গজারিয়ায় গ্যাসের অবৈধ সংযোগ চলছেই

নারায়ণগঞ্জের সোনারগাঁ ও মুন্সিগঞ্জের গজারিয়া
মুন্সিগঞ্জের গজারিয়া উপজেলার মধ্য ভাটেরচর এলাকায় অবৈধ সংযোগের গ্যাসে চলছে রান্নার চুলা সোনারগাঁ উপজেলার নয়টি ইউনিয়নের ২১ হাজার এবং মুন্সিগঞ্জের গজারিয়া উপজেলার আটটি ইউনিয়নের ২৫ হাজার বাড়িতে দেওয়া অবৈধ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করার কাজ এখনো বন্ধ করা হয়নি।

সোনারগাঁয় আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীদের গড়া ‘গ্যাস কমিটি’ এবং গজারিয়ায় প্রতিটি ইউনিয়নের ‘প্রভাবশালী’ নেতাদের তৎপরতায় গত প্রায় নয় মাসে এসব অবৈধ সংযোগ দেওয়া হয়।

সোনারগাঁ উপজেলার অবৈধ গ্যাস-সংযোগ দেওয়া ইউনিয়নগুলো হলো শম্ভুপুরা, মোগরাপাড়া, পিরোজপুর, বৈদ্যেরবাজার, নোয়াগাঁও, সাদিপুর, কাঁচপুর, জামপুর ও সনমান্দি।

গতকাল শুক্রবার সোনারগাঁ উপজেলার শম্ভুপুরা ইউনিয়নের একরামপুরা, সনমান্দি ইউনিয়নের মারবদী, কান্দাপাড়া, আলমদী, নোয়াগাঁও ইউনিয়নের ধন্দী বাজার, জামপুর ও সাদিপুর ইউনিয়নের কয়েকটি গ্রামে গিয়ে লোকজনকে অবৈধ গ্যাস-সংযোগ নিতে দেখা যায়। তাঁরা গ্যাস-সংযোগ পেয়ে উচ্ছ্বাস প্রকাশ করেন।
অবৈধ এই গ্যাস-সংযোগ দেওয়ার কাজ তদারক করছেন ওয়ার্ড ও ইউনিয়ন আওয়ামী লীগ এবং অঙ্গসংগঠনের নেতা-কর্মীরা। নাম জানতে চাইলে তা জানাতে রাজি হননি কেউ। জামপুর গ্রামের এক বাসিন্দা জানান, ‘আওয়ামী লীগের নেতারা আমাদের আশ্বস্ত করেছেন, সরকার কোনো দিন এই সংযোগ বিচ্ছিন্ন করবে না। আমাদের কোনো দিন গ্যাসের বিলও দিতে হবে না। তাই এলাকাবাসী আনন্দ-উল্লাস করে গ্যাসের সংযোগ নিচ্ছেন।’

গত ৬ ফেব্রুয়ারি প্রথম আলোয় ‘আওয়ামী লীগের গ্যাস ডাকাতি’ শিরোনামে সংবাদ প্রকাশিত হওয়ার পর তিতাস গ্যাস ট্রান্সমিশন অ্যান্ড ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি গণমাধ্যমে বিজ্ঞপ্তি দিয়ে অবৈধ গ্যাস-সংযোগ বিচ্ছিন্ন করার কাজ শুরু করে। ঢাকার আশপাশের কয়েকটি উপজেলার সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে তারা থেমে যায়। এ সময় কয়েকটি উপজেলায় স্থানীয় সাংসদের প্রভাবের কারণে সোনারগাঁ, রূপগঞ্জ ও আড়াইহাজার উপজেলায় অভিযান চালায়নি তিতাস কর্তৃপক্ষ।

গত ১৫ জুন সোনারগাঁ পৌরসভার নোয়াইল ও মোগরাপাড়া ইউনিয়নের সোনাখালী এলাকায় পর পর দুই দিন বিচ্ছিন্নকরণ অভিযান চালায় তিতাস কর্তৃপক্ষ। অভিযানের দুই দিন পর আওয়ামী লীগের প্রভাবশালী নেতাদের হস্তক্ষেপে আবারও সংযোগ চালু করা হয়। এর পর থেকে একাধিকবার ঘোষণা দিয়েও আর অভিযান চালায়নি তিতাস কর্তৃপক্ষ।

বিভিন্ন গ্রামের মানুষ জনপ্রতিনিধি ও তিতাসের কার্যালয় সূত্রে জানা যায়, এ বছরের ফেব্রুয়ারি মাসের আগে এ উপজেলায় ১২ হাজার অবৈধ সংযোগ ছিল। বর্তমানে তা ১৫ হাজার ছাড়িয়েছে। আওয়ামী লীগের ‘গ্যাস কমিটি’ গ্রাহকদের কাছ থেকে গড়ে ৪৫ হাজার টাকা করে ২১ হাজার গ্রাহকের কাছ থেকে প্রায় ৯৪ কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছে।

অনুসন্ধানে জানা যায়, জাতীয় পার্টির স্থানীয় সাংসদ লিয়াকত হোসেন গত ১২ মে সোনারগাঁ উপজেলা আইনশৃঙ্খলা কমিটির মাসিক সভায় এবং ১৮ আগস্ট আরেক সভায় প্রকাশ্যে অবৈধ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করার বিরুদ্ধে বক্তব্য দেন। গ্যাস-সংযোগ বিচ্ছিন্ন করতে এলে তা প্রতিহত করার হুমকি দিয়ে তিনি বলেন, ‘আসুক এবার, দেখি কে গ্যাস-সংযোগ বিচ্ছিন্ন করতে আসে।’ অবৈধ গ্যাস-সংযোগ বৈধ করতে তিনি জ্বালানি প্রতিমন্ত্রী, পেট্রোবাংলার চেয়ারম্যান ও তিতাসের ব্যবস্থাপনা পরিচালককে চিঠিও দেন।
গত মঙ্গলবার লিয়াকত হোসেন প্রথম আলোকে বলেন, ‘অবৈধ সংযোগগুলো তো আওয়ামী লীগের গত মেয়াদে দেওয়া। তাই সেগুলো বিচ্ছিন্ন করার নির্দেশ দেওয়া আমার পক্ষে সম্ভব নয়। আর এতে মানুষের ক্ষতি হবে। তাই সংযোগগুলো বৈধ করতে চিঠি দিয়েছিলাম।’

সোনারগাঁ আওয়ামী লীগের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি শামসুল ইসলাম ভূঁইয়া এসব অবৈধ সংযোগের কথা স্বীকার করেন। তিনি বলেন, ‘আমি প্রথম থেকেই দলীয় ফোরামে এই অবৈধ সংযোগের বিরুদ্ধে বলে আসছি। কিন্তু সরকার কোনো পদক্ষেপ নেয়নি।’

এদিকে, মুন্সিগঞ্জের গজারিয়া উপজেলার আটটি ইউনিয়নের ২৫ হাজার বাড়িতে বর্তমানে গ্যাসের অবৈধ সংযোগ রয়েছে। ইউনিয়নগুলো হলো বাউশিয়া, ভবেরচর, গজারিয়া, ইমামপুর, গুয়াগাছি, বালুয়াকান্দি, হোসেন্দি ও টেঙ্গারচর। এসব ইউনিয়নের প্রতিটিতে অবৈধ গ্যাস-সংযোগ বেড়েই চলছে। আর টেঙ্গারচর ইউনিয়নে আটটি গ্রামের এক হাজার ২০০ অবৈধ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করার কয়েক মাসের মধ্যেই সেগুলো পুনঃস্থাপন করা হয়। গত ১২ মে তিতাস গ্যাস ট্রান্সমিশন অ্যান্ড ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানির সোনারগাঁ অঞ্চল কর্তৃপক্ষ এবং মুন্সিগঞ্জের নির্বাহী হাকিম আল আমিন অবৈধ গ্যাস-সংযোগের বিরুদ্ধে অভিযান চালিয়ে এসব সংযোগ বিচ্ছিন্ন করেছিলেন।

গতকাল সরেজমিনে টেঙ্গারচর ইউনিয়নের মধ্যভাটেরচর, বৈদ্যেরগাঁও, বড় ভাটেরচরসহ আটটি গ্রাম ঘুরে অবৈধ গ্যাস-সংযোগ দিয়ে রান্না করতে দেখা যায়। মহাসড়কের মূল পাইপ থেকে সংযোগ নেওয়ায় গ্যাসের চাপ ছিল অনেক বেশি। প্রতিটি চুলাতেই আগুন দাউ দাউ করে জ্বলতে দেখা যায়। পরিবারগুলোর সদস্যরা অকপটে অবৈধ সংযোগ নেওয়ার কথা স্বীকার করেন।

মধ্য ভাটের গ্রামের শহিদুল্লাহ জানান, গ্যাস-সংযোগ নেওয়ার জন্য তাঁকে ৫০ হাজার টাকা দিতে হয়েছে। সংযোগ দেওয়ার সময় নেতারা বলেছিলেন, সংযোগ বৈধ করে দেবেন কিন্তু দেননি।

নারায়ণগঞ্জের সোনারগাঁ অঞ্চল তিতাস গ্যাস ট্রান্সমিশন অ্যান্ড ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি সূত্রে জানা যায়, গত ১২ মে তিতাস গ্যাস কর্তৃপক্ষ ভাটেরচর বাণিজ্যিক লাইন থেকে এলাকায় মূল সংযোগ গ্রহণকারী তিনটি সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে। এতে আট গ্রামের সব অবৈধ সংযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। এই অবৈধ সংযোগের মধ্যে ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান শাহজাহান খানের বাড়ির সংযোগও রয়েছে। অভিযোগ আছে, তিনি এই অবৈধ সংযোগ-বাণিজ্যে জড়িত।

এই অভিযোগ অস্বীকার করে শাহজাহান খান বলেন, ইউনিয়নের প্রতিটি গ্রামের প্রভাবশালী ব্যক্তি ও তিতাস গ্যাসের লোকজনই এসব অবৈধ কাজে জড়িত।
গজারিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মাহবুবা বিলকিস প্রথম আলোকে জানান, ঘরে ঘরে অবৈধ সংযোগ। একটি-দুটি হলে সংযোগ বিচ্ছিন্ন করা সম্ভব হতো।

প্রথম আলো

Comments are closed.