সেতুর জন্য চর কাটার কাজ ফের শুরু, চলছে বালু ভরাট

পদ্মার ঢেউয়ে স্বপ্নের ঝিলিক
মো. মাসুদ খান: পদ্মা সেতুর অবকাঠামো নির্মাণকাজের সুবিধার্থে মাঝের চর কাটার কাজ ফের শুরু হয়েছে। পদ্মা নদীর মাঝখানে এই চর কেটে সেখানে একটি চ্যানেল তৈরি করা হবে, যা দিয়ে নদীতে ভাসমান প্ল্যাটফরম থেকে এখানে পাইল নির্মাণের কাজ চলবে।

গত সোমবার থেকে চর কাটার কাজ শুরু হয়েছে। দেড় কিলোমিটার দীর্ঘ চরটি কাটা হবে ২৫০ মিটার প্রশস্ত করে। চর কাটার কাজ শুরুর আগে সেখানে অবৈধভাবে বসবাসরত ৫৬৩টি পরিবারকে অন্যত্র সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। গত মাসের মাঝামাঝিও একবার চর কাটার কাজ শুরু হয়েছিল। পরে নানা জটিলতায় তা স্থগিত করা হয়। সোমবার থেকে তা ফের শুরু হলো।

সেতুর দুই প্রান্ত থেকে বড় আকারের ছয়টি ড্রেজার একযোগে দেড় কিলোমিটার দীর্ঘ ওই চর কাটার কাজ শুরু করেছে। এখানে সেতুর পাইল স্থাপন করা হবে। শরীয়তপুর ও মাদারীপুর এলাকার এ বিশাল চরের মাঝে চ্যানেলের দুই তীরে আরো ২৫০ মিটার এলাকা থাকবে সেতুর জন্য সংরক্ষিত। মুন্সীগঞ্জের জেলা প্রশাসক মো. সাইফুল হাসান বাদল জানান, সেতুর সব কাজ চলছে ঠিকঠাকভাবে। যথাসময়েই সব হচ্ছে। মাওয়া ফেরিঘাটও সরিয়ে নেওয়া হয়েছে নভেম্বরের মধ্যে। গত রবিবার সেতুর ঠিকাদার চায়না মেজর ব্রিজ ইঞ্জিনিয়ারিং কম্পানি লিমিডেটের প্রকল্প ব্যবস্থাপক লিউ জিন হুয়া এ এলাকাটি বুঝে নেন। সোমবার থেকেই তারা সেতুর কাজের স্বার্থে পুরনো এ ঘাট এলাকা সংরক্ষণ শুরু করেছে।

সেতুর দুই পারে সংযোগ সেতু এলাকায় বালু ভরাটকাজও সোমবার শুরু হয়েছে। একই দিন সকালে সেতুর ৪২ পরামর্শকও কাজে যোগ দিয়েছেন। সংশ্লিষ্ট প্রকৌশলীরা জানিয়েছেন, বাংলাদেশের বিশাল এই কর্মযজ্ঞ ছাড়াও চীন, সিঙ্গাপুর এবং জার্মানিতে একযোগে চলছে পদ্মা সেতুর কর্মযজ্ঞ।

পদ্মা সেতুর অবকাঠামো নির্মাণকাজের সুবিধার্থে মাঝের চর কাটার কাজ ফের শুরু হয়েছে।

সেতুর পাইল স্থাপনের জন্য তিন হাজার টন ওজনের হ্যামার তৈরি হচ্ছে জার্মানিতে। এ হ্যামার দিয়ে পাইলগুলো ১২০ মিটার মাটির নিচে ঢোকানো হবে। অন্যদিকে ১২টি ট্রায়াল পাইল তৈরি হচ্ছে চীনে। পাইলগুলো নিয়ে চলতি মাসের শেষের দিকে চীন থেকে জাহাজ রওনা হবে। সঙ্গে থাকবে আরো ভারি ইকুইপমেন্ট। ট্রায়াল পাইলের হ্যামার তৈরি হচ্ছে সিঙ্গাপুরে। ট্রায়াল পাইলগুলো স্থাপন করা হবে মূল পাইলের ৫০ মিটার দূরে। সেতুর মোট ২৬৪টি পাইলের মাঝে মাঝে ট্রায়াল পাইলগুলো স্থাপন করা হবে পরীক্ষামূলকভাবে। জানুয়ারির শেষ নাগাদ এসব পাইল স্থাপন শুরুর কথা রয়েছে।

৪২টি পিলারের ওপর ৬.১৫ কিলোমিটার দীর্ঘ পদ্মা সেতু নির্মিত হবে। ১৫০ মিটার পরপর থাকবে পিলার। এ ছাড়া দেড় কিলোমিটার করে উভয় পারে তিন কিলোমিটার সংযোগ সেতুর জন্য থাকবে আরো ২৪টি পিলার। মোট ৬৬ পিলারের জন্য ৬৬ পয়েন্টে মাটি পরীক্ষার প্রয়োজন হচ্ছে। মূল সেতুর ৪২টি পিলারের মধ্যে নকশার সময় ১৩টি পয়েন্টে মাটি পরীক্ষা হয়েছে। বাকি ২৯ পয়েন্টে এখন মাটি পরীক্ষা করতে হবে। মূল সেতুর ৪০টি পিলারের প্রতিটিতে ছয়টি করে ২৪০টি এবং দুই পারের দুটিতে ১২টি করে ২৪টিসহ মোট ২৬৪টি পাইল করতে হবে।

মূল পদ্মা সেতুর কাজ তিন ভাগে ভাগ করা হয়েছে। মাটি পরীক্ষা, সাবস্ট্রাকচার ও সুপার স্ট্রাকচার। মাটি পরীক্ষার কাজ ইতিমধ্যে শুরু হয়েছে। সেতুর কাজ যত দিন চলবে, তত দিন মাটি পরীক্ষার কাজও চলবে। সাবস্ট্রাকচার হলো পাইল থেকে ক্যাব পর্যন্ত কাজ, যা শুরু হবে জানুয়ারির শেষ নাগাদ। সুপার স্ট্রাকচার হলো কলাম ও আপার ডেক। এ কাজ শেষে সেতু নির্মাণও শেষ হবে। ২০১৮ সালের ডিসেম্বর নাগাদ এ কাজ শেষ হতে পারে। সেতুর দ্বিতীয় ধাপের কাজ শেষ হতে পারে ২০১৬ সালের শেষ নাগাদ। তারপর শুরু হবে তৃতীয় ধাপের কাজ।

সেতুর দুই পারে কনস্ট্রাকশন ইয়ার্ডে কাজ চলছে সমানতালে। মাওয়া প্রান্তে লৌহজংয়ের কুমারভোগে এবং শরীয়তপুরের মাঝিকান্দিতে চলছে ওয়ার্কশপ এবং কংক্রিট তৈরির জন্য ব্যাচিং প্ল্যান তৈরিসহ নানা কাজ।

বাদ সেধেছে পল্লীবিদ্যুৎ : সেতুর অগ্রগতির কাজে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে মুন্সীগঞ্জ পল্লীবিদ্যুৎ সমিতি। সমিতির অসহযোগিতার কারণে কনস্ট্রাকশন ইয়ার্ডের পণ্য পরিবহনের রাস্তার কাজ আটকে আছে। সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, কুমারভোগে পদ্মা পাড়ে মালামাল পরিবহনের জন্য মাওয়া চৌরাস্তাসংলগ্ন পদ্মা সেতু রেস্ট হাউসের দক্ষিণ পাশ থেকে পূর্ব দিকে কনস্ট্রাকশন ইয়ার্ড পর্যন্ত প্রায় দুই কিলোমিটার রাস্তা নির্মাণ, পুনর্নির্মাণ ও সংস্কারের কাজের পরিকল্পনা হাতে নেয় সেতু বিভাগ। এ রাস্তার পাশে রয়েছে পল্লী বিদ্যুতের বেশ কিছু পুল। পুলগুলো সরিয়ে নিতে পদ্মা সেতু কর্তৃপক্ষ মুন্সীগঞ্জ পল্লীবিদ্যুৎ সমিতির অনুকূলে প্রয়োজনীয় টাকা জমা দেয় ২০১০ সালে। তবে প্রায় চার বছর পার হলেও সমিতি পুলগুলো সরিয়ে নিচ্ছে না। চার দফা প্রতিশ্রুতি দিয়েও তারা কথা রাখেনি।

লৌহজং পল্লীবিদ্যুৎ সমিতির ডেপুটি জেনারেল ম্যানেজার শেখ মানোয়ার মোর্শেদ টাকা জমা দেওয়ার বিষয়টি স্বীকার করে বলেন, বিষয়টি পল্লীবিদ্যুৎ সমিতির নয়, এটি ঠিকাদারের কাজ। এ কাজের জন্য ইতিমধ্যে টেন্ডার হয়েছে। তার পরও পুল সরানোর কাজ শুরু হয়েছে।

কালের কন্ঠ

Comments are closed.