হযরত বাবা আদম শহীদ (র.) এর মসজিদ

কিভাবে যাওয়া যায়: ঢাকার পার্শ্ববর্তী জেলা মুন্সীগঞ্জ। মুন্সীগঞ্জ সদর উপজেলার রামপালে হযরত বাবা আদম শহীদ (র.) এর মাজার সংলঘ্ন মসজিদ অবস্থিত। সড়কপথে ঢাকা থেকে মুন্সীগঞ্জের দূরুত্ব মাত্র ২৩ কিলোমিটার। তবে এই মাজারে আসার জন্য আরো ০৫ (প্রায়) কিলোমিটার ভিতরে আসতে হবে। ঢাকা হতে সকালে এসে মাজার জিয়ারত ও মসজিদ দর্শন করে বিকেলেই ঢাকায় ফিরে আসা যাবে। সড়কপথে যেতে কষ্ট হবে না। তবে নৌপথে গেলে সময়ও বাচঁবে এবং যানজট এড়িয়ে নদী পথের সৌন্দর্য অবগাহন করে স্বাচ্ছন্দের সাথে পৌছানো যাবে। সদর ঘাট থেকে মুন্সীগঞ্জ গামী লঞ্চে ২ ঘন্টার মধ্যেই পৌছে যাওয়া যাবে মুন্সীগঞ্জ লঞ্চ ঘাটে। মুন্সীগঞ্জ সদর উপজেলা হইতে রিক্সায় দরগাবাড়ি হযরত বাবা আদম শহীদ (র.) এর মাজার সংলঘ্ন মসজিদ এ যাওয়া যায়। ভাড়া ২৫-৩০ টাকা।

বাবা আদমের মসজিদ ও মাজার

বিক্রমপুরের ইতিহাস প্রসিদ্ধ রামপাল গ্রামের নিকটস্থ কাজী কসবা গ্রামে সুলতানী আমলের একটি ছয় গম্বুজ বিশিষ্ট মসজিদ আছে। এর গজ কয়েক পূর্বে আছে একটি মাজার। মাজারটি ২৫ (পঁচিশ) ফুট বাহুবিশিষ্ট বর্গাকার আয়তনের ইটের তৈরী মঞ্চের উপর একটি পাকা সমাধি বিশেষ।

মসজিদটি আয়তাকার ভিত্তি ভূমির উপর প্রতিষ্ঠিত। উত্তর-দক্ষিণে এর আয়তন ৪৩ ফুট এবং পূর্ব-পশ্চিমে ৩৬ ফুট। চার কোণায় চারটি অষ্ট কোণাকৃতির বুরুজ বা মিনার। মিনার ছাদের কার্ণিশের উপর উঠেনি। মিনারের ধাপে ধাপে মনোরম বলয়াকারের স্ফীত রেখায় অলংকরণের কাজ আছে।

পশ্চিম দেয়ালে তিনটি অর্ধবৃত্তাকার অবতল মেহরাব। কেন্দ্রী মেহরাবের পেছন দিকের দেয়াল বাইরের দিকে উদগত। সামনের দেয়ালের ধনুকাকৃতির খিলানবিশিষ্ট তিনটি প্রবেশপথে আয়তাকারে নির্মিত যে সব ফ্রেম আছে তার শীর্ষ দেশে অতি সুন্দর কারুকাজ আছে। প্রধান প্রবেশ পথের দুই পাশে গভীর সমতল কুলুঙ্গী। উপরিভাগ সুন্দরভাবে খাঁজকাটা। ঝুলন্ত শিকল ও ঘন্টার অলংকরণ রয়েছে। মসজিদে কোন বারান্দা নেই। অভ্যন্তর ভাগে আছে গ্রানাইট পাথরে নির্মিত দুইটি স্তম্ভ। অভ্যন্তর ভাগ এই দুইটি স্তম্ভের সাহায্যে পূর্ব পশ্চিমে দুই সারিতে এবং উত্তর-দক্ষিণে তিন সারিতে বিভক্ত। স্তম্ভ দুইটি মাঝ থেকে ৪ (চার) ফুট পর্যন্ত অষ্টকোণাকৃতির এবং এর পর ষোলকোণাকৃতির। এই দুইটি স্তম্ভ এবং চারপাশের দেয়ালের উপর মসজিদের অর্ধবৃত্তাকার ছোট ছোট গম্বুজ ছয়টি স্থাপিত। গম্বুজ ও মসজিদের অভ্যন্তর-ভাগের মতোই পূর্ব-পশ্চিমে দুই এবং উত্তর-দক্ষিণে তিন সারিতে বিভক্ত। দেয়াল অতিশয় পুরু।প্রধান মেহরাবটি এবং দুই পাশের দুই মেহরাব ও পাশের দেয়াল লতাপাতা, জ্যামিতিক নক্সা ও ও গোলাপফুল, ঝুলন্ত প্রদীপ ও শিকল প্রভৃতি অত্যন্ত সুন্দর পোড়ামাটির চিত্র ফলক দিয়ে অলংকৃত। মসজিদের বাইরের দিক বিশেষ করে সামনের দেয়াল অতি সুন্দর পোড়ামাটির চিত্রফলক দিয়ে অলংকৃত ছিল। কেন্দ্রীয় প্রবেশপথের দুইপাশে কিছু কিছু চিত্রফলকের কাজ এখনও চোখে পড়ে।

এক সময়ে মানত হাসিলের জন্য হিন্দু-মুসলিম উভয় সমপ্রদায়ের মহিলাদের দ্বারা এই মসজিদের স্তম্ভ দুইটি সিন্দুরানুলিপ্ত হয়ে রক্তবর্ণ ধারণ করেছিল।

আমাদের আলোচ্য এই মসজিদটি দরগাবাড়ীর মসজিদ বা বাবা আদমের মসজিদ এবং মাজারটি বাবা আদমের দরগা নামে পরিচিত। বাবা আদম সম্পর্কে বিক্রমপুরে বহু জনশ্রুতি প্রচলিত রয়েছে। তবে জনশ্রুতিগুলোর সবাই বাবা আদম ও বল্লাল সেনের যুদ্ধ সম্পর্কীত।

জনশ্রুতিগুলো নিম্নরূপঃ

বিক্রমপুরের মহাপরাক্রমশালী রাজা বল্লাল সেন ছিলেন ঘোর তান্ত্রিক। তিনি ধর্মীয় অসহিষ্ণুতার বশবর্তী হয়ে মসজিদ গুলোকে মন্দিরে পরিণত করেন এবং বিক্রমপুরে গরু জবেহ ও আযান দিয়ে নামাজ পড়া নিষিদ্ধ করেন। রামপালের নিকটস্থ আব্দুল্লাহপুর গ্রামের কানাইচং মাঠের জনৈক মুসলমান তার পুত্রের জন্ম উপলক্ষে অতি সঙ্গোপনে গরু জবেহ করেন। কিন্তু দুর্ভাগ্যক্রমে একটি চিল ছো মেরে এক টুকরো মাংস নিয়ে বল্লাল সেনের রাজপ্রাসাদের আঙ্গিনায় ফেলে। ফলে বল্লাল সেন অত্যন্ত ক্রুদ্ধ হয়ে গো হন্তাকে খোঁজে বের করার জন্য গুপ্তচর নিয়োগ করেন। বল্লালী নির্যাতনের ভয়ে উক্ত গোহন্তা বিক্রমপুর থেকে পালিয়ে গিয়ে মক্কায় হাজির হন।

তখন মক্কায় বাবা আদম নামক এক ধর্মান্ধ জবরদস্ত ফকীর ছিলেন। উক্ত ব্যক্তি বল্লালী নির্যাতনের প্রতিকারের জন্য বাবা আদমের শরনাপন্ন হন। পৌত্তলিক বল্লাল কর্তৃক মুসলিম নির্যাতনের কাহিনী দরবেশকে আদ্যোপান্ত বলেন। বিক্রমপুরে বল্লাল রাজার অধীনতা থেকে তাদেরকে উদ্ধার করবেনই করবেন। এই উদ্দেশ্যে তিনি নিমিষে ৭ (সাত) হাজার সৈন্য সংগ্রহ করেন এবং এই সৈন্যবাহিনী নিয়ে তিনি মক্কা থেকে বিক্রমপুর অভিমুখে দীর্ঘ যাত্রা শুরু করেন। পথে পথে অনেক যুদ্ধ জয়ের পর অবশেষে তিনি এবং তার সৈন্য বাহিনী বল্লাল রাজার রাজধানী রামপালের উপকন্ঠে দরগাবাড়িতে এসে ঘাঁটি গাড়েন। এখানে একটি মসজিদ প্রতিষ্ঠা করেন এবং নিজের নামে মসজিদটি নামকরণ করেন বাবা আদমের মসজিদ। এই মসজিদটিকে কেন্দ্র করেই বাব আদম ইসলামী আচার অনুষ্ঠান প্রকাশ্যেই পালন করা শুরু করেন। অনেক ষাঁড় ও গাভী জবে হ করা হতে থাকে। আজান দিয়ে নামাজ পড়া শুরু হয়।

এই আজানের শব্দ বল্লাল সেনের রাজপ্রসাদের অভ্যন্তর ভাগেও গিয়ে পৌঁছে। এতে বল্লাল ক্রুদ্ধ হয়ে নবাগত মুসলিম সৈন্যবাহিনীর নেতা বাবা আদমের কাছে কয়েকটি দাবী রেখে দূত পাঠান। দূত এসে বাবা আদমকে বলেন, “হয় বিক্রমপুর ছেড়ে চলে যাও নয় পৌত্তলিকতা বিরোধী আচার অনুষ্ঠান প্রতিপালন থেকে বিরত হও।” কিন্তু অলৈকিক ক্ষমতাসম্পন্ন দরবেশ বাবা আদম এতে দমাবার পত্র নন। তিনি তার অসংখ্য ভক্তের সমর্থনে নিশ্চিত হয়ে পরাক্রমশালী বল−াল সেনের কাছে এক ঔদ্ধত্বপূর্ণ উত্তর পাঠালেন। তিনি বললেন, “একমাত্র আল্লাহ ছাড়া অন্য কোন উপাস্য নেই এবং মোহাম্মদ (দঃ) তার রসূল। পৌত্তলিক বল্লাল রাজা যাই বলুন না কেন আর যাই করুন না কেন আমি এবং আমার সমর্থন আমাদের ধর্মীয় আচার অনুষ্ঠান প্রতিপালন থেকে এক চুল পরিমাণও বিরত হব না”। এহেন ঔদ্ধত্বপূর্ণ উত্তরে বাধ্য হয়েই বল−াল সেন সৈন্য সংগ্রহ করে বাবা আদমের বিরুদ্ধে যুদ্ধ যাত্রা করলেন।

তবে পূর্ব থেকেই বিভিন্ন রণাঙ্গনে মুসলিম সৈন্য বাহিনীর বিজয় ও পরাক্রমের কাহিনী m¤^‡Ü অবহিত থাকাতে পরাজিত হলে যাতে শত্রুর হাতে বন্দী হয়ে মানসম্ভ্রম খোয়াতে না হয় সে জন্য তিনি আগেভাগেই ব্যবস্থা করে রেখে যান। তিনি সাথে করে একটি কবুতর নিয়ে যান এবং বলে যান যে, পায়রাটি একা রাজপুরীতে ফিরে এলে রানী এবং রাজপরিবারের অপরাপর সদস্যগণ যেন মনে করেন যে রাজা যুদ্ধে পরাজিত ও নিহত হয়েছেন। আর তারাও যেন জাতিধর্ম রক্ষার জন্য অমনি জ্বলন্ত অগ্নিকুন্ডে আত্মবিসর্জন দেন। এই উদ্দেশ্যে পূর্ব থেকেই রাজপুরীতে একটি অগ্নিকুন্ড প্রজ্বলিত ছিল। রাজধানী রামপালের মাইল দুই দূরবর্তী কানাইচঙ্গের মাঠে প্রত্যুষকালে থেকে তৃতীয় প্রহর পর্যন্ত এক রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ হয়। বল−াল সেন বাবা আদমকে নিহত করেন। বল−াল যুদ্ধে জয়ী হয়ে রক্তমাখা দেহ ধোয়ার জন্য যেই পার্শ্ববর্তী জলাশয় “কাঁছারীর দীধিতে” অবতরণ করেন অমনি দৈবক্রমে পায়রাটি বস্ত্রাভ্যন্তরে থেকে উড়ে গিয়ে রাজপুরীতে পৌঁছে।

আর তক্ষুণি রাণী ও রাজপরিবারের অপরাপর সদস্যবৃন্দ ও রাজার পরাজয় ও মৃত্যু আশঙ্কা করে সেই জ্বলন্ত অগ্নিকুন্ডে আত্মবিসর্জন দিলেন। এদিকে বল্লাল সেনও পায়রা ছুটে যাওয়া মাত্রই যুদ্ধ ক্ষেত্র থেকে পাগলের মতো রাজধানী রামপাল অভিমুখে ছুটে এলেন। কিন্তু ইতিমধ্যে সবাই শেষ হয়ে গেছে। এই শোক সহ্য করতে না পেরে রাজও ঐ একই চিতায় ঝাঁপিয়ে পড়ে আত্মহুতি দিলেন। ফলে বিক্রমপুর মোসলমানদের করতলগত হল। শহীদ দরবেশ বাবা আদমকে সমাহিত করা হল তৎকর্তৃক নির্মিত মসজিদের গজ কয়েক পূর্বে। তখন থেকেই মসজিদটির নাম হল বাবা আদমের মসজিদ আর সমাধিটির নাম হল বাবা আদমের দরগা।

আরেকটি জনশ্রুতি এই রকমঃ কানাইচং গ্রামের জনৈক মোসলমান তার পুত্রের জন্ম উপলক্ষে গরু জবাই করায় তার উপর বল্লাল সেনের অকথ্য নির্যাতন নেমে আসে। অতি কষ্টে বল্লালী নির্যাতনের হাত থেকে পালিয়ে গিয়ে উক্ত ব্যক্তি মক্কায় বাবা আদমের জনৈক মহাপরাক্রমশালী ফকিরের শরাণাপন্ন হন। বিক্রমপুরের নির্যাতিত মুসলমানদেরকে রক্ষা করার জন্য বাবা আদম ৬/৭ হাজার সৈন্য সংগ্রহ করে মক্কা থেকে বিক্রমপুর অভিমুখে যাত্রা করেন। পথে পথে অনেক যুদ্ধ জয়ের পর তারা বিক্রমপুরে এসে পৌছেন। বল্লাল রাজার রাজধানী রামপালের নিকটস্থ দরগাবাড়ীতে ঘাঁটি গাড়েন। বাবা আদম গরু জবাই করে বল্লালের রাজপ্রসাদের অভ্যন্তরে মাংসের টুকরা গোপনে ছোড়ে মারেন। এতে বল্লাল রাজা অত্যন্ত ক্রুদ্ধ হন। রাজা বিভিন্ন জায়াগায় গুপ্তচর পাঠান গোহন্তাকে খোঁজে বের করার জন্য। কিছুক্ষণের মধ্যেই এক গুপ্তচর হন্তদন্ত হয়ে ফিরে এসে বললেন যে, নিকটেই এক বিদেশী মুসলিম সৈন্য বাহিনী তাবু ফেলেছে। এদের নেতা বাবা আদম রাজপ্রসাদের সন্নিকটেই দরগাবাড়ি এলাকায় নামাজরত রয়েছেন।

বল্লাল রাজা তক্ষুণি অশ্বারোহন করে উক্ত জায়গায় গিয়ে দেখেন বাবা আদম তখনও নামাজ পড়ছেন। রাজা চোখের পলকে বাবা আদমের ঘাড়ে তরবারি দিয়ে আঘাতের পর আঘাত করলেন। কিন্তু কি আশ্চর্য এক চুল পরিমাণও কাটল না। ফকিরেরও কোন ভাবান্তর দেখা গেল না। নিশ্চিন্তে নামাজ শেষ করার পর দরবেশ রাজাকে বললেন, “নিজের তরবারি ত্যাগ করে আমার তরবারি নিয়ে আমার ঘাড়ে আঘাত করেন।” দরবেশের নির্দেশ মতো রাজা চোখের পলকে তরবারির এক আঘাতে বাবা আদমের মস্তক দ্বিখন্তিত করলেন। কিন্তু ভাগ্যের নির্মম পরিহাস দৈবক্রমে খাঁচা থেকো পায়রা ছুটে যাওয়ায় রাজা এবং রাজপরিবারের সদস্যবৃন্দ এই হত্যাকান্ড ঘটার অব্যবহিত পরই অগ্নিকুন্ডে আত্মাহুতি দিলেন। এদিকে বাবা আদম নিহত হওয়ার সময় যে জায়াগায় নামাজরত ছিলেন ঠিক সে জায়াগায় এক রাতের মধ্যে অলৌকিকভাবে একটি প্রকান্ড মসজিদ তৈরী হয়ে গেল আর তার মরদেহ মসজিদের গজ কয়েক পূর্বে সমাধিস্থল হল। তখন থেকে মসজিদটির নাম হল বাবা আদমের মসজিদ আর মাজারটির নাম হল বাবা আদমের মাজার।

“বল্লাল চরিতম” নামক একটি সংস্কৃত পদ্য গ্রন্থ থেকে আরেকটি কাহিনী পাওয়া যায়। কাহিনীটি এইঃ করতোয়া তীরবর্তী মহাস্থানে উগ্র নামক একটি প্রাচীন শিবলিঙ্গ ছিল। শক্তি, শৈব, বৈঞ্চব, বৌদ্ধ সকলেই মন্দিরে শিব পূজো করতে যেত। একদিন বল্লাল মহিষী মহুমুল্যে উপকরণ দিয়ে শিব পূজো করান। পূজার দ্রব্যের ভাগ নিয়ে মন্দিরের প্রধান পুরোহিত বা মহন্তের সাথে রাজপুরোহিতের বিবাদ দেখা দেয়। মহন্ত রাজপুরোহিতকে মন্দির থেকে তাড়িয়ে দেন। রাজপুরোহিত রাজা বল্লালের নিকট মহন্তের এই অসদাচরণের কথা জ্ঞাপন করলে রাজা মহন্ত ধর্মগিরিকে তার সমস্ত অনুসারীসহ নির্বাসিত করেন। ধর্মগিরি শত্রুর বিরুদ্ধে প্রতিশোধ লওয়ার জন্য মুসলমানদের নেতা বাবা আদম নামক ফকীরের শরণাপন্ন হন এবং তাকে বিক্রমপুর আক্রমণ করার জন্য প্ররোচিত করেন। ফকির বাবা আদম রাজা বল্লাল সেনের সাথে যুদ্ধ করার জন্য পাঁচ হাজার সৈন্য নিয়ে বিক্রমপুরে উপস্থিত হলেন। যুদ্ধে যাওয়ার সময় বল্লাল রাজা খাঁচায় করে এক জোড়া পায়রা সঙ্গে নিয়ে যান এবং রাজ মহিষী ও রাজপরিবারের অন্যান্য সদস্যকে বলে যান যে, পায়রা যদি একা একা রাজপুরীতে ফিরে আসে তাহলে বুঝতে হবে যে রাজা যুুদ্ধে পরাজিত ও নিহত হয়েছেন। তখন তারা যেন নিজ নিজ মনসম্ভ্রম ও জাতিধর্ম রক্ষার জন্য জ্বলন্ত অগ্নিকুন্ডে ঝাঁপ দিয়ে মৃত্যুবরণ করেন। কানাইচং মাঠে তুমুল যুদ্ধের পর বল্লাল রাজা জয়লাভ করেন। মুসলিম সৈন্য পরাজিত হয়। বাবা আদম বল্লালের হাতে নিহত হন। কিন্তু দুর্ভাগ্যক্রমে এক অসতর্কমুহুর্তে পায়রা খাঁচা থেকে ছুটে উড়ে যায় রাজপ্রসাদে। প্রাসাদবাসীরা পায়রা একা একা উড়তে আসতে দেখে পূর্ব ব্যবস্থানুসারে জ্বলন্ত চিতায় আত্মবিসর্জন দেন। এদিকে রাজা খাঁচা পায়রা শূন্য দেখামাত্রই ছুটলেন রাজধানী রামপাল অভিমুখে। রাজপ্রাসাদে পৌঁছে দেখলেন ইতিপূর্বেই সব শেষ হয়ে গেছে। রাজা শোকে দুঃখে বিহ্বল হয়ে পড়লেন। তখনই তার মনে পড়ল জনৈক যোগীর অভিশাপের কথা।

অপর একটি জনশ্রুতি থেকে জানা যায় যে, কানাইচং এর মাঠে এক রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ হয়। এই যুদ্ধে বল্লাল সেন নিহত হন। ফকীরের সৈন্য বাহিনী জয়লাভ করে এবং ফলে বিক্রমপুরে মুসলিম শাসন স্থায়ীভাবে প্রতিষ্ঠিত হয়। ডঃ জেমস ওয়াইজও এই জনশ্রুতিটির উল্লেখ করেছেন।

অপর একটি জনশ্রুতি থেকে জানা যায় যে, বল্লাল রাজা ফকীরের সৈন্যদের সাথে যুদ্ধ করে পরাজিত হন ঠিকই কিন্তু তিনি নিহন হননি। তিনি পরাজিত হলে আল্লাহ তাকে সশরীরে ও সপরিবারে উর্ধ্বলোকে পাঠিয়ে নেন এবং এর ফলে বল্লাল রাজার বংশ লুপ্ত হয়ে যায়।

হিন্দু রাজার রাজ্যে বসবাসকারী মুসলমানের পুত্রের আঁকিকা উপলক্ষ্যে গরু জবেহ, চিলের সাহায্যে এই জবেহ করা গরুর মাংশ হিন্দু রাজার প্রাসাদে নিক্ষেপ, তার ফলে হিন্দু রাজা কর্তৃক মুসলমানের উপর অত্যাচার এবং এর প্রতিক্রিয়া হিসাবে মুসলিম রাজশক্তি বা কোন মুসলিম ফকীর কর্তৃক হিন্দু রাজার রাজ্য আক্রমণ ও অধিকার এবং পরিণতিতে হিন্দু রাজার সপরিবারে জলন্ত অগ্নিকুন্ডে প্রাণবিসর্জন সংক্রান্ত এই একই ধরনের কাহিনী মুসরমানদের সিলেট ও সাতগাঁও বিজয় সম্পর্কেও প্রচলিত আছে। সুতরাং দেখা যায় যে, বাংলাদেশের বিভিন্ন এলাকায় মুসলমান বিজয়ের সাথে এই ধরনের কাহিনীর অবতারণা বহুল প্রচলিত।

তাছাড়া সমগ্র বিষয়টি অত্যন্ত প্রহেলিকাময়। ৬/৭ হাজার বিদেশী শত্রুসৈন্য সুদূর মক্কা থেকে এসে রাজধানীর রাজপ্রাসাদের মাইল দূরে গোপনে ঘাঁটি গড়ল আর তাদের অবস্থান খোঁজে বের করার জন্য গুপ্তচর নিয়োগ করতে হল, সামান্য একজন বিদেশী ফকীরের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে রাজাকে যেতে হল এবং ফকীরের হাতে পরাজিত ও নিহত হওয়ার আশঙ্কা করা হল-এই কাহিনীকে নিতান্তই গাঁজাখুড়ি গল্প ছাড়া আর কিছুই ভাবা যায় না।

তদুপরি যুদ্ধটি সংঘটিত হয়েছিল রাজপ্রাসাদ থেকে মাইল দুয়েক দূরত্বে। সেখান থেকে রাজপুরীতে দৌড়ে আসতে মাত্র কয়েক মিনিট সময় লাগার কথা। অথচ এত নিকটবর্তী স্থানে যুদ্ধ করতে যেয়ে রাজা কবুতর সঙ্গে করে নিয়ে গিয়েছিলেন যুদ্ধের ফলাফল সেই কবুতরের মাধ্যমে রাজপূরীতে পৌঁছে দেয়ার জন্য আর সেই কবুতর অসতর্কতার কারণে ছাড়া পেলে এই সামান্য দূরুত্ব পার হওয়ার আগেই রাজপুরীতে সব সদস্য অগ্নিকুন্ডে ঝাঁপ দিয়ে মারা গেলেন এবং শোকে দুঃখে রাজাও একই অগ্নিকুন্ডে ঝাঁপিয়ে পড়ে প্রাণ বিসর্জন দিলেন-এই কাহিনীকেও সত্য বলে কিছুতেই মেনে নেয়া যায় না।

যাই হোক ঐতিহাসিক বিচার বিশ্লেষন জনশ্রুতিগুলোর মধ্যে তথ্য কতটুকু প্রমাণিত তা এখন আলোচনা করে দেখা যাক।

বল্লাল সেনের আমলের একখানি তাম্রশাসন ও একটি মূর্তিলিপি, বল্লাল সেনের পুত্র লক্ষণ সেনের আটখানি তাম্রশাসন এবং লক্ষণ সেনের পুত্র বিশ্বরূপ সেন ও কেশব সেনের তাম্রশাসন (যার সবগুলোই প্রদান করা হয়েছে বিক্রমপুরের সংস্থাপিত রাজধানী থেকে) আমরা জানতে পারি সেন রাজা বল্লাল সেন সুদীর্ঘ ১৮ (আঠার) বৎসর রাজত্ব করার পর বৃদ্ধ বয়সে পুত্র লক্ষণ সেনের হাতে রাজ্যভার অর্পন করে মৃত্যু বরণ করেন। লক্ষণ সেন ১২০৩/১২০৪ খ্রীষ্টাব্দের দিকে মুসলিম সেনাপতি বখতিয়ার খলজী কতৃক উত্তর ও উত্তর পশ্চিমবঙ্গ থেকে উৎখাত হয়ে দক্ষিণ-পূর্ব বঙ্গ তথা বিক্রমপুরে এসে ২/৩ বৎসর রাজ্য পরিচালনার পর মৃত্যুবরণ করেন। তার মৃত্যুর পর তার দুই পত্র বিশ্বরূপ সেন ও কেশব সেন পর পর বিক্রমপুরের সিংহাসনে আরোহন করেন। এই দুই ভাই মিলে অন্ততঃ ১২৩০ খ্রীষ্টাব্দ পর্যন্ত বিক্রমপুরকে কেন্দ্র করেই দক্ষিণ-পূর্ব বঙ্গে রাজত্ব করেন। সমকালীন মুসলিম ঐতিহাসিক মিনহাজ-ই-সিরাজ যে সময়ে তার “তবকাৎ-ই-নাসিরী” গ্রন্থ রচনা সমাপ্ত করেন (১২৬০ খ্রীষ্টাব্দের দিকে) বা অন্ততঃ যে সময়ে তিনি লক্ষণাবর্তী বা গৌড়ে এসে বঙ্গদেশের ঐতিহাসিক বিবরণ সংগ্রহ করেন (১২৪৪-১২৪৫ খ্রীষ্টাব্দের দিকে) তখনও লক্ষণ সেনের বংশধর দক্ষিণ-পূর্ব বঙ্গে তথা বিক্রমপুরে রাজত্ব করেছিলেন বলে মিনহাজ পরিস্কার উলে−খ করেন। এখন প্রশ্ন বল্লাল সেনের পরিবার পরিজন সবাই যদি অগ্নিকুন্ডে ঝাঁপ দিয়ে মারা গিয়ে থাকেন এবং তাদের এই তথাকথিত মৃত্যুর সাথে সাথেই যদি বিক্রমপুরে মুসলিম শাসন স্থায়ীভাবে প্রতিষ্ঠিত হয়ে গিয়ে থাকে তবে বল্লাল সেনের পুত্র-পৌত্ররা পরবর্তী সময়ে অন্ততঃ ১২৪৫ খ্রীষ্টাব্দ পর্যন্ত বিক্রমপুরে রাজত্ব করলেন কি করে?

লক্ষণ সেনের সভাপন্ডিত ভবদেব ভট্ট, ধোয়ী, শরণ দত্ত, জয়দেব, গোবর্ধন, উমাপতিধর, হলায়ুধ মিশ্র, পুরুষোত্তম, ঈষাণ, পশুপতি প্রমুখ পন্ডিতগণ বহুবিধ বিষয়ে গ্রন্থ রচনা করেন। এদের কোন রচনায় বল্লাল সেন ও তথাকথিত বাবা আদমের যুদ্ধ বা বাবা আদম সম্পকেৃ বিন্দুমাত্র কোন ইঙ্গিতও নেই।

অধিকন্তু সমসাময়িক কালের মুসলিম ঐতিহাসিক মিনহাজুদ্দিন রচিত “তবকাৎ-ই-নাসিরী” যার রচনা কাল সমাপ্ত হয় ১২৬০ খ্রীষ্টাব্দের দিকে),জিয়াউদ্দিন বরণীর “তারিখ-ই-ফিরুজ শাহী” *(যার রচনা শুরু হয় ১২৬৬ খ্রীষ্টাব্দের দিকে অথবা ইসলামীর “ফতুহ-উস-সালাতীন” (যা রচিত হয় ১৩৫০ খ্রীষ্টাব্দের দিকে) গ্রন্থেও এই তথাকথিত যুদ্ধ বা বাবা আদমের বিন্দুমাত্র আভাস নেই। অথচ এই ঐতিহাসিকবৃন্দের সবাই ছিলেন মুসলমানদের প্রথম বঙ্গ অভিযান ও অধিকারের ইতিহাস রচয়িতা ও জনশ্রুতি সংগ্রাহক। যদি বাবা আদম নামক কোন মুসলিম ফকীর সুদুর মক্কা থেকে ৫/৭ হাজার সৈন্য নিয়ে বিক্রমপুরে এসে এত বড় একটা বীরত্বপূর্ণ ঘটনা ঘটাতেন তা হলে সমকালীন মুসলিম ঐতিহাসিকবৃন্দ তাদের স্ব স্ব গ্রন্থে এর উলে−খ অবশ্যই করতেন। কেন না এমন চাঞ্চল্যকার ঘটনা নিঃসন্দেহেই মুসলমানদের জন্য একটা বিরাট গৌরবের ব্যাপর। কিন্তু তারা তথাকথিত বাবা আদম ও তার বিক্রমপুর অভিযানের ব্যাপারে সম্পূর্ণ নীরব- এর লেশমাত্র আভাসও তাদের গ্রন্থে নেই। মোট কথা সেন রাজা বল্লাল সেনের পুত্র লক্ষণ সেনের রাজত্বকালে ১২০৪ খ্রীষ্টাব্দের দিকে মুসলিম সেনাধ্যক্ষ ইখতিয়ার উদ্দিন মুহাম্মদ বিন বখতিয়ার খলজীর বঙ্গ বিজয়ের পূর্বে বঙ্গে বা বিক্রমপুরে কোন মুসলিম অভিযান হয়েছিল এ কথা কোন প্রামাণ্য ইতিহাসে পাওয় যায় না।

ইতিপূর্বে একটি জনশ্রুতি থেকে আমরা জানতে পেয়েছি যে, বাবা আদম মক্কা থেকে এসে বিক্রমপুরের দরগাবাড়িতে একটি মসজিদ নির্মাণ করান এবং নিজের নামে এর নামকরণ করেন বাবা আদমের মসজিদ। অন্য একটি জনশ্রুতির তথ্য একটু ভিন্ন ধরনের আমরা দেখতে পেয়েছি। এতে আছে বল্লাল সেনের সাথে ফকীর বাবা আদমের যুদ্ধ হয়। যুদ্ধে বাবা আদম নিহন হন। বাবা আদম যে জায়াগায় নিহত হন ঠিক সে জায়গায়ই অলৌকিকভাবে এক রাতের মধ্যেই একটি মসজিদ তৈরী হয়ে যায় এবং মসজিদ থেকে গজ কয়েক পূর্বে তার মরদেহ অলৌকিকবাবে সমাহিত হয়। মসজিদটির নাম হয় বাবা আদমের মসজিদ আর মাজারটির নাম হয় বাবা আদমের মাজার।

মাজারটিতে কোন পরিচয় ফলক নেই। মসজিটির প্রধান প্রবেশ পথের উপরে একটি পরিচয় ফলক রয়েছে। তুঘরা অক্ষরে উৎকীর্ণ এই শিলালিপি থেকে দেখা যায়, এই মসজিদটি নির্মিত হয় ১৪৮৩ খ্রীষ্টাব্দে। নির্মাণ করেন কাফুর নামে একজন মালিক বা পদস্থ সরকারী কর্মকর্তা। শিলালিপির বাংলা অনুবাদ হচ্ছে, “সর্বশক্তিমান আল্লাহ বলেছেন, ‘নিশ্চয়ই মসজিদ আল্লাহর সম্পত্তি, আল্লাহর সঙ্গে কাউকে অংশীদার করো না”। নবী (সাঃ) বলেছেন, যিনি একটি মসজিদ নির্মাণ করান আল্লাহ তার জন্য বেহেস্ত একটি প্রাসাদ নির্মাণ করেন” এই জামে মসজিদ নির্মাণ করার মহান মালিক কাফুর, সুলতান মোহাম্মদ শাহ’র পুত্র সুলতান জালাল উদ্দিন ফতেহ শাহর আমলে, ৮৮৮ হিজরীর রজব মাসের মধ্যভাগে”।

শিলালিপিতে মসজিদটির প্রতিষ্ঠাতার নাম রয়েছে- কাফুর। সুলতানের আমলে নির্মিত হয় বলে তার পিতার নামসহ তার নাম রয়েছে-সুলতানা মোহাম্মদ শাহর পুত্র সুলতান জালাল উদ্দিন ফতেহ শাহ্‌ প্রতিষ্ঠার তারিখ রয়েছে ৮৮৮ হিজরীর রজব মাসের মধ্যভাগ। মসজিদটির নাম রয়েছে-জামি মসজিদ। কেন প্রতিষ্ঠা করা হয় তার কারণ রয়েছে- পূর্ণ অর্জনের জন্য। অর্থাৎ মসজিদটির নির্মাণ সম্পর্কীয় সমস্ত তথ্যই রয়েছে। কিন্তু কথিত বাবা আদমের কোন উল্লেখ নেই, উল্লেখ নেই কোন মাজারেরও।

তদুপরি কথিত বাবা আদমের সাথে বল্লাল সেনের যুদ্ধ হয় দ্বাদশ শতাব্দীতে কেননা রাজা বল্লাল দ্বাদশ শতাব্দীরই মানুষ। মসজিদটি নির্মিত হয় পঞ্চদশ শতাব্দীর শেষপদে। অর্থাৎ কথিত বাবা আদমের নিহত হওয়ার ৩০০ (তিন শত) বছরেরও অধিকার পরে। ৩০০ (তি শত) বছর পূর্বের কোন ধর্মপ্রচারক বীর শহীদের স্মরণার্থে যদি এই মসজিদ নির্মাণ করা হয় এবং সেই ধর্মপ্রচারক শহীদের নামানুসারে এই মসজিদটির “বাবা আদমের মসজিদ” নামকরণ হয় তা হলে শিলালিপিতে সে নামটিই প্রতিষ্ঠাতার নামের চেয়েও বেশী গুরুত্ব দিয়ে উল্লেখ করার কথা। কিন্তু সে ধরনের কোন নামই পরিচয় ফলকে নেই। সুতরাং এখান থেকে পরিস্কার ভাবেই প্রমাণ মেলে যে, এই মসজিদটির প্রতিষ্ঠাতা মালিক কাফুর এই মসজিদের “বাবা আদমের মসজিদ” এই নামকরণটি করেন নি।

অবস্থান: কাঠালতলা, রামপাল, মুন্সীগঞ্জ।

ডিসি-ওয়েবসাইট

Comments are closed.