পাকিস্তানিদের নিষ্ঠুর ধ্বংসযজ্ঞের স্মারক মুন্সীগঞ্জের কেন্দ্রীয় বধ্যভূমি

পাকিস্তানি হানাদারদেরদের নিষ্ঠুর ধ্বংসযজ্ঞের স্মারক মুন্সীগঞ্জের কেন্দ্রীয় বধ্যভূমি । সরকারি হরগঙ্গা কলেজ ক্যাম্পাসের দক্ষিণ-পূর্ব কোণে এ বধ্যভূমিটির অবস্থান। ২০০৬ সালে এই বধ্যভূমিতে স্মৃতিসৌধ নির্মাণ করে গণপূর্ত বিভাগ। ২০ শতাংশ জায়গার ওপর বদ্ধভূমির স্মৃতিসৌধ। এই জায়গাটি বধ্যভূমির স্মৃতিসৌধের জন্য দান করেছে হরগঙ্গা কলেজ।

বর্তমানে বধ্যভূমিটি অরক্ষিত ও অবহেলিত। এর বাউন্ডারি দেয়ালের অধিকাংশ ভেঙে গেছে। ভেঙে গেছে প্রধান ফটকটিও। মহান বিজয় দিবসকে সামনে রেখে স্মৃতিসৌধের কিছু সংস্কার করা হয়েছে।

পাক হানাদার বাহিনী ১৯৭১ সালের ১১ ডিসেম্বর ভোরে মুন্সীগঞ্জ শহর ত্যাগ করলে এখানে ৩৬ জনের লাশ পাওয়া যায়। ১৯৭২ সালে এই জায়গাটি বধ্যভূমি হিসেবে চিহ্নিত করা হয় এবং স্মৃতিফলক নির্মাণ করা হয়।

১৯৭১ সালের ৯ মে ২০০ পাকিস্তানি হানাদার এক মেজরের নেতৃত্বে হরগঙ্গা কলেজে ক্যাম্প স্থাপন করে। কলেজের তিন তলা বিশিষ্ট ছাত্রাবাসে পাক সেনারা থাকতো। বিভিন্ন জায়গা থেকে মুক্তিযোদ্ধাদের ধরে এনে নির্যাতন চালাতো। নির্যাতন শেষে তাদের গুলি করে হত্যা করার পর এখানে একটি গর্তের মধ্যে লাশগুলো ফেলা হতো।

প্রত্যক্ষদর্শী সরকারি হরগঙ্গা কলেজের সাবেক অধ্যক্ষ প্রফেসর সুখেন ব্যানার্জী বলেন, ‘তখন আমি এই কলেজের ছাত্রাবাসে থাকতাম। তখন এসব দৃশ্য দেখে চোখের জল ফেলা ছাড়া আর কিছুই করার ছিল না।’

মুন্সীগঞ্জের সাতানিখিল ও পাঁচঘড়িয়াকান্দি বধ্যভূমি এখন শনাক্ত করাই এখন কঠিন। কোন স্মৃতিচিহ্নই নেই ওইখানে। এ পর্যন্ত সরকারি বা বেসরকারি পর্যায়ে কোন উদ্যোগ নেয়া হয়নি বদ্ধভূমিগুলো সংরক্ষণে।

পাকসেনারা ১৯৭১ সালের ১৩ মে দিবাগত রাত সাড়ে ৩ টায় ঘেরাও করে সদর উপজেলার কেওয়ার চৌধুরী বাড়ি। ওই বাড়ি থেকে ডা. সুরেন্দ্র চন্দ্র সাহা ও তার দুই ছেলে শিক্ষক সুনিল কুমার সাহা, দ্বিজেন্দ্র লাল সাহা এবং প্রফেসর সুরেশ ভট্টাচার্য, শিক্ষক দেব প্রসাদ ভট্টাচার্য, পুলিশের সাব-ইনসপেক্টর শচীন্দ্র নাথ মুখার্জীসহ ১৭ জন বুদ্ধিজীবীকে ধরে নিয়ে আসে। ১৪ মে সকাল দশটায় কেওয়ার সাতানিখিল গ্রামের খালের পাড়ে নিয়ে চোখ বেঁধে ১৬ জনকে ব্রাশ ফায়ার করে হত্যা করে ফেলে রেখে যায়। আর ডা. সুরেন্দ্র চন্দ্র সাহাকে ধরে নিয়ে যায় হরগঙ্গা কলেজের সেনাক্যাম্পে।

সেখানে নির্যাতনে পর কলেজের পিছনে পাচঘড়িয়াকান্দি (চর শিলমন্ডি) গ্রামের একটি বাগানবাড়ির গাছে ঝুলিয়ে ব্রাশ ফায়ার করে তাকেও হত্যা করে হানাদাররা। এরপর ওই বাগানবাড়িতে আরো জানা-অজানা অনেক বুদ্ধিজীবীকে এনে হত্যা করে বলে জানা গেছে।

শহীদ ডা. সুরেন্দ্র চন্দ্র সাহার ছোট ছেলে যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধা সুভাষ চন্দ্র সাহা বলেন, ‘মনে বড় কষ্ট। ৪৬ বছরে একটি ইটও গাঁথা হয়নি ওই বদ্ধভূমিগুলোতে। এটা আমাদের জেলাবাসীর চরম ব্যর্থতা এবং কষ্টদায়ক আরেকটি ইতিহাস হয়ে থাকবে।’

আব্দুল্লাহপুরের পালবাড়ি বধ্যভূমিটির নামটি এখনো ইতিহাসের পাতায় জায়গা হয়নি। পাকিস্তানি পাকসেনাদের নিষ্ঠুরতার চিহ্ন বইছে এই মুন্সীগঞ্জের টঙ্গীবাড়ি উপজেলার আব্দুল্লাহপুরের বাড়িটি। এ বাড়িটিও ইতিহাসের পাতায় এখনও স্থান পায়নি। বাড়িটি মুন্সীগঞ্জ শহর থেকে প্রায় ৭ কিলোমিটার দূরে।

১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে পাকসেনারা এক বৃষ্টিভেজা দিনে আক্রমণ চালিয়ে এ বাড়ির মালিক ও অশ্রিতসহ ১৯ জনকে হত্যা করে। বাড়ির মালিক অমূল্যধন পাল, তার ভাই মনোরঞ্জন পাল, মিহির পালসহ আত্মীয়স্বজন ওই বাড়িতে ছিল। দিন-দুপুরে পাকসেনারা ওই বাড়ির দরজা ভেঙ্গে ভিতরে ঢুকে লুটপাট ও হত্যাসহ তা-বলীলা চালায়। পরে মৃত দেহগুলো বাড়ির পুকুর পাড়ে ফেলে রেখে চলে যায়।

পালবাড়ির লোকজন তখন ওই এলাকার বড় ব্যবসায়ী ছিলেন। বাংলাদেশের সর্ব-বৃহৎ বানিজ্যিক এলাকা মিরকাদিমে তাদের চালসহ বিভিন্ন দ্রব্যের আড়ৎ ছিল বলে জানা যায়। নারায়ণগঞ্জ জেলায়ও তাদের ব্যবসা ছিল। বর্তমানে শহীদ অমূল্যধন পালদের নাতিসহ তার আত্মীয় স্বজনরা ওই বাড়িতে বসবাস করছে।

দীর্ঘ প্রায় ২৮ বছর পর আব্দুল্লাহপুর ইউনিয়নের তৎকালীন চেয়ারম্যান মো. শহীদ মোল্লা একটি স্মৃতি ফলক নির্মাণ করে পালবাড়ির পুকুর পাড়ে। ১৯৯৮ সালের মহান স্বাধীনতা দিবসে এই স্মৃতিস্তম্ভটি উদ্বোধন করেছিলেন জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও মুক্তিযোদ্ধা মো. লুৎফর রহমান। এর পর থেকে স্বাধীনাতা দিবস ও বিজয় দিবসে ওই এলাকার স্কুলের ছাত্র-ছাত্রী, শিক্ষক, স্থানীয় নেতাকর্মী ও জনগণ এই স্মৃতিস্তম্ভের বেদিতে পুষ্পার্ঘ্য নিবেদন করেন শহীদের স্মৃতির উদ্দেশ্যে।

এই বদ্ধভূমিটির ইতিহাস সংরক্ষণ ও উন্নয়নে সরকারি পর্যায়ে কোন উদ্যোগ নেয়া হয়নি বলে শহীদ অমূল্যধনের নাতি-নাতনিরা জানান। এই পালবাড়িতে পাকসেনাদের হত্যাকান্ড ঘটানোর বিস্তারিত তথ্য এখন কেউ বলতে পারে না। অনেকটা অজানাই রয়ে গেছে এই বদ্ধভূমিটি।

রাইজিংবিডি