সিরাজদিখানে শাসনগাঁও সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে সাপ আতঙ্ক কাটেনি

শেখ মো. রতন: মুন্সীগঞ্জের সিরাজদিখান উপজেলার শাসনগাঁও সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ছাত্রছাত্রীদের মধ্যে বিরাজ করছে সাপ আতঙ্ক। এই সাপ আতঙ্কের কারণে ছাত্র ছাত্রীরা স্কুলে আসছে না। গত ১লা ডিসেম্বর প্রথম শ্রেণীর ছাত্র আকাশ বাড়ৈ (৮)কে সাপে কাপড়ালে এ আতঙ্ক আরো ছড়িয়ে পড়ে। আকাশ বাড়ৈকে ঢাকা মিডফোট হাসপাতালে নিয়ে চিকিৎসা করে ভালো করা হলেও সাপের আতঙ্ক এখন বিরাজ করছে।

স্কুলের সহকারি শিক্ষক পলাশ চন্দ্র পাল জানান, বুধ ও বৃহস্পতিবার স্কুল থেকে ১০টি সাপ এলাকাবাসী মেরেছে। ইতোমধ্যেই আশ পাশ ও ঝোঁপ ঝাড় পুড়িয়ে ফেলা হয়েছে। স্কুলের মেঝের ফাটল সিমেন্ট দিয়ে বদ্ধ করা হয়েছে। কিন্তু তারপরেও সাপ ও সাপের বাচ্ছা বের হওয়া বদ্ধ করা যাচ্ছে না।

শাসনগাঁও এলাকার আব্দুল হামিদ জানান, তাঁর সন্তান এ স্কুলের চতুর্থ শ্রেণীতে পড়াশুনা করছে। সাপ আতঙ্কের ফলে তার ছেলে স্কুলে যাচ্ছে না। এতে তার ছেলের লেখা পড়া দারুণভাবে বিঘ্নিত হচ্ছে। সিরাজদিখান উপজেলার প্রত্যন্ত অঞ্চলের এই বিদ্যাপিঠটি সাপ আতঙ্কের কারণে অভিভাবকরা তাদের সন্তানদের পড়াশুনা নিয়ে পড়েছেন সঙ্কটে। অধিকাংশই কৃষিজীবী অভিভাবকরা এর কোন সঠিক উত্তর খুঁজে পাচ্ছেন না। ১৯৯৫ সালে নির্মিত স্কুলটির অবকাঠামো নিম্নমানের হওয়ায় স্কুলের ছাদেও অসংখ্য ফাঁটলের সৃষ্টি হয়েছে। মাঝেমধ্যে কংক্রিট খসে পড়ারও ঘটনা ইতোমধ্যে ঘটেছে। এই দুর্বল অবকাঠামোর স্কুলটি কোন মতে চুনকাম করে এটাকে পড়াশুনার উপযোগী করায় বর্তমানে এটি ছাত্রছাত্রীদের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়েছে। আশ্চার্যজনক হলেও সত্যি যে, বর্তমানে এই স্কুলটি সাপের স্কুল নামে পরিচিতি লাভ করেছে এলাকায়।

স্কুলটিতে গেলে দেখা যায়, স্কুলে মোট ১৮০ জন ছাত্রছাত্রীর মধ্যে প্রথম শিফটে প্রথম শ্রেণীতে মাত্র ৫ জন, ২য় শ্রেণীতে ১১জন ও শিশু শ্রেণীতে মাত্র ৯ জনের উপস্থিতি লক্ষ্য করা গেছে। তবে স্কুলে যে কজন ছাত্রছাত্রী আসে তাদের অধিকাংশই অভিভাবকদের হাত ধরে আসে। একা একা ছাত্রছাত্রীরা স্কুলে আসতে ভয় পায় বলে অভিভাবকরা নিয়ে আসে।

স্কুলে সন্তান নিয়ে আসা অভিভাবক মাহমুদ আলী জানান, তার সন্তানেরা সাপের কামড়ের পর আর স্কুলে আসে না। তাঁর দুটি সন্তান এ স্কুলে লেখা পড়া করে। সাপে কাটার পর এই বৃহস্পতিবার থেকে সন্তানদের স্কুলে নিয়ে আসছেন। শাসনগাঁও এলাকার আরেক অভিভাবক উম্মে হানি জানান, তার সন্তান ৩য় শ্রেণীতে পড়াশুনা করছে এ স্কুলে। সাপের ভয়ে তার সন্তানকে তিনি নিজে নিয়ে এসেছেন।

শাসনগাঁও গ্রামের আরেক অভিভাবক অনুরাধা জানান, শিশু শ্রেণীতে পড়–য়া তার সন্তানটি সাপের ভয়ে স্কুলে একা একা আসছে না। আজ তিনি সাথে করে নিয়ে এসেছেন। অভিভাবকের হাত ধরে স্কুলে আসা ২য় শ্রেণীর ছাত্র জিয়াউল হাসান জানায়, সাপের ভয়ে একাএকা সে স্কুলে আসে না। স্কুলে প্রথম শ্রেণীতে পড়–য়া অপর এক ছাত্রী লামিয়া জানায়, সাপে কামড়ানোর পর বাবার হাত ধরে স্কুলে আসছে। ভয়ে এতোদিন সে স্কুলে আসেনি। প্রথম শ্রেণীতে পড়ুয়া অনিকা আক্তারও সাপের ভয়ের কথা জানায়।

তবে ব্যতিক্রম একটি ঘটনা চোখে পড়ার মত। যে আকাশ বাড়ৈকে বিষাক্ত সাপে কামড়িয়েছিল তাকে দেখা গেল মায়ের কোলে চড়ে স্কুলে আসতে। মা কমলা রানী তাকে কোলে করে তাকে স্কুলে নিয়ে এসেছেন।

এ ব্যাপারে স্কুলের ম্যানেজিং কমিটির সভাপতি হাজী ইউনুস বলেন, সাপ আতঙ্কের কারণে ছাত্রছাত্রীরা স্কুলে আসছে না। তিনি আরো বলেন, স্কুলটির অবকাঠামো অত্যন্ত দুর্বল। ফলে ফ্লোরে অসংখ্যা ফাটল দেখা দিয়েছে। এই ফাঁটলের ভিতর অসংখ্য সাপের বাসা। এখান থেকেই সাপ উঠে আসে। তবে স্কুলটিতে নতুন ভবন নির্মাণ না করলে পড়াশুনার সুন্দর পরিবেশ তৈরী হবে না এবং সাপ আতঙ্ক কাটবে না। আশঙ্কাজনকভাবে স্কুলের ছাত্রছাত্রীর উপস্থিতি কমে যাওয়া প্রসঙ্গে তিনি বলেন, আমরা অভিভাবকদের সাথে যোগাযোগ করার চেষ্টা করছি। যাতে ছাত্রছাত্রীরা স্কুলে স্বাভাবিকভাবে আবার আসতে পারে। স্কুলের মোট ৩জন শিক্ষকের মধ্যে প্রধান শিক্ষিকা বর্তমানে মাতৃকালীন ছুটিতে রয়েছেন। তার সাথে যোগাযোগ করা হলে তিনি জানান, ডিসেম্বরের ৯ তারিখে স্কুলে যোগ দেব।

তবে আকাশ বাড়ৈকে সাপে কামড়ানোর পর তাকে দেখতে স্কুলে ছুটে গিয়েছিলাম। এই স্কুলে পেশনে থাকা শিক্ষক পলাশ চন্দ্র জানান, সাপ আতঙ্কে বর্তমানে বিপদেই আছি। স্কুলটির ছাত্রছাত্রীদের মধ্যে সাপ আতঙ্কের ভাবটি চেষ্টা করেও কমানো যাচ্ছে না। তিনি আরো বলেন, গ্রামবাসীরা বুধ ও বৃহস্পতিবার ১০টি সাপ স্কুল প্রাঙ্গন থেকে পিটিয়ে মেরেছে। সরজমিনে দেখা গেছে, যে রুমটিতে আকাশ বাড়ৈকে সাপে কামড়িয়ে ছিল তা তালাবদ্ধ করে রাখা হয়েছে। ছবি তোলার জন্য ভয়ে ভয়ে তা খুলে দেওয়া হলেও পরে তা বদ্ধ করে দেওয়া হয়।

প্রধান শিক্ষকের অনুপস্থিতিতে স্কুলের দায়িত্বে থাকা সহকারী শিক্ষক নয়ন রানী মৃধা জানান, উপজেলা সহকারি শিক্ষা অফিসার লতিফা আক্তার স্কুলটি ভিজিট করেছেন। তিনি স্কুলের পরিবেশ ফিরিয়ে আনার জন্য অভিভাবক ও ছাত্রছাত্রীদের সাথে কয়েক দফা আলোচনা করেছেন।

এ ব্যপারে শিক্ষা অফিসার বেলায়েত হোসেনের সাথে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, সাপে কামড়ানোর ঘটনাটি সত্যি এবং প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। কি ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে এ প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন, ইতোমধ্যেই সহকারী শিক্ষা অফিসারকে স্কুলে পাঠানো হয়েছে। স্কুলে বিভিন্ন ফাঁটলে সিমেন্ট দিয়ে প্লাস্টার করে দেওয়া হয়েছে। আশপাশের ঝোঁপ ঝাড় পরিস্কার করে তা পুড়িয়ে ফেলা হয়েছে। ইতোমধ্যেই নতুন ভবন নির্মাণের জন্য চিঠি পাঠানো হয়েছে। সাপে কামড়ানোর ঘটনার ৪দিন অতিবাহিত হলেও উপজেলা শিক্ষা অফিসার বেলায়েত হোসেন স্কুল পরিদর্শনে না যাওয়ায় এবং এলাকার অভিভাবকদের সাথে স্বশরীরে উপস্থিত না হওয়ায় এলাকাবাসী ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন।

টাইমটাচনিউজ