেলা হচ্ছে।

মুন্সীগঞ্জ-মুক্তারপুর সড়কের পাশে নতুনগাঁ এলাকার ব্রাক অফিসের পাশের গনকপাড়া খালের কালভার্ট সংলগ্ন প্রায় ২০ শতাংশ জায়গা ভরাট করে এক প্রতারক তিন ব্যক্তির কাছে ১৫ শতাংশ জমি বিক্রি করে। আর এ ঘটনা ঘটে পরিবেশ অধিদপ্তর কার্যালয়ের ২০ গজ দূরত্বের মধ্যে।

প্রতারনার শিকার গোলাম রব্বানী, মো. আজমুল, মো. আলমগির জানান, আরো ৭ বছর আগে আব্দুল কুদ্দুসের ৩৩০৭ দাগের ৪৭ শতাংশ সম্পত্তি থেকে আমরা তিন শরিক ১৫ শতাংশ সম্পত্তি ক্রয় করি। কিন্তু গত ১৫ সেপ্টেম্বর ভূমি অফিস কর্তৃক একটি নোটিশ আসে আমাদের বসতকৃত সম্পত্তি সরকারি খালে যায়গায় পরেছে। এবং ওই দিন তারা আমাদের বাসস্থান ভেঙ্গে দিয়ে যায়।

এ ঘটনার সত্যতা স্বীকার করে জেলা ভূমি কর্মকর্তা পুর্শীয়া আক্তার ঘটনার সত্যতা স্বীকার করে জানান, প্রাথমিক ভাবে গনকপাড়া কালভার্ট সংলগ্ন সরকারি খালের প্রায় ১০ শতাংশ জায়গা উদ্ধার করা হচ্ছে। এবং এই খালের বিভিন্ন স্থান ভরাটের খোঁজ পাওয়া গেছে যা জেলা প্রশাসকে অবহিত করা হয়েছে। পরবর্তীতে তা উদ্ধার করা হবে। এবং সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হবে।

অবাদে পরিবেশের ধংস করে নদী-খাল ভরাটের চিত্র সংরক্ষণ করে জেলা পরিবেশ অধিদপ্তরের সহকারী পরিচালক নূর-আলমের সাথে যোগাযোগ করলে তিনি বলেন, এ বিষয়ে আমাদের কাছে কেউ অভিযোগ করেনি। অভিযোগ করলে ব্যবস্থা গ্রহন করা হবে।

ওই কর্মকর্তাকে প্রশ্ন করা হয় অভিযোগ করলেই ব্যবস্থা নিবেন কিন্তু আপনার অফিসের কয়েক গজের মধ্যে খালের জায়গা ভরাট করে পরিবেশের ভারসাম্য নষ্ট করা হচ্ছে এবং জেলার বিভিন্ন খাল-নদীর জায়গা ভরাট করা হচ্ছে এ বিষয়ে আপনারা কি ব্যবস্থা নিয়েছে।

তিনি উত্তর না দিয়ে বলেন, আপনাকে এ বিষয়ে তথ্য দিতে বাধ্য না। আমাদের যা লিখার যা করার করতে পারেন।

পরিবেশ রক্ষাকারী কর্মকর্তা কথা শুনে মনে হয় সবকিছুই যেন তাদের নখদর্পণে। অভিযোগ পাওয়া যায় অর্থের লোভে তারা অন্ধ। অর্থ না পেলেই ক্ষিপ্ত তারা। এ চিত্রে যেন জেলার সর্বত্রই।

গত ৩০ সেপ্টেম্বর এটিএন টাইমসে “মুন্সীগঞ্জে চলছে খাল দখল ও ভরাটের মহোৎসব” শিরোনামে নিউজ প্রচারের আগে জেলা প্রশাসক সাইফুল হাসান বাদলের সাথে কথা হলে তিনি জানান, খালসহ বিভিন্ন জলাশয় ভরাট আইনগত দন্ডনীয় অপরাধ। এ ধরনের ঘটনার সাথে যারা জড়িত তার কেউই রেহাই পাবে না। এবং ভরাট করা জলাশয় উদ্ধার করা হবে।

তবে, ৪ মাস পেড়িয়ে গেলেও প্রকৃতপক্ষে এখনো উল্লেখ্যযোগ্য কোন অগ্রগতি চোখে পরেনি। উদ্ধার হয়নি খালের জায়গা। উপরন্তু নতুন করে ভরাট ও দখল হচ্ছে জেলার সরকারি খাল-পুকুর-নদীসহ জলাশয়। আইনগত নিষেধাজ্ঞা থাকার সত্ত্বেও নিশ্চুপ কেন কর্তৃপক্ষ। এরুপ নানা প্রশ্ন এখন জেলার সর্বত্র।

এটিএন টাইমস