হাঁটুর গুলির দাগ রফিকুলকে স্মৃতিতাড়িত করে

মুক্তিযোদ্ধা রফিকুল ইসলাম বলেন, ‘এত দিন পর যখন ডান হাঁটুর ওপরে গুলির ওই দাগটি দেখি, তখন স্মৃতিকাতর হয়ে পড়ি’
যদি একবার তার দেখা পেতেন? মধ্যবয়সে এসে বীরপ্রতীক মো. রফিকুল ইসলামের বারবার না দেখা ওই মানুষটার কথা মনে পড়ে। সীমান্তে পাকিস্তানি সেনাদের সঙ্গে যুদ্ধে গুলিবিদ্ধ হলে মরণাপন্ন অবস্থায় হাসপাতালে ভর্তি করা হয় তাকে। দিন তিনেক তিনি জ্ঞানহীন ছিলেন। পরে ক্যাপ্টেন এ টি এম হায়দারের কাছে শুনেছেন, ডি কে পাল নামের এক শল্যচিকিৎসক তার প্রাণ রক্ষা করেছেন। রফিকুলকে স্মৃতিতাড়িত করে হাঁটুর গুলির দাগ

রফিকুল ইসলাম বলেন, তখন অবশ্য ওই ডাক্তারের কথা মনে আসেনি। এত দিন পর যখন ডান হাঁটুর ওপরে গুলির ওই দাগটি দেখি, তখন স্মৃতিকাতর হয়ে পড়ি। ভাবি, ওই ডাক্তার ভদ্রলোক না জানি কোথায় আছেন! কিন্তু একাত্তরে আহত অবস্থায় হাসপাতালে শুয়েও মন পড়ে ছিল যুদ্ধের ময়দানে। শুধু মনে হতো, যুদ্ধটা শুরুই করতে পারলাম না!

জুন মাসের কোন দিনের যুদ্ধে রফিকুল ইসলাম আহত হয়েছিলেন, তার তা মনে নেই। তবে সেটা ছিল যুদ্ধের শিক্ষানবিশি। ২ নম্বর সেক্টরের গেরিলা যোদ্ধাদের ঢাকায় পাঠানোর আগে সীমান্তবর্তী এলাকায় যুদ্ধ করতে পাঠানো হতো।

রফিকুল ইসলাম বলেন, আহত হয়ে হাসপাতালের শয্যায় শুয়ে আল্লাহকে ডেকেছি। তাকে বলেছি, যেন সত্যিকারের যুদ্ধে ভূমিকা রাখতে পারি। আল্লাহ আমার ডাক শুনেছিলেন। আমি যুদ্ধ করতে পেরেছি।

অবরুদ্ধ ঢাকা, মুন্সীগঞ্জ ও কুমিল্লায় গেরিলাযুদ্ধ করে বীরত্বপূর্ণ অবদানের জন্য বীরপ্রতীক খেতাব পান মো. রফিকুল ইসলাম। মুন্সীগঞ্জের গজারিয়া উপজেলার ভাটেরচর গ্রামের আবদুল আলী ও ফরিদা খাতুনের ছেলে রফিক যুদ্ধের আগে ছিলেন ফরিদপুরে। মামাতো ভাই মো. আইনুদ্দিনের কর্মস্থল ফরিদপুরে গিয়েছিলেন পড়াশোনা করতে। পড়তেন দশম শ্রেণীতে। জেলা শহরে থাকার কারণে রাজনৈতিক নেতাদের অনেকের কাছাকাছি যাওয়ার সুযোগ হয়েছিল তার। স্কুলের ছাত্র হওয়ার পরও ছাত্ররাজনীতির সঙ্গে জড়িয়ে পড়েন তিনি।

রফিকুল ইসলাম জানান, তার জানামতে একাত্তরে বাংলাদেশের প্রায় প্রতিটি স্কুলেই ছাত্ররাজনীতি চালু ছিল। সে সুবাদে তিনি যুক্ত হলেন ছাত্রলীগের সঙ্গে। সহপাঠীদের প্রায় সবাই ছিলেন ছাত্রলীগের কর্মী-সমর্থক। একেবারেই যারা রাজনীতি করতেন না, তারাও সমর্থন করতেন কোনো না কোনো রাজনৈতিক দলকে।

রফিকুলকে স্মৃতিতাড়িত করে হাঁটুর গুলির দাগ
জেলা আওয়ামী লীগ নেতাদের সঙ্গেও সে সময়ের ছাত্রদের ঘনিষ্ঠতা ছিল। তারা কখনও কখনও ছাত্রলীগের কর্মীদের রাজনৈতিক কাজে অংশ নিতে বলতেন। রফিকুলের প্রিয় একজন নেতা ছিলেন ইমামউদ্দিন। তিনি ছিলেন ফরিদপুর জেলা আওয়ামী লীগের নেতা এবং প্রাদেশিক পরিষদের সদস্য। পরবর্তীকালে জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতিও হয়েছিলেন। ইমামউদ্দিনকে ঘিরে বঙ্গবন্ধু অনুসারীদের ভিড় ছিল। ছাত্রলীগ কর্মী হিসেবে রফিকুল ইসলামও তার কাছে যেতেন প্রায়ই। তিনিও দিকনির্দেশনা দিতেন আন্দোলনের।

একাত্তরের মার্চ মাসে গ্রামের বাড়িতে এসেছিলেন তিনি। ঢাকার কাছাকাছি হওয়ায় দেখছিলেন রাজনৈতিক উত্তাল সময়টিকে। শুনেছেন বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ভাষণ। পরে ২৫ মার্চ বিকেলে তিনি সদরঘাট থেকে লঞ্চযোগে রওনা হলেন ফরিদপুর যাবেন বলে। ভোরবেলা তাদের লঞ্চ নানারটেক পেঁৗছে। উদ্দেশ্য- শহরে যাবেন। টেপাখোলা পেঁৗছার পর জানতে পারেন, ঢাকায় পাকিস্তানি বাহিনীর সদস্যরা গণহত্যা শুরু করেছে।

আবারও ফিরে এলেন গ্রামের বাড়িতে। এপ্রিল মাস পুরোটা গ্রামেই কাটালেন। আলোচনা করলেন বন্ধুদের সঙ্গে। শের আলী, সফিউল্লাহ, শাহজাহান, আলী হোসেন- এমন প্রায় ১৫ জন একত্র হলেন ভারতে যাবেন বলে। এক রাতে তারা বাড়ি ছাড়লেন। নৌকায় করে ও হেঁটে কুমিল্লা জেলার মুরাদনগর থানার রামচন্দ্রপুর, ব্রা?হ্মণপাড়া উপজেলার চান্দলা, সাজঘর, ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলার মন্দবাগ হয়ে ভারতের কোনাবন পেঁৗছালেন। পথপরিক্রমণে অনেক কষ্ট করতে হয়।

রফিকুল ইসলাম বলেন, ভারত যাওয়ার সময় পথে দেখা দৃশ্যগুলো তাদের যুদ্ধে যাওয়ার জন্য আরও বেশি প্রেরণা জোগাতে থাকে। অবিশ্বাস্য ছিল সেসব দৃশ্য। হাজারে হাজারে মানুষ দেশ ছাড়ছে বাঁচার তাগিদে।

২৮ মে সীমান্ত পার হয়ে ভারতের আগরতলায় পেঁৗছেন রফিকুল ইসলাম। মেলাঘরে যুদ্ধের প্রশিক্ষণ পান। এবার দেশে ফেরার পালা। সময় যেতে চাইছে না। তার মতো অন্যরাও অস্থির হয়ে পড়েছিলেন- কখন দেশে গিয়ে পাকিস্তানি বাহিনীর বিরুদ্ধে লড়াইয়ে অংশ নেবেন। একসময় এলো সেই বিশেষ সুযোগ। ১৪ আগস্ট মুন্সীগঞ্জের গজারিয়া উপজেলার মধ্য ভাটেরচরে একটি সেতু ধ্বংসের সময় পাকিস্তান সেনাবাহিনীর নিক্ষিপ্ত সেলে আহত হন তিনি। সহযোদ্ধারা তাকে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেন। পরে সুস্থ হয়ে আবারও যুদ্ধে যোগ দিলেন।

তিনি জানান, মেলাঘর থেকে মুক্তিযোদ্ধাদের ৯৯ জনকে কয়েকটি দলে ভাগ করে ঢাকায় পাঠানো হয়েছিল। তাদের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল ঢাকার বিদ্যুৎ ব্যবস্থা অচল করে দেওয়ার। এই যোদ্ধাদের নয়টি অথবা ১১টি দলে ভাগ করা হয়েছিল। সঠিক সংখ্যাটি মনে করতে পারছেন না রফিকুল ইসলাম। প্রতিটি গ্রুপেই একেকজন কমান্ডার নিয়োগ করা হলো। রফিকুল ইসলামও একটি গ্রুপের দায়িত্ব পেলেন।

রফিকুল ইসলামের গ্রুপের দায়িত্ব পড়ে ঢাকার পাশে সিদ্ধিরগঞ্জ থেকে মাতুয়াইল হয়ে ঢাকায় যে বিদ্যুৎ লাইন গেছে, সেটা অচল করে দেওয়ার। নির্ধারিত রাতের নির্ধারিত সময়ে অপারেশন চালানোর পর অবাক হয়ে তাকান ঢাকা শহরের দিকে। একটু আগেও যে ঢাকা ছিল আলোয় ঝলমল, মুহূর্তেই তা কেমন ভুতুড়ে নগরীতে পরিণত হয়ে যায়।
এরপর মুন্সীগঞ্জের টঙ্গীবাড়ী, গজারিয়া, কুমিল্লার দাউদকান্দি, হোমনা, দেবীদ্বার, পানতি, পাহাড়পুর, কোনাবন এবং ঢাকার মাতুয়াইলে গেরিলাযুদ্ধ করেছেন। একটা অপারেশন করেন ষাটনলের উল্টো দিকে দৌলতপুরের টেকে। মেঘনা নদীর তীরে তারা অ্যাম্বুশ নিয়েছিলেন। উদ্দেশ্য ছিল নদীপথে পাকিস্তানি বাহিনীর যাতায়াতকালে তাদের আক্রমণ করবেন। সেখানে ইব্রাহিম নামের একজন মুক্তিযোদ্ধা শহীদ হলেন গুলিবিদ্ধ হয়ে। রফিকুল ইসলাম বলেন, যুদ্ধে যে বন্ধুদের হারিয়েছেন তাদের কথা এখনও মনে পড়ে।

রাজীব নূর – সমকাল